বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হারাল্ড হার্ডরাডা ও স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধ: ১০৬৬ সালে কীভাবে শেষ হয়েছিল ভাইকিং যুগ?

সিরিজ: ভাইকিং যুগ: অভিযান, বিজয় ও নর্স সভ্যতার ইতিহাস

হারাল্ড হার্ডরাডা ও স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধ: ১০৬৬ সালে কীভাবে শেষ হয়েছিল ভাইকিং যুগ?
১০৬৬: ভাইকিং যুগের প্রতীকী শেষ অধ্যায়

ইতিহাসের কোনো যুগ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট দিনে হঠাৎ শেষ হয়ে যায় না। রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ধর্ম, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সমাজের পরিবর্তন কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে চলতে থাকে। ভাইকিং যুগের ক্ষেত্রেও ১০৬৬ সাল কোনো জাদুকরী সীমারেখা ছিল না। স্ক্যান্ডিনেভীয়রা এর পরেও সমুদ্রযাত্রা করেছে, যুদ্ধ করেছে এবং বিদেশে অভিযান চালিয়েছে। তবু ২৫ সেপ্টেম্বর ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ডের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নরওয়ের রাজা হারাল্ড হার্ডরাডার পরাজয় ও মৃত্যু ঐতিহাসিকভাবে এত তাৎপর্যপূর্ণ যে ঘটনাটিকে প্রচলিতভাবে ভাইকিং যুগের প্রতীকী সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়।

এই যুদ্ধকে বুঝতে হলে শুধু ১০৬৬ সালের কয়েকটি দিনের দিকে তাকালে চলবে না। হারাল্ড হার্ডরাডার জীবন নিজেই ভাইকিং যুগের শেষপর্বের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন নরওয়ের রাজা, নির্বাসিত যোদ্ধা, পূর্ব ইউরোপের রাজদরবারের সৈনিক, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ভারাঙ্গিয়ান গার্ডের সদস্য এবং বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনানায়ক। শেষ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডের মুকুট দাবি করতে বিশাল নৌবহর নিয়ে উত্তর সাগর পাড়ি দেন।

হারাল্ডের পুরোনো নর্স নাম ছিল Haraldr Sigurðarson। তিনি আনুমানিক ১০১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সৎভাই ছিলেন নরওয়ের রাজা ওলাফ হ্যারাল্ডসন, যিনি পরে সেন্ট ওলাফ নামে পরিচিত হন।

১০৩০ সালে নরওয়ের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে ওলাফ স্টিকলেস্টাদের যুদ্ধে নিহত হন। তরুণ হারাল্ডও সেই যুদ্ধে তাঁর পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন বলে পরবর্তী উৎসে জানা যায়। পরাজয়ের পর আহত হারাল্ড স্ক্যান্ডিনেভিয়া ছেড়ে পূর্বদিকে পালিয়ে যান।

এরপর তাঁর জীবনের একটি অসাধারণ অধ্যায় শুরু হয়। তিনি প্রথমে কিয়েভীয় রুসের শাসক ইয়ারোস্লাভ দ্য ওয়াইজের পরিবেশে আশ্রয় পান এবং সামরিক কাজে যুক্ত হন। নর্স ও পূর্ব ইউরোপের সম্পর্ক তখন নতুন কিছু ছিল না। কয়েক শতাব্দী ধরে ভারাঙ্গিয়ানরা বাল্টিক ও নদীপথ ধরে রুস ও বাইজেন্টাইন বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল।

পরে হারাল্ড কনস্টান্টিনোপলে যান এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ভারাঙ্গিয়ান গার্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। এই বাহিনীতে স্ক্যান্ডিনেভীয় ও পরবর্তীকালে অ্যাংলো-স্যাক্সন যোদ্ধারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

হারাল্ডের পরবর্তী সাগাগুলো তাঁর ভূমধ্যসাগরীয় অভিযানকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বর্ণনা করে। তিনি সিসিলি, বলকান ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে সাগায় বর্ণিত তাঁর প্রতিটি যুদ্ধ ও ব্যক্তিগত কীর্তি সমসাময়িক প্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না।

তবু একটি বিষয় পরিষ্কার—হারাল্ড শুধু স্ক্যান্ডিনেভিয়ার স্থানীয় যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্যের সামরিক ব্যবস্থায় বহু বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।

বাইজেন্টাইন জগতে তিনি বিপুল সম্পদও অর্জন করেন। পরে তিনি রুস অঞ্চলে ফিরে যান এবং শেষ পর্যন্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই সম্পদ তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১০৪৬ সালের দিকে হারাল্ড নরওয়েতে ফিরে এসে তাঁর ভাতিজা রাজা ম্যাগনুস দ্য গুডের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা করেন। ১০৪৭ সালে ম্যাগনুস মারা গেলে হারাল্ড নরওয়ের একক রাজা হন।

পরবর্তী প্রায় দুই দশক তিনি নিজের রাজকীয় ক্ষমতা শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। তাঁর উপনাম Hardrada পুরোনো নর্স harðráði থেকে এসেছে, যার অর্থ মোটামুটি “কঠোর শাসক” বা “কঠোর পরামর্শের মানুষ”। নামটি তাঁর দৃঢ় ও কখনো নির্মম রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

হারাল্ড দীর্ঘদিন ডেনমার্কের রাজা সোয়েন দ্বিতীয়ের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ডেনিশ সিংহাসনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। বহু সামুদ্রিক যুদ্ধ ও অভিযান সত্ত্বেও তিনি শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ডেনমার্ক দখল করতে পারেননি। ১০৬৪ সালের দিকে দুই শাসকের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ডেনমার্কের দিকে সম্প্রসারণ ব্যর্থ হওয়ার কিছুদিন পরই ইংল্যান্ডে এমন এক উত্তরাধিকার সংকট সৃষ্টি হয়, যা হারাল্ডের সামনে আরও বড় সুযোগ এনে দেয়।

ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড দ্য কনফেসর ৫ জানুয়ারি ১০৬৬ সালে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। তাঁর কোনো সরাসরি উত্তরাধিকারী না থাকায় ইংরেজ সিংহাসন নিয়ে একাধিক দাবিদার সামনে আসে।

ইংরেজ অভিজাতদের শক্তিশালী পরিষদ উইটান হ্যারল্ড গডউইনসনকে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ক্ষমতাবান অভিজাত পরিবারের সদস্য এবং এডওয়ার্ডের শাসনের শেষপর্বে কার্যত রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।

কিন্তু তাঁর সিংহাসনের ওপর বিদেশি দাবিও ছিল। নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম দাবি করেন যে এডওয়ার্ড তাঁকে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং হ্যারল্ডও একসময় তাঁর দাবিকে সমর্থনের শপথ করেছিলেন। এসব দাবির সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও ব্যাখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।

একই সময়ে নরওয়ের হারাল্ড হার্ডরাডাও ইংল্যান্ডের সিংহাসনের দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর দাবির ভিত্তি ছিল পূর্ববর্তী স্ক্যান্ডিনেভীয় রাজাদের মধ্যে হওয়া উত্তরাধিকারসংক্রান্ত রাজনৈতিক সমঝোতার ঐতিহ্য। বিশেষ করে নরওয়ের ম্যাগনুস দ্য গুড ও ডেনমার্ক-ইংল্যান্ডের হার্ডিকনুটের মধ্যকার কথিত চুক্তিকে এই দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

দাবিটি ইংরেজদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য ছিল, সেটি অন্য প্রশ্ন। কিন্তু হারাল্ডের কাছে সিংহাসনের দাবি একটি বিশাল সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করেছিল।

তাঁর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন হ্যারল্ড গডউইনসনের নিজের ভাই টোস্টিগ গডউইনসন

টোস্টিগ একসময় নর্থামব্রিয়ার আর্ল ছিলেন। কিন্তু তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর ১০৬৫ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। রাজা এডওয়ার্ড শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের দাবি মেনে নিলে হ্যারল্ড গডউইনসনও ভাইকে পুনর্বহাল করতে পারেননি বা করেননি। ফলে টোস্টিগ নির্বাসিত হন এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ অবস্থান নেন।

১০৬৬ সালে টোস্টিগ বিভিন্ন জায়গা থেকে সামরিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি হারাল্ড হার্ডরাডার সঙ্গে জোট বাঁধেন। ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ নরওয়েজীয় অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত।

হারাল্ড তখন ইংল্যান্ড আক্রমণের জন্য বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। মধ্যযুগীয় উৎসে তাঁর নৌবহরের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন বিবরণ রয়েছে, প্রায়ই ৩০০-এর কাছাকাছি জাহাজের কথা বলা হয়। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত নয়, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজকীয় অভিযান ছিল।

এটি নবম শতকের ছোট উপকূলীয় লুণ্ঠন অভিযান ছিল না। একজন খ্রিস্টীয় স্ক্যান্ডিনেভীয় রাজা একটি সংগঠিত সেনাবাহিনী নিয়ে আরেকটি খ্রিস্টীয় রাজ্য জয় করতে যাচ্ছিলেন। এই বাস্তবতাই দেখায় যে ১০৬৬ সালের “ভাইকিং” পৃথিবী ৭৯৩ সালের পৃথিবীর তুলনায় কতটা বদলে গিয়েছিল।

হারাল্ড নরওয়ে থেকে যাত্রা করে উত্তর ইংল্যান্ডের দিকে অগ্রসর হন। টোস্টিগ তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। নরওয়েজীয় নৌবহর হাম্বার অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং ইয়র্কের দিকে এগোয়।

ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন নর্থামব্রিয়ার আর্ল মরকার এবং তাঁর ভাই মার্সিয়ার আর্ল এডউইন। তাঁরা নরওয়েজীয় বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সেনাবাহিনী সংগঠিত করেন।

২০ সেপ্টেম্বর ১০৬৬ সালে ফুলফোর্ডের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, ইয়র্কের কাছে। হারাল্ড ও টোস্টিগের বাহিনী এডউইন ও মরকারের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে।

ফুলফোর্ডে জয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ইংল্যান্ডের প্রধান সামরিক প্রতিরোধ সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে এবং ইয়র্ক হারাল্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

এই মুহূর্তে হারাল্ড হার্ডরাডার অভিযান সফল হতে চলেছে বলে মনে হতে পারে। উত্তর ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগর তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসছিল এবং স্থানীয় জিম্মি ও সমর্থন সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছিল।

কিন্তু দক্ষিণ ইংল্যান্ডে রাজা হ্যারল্ড গডউইনসন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় প্রতিক্রিয়া জানান।

তিনি কয়েক মাস ধরে দক্ষিণ উপকূলে নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়ামের সম্ভাব্য আক্রমণের অপেক্ষায় ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর প্রধান সেনাবাহিনী ইংল্যান্ডের দক্ষিণে কেন্দ্রীভূত ছিল। নরওয়েজীয় আক্রমণের খবর পাওয়ার পর তাঁকে দেশের প্রায় সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য অতিক্রম করে উত্তরে যেতে হয়।

হ্যারল্ড তাঁর হাউসকার্ল ও সংগৃহীত ইংরেজ বাহিনী নিয়ে দ্রুত উত্তরমুখী যাত্রা করেন। লন্ডন থেকে ইয়র্ক অঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। মধ্যযুগীয় সেনাবাহিনীর জন্য এত দ্রুত এই পথ অতিক্রম করা ছিল অসাধারণ সামরিক কৃতিত্ব।

২৫ সেপ্টেম্বর ১০৬৬ সালে ইংরেজ সেনাবাহিনী স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নরওয়েজীয় বাহিনীকে কার্যত অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরে ফেলে।

হারাল্ড ও টোস্টিগ সম্ভবত ইয়র্কের আত্মসমর্পণের অংশ হিসেবে জিম্মি গ্রহণের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের নৌবহরের বড় অংশ রিকল এলাকায় অবস্থান করছিল।

দিনটি উষ্ণ ছিল বলে কিছু পরবর্তী উৎসে উল্লেখ আছে এবং নরওয়েজীয় বাহিনীর একটি অংশ তাদের ভারী বর্ম জাহাজে রেখে এসেছিল বলে ঐতিহ্যগত বর্ণনা রয়েছে। এই ধরনের নির্দিষ্ট বিবরণ পরবর্তী উৎস থেকে এসেছে, তাই সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। তবে ইংরেজ বাহিনীর আকস্মিক উপস্থিতি যে নরওয়েজীয়দের জন্য বড় কৌশলগত সমস্যা সৃষ্টি করেছিল, তা স্পষ্ট।

স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধের সঙ্গে একটি বিখ্যাত কিংবদন্তি জড়িত। Anglo-Saxon Chronicle-এর একটি সংস্করণে বলা হয়েছে, এক বিশাল নরওয়েজীয় যোদ্ধা একাই সেতু আটকে রেখে বহু ইংরেজ সৈন্যকে হত্যা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত একজন ইংরেজ যোদ্ধা সেতুর নিচে গিয়ে বর্শা দিয়ে তাঁকে হত্যা করেন।

ঘটনাটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও সেই যোদ্ধার নাম জানা যায় না এবং কাহিনিটির প্রতিটি নাটকীয় বিবরণ যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই এটিকে যুদ্ধের নিশ্চিত সামরিক ঘটনা না বলে মধ্যযুগীয় বর্ণনার একটি বিখ্যাত পর্ব হিসেবে দেখা ভালো।

সেতু পার হওয়ার পর ইংরেজ বাহিনী মূল নরওয়েজীয় সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়। হারাল্ডের সৈন্যরা প্রতিরক্ষা সংগঠিত করে এবং প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়।

নর্স ও অ্যাংলো-স্যাক্সন উভয় পক্ষের যুদ্ধপদ্ধতিতে ঢালবদ্ধ পদাতিক বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট কৌশল সম্পর্কে পরবর্তী সাগা অনেক বিস্তারিত বর্ণনা দিলেও সব তথ্য সমসাময়িক উৎসে নিশ্চিত নয়।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে হারাল্ড হার্ডরাডা নিহত হন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী তাঁর গলায় একটি তীর আঘাত করেছিল। এই নির্দিষ্ট মৃত্যুর বিবরণ মূলত পরবর্তী নর্স সাহিত্য থেকে এসেছে; তবে যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত।

হারাল্ডের পতনের পরও যুদ্ধ শেষ হয়নি। টোস্টিগ আত্মসমর্পণের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে লড়াই চালিয়ে যান এবং তিনিও নিহত হন।

নরওয়েজীয়দের জন্য কিছু আশা আসে যখন রিকলে থাকা আইস্টেইন অরের নেতৃত্বাধীন অতিরিক্ত বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছায়। তারা এত দ্রুত অগ্রসর হয়েছিল যে পরবর্তী নর্স ঐতিহ্যে এই পর্যায়কে “Orri's Storm” বা আইস্টেইনের ঝড় নামে বর্ণনা করা হয়েছে।

কিন্তু তারা যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলাতে পারেনি। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ক্লান্ত অবস্থায় এসে তাদেরও ভয়াবহ ক্ষতি হয়। শেষ পর্যন্ত নরওয়েজীয় বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়।

ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায় না। পরবর্তী একটি বিখ্যাত বর্ণনায় বলা হয়েছে, যে বিশাল নৌবহর ইংল্যান্ডে এসেছিল তার জীবিতদের দেশে ফেরাতে মাত্র ২৪টি জাহাজ যথেষ্ট হয়েছিল। এই সংখ্যাকে নিখুঁত সামরিক পরিসংখ্যান হিসেবে নেওয়া উচিত নয়, কিন্তু উৎসগুলো যে বিপর্যয়কর নরওয়েজীয় ক্ষতির স্মৃতি সংরক্ষণ করেছে, তা স্পষ্ট।

হারাল্ডের ছেলে ওলাফকে ইংরেজরা ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়। জীবিত নরওয়েজীয়রা ইংল্যান্ড ছেড়ে যায়।

হারাল্ড হার্ডরাডার ইংল্যান্ড জয়ের অভিযান শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু হ্যারল্ড গডউইনসনের জন্য যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং তাঁর সামনে আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছিল।

স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে যুদ্ধের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম দক্ষিণ ইংল্যান্ডে অবতরণ করেন। হ্যারল্ডকে সদ্য যুদ্ধ করা ক্লান্ত সেনাবাহিনী নিয়ে আবার দ্রুত দক্ষিণে ফিরতে হয়।

১৪ অক্টোবর ১০৬৬ সালে হেস্টিংসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেখানে হ্যারল্ড গডউইনসন নিহত হন এবং উইলিয়াম বিজয় অর্জন করেন। পরে তিনি উইলিয়াম দ্য কনকারার নামে ইংল্যান্ডের রাজা হন।

অদ্ভুতভাবে, উইলিয়াম নিজেও নর্স ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করছিলেন। তাঁর নরম্যান পূর্বপুরুষেরা ছিল রোলোর নেতৃত্বে ফ্রান্সে বসতি স্থাপনকারী স্ক্যান্ডিনেভীয়দের বংশধর। কিন্তু ১০৬৬ সালের মধ্যে তারা ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ফরাসিভাষী খ্রিস্টীয় নরম্যান অভিজাতে পরিণত হয়েছিল।

ফলে একই বছরে ইংল্যান্ড প্রথমে শেষ মহান নরওয়েজীয় আক্রমণগুলোর একটিকে প্রতিহত করে, তারপর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নর্স বংশোদ্ভূত কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির নরম্যানদের কাছে পরাজিত হয়।

তাহলে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধকে কেন ভাইকিং যুগের সমাপ্তি বলা হয়?

প্রথম কারণ হলো হারাল্ড হার্ডরাডার ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন পুরোনো নর্স সামরিক সম্প্রসারণের বিস্তৃত ভূগোলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল—নরওয়ে থেকে রুস, কনস্টান্টিনোপল, ভূমধ্যসাগর এবং শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড। তিনি এমন এক স্ক্যান্ডিনেভীয় যোদ্ধা-রাজার প্রতীক, যার সামরিক জীবন ভাইকিং যুগের আন্তর্জাতিক জগতকে ধারণ করে।

দ্বিতীয় কারণ হলো তাঁর ইংল্যান্ড অভিযান। এটি ছিল উত্তর সাগর পেরিয়ে একটি বৃহৎ স্ক্যান্ডিনেভীয় বাহিনীর ইংল্যান্ড জয়ের শেষ বড় প্রচেষ্টাগুলোর একটি। কনুট দ্য গ্রেট কয়েক দশক আগে যা সফলভাবে করেছিলেন, হারাল্ড ১০৬৬ সালে সেটি পুনরাবৃত্তি করতে চেয়েছিলেন।

তৃতীয় এবং আরও গভীর কারণ হলো, ১০৬৬ সালের মধ্যে স্ক্যান্ডিনেভিয়া নিজেই বদলে গিয়েছিল। ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেন এখন ক্রমে কেন্দ্রীভূত খ্রিস্টীয় রাজ্যে পরিণত হচ্ছিল। স্থানীয় প্রধান ও স্বাধীন যোদ্ধাদলের জায়গায় রাজকীয় ক্ষমতা, গির্জা, কর এবং সংগঠিত প্রশাসন শক্তিশালী হচ্ছিল।

হারাল্ড নিজেই এর প্রমাণ। তিনি ওডিনের নামে ইংল্যান্ড জয় করতে আসা কোনো প্রাক্‌-খ্রিস্টীয় নর্স প্রধান ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টীয় নরওয়েজীয় রাজা, যিনি রাজবংশীয় অধিকারের ভিত্তিতে আরেকটি খ্রিস্টীয় রাজ্যের সিংহাসন দাবি করেছিলেন।

এই বাস্তবতা দেখায় যে ভাইকিং যুগের অবসান শুধু ভাইকিংদের সামরিক পরাজয়ের কারণে ঘটেনি। বরং নর্স সমাজ নিজেই এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছিল যে পুরোনো ধরনের “ভাইকিং পৃথিবী” আর আগের অবস্থায় ছিল না।

স্ক্যান্ডিনেভীয়রা এরপরও বিদেশে যুদ্ধ করেছে। ডেনিশ রাজারা পরবর্তী শতাব্দীতেও ইংল্যান্ডে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছেন। নরওয়েজীয়রা উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জে প্রভাব বজায় রেখেছে। নর্স বসতি গ্রিনল্যান্ডে আরও কয়েক শতাব্দী টিকে ছিল। তাই ২৫ সেপ্টেম্বর ১০৬৬-এর পর ভাইকিং কার্যকলাপ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—এমন দাবি ভুল।

এমনকি “ভাইকিং যুগ” শব্দটিও আধুনিক ইতিহাসবিদদের একটি কালবিভাজন। যারা তখন বেঁচে ছিল তারা ৭৯৩ সালে নিজেদের একটি নতুন ঐতিহাসিক যুগে প্রবেশ করতে বা ১০৬৬ সালে সেটি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেনি।

তারপরও ৭৯৩ সালের লিন্ডিসফার্ন এবং ১০৬৬ সালের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ দুটি শক্তিশালী প্রতীকী সীমারেখা তৈরি করে। প্রথমটিতে সমুদ্রপথে আসা নর্স আক্রমণকারীরা পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টীয় জগৎকে আতঙ্কিত করেছিল। দ্বিতীয়টিতে একটি ইংরেজ রাজ্য বিশাল নরওয়েজীয় আক্রমণকারী বাহিনীকে ধ্বংসাত্মকভাবে পরাজিত করেছিল।

এই দুই ঘটনার মাঝের প্রায় ২৭০ বছরে নর্সরা শুধু লুণ্ঠন করেনি। তারা ডাবলিন প্রতিষ্ঠা করেছে, ইয়র্ক শাসন করেছে, ডেনল গড়েছে, নরম্যান্ডিতে বসতি স্থাপন করেছে, রুসের নদীপথে কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌঁছেছে, আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডে উপনিবেশ গড়েছে এবং উত্তর আমেরিকার নিউফাউন্ডল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে।

একই সময়ে তাদের নিজেদের সমাজও বদলে গেছে। ওডিন ও থরের প্রকাশ্য ধর্মীয় জগতের জায়গায় খ্রিস্টধর্ম এসেছে। বিচ্ছিন্ন প্রধানতন্ত্রের পরিবর্তে ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনের রাজতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। রুনের পাশাপাশি লাতিন লিখনসংস্কৃতি ও গির্জার প্রশাসন বিস্তার লাভ করেছে।

এই পরিবর্তনের কারণে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধের তাৎপর্য শুধু একটি সামরিক পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক মুহূর্তের প্রতীক যখন ভাইকিং সম্প্রসারণের পুরোনো ঐতিহাসিক অধ্যায় এবং মধ্যযুগীয় স্ক্যান্ডিনেভীয় রাজতন্ত্রের নতুন অধ্যায় একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।

হারাল্ড হার্ডরাডার মৃত্যু সেই রূপান্তরের জন্য প্রায় নিখুঁত প্রতীক। কৈশোরে তিনি স্টিকলেস্টাদের যুদ্ধে লড়েছেন, নির্বাসনে রুসে গেছেন, কনস্টান্টিনোপলের ভারাঙ্গিয়ান গার্ডে কাজ করেছেন, ভূমধ্যসাগরীয় যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, বিপুল সম্পদ নিয়ে নরওয়েতে ফিরেছেন, রাজা হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত শত শত জাহাজ নিয়ে ইংল্যান্ড জয়ের চেষ্টা করেছেন।

তাঁর জীবনের পথ যেন ভাইকিং বিশ্বের মানচিত্রকেই অনুসরণ করে।

কিন্তু স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে তাঁর মৃত্যু দেখিয়ে দেয় যে সেই পৃথিবী ইতোমধ্যে বদলে যাচ্ছিল। স্ক্যান্ডিনেভীয়রা আর ইউরোপের বাইরে থেকে আসা রহস্যময় সমুদ্রযোদ্ধা ছিল না; তারা ইউরোপের খ্রিস্টীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।

এই কারণেই ১০৬৬ সালকে ভাইকিং ইতিহাসের শেষ অধ্যায় হিসেবে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি কোনো কঠোর শেষ তারিখ নয়, বরং দীর্ঘ রূপান্তরের একটি শক্তিশালী প্রতীক।

লিন্ডিসফার্নে ৭৯৩ সালের আকস্মিক আক্রমণ থেকে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে ১০৬৬ সালের হারাল্ড হার্ডরাডার পতন—এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ভাইকিংরা ইউরোপের উপকূলের আতঙ্ক থেকে বণিক, বসতি স্থাপনকারী, অভিযাত্রী এবং শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টীয় রাজ্যের শাসকে পরিণত হয়েছিল।

তাই স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে শুধু একজন নরওয়েজীয় রাজা পরাজিত হননি। সেখানে প্রতীকীভাবে শেষ হয়েছিল এমন একটি যুগ, যখন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রযাত্রীরা স্বাধীন অভিযান, বিজয় ও বসতির মাধ্যমে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রকে বারবার বদলে দিয়েছিল। ভাইকিংরা অদৃশ্য হয়ে যায়নি—তাদের উত্তরসূরিরাই মধ্যযুগীয় স্ক্যান্ডিনেভিয়া হয়ে উঠেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে