প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি: ভার্সাই চুক্তি, অর্থনৈতিক সংকট ও নাৎসিবাদের উত্থান
সিরিজ: নাৎসি জার্মানির উত্থান ও পতন
সংকটের ভেতর নাৎসিবাদের উত্থান
১৯১৮ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির লড়াই শেষ হলেও দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তখন কেবল শুরু হয়েছিল। চার বছরের যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়, খাদ্যাভাব তীব্র হয় এবং অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে মিত্রবাহিনী তখনো জার্মানির অধিকাংশ ভূখণ্ড দখল করেনি বলে বহু সাধারণ নাগরিক পরাজয়ের গভীরতা প্রথমে বুঝতে পারেননি। অথচ জার্মান সামরিক নেতৃত্ব জানত, সৈন্যবাহিনী আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই। এই ব্যবধান থেকেই পরে একটি বিপজ্জনক মিথের জন্ম হয়—জার্মান সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়নি; দেশের ভেতরের রাজনীতিবিদ, সমাজতন্ত্রী ও ইহুদিরা পেছন থেকে ছুরি মেরেছে। বাস্তবে এই দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল না, কিন্তু নাৎসিরা পরবর্তী সময়ে এটিকে অত্যন্ত কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে।
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নৌবিদ্রোহ, শ্রমিক বিক্ষোভ এবং বিপ্লবের আশঙ্কার মধ্যে সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্ম সিংহাসন ত্যাগ করেন। ১৯১৮ সালের ৯ নভেম্বর জার্মানিকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় এবং পরে ভাইমারে গৃহীত সংবিধানের ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ভাইমার প্রজাতন্ত্র শুরু থেকেই একটি গুরুতর দুর্বলতা বহন করছিল—সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ নতুন শাসনব্যবস্থাকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং পরাজয়, বিশৃঙ্খলা এবং জাতীয় অপমানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছিল। যুদ্ধবিরতিতে স্বাক্ষরকারী রাজনীতিবিদদের ডানপন্থীরা অবমাননাকরভাবে “নভেম্বরের অপরাধী” বলতে শুরু করে।
১৯১৯ সালের জুনে স্বাক্ষরিত ভার্সাই চুক্তি এই ক্ষোভকে আরও গভীর করে। চুক্তির ২৩১ নম্বর ধারা অনুসারে জার্মানি ও তার মিত্রদের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় স্বীকার করতে হয়। ধারাটি পরবর্তী ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছিল, কিন্তু জার্মান জনগণের কাছে এটি পরিচিত হয়ে ওঠে যুদ্ধাপরাধের ধারা হিসেবে। জার্মান প্রতিনিধিদের আলোচনার শর্ত নির্ধারণে প্রকৃত অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি; তাদের সামনে কার্যত চুক্তি গ্রহণ অথবা পুনরায় যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার বিকল্প রাখা হয়। ফলে চুক্তিটি জার্মানিতে একটি আরোপিত শান্তি বা ডিক্টাট হিসেবে পরিচিত হয়।
চুক্তির ফলে জার্মানি ইউরোপে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হারায়। আলসাস ও লোরেন ফ্রান্সের কাছে ফিরে যায়; পোল্যান্ডকে সমুদ্রপথ দেওয়ার জন্য পোলিশ করিডর সৃষ্টি হয়; দানৎসিগকে পৃথক মুক্ত নগরীর মর্যাদা দেওয়া হয় এবং সার অঞ্চলের কয়লাখনির সুবিধা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফ্রান্সকে দেওয়া হয়। জার্মানির বিদেশি উপনিবেশগুলোও কেড়ে নেওয়া হয়। দেশটির সেনাবাহিনী এক লাখ সদস্যে সীমাবদ্ধ করা হয়; বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ, বিমানবাহিনী, ট্যাংক ও সাবমেরিন নিষিদ্ধ হয়। রাইনল্যান্ডকে অসামরিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। এই শর্তগুলো জার্মানিকে শুধু সামরিকভাবে দুর্বল করেনি, জাতীয় মর্যাদায় আঘাত লেগেছে—এমন ধারণাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল।
১৯২১ সালে জার্মানির ওপর ১৩২ বিলিয়ন স্বর্ণ মার্ক ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারিত হয়। সম্পূর্ণ অঙ্কটি বাস্তবে একইভাবে আদায় করা হয়নি এবং পরে একাধিকবার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণের চাপ জার্মান রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর বিরাট প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে সাম্রাজ্যিক সরকার আগে থেকেই বিপুল ঋণ নিয়েছিল এবং যুদ্ধ শেষে কর বৃদ্ধি ও ব্যয় সংকোচনের পরিবর্তে নতুন সরকার বিপুল পরিমাণ কাগুজে মুদ্রা ছাপাতে থাকে। ফলে জার্মান মার্কের মূল্য ক্রমাগত কমে যায়। ক্ষতিপূরণই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ ছিল না; যুদ্ধকালীন ঋণ, উৎপাদনের ক্ষতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯২৩ সালে সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছে। জার্মানি ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবে কয়লা ও কাঠ সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ার পর ফরাসি ও বেলজীয় বাহিনী শিল্পসমৃদ্ধ রুর অঞ্চল দখল করে। জার্মান সরকার শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের নির্দেশ দেয় এবং কাজ বন্ধ রেখেও তাদের মজুরি দিতে থাকে। সেই অর্থ জোগাতে আরও মুদ্রা ছাপানো হয়। ফলাফল ছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অতিমুদ্রাস্ফীতি। যে অর্থে সকালে পণ্য কেনা যেত, সন্ধ্যায় সেই অর্থের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেত। মানুষ বেতন পাওয়ার পর দ্রুত দোকানে ছুটত, কারণ কয়েক ঘণ্টা পরই দাম বেড়ে যেতে পারত। সঞ্চয়নির্ভর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; বহু বছরের জমানো অর্থ প্রায় মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
এই সংকট কেবল দারিদ্র্য সৃষ্টি করেনি; এটি রাষ্ট্র, ব্যাংক, গণতন্ত্র ও প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর মানুষের বিশ্বাসও নষ্ট করেছিল। তবে সবাই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মূল্যহীন মুদ্রায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের সুযোগ পেয়েছিল, আবার বাস্তব সম্পদের মালিকেরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় ছিল। কিন্তু জনস্মৃতিতে ১৯২৩ সাল রয়ে যায় অপমান, নিরাপত্তাহীনতা ও সর্বস্ব হারানোর প্রতীক হিসেবে। নাৎসিরা পরে এই স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে দাবি করে যে কেবল একটি শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী সরকারই জার্মানিকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করতে পারবে।
১৯২৩ সালের সংকটের মধ্যেই অ্যাডলফ হিটলার ও তার নাৎসি দল বাভারিয়ায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। মিউনিখের বিয়ার হল অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং হিটলার গ্রেপ্তার হন। বিচারকে তিনি জাতীয় পর্যায়ে প্রচার পাওয়ার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন। কারাগারে থাকার সময় তিনি নিজের রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী ধারণা সংগঠিত করেন এবং উপলব্ধি করেন যে সরাসরি অভ্যুত্থানের বদলে নির্বাচনী ও সাংবিধানিক পথ ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি যেতে হবে। তখন নাৎসিরা জাতীয়ভাবে শক্তিশালী দল ছিল না; ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে তাদের সমর্থনও সীমিত থেকে যায়।
গুস্তাভ স্ট্রেসেমানের নীতির অধীনে নতুন মুদ্রা চালু, রুরে প্রতিরোধের অবসান এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতার মাধ্যমে অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। ১৯২৪ সালের ডজ পরিকল্পনায় ক্ষতিপূরণের কিস্তি পুনর্বিন্যাস করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল ঋণ জার্মান অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। শিল্পোৎপাদন বাড়ে, নগরজীবনে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে এবং জার্মানি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পুনরায় গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কিন্তু এই আপাত সমৃদ্ধির ভিত ছিল দুর্বল। জার্মানির ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি বিদেশি, বিশেষত মার্কিন ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। কৃষিক্ষেত্রেও আয় ও ঋণের সংকট বজায় ছিল।
১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ধসের পর মহামন্দা শুরু হলে সেই দুর্বলতা প্রকাশ পায়। মার্কিন ঋণ প্রত্যাহার হতে থাকে, জার্মান ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিপদে পড়ে, উৎপাদন কমে যায় এবং বেকারত্ব দ্রুত বাড়ে। ১৯৩২ সালের শুরুতে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখে পৌঁছায়। কর্মহীনতা শুধু আয় কেড়ে নেয়নি; বহু মানুষের আত্মমর্যাদা, পারিবারিক স্থিতি এবং ভবিষ্যতের আশা ধ্বংস করেছিল। মধ্যপন্থী সরকারগুলো কার্যকর সমাধানে একমত হতে ব্যর্থ হয়। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে রাষ্ট্রপতির জরুরি আদেশের মাধ্যমে শাসন ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেতর থেকেই দুর্বল করে দেয়।
এই পরিবেশে নাৎসিরা নিজেদের একই সঙ্গে বহু শ্রেণির রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে। বেকারদের জন্য কাজ, ব্যবসায়ীদের জন্য শৃঙ্খলা, কৃষকদের জন্য সহায়তা, মধ্যবিত্তের জন্য স্থিতিশীলতা এবং জাতীয়তাবাদীদের জন্য ভার্সাই চুক্তি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। আধুনিক প্রচারকৌশল, বিশাল জনসভা, বেতার, পোস্টার, স্লোগান এবং হিটলারের বক্তৃতাকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি জাতীয় পুনর্জন্মের মায়াময় চিত্র নির্মাণ করে। একই সঙ্গে ইহুদি, কমিউনিস্ট এবং অন্যান্য গোষ্ঠীকে জার্মানির সমস্যার জন্য অন্যায়ভাবে দায়ী করে ঘৃণা ছড়ানো হয়। নাৎসিবাদের শক্তি ছিল বাস্তব সংকটের সহজ কিন্তু মিথ্যা ব্যাখ্যা এবং স্পষ্ট শত্রু উপস্থাপন করার ক্ষমতায়।
তবে ভার্সাই চুক্তি বা অর্থনৈতিক সংকট থেকে নাৎসিদের ক্ষমতায় আসা অনিবার্য ছিল না। জার্মানিতে রক্ষণশীল অভিজাতদের গণতন্ত্রবিরোধিতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, কমিউনিজমের ভয়, দলগুলোর পারস্পরিক বিভাজন, দুর্বল জোট সরকার এবং হিটলারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভুল ধারণা—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ভার্সাই চুক্তি ক্ষোভের ভাষা দিয়েছিল, অতিমুদ্রাস্ফীতি গণতন্ত্রের ওপর আস্থা দুর্বল করেছিল এবং মহামন্দা নাৎসিদের জন্য গণসমর্থনের দরজা খুলে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই সংকটগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেই হিটলার একটি প্রান্তিক উগ্রবাদী আন্দোলনকে জার্মান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যান।
কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পটভূমি: বে অব পিগস থেকে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন
মহামন্দা ও নাৎসি পার্টির উত্থান: বেকারত্ব কীভাবে হিটলারের জনসমর্থন বাড়িয়েছিল?
হারাল্ড হার্ডরাডা ও স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধ: ১০৬৬ সালে কীভাবে শেষ হয়েছিল ভাইকিং যুগ?
সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড ও কনুট দ্য গ্রেট: ভাইকিংরা কীভাবে ইংল্যান্ড জয় করে উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য গড়েছিল?
ভাইকিংদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ: নর্স দেবতাদের যুগ কীভাবে শেষ হয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় নতুন রাজতন্ত্রের উত্থান ঘটেছিল?