বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড ও কনুট দ্য গ্রেট: ভাইকিংরা কীভাবে ইংল্যান্ড জয় করে উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য গড়েছিল?

সিরিজ: ভাইকিং যুগ: অভিযান, বিজয় ও নর্স সভ্যতার ইতিহাস

সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড ও কনুট দ্য গ্রেট: ভাইকিংরা কীভাবে ইংল্যান্ড জয় করে উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য গড়েছিল?
ইংল্যান্ড জয় ও কনুটের উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য

৭৯৩ সালে লিন্ডিসফার্নে নর্স আক্রমণ যখন ইংল্যান্ডে ভাইকিং যুগের প্রতীকী সূচনা করেছিল, তখন স্ক্যান্ডিনেভীয়রা ছিল মূলত সমুদ্রপথে আসা বহিরাগত আক্রমণকারী। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ভাইকিংরা ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি গড়ে, ডেনল প্রতিষ্ঠিত হয়, নর্স ও অ্যাংলো-স্যাক্সন জনগোষ্ঠী একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একাদশ শতকের শুরুতে একজন ডেনিশ রাজা পুরো ইংল্যান্ডের সিংহাসন দখল করেন। তাঁর ছেলে আরও এগিয়ে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়েকে নিজের কর্তৃত্বের অধীনে এনে উত্তর সাগরকে কেন্দ্র করে এক বিশাল রাজকীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

এই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন দুই ব্যক্তি—সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড এবং তাঁর ছেলে কনুট দ্য গ্রেট। তাঁদের উত্থান দেখায় ভাইকিং যুগের শেষপর্ব কতটা আলাদা ছিল প্রাথমিক লুণ্ঠনমূলক অভিযানের সময় থেকে। এখানে আর শুধু কয়েকটি লংশিপে এসে মঠ লুট করে ফিরে যাওয়ার গল্প নেই। রয়েছে রাজবংশ, সংগঠিত নৌবহর, কর, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, খ্রিস্টীয় রাজতন্ত্র এবং ইংল্যান্ডের সিংহাসনের জন্য দীর্ঘ যুদ্ধ।

সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড ছিলেন ডেনমার্কের রাজা হ্যারাল্ড ব্লুটুথের ছেলে। হ্যারাল্ডের শাসনকাল ডেনমার্কের রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণ ও খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলিংয়ের বিখ্যাত রুনপাথরে হ্যারাল্ড দাবি করেছিলেন যে তিনি ডেনমার্ক ও নরওয়ে জয় করেছিলেন এবং ডেনদের খ্রিস্টান করেছিলেন।

কিন্তু পিতা ও ছেলের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সংঘাতে পরিণত হয়। দশম শতকের শেষভাগে সোয়েন তাঁর বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন বলে মধ্যযুগীয় উৎসে উল্লেখ রয়েছে। আনুমানিক ৯৮৬ বা ৯৮৭ সালের দিকে হ্যারাল্ডের মৃত্যুর পর সোয়েন ডেনমার্কের প্রধান শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

সোয়েনের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে মধ্যযুগীয় উৎসগুলোতে কিছু বিরোধ রয়েছে। পরবর্তী কিছু লেখক তাঁকে পুরোনো নর্স ধর্মের সমর্থক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, আবার অন্য প্রমাণ থেকে তাঁকে খ্রিস্টীয় রাজনৈতিক জগতের অংশ হিসেবেই দেখা যায়। তাঁর শাসনকে খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে সরল “পৌত্তলিক প্রতিক্রিয়া” হিসেবে দেখা তাই যথার্থ নয়।

সোয়েন ক্ষমতায় আসার সময় ইংল্যান্ডে রাজত্ব করছিলেন এথেলরেড দ্বিতীয়, যিনি পরবর্তীকালে Æthelred the Unready নামে পরিচিত হন। এখানে “Unready” শব্দটির আধুনিক অর্থের “অপ্রস্তুত” ধারণা কিছুটা বিভ্রান্তিকর। পুরোনো ইংরেজি unræd শব্দটির অর্থ ছিল মূলত “খারাপ পরামর্শ” বা “দুর্বল পরামর্শ”; এটি তাঁর নাম Æthelred-এর সঙ্গে একটি শব্দখেলা তৈরি করেছিল।

এথেলরেডের শাসনামলে ইংল্যান্ড আবার ব্যাপক স্ক্যান্ডিনেভীয় আক্রমণের মুখে পড়ে। নবম শতকের গ্রেট হিথেন আর্মির সময়কার ভাইকিংদের তুলনায় নতুন আক্রমণকারীরা এমন এক পৃথিবী থেকে আসছিল যেখানে ডেনমার্কের মতো স্ক্যান্ডিনেভীয় রাজ্যগুলো ইতোমধ্যে আরও সংগঠিত হয়ে উঠেছে। ফলে অভিযানের আকার ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও বদলাচ্ছিল।

ইংরেজরা অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থ দিয়ে আক্রমণকারীদের চলে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা করে। এই অর্থপ্রদানকে সাধারণভাবে ডেনেগেল্ড নামে পরিচিত করা হয়। বিপুল পরিমাণ রূপা প্রদান সাময়িকভাবে একটি বাহিনীকে সরিয়ে দিতে পারলেও এর একটি বিপজ্জনক দিক ছিল—ইংল্যান্ড যে বিপুল অর্থ দিতে সক্ষম, সেটিও স্ক্যান্ডিনেভীয় নেতাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।

দশম শতকের শেষ এবং একাদশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একাধিক বড় নর্স অভিযান ঘটে। সোয়েনও এই সংঘর্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন।

১০০২ সালের একটি ঘটনা পরবর্তী অ্যাংলো-ডেনিশ সংঘাতের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত—সেন্ট ব্রাইস ডে হত্যাকাণ্ড। ১৩ নভেম্বর ১০০২ সালে এথেলরেড তাঁর রাজ্যে বসবাসকারী ডেনদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে সমসাময়িক রাজকীয় দলিল থেকে জানা যায়।

তবে “ইংল্যান্ডের সব ডেনিশ মানুষকে একই দিনে হত্যা করা হয়েছিল”—এমন সরল চিত্র সম্ভবত ভুল। ইংল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে প্রাক্তন ডেনল এলাকায়, ডেনিশ বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা এত বড় ও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে তাদের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করা বাস্তবসম্মত ছিল না। হত্যাকাণ্ডের পরিসর ও নিহতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

পরবর্তী ঐতিহ্যে বলা হয়, সোয়েনের বোন গুনহিল্ড এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছিলেন এবং এর প্রতিশোধ নিতে সোয়েন ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন। কিন্তু এই নির্দিষ্ট সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি অনিশ্চিত। সোয়েনের ইংল্যান্ড আক্রমণের পেছনে প্রতিশোধের পাশাপাশি সম্পদ, রাজনৈতিক সুযোগ এবং রাজ্য জয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১০০৩ ও ১০০৪ সালে সোয়েন ইংল্যান্ডে অভিযান চালান। পরবর্তী বছরগুলোতেও ইংল্যান্ডের ওপর স্ক্যান্ডিনেভীয় চাপ অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন নর্স সেনাপতি ও নৌবহর ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং বিপুল অর্থ আদায় করে।

এই সময়ে আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্ক্যান্ডিনেভীয় নেতা ছিলেন থর্কেল দ্য টল। তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনী ১০০৯ থেকে ১০১২ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডে ব্যাপক অভিযান চালায়। ক্যান্টারবারি দখল এবং আর্চবিশপ আলফিয়ার হত্যার মতো ঘটনা এই পর্যায়ে ঘটে। পরে থর্কেল নিজেই এথেলরেডের পক্ষে কাজ করেন—যা দেখায় ভাইকিং যুগের শেষপর্বে রাজনৈতিক আনুগত্য কতটা পরিবর্তনশীল ছিল।

কিন্তু সোয়েন শুধু অর্থ আদায় করতে ইংল্যান্ডে আসেননি। ১০১৩ সালে তিনি ইংল্যান্ড জয়ের উদ্দেশ্যে একটি বড় অভিযান শুরু করেন।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছেলে কনুট। তরুণ কনুটের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে তথ্য সীমিত, কিন্তু এই অভিযান তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

সোয়েনের নৌবহর ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং উত্তর ও মধ্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শক্তি দ্রুত তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকার করতে শুরু করে। ডেনল অঞ্চলে স্ক্যান্ডিনেভীয় বসতি ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তাঁর জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছিল।

ইংরেজ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল লন্ডন। এথেলরেড এবং থর্কেল সেখানে প্রতিরোধ চালান। কিন্তু সোয়েন সরাসরি শুধু লন্ডনের ওপর নির্ভর না করে ইংল্যান্ডের অন্যান্য অঞ্চলের আনুগত্য অর্জন করতে থাকেন।

শেষ পর্যন্ত ইংরেজ রাজনৈতিক অবস্থান ভেঙে পড়ে। এথেলরেড তাঁর পরিবারসহ নরম্যান্ডিতে আশ্রয় নেন। ১০১৩ সালের শেষদিকে সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড কার্যত ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

প্রায় দুই শতাব্দীর ভাইকিং আক্রমণ ও বসতির ইতিহাসে এটি ছিল এক নাটকীয় মুহূর্ত। লিন্ডিসফার্নে আক্রমণকারী নর্সদের উত্তরসূরিরা এবার আর শুধু লুট নিয়ে ফিরে যাচ্ছিল না—ডেনমার্কের রাজাই ইংল্যান্ডের সিংহাসন দখল করেছিলেন।

কিন্তু সোয়েন তাঁর নতুন রাজ্য দীর্ঘদিন শাসন করতে পারেননি। ১০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি আকস্মিকভাবে মারা যান। ইংল্যান্ডে তাঁর কার্যকর রাজত্ব মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল।

ডেনিশ বাহিনী কনুটকে রাজা হিসেবে সমর্থন করলেও ইংরেজ অভিজাতদের একটি বড় অংশ নির্বাসিত এথেলরেডকে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানায়। এথেলরেড ইংল্যান্ডে ফিরে এলে তরুণ কনুটের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তিনি ডেনমার্কে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

কিন্তু এই পশ্চাদপসরণ তাঁর ইংল্যান্ড জয়ের স্বপ্নের সমাপ্তি ছিল না।

ডেনমার্কে ফিরে কনুট নতুন বাহিনী ও রাজনৈতিক সমর্থন সংগ্রহ করেন। ১০১৫ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। এবার তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—পুরো ইংরেজ রাজ্য দখল।

ইংল্যান্ড তখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে আক্রান্ত। এথেলরেডের ছেলে এডমন্ড আয়রনসাইড শক্তিশালী সামরিক নেতা হিসেবে উঠে আসছিলেন। একই সময়ে ইংরেজ অভিজাতদের মধ্যে আনুগত্যের পরিবর্তন কনুটের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।

বিশেষ করে মার্সিয়ার প্রভাবশালী অভিজাত ইড্রিক স্ট্রিওনা বারবার পক্ষ পরিবর্তনের জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠেন। তিনি কখনো কনুটের, কখনো ইংরেজ রাজপক্ষের সঙ্গে যুক্ত হন। এই পরিবর্তনশীল আনুগত্য ইংল্যান্ডের প্রতিরক্ষাকে আরও জটিল করে তোলে।

১০১৬ সালে এথেলরেড মারা গেলে এডমন্ড আয়রনসাইড ইংরেজ প্রতিরোধের কেন্দ্রীয় নেতা হন। এরপর কনুট ও এডমন্ডের মধ্যে ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

এই সংঘর্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর একটি ছিল আসানডুনের যুদ্ধ, ১৮ অক্টোবর ১০১৬। যুদ্ধক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট আধুনিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে কনুট সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করেন।

পরাজয়ের পরও এডমন্ড সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেননি। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষ একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী, এডমন্ড দক্ষিণ-পশ্চিমের ওয়েসেক্সের নিয়ন্ত্রণ রাখেন এবং কনুট ইংল্যান্ডের বাকি বৃহৎ অংশের ওপর কর্তৃত্ব পান।

কিন্তু সমঝোতার কিছুদিন পর, ৩০ নভেম্বর ১০১৬ সালে এডমন্ড মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে কনুটের দিকে চলে যায়। ১০১৭ সালের শুরুতে কনুট পুরো ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

এখানেই কনুটের ইতিহাস সাধারণ ভাইকিং বিজেতার গল্প থেকে আলাদা হয়ে যায়। ইংল্যান্ড জয়ের পর তিনি দেশটিকে শুধু দখলকৃত অঞ্চল হিসেবে লুট করতে থাকেননি। বরং বিদ্যমান অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো ব্যবহার করে নিজেকে বৈধ ইংরেজ রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

শুরুতে তিনি ইংল্যান্ডকে কয়েকটি বড় রাজনৈতিক অঞ্চলে ভাগ করে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের হাতে দায়িত্ব দেন। ওয়েসেক্স নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং অন্যান্য অঞ্চলে শক্তিশালী আর্ল নিয়োগ করেন। এর মধ্যে গডউইন পরবর্তীকালে ইংরেজ রাজনীতির অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

কনুট তাঁর নৌবাহিনীর সদস্যদের অর্থ প্রদান করতে ইংল্যান্ড থেকে বিপুল কর সংগ্রহ করেন। এরপর বাহিনীর বড় অংশকে দেশে ফেরত পাঠানো হয় এবং তুলনামূলক ছোট একটি পেশাদার সামরিক শক্তি তাঁর শাসনের ভিত্তি হিসেবে থেকে যায়।

আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর বিবাহ। ১০১৭ সালে কনুট নরম্যান্ডির এমাকে বিয়ে করেন। এমা ছিলেন মৃত এথেলরেডের বিধবা এবং নরম্যান্ডির ডিউকীয় পরিবারের সদস্য।

এই বিবাহের রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল বিশাল। এর মাধ্যমে কনুট পরাজিত ইংরেজ রাজবংশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন এবং নরম্যান্ডির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতও কমিয়ে আনেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার প্রশ্নে তাঁর নিজের রাজবংশের অবস্থান শক্তিশালী হয়।

কনুট ইতোমধ্যে নর্থ্যাম্পটনের এলফগিফুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং তাঁদের সন্তানও ছিল। ফলে তাঁর পারিবারিক ও উত্তরাধিকার রাজনীতি পরবর্তীতে জটিল হয়ে ওঠে। কিন্তু এমার সঙ্গে বিবাহ তাঁকে ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় রাজতন্ত্রের একজন বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

কনুটের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ডেনিশ বিজেতা থেকে ইংরেজ খ্রিস্টীয় রাজায় নিজের পরিচয় রূপান্তর করা। তিনি গির্জাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেন এবং পূর্ববর্তী যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু গির্জার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করেন।

১০২৭ সালে তিনি রোমে যান এবং সম্রাট দ্বিতীয় কনরাডের রাজ্যাভিষেকের সঙ্গে যুক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। সেখানে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টীয় শাসকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এই সফর দেখায়, কয়েক দশক আগের ভাইকিং অভিযাত্রীর উত্তরসূরি এখন ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় রাজনীতির কেন্দ্রে স্বীকৃত রাজা।

কিন্তু কনুটের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইংল্যান্ডেই থেমে থাকেনি।

১০১৮ বা ১০১৯ সালের দিকে তাঁর ভাই ডেনমার্কের রাজা হ্যারাল্ড দ্বিতীয় মারা গেলে কনুট ডেনমার্কের রাজাও হন। এর ফলে ইংল্যান্ড ও ডেনমার্ক একই শাসকের অধীনে আসে।

উত্তর সাগর এখন তাঁর রাজ্যের মাঝখানে অবস্থান করছিল। একদিকে ইংল্যান্ড, অন্যদিকে ডেনমার্ক—সমুদ্র আর দুটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের বাধা নয়; বরং সৈন্য, বণিক, দূত ও রাজকীয় যোগাযোগের প্রধান পথ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই কনুটের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আধুনিক ইতিহাসে প্রায়ই North Sea Empire বা উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য বলা হয়। তবে এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে “North Sea Empire” কনুটের নিজের ব্যবহৃত কোনো আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রনাম ছিল না। এটি আধুনিক ইতিহাসবিদদের একটি সুবিধাজনক বর্ণনামূলক শব্দ।

পরবর্তী লক্ষ্য ছিল নরওয়ে।

নরওয়ের রাজা ওলাফ হ্যারাল্ডসনের সঙ্গে কনুটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকে। কনুট নরওয়ের অভিজাতদের মধ্যে নিজের সমর্থন তৈরি করেন এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব ব্যবহার করেন।

১০২৮ সালে কনুট একটি বড় নৌবহর নিয়ে নরওয়েতে যান। ওলাফের অবস্থান ভেঙে পড়ে এবং তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। কনুট নরওয়ের রাজা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

এর ফলে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং নরওয়ে একই শাসকের কর্তৃত্বে আসে। দক্ষিণ সুইডেনের কিছু অঞ্চলের ওপরও তাঁর প্রভাব ছিল, যদিও কনুট পুরো সুইডেনের রাজা ছিলেন না।

এই বিশাল রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আধুনিক অর্থে একটি কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য ভাবলে ভুল হবে। ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের নিজস্ব আইন, অভিজাতগোষ্ঠী, রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল। কনুট সব অঞ্চলকে একটি একক প্রশাসনে রূপান্তর করেননি।

বরং তাঁর সাম্রাজ্য ছিল একজন শক্তিশালী রাজা ও তাঁর রাজবংশের অধীনে যুক্ত কয়েকটি পৃথক রাজ্যের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংযোগ। রাজাকে প্রতিটি অঞ্চলের স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সমঝোতা করে শাসন করতে হতো।

ইংল্যান্ড ছিল সম্ভবত এই ব্যবস্থার সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও প্রশাসনিকভাবে উন্নত অংশ। অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজারা ইতোমধ্যে কর সংগ্রহ, মুদ্রা উৎপাদন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন পরিচালনার শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। কনুট সেই ব্যবস্থা ধ্বংস না করে নিজের কাজে ব্যবহার করেন।

ইংরেজ মুদ্রাব্যবস্থাও তাঁর ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। কনুটের নামে বিপুলসংখ্যক মুদ্রা তৈরি হয় এবং সেগুলোর নকশা ও ব্যবস্থাপনা রাজকীয় কর্তৃত্বের বার্তা বহন করে। ইংরেজ মুদ্রার প্রভাব স্ক্যান্ডিনেভিয়াতেও দেখা যায়।

কনুটের শাসনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল পুরোনো ইংরেজ আইন ও রাজকীয় ঐতিহ্যের প্রতি প্রকাশ্য সম্মান। তাঁর আইনসংক্রান্ত ঘোষণায় তিনি নিজেকে শুধু বিদেশি বিজেতা হিসেবে নয়, পূর্ববর্তী বৈধ ইংরেজ রাজাদের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।

এখানে ভাইকিং যুগের রূপান্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। দুই শতাব্দী আগে নর্স অভিযাত্রীরা ইংরেজ মঠ ও শহর লুট করছিল। এখন একজন ডেনিশ বংশোদ্ভূত রাজা ইংরেজ আইন রক্ষা করছেন, গির্জাকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন এবং ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় শাসকদের সঙ্গে কূটনীতি করছেন।

কনুটকে ঘিরে সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগুলোর একটি হলো সমুদ্রের ঢেউ থামানোর কাহিনি। জনপ্রিয় সংস্করণে কখনো বলা হয়, তিনি এত অহংকারী ছিলেন যে সমুদ্রকে থামার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং ব্যর্থ হন। কিন্তু মধ্যযুগীয় কাহিনিটির মূল শিক্ষা ছিল প্রায় উল্টো।

পরবর্তী লেখক হেনরি অব হান্টিংডনের বিবরণ অনুযায়ী, কনুট তাঁর দরবারিদের দেখাতে চেয়েছিলেন যে একজন রাজার ক্ষমতারও সীমা আছে এবং প্রকৃতির ওপর একমাত্র ঈশ্বরেরই পূর্ণ কর্তৃত্ব। ঘটনাটি কনুটের জীবদ্দশার অনেক পরে লেখা হয়েছে, তাই একে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা বলা যায় না। তবে গল্পটির আসল অর্থ অহংকারের চেয়ে রাজকীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে।

কনুটের শাসনকালে উত্তর সাগর একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইংল্যান্ডের রূপা, ডেনমার্কের সামুদ্রিক অবস্থান এবং স্ক্যান্ডিনেভীয় বাণিজ্যপথ এক বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠে।

তবে তাঁর সাম্রাজ্য শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা ছিল না। এর ভিত্তিতে ছিল সামরিক বিজয়, কর, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ। কনুট ছিলেন দক্ষ প্রশাসক ও কূটনীতিক, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এমন একজন বিজেতা যিনি যুদ্ধের মাধ্যমেই ইংল্যান্ডের সিংহাসন অর্জন করেছিলেন।

এই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও এখানেই ছিল—এটি প্রতিষ্ঠানগত ঐক্যের চেয়ে কনুটের ব্যক্তিগত ক্ষমতার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল।

১০৩৫ সালের ১২ নভেম্বর কনুট মারা যান। তাঁর বয়স সম্ভবত চল্লিশের কাছাকাছি ছিল। তাঁর মৃত্যুর পরই উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা শুরু হয়।

ইংল্যান্ডে প্রথমে তাঁর ছেলে হ্যারল্ড হেয়ারফুট ক্ষমতা লাভ করেন। ১০৪০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কনুট ও এমার ছেলে হার্ডিকনুট ইংল্যান্ডের রাজা হন। তিনি একই সঙ্গে ডেনমার্কের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তাঁর শাসনও খুব অল্প সময় স্থায়ী হয়।

১০৪২ সালে হার্ডিকনুটের মৃত্যু হলে ইংল্যান্ডে কনুটের সরাসরি রাজবংশীয় শাসনের অবসান ঘটে। এথেলরেড ও এমার ছেলে এডওয়ার্ড দ্য কনফেসর ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন।

ডেনমার্ক ও নরওয়েতেও পৃথক রাজবংশীয় শক্তি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে কনুট যে উত্তর সাগরীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর এক দশকের মধ্যেই সেটি ভেঙে যায়।

এই দ্রুত পতন প্রমাণ করে যে “উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য” রোমান সাম্রাজ্যের মতো একীভূত প্রশাসনিক রাষ্ট্র ছিল না। একই ব্যক্তির রাজত্বই ছিল এর প্রধান সংযোগসূত্র। সেই ব্যক্তি চলে গেলে পৃথক রাজ্যগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ আবার সামনে চলে আসে।

তবু সোয়েন ও কনুটের ইতিহাসের গুরুত্ব অসাধারণ। সোয়েন দেখিয়েছিলেন যে ইংল্যান্ডকে সম্পূর্ণভাবে জয় করা সম্ভব। তাঁর বিজয় স্বল্পস্থায়ী হলেও ছেলে সেই প্রকল্পকে স্থায়ী রাজনৈতিক রূপ দেন।

কনুট আবার প্রমাণ করেন যে একজন স্ক্যান্ডিনেভীয় বিজেতা ইংল্যান্ডের প্রশাসনিক কাঠামো গ্রহণ করে নিজেকে সফল খ্রিস্টীয় রাজায় রূপান্তর করতে পারেন। তিনি নর্স সামরিক ঐতিহ্য ও অ্যাংলো-স্যাক্সন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একই রাজকীয় কাঠামোর মধ্যে ব্যবহার করেছিলেন।

এই ইতিহাস ভাইকিং যুগের শেষপর্ব বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সোয়েন ও কনুটকে শুধু “ভাইকিং নেতা” বললে তাঁদের সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তন পুরোপুরি বোঝা যায় না। তাঁরা এমন এক যুগের শাসক, যখন স্ক্যান্ডিনেভীয় যোদ্ধা ও সমুদ্রযাত্রীদের পৃথিবী দ্রুত খ্রিস্টীয় মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল।

কনুট নিজে ছিলেন খ্রিস্টীয় রাজা, তাঁর প্রশাসন ছিল সংগঠিত, তাঁর নামে মুদ্রা তৈরি হতো, তিনি গির্জাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং ইউরোপের শাসকদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতার পেছনে সেই একই উত্তর সাগরীয় নৌদক্ষতা ও সামরিক ঐতিহ্য কাজ করেছিল, যা কয়েক শতাব্দী ধরে নর্স সম্প্রসারণকে সম্ভব করেছিল।

সোয়েন ফর্কবিয়ার্ড থেকে কনুট দ্য গ্রেটের ইতিহাস তাই ভাইকিং যুগের এক অসাধারণ রূপান্তরের গল্প। লুটপাট থেকে কর আদায়, মৌসুমি অভিযান থেকে রাজ্য জয়, স্বাধীন নৌবহর থেকে রাজকীয় সামরিক শক্তি এবং নর্স প্রধান থেকে খ্রিস্টীয় সম্রাটসদৃশ রাজা—এই পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রকাশ ছিল কনুটের উত্তর সাগরীয় সাম্রাজ্য।

আর সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে কোনো স্থলভাগ ছিল না—ছিল উত্তর সাগর। যে সমুদ্র একসময় ভাইকিং আক্রমণকারীদের ইংল্যান্ডে নিয়ে এসেছিল, কনুটের যুগে সেই সমুদ্রই ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়েকে একই রাজকীয় ক্ষমতার অধীনে যুক্ত করার প্রধান পথ হয়ে ওঠে। ভাইকিং ইতিহাসে এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীক খুব কমই আছে: একসময়ের আক্রমণের পথই শেষ পর্যন্ত একটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে