বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মাচু পিচু: মেঘের মাঝে লুকিয়ে থাকা ইনকা নগরী কেন তৈরি করা হয়েছিল?

সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

মাচু পিচু: মেঘের মাঝে লুকিয়ে থাকা ইনকা নগরী কেন তৈরি করা হয়েছিল?
আন্দিজের মেঘে লুকিয়ে থাকা মাচু পিচু

পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার একটি সরু পাহাড়ি শৈলশিরার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এমন এক প্রাচীন নগর, যার চারপাশে খাড়া সবুজ পাহাড়, গভীর উপত্যকা এবং ভেসে বেড়ানো মেঘ। নিচে অনেক দূরে বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে উরুবাম্বা নদী। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি কৃষি সোপান, আর তার ওপরে ছড়িয়ে রয়েছে নিখুঁতভাবে কাটা পাথরের ঘর, প্রাঙ্গণ, সিঁড়ি, মন্দির ও পানির নালা। স্থানটির নাম মাচু পিচু। আজ এটি ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বিখ্যাত স্থানটির আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইনকারা আমাদের জন্য কোনো লিখিত ব্যাখ্যা রেখে যায়নি।

মাচু পিচুকে তাই ঘিরে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—এত দুর্গম পাহাড়ের ওপর এই অসাধারণ স্থাপনাটি কেন তৈরি করা হয়েছিল?

একসময় একে হারিয়ে যাওয়া ইনকা রাজধানী, সামরিক দুর্গ, সূর্যদেবতার গোপন মন্দির কিংবা বিশেষ নারীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এসব পুরোনো ধারণার অনেকটিই সংশোধন করেছে। বর্তমানে শক্তিশালী একটি ব্যাখ্যা হলো, মাচু পিচু সম্ভবত ইনকা সম্রাট পাচাকুতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাজকীয় এস্টেট বা বিশেষ রাজকীয় কেন্দ্র ছিল, যেখানে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম একসঙ্গে চলত। তবে এর প্রতিটি স্থাপনার সুনির্দিষ্ট ব্যবহার নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে।

মাচু পিচু বর্তমান পেরুর কুসকো অঞ্চলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৪৩০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটি আন্দিজের সর্বোচ্চ উচ্চতায় নির্মিত ইনকা বসতি নয়; বরং কুসকোর তুলনায় নিচু ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পরিবেশে অবস্থিত। এর চারপাশের ভূদৃশ্য অত্যন্ত নাটকীয়—একদিকে উঁচু পর্বত, অন্যদিকে গভীর নদী উপত্যকা।

ইনকা সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে মাচু পিচুর নির্মাণকাল ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী এর প্রধান নির্মাণ পঞ্চদশ শতকে, ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ে ঘটে। এই সময়ের সঙ্গে সম্রাট পাচাকুতি ইনকা ইউপানকির শাসনকাল যুক্ত। পরবর্তী ঔপনিবেশিক যুগের নথি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা মিলিয়ে মাচু পিচুকে পাচাকুতির রাজকীয় সম্পত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করার ব্যাখ্যা শক্তিশালী হয়েছে।

পাচাকুতি ইনকা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাসক। তাঁর সময়ে কুসকোকেন্দ্রিক ইনকা রাষ্ট্র একটি বৃহৎ সম্প্রসারণশীল সাম্রাজ্যে রূপ নিতে শুরু করে। ফলে মাচু পিচুর মতো রাজকীয় স্থাপনা শুধু বিশ্রামের জায়গা ছিল—এমন ধারণা যথেষ্ট নয়। রাজকীয় এস্টেট একই সঙ্গে ক্ষমতা প্রদর্শন, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং অভিজাত রাজনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনার স্থান হতে পারত।

কিন্তু নির্মাণের জন্য এমন দুর্গম স্থান কেন বেছে নেওয়া হলো?

এর একটি উত্তর সম্ভবত ইনকা ধর্মীয় ভূগোলের মধ্যে রয়েছে। ইনকারা পাহাড়, ঝরনা, পাথর এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পবিত্র শক্তির উপস্থিতি দেখতে পারত। বিশেষ পবিত্র স্থান বা বস্তুকে সাধারণভাবে হুয়াকা ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আন্দিজের বিশাল পর্বতগুলোও ধর্মীয় অর্থ বহন করত। ফলে মাচু পিচুর চারপাশের পাহাড়ি ভূদৃশ্য শুধু সুন্দর দৃশ্য ছিল না; এর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও থাকতে পারে।

মাচু পিচুর স্থাপত্য যেন প্রাকৃতিক পাহাড়ের বিরুদ্ধে নির্মিত নয়, বরং পাহাড়ের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি। ভবন, সিঁড়ি, প্রাঙ্গণ ও সোপানগুলো শৈলশিরার প্রাকৃতিক আকৃতি অনুসরণ করেছে। অনেক স্থানে প্রাকৃতিক পাথরকে পুরোপুরি সরিয়ে না দিয়ে স্থাপত্যের অংশে রূপ দেওয়া হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য ইনকা স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—প্রকৃতি ও মানুষের নির্মাণকে আলাদা না রেখে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করা।

নগরের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো এর কৃষি সোপান। দূর থেকে এগুলো শুধু ফসল উৎপাদনের জমি বলে মনে হয়। কিন্তু তাদের ভূমিকা আরও জটিল ছিল। পাহাড়ের খাড়া ঢালে সোপান তৈরি করে সমতল জমি পাওয়া যেত, একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি ও মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। সঠিক নিষ্কাশন না থাকলে প্রচণ্ড বর্ষণের সময় পাহাড়ি ভূমিতে বিশাল স্থাপনা টিকিয়ে রাখা কঠিন হতো।

এই নিষ্কাশনব্যবস্থাই মাচু পিচুর প্রকৌশলের অন্যতম বড় সাফল্য। অঞ্চলটিতে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়। তাই পাথরের ভবন তৈরি করার পাশাপাশি পানিকে নিরাপদে সরিয়ে দেওয়া ছিল পুরো নগর টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। নির্মাতারা মাটির নিচে পাথর ও অন্যান্য স্তর ব্যবহার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন এবং স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশে পরিকল্পিত ড্রেন রেখেছিলেন।

মাচু পিচুতে একটি প্রাকৃতিক ঝরনার পানি ধরে তৈরি করা হয়েছিল পাথরের জলনালা ও ধারাবাহিক ফোয়ারা। পানি উঁচু অংশ থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছাত। এই ব্যবস্থায় মহাকর্ষের শক্তিই প্রধান ভূমিকা পালন করত। আধুনিক পাম্প ছাড়াই পরিকল্পিত ঢালের সাহায্যে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল।

এত দুর্গম স্থানে বিশাল পাথর কীভাবে আনা হয়েছিল—এ প্রশ্নও বহুল আলোচিত। বাস্তবে মাচু পিচুর নির্মাণে ব্যবহৃত পাথরের উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবে পাওয়া গ্রানাইটজাত শিলা থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল। প্রত্নস্থলের কাছেই পাথর প্রক্রিয়াজাত করার চিহ্ন রয়েছে। ফলে প্রতিটি পাথর বহু দূরের পাহাড় থেকে টেনে আনার প্রয়োজন ছিল না।

ইনকা কারিগরেরা লোহার আধুনিক ছেনি বা বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র ব্যবহার করতেন না। শক্ত হাতুড়িপাথর দিয়ে আঘাত, ঘর্ষণ এবং দীর্ঘ সময়ের সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে পাথরকে প্রয়োজনীয় আকার দেওয়া হতো। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে পাথর এমনভাবে কাটা হয়েছে যে দুটি ব্লকের মাঝখানে প্রায় কোনো ফাঁক দেখা যায় না

তবে মাচু পিচুর সব ভবন একই মানের পাথরশিল্পে তৈরি নয়। অভিজাত ও আনুষ্ঠানিক স্থাপনার কিছু অংশে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাটা পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, আর সাধারণ স্থাপত্যে অপেক্ষাকৃত সাধারণ নির্মাণপদ্ধতি দেখা যায়। এই পার্থক্য নগরের ভেতরের সামাজিক ও কার্যগত বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়।

মাচু পিচুর অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা টেম্পল অব দ্য সান নামে পরিচিত অর্ধবৃত্তাকার পাথরের কাঠামো। এটি একটি প্রাকৃতিক শিলার ওপর নির্মিত এবং এর নিচে একটি গুহাসদৃশ অংশ রয়েছে। এর জানালা ও স্থাপত্যের সঙ্গে সূর্যের নির্দিষ্ট অবস্থানের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সম্ভবত এখানে সূর্যসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ ও ধর্মীয় আচার গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আরেকটি বিখ্যাত অংশকে বলা হয় টেম্পল অব দ্য থ্রি উইন্ডোজ। বিশাল পাথরের দেয়ালে তিনটি বড় জানালাসদৃশ খোলা অংশ রয়েছে। এগুলোর ধর্মীয় অর্থ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে, কিন্তু ইনকারা নিজেরা কোনো লিখিত ব্যাখ্যা রেখে যায়নি। ফলে আধুনিক নামগুলোকে তাদের প্রকৃত ইনকা যুগের নাম মনে করা ঠিক নয়।

মাচু পিচুর সবচেয়ে রহস্যময় পাথরগুলোর একটি হলো ইন্তিহুয়াতানা নামে পরিচিত খোদাই করা শিলা। নামটি পরবর্তী ব্যাখ্যার অংশ এবং সাধারণভাবে “সূর্যকে বাঁধার স্থান” ধরনের অর্থে অনুবাদ করা হয়। পাথরটির আকৃতি এবং অবস্থানের সঙ্গে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা হয়েছে।

ইনকারা যে সূর্য ও আকাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কৃষি, ধর্মীয় উৎসব এবং সময় নির্ধারণে এসব পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ইন্তিহুয়াতানাকে আধুনিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের মতো নির্দিষ্ট একটি কার্যসম্পন্ন “মেশিন” হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর ধর্মীয় ও প্রতীকী অর্থও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।

মাচু পিচুর জনসংখ্যা নিয়েও বহু অতিরঞ্জিত ধারণা রয়েছে। এটি সম্ভবত লক্ষাধিক বা কয়েক দশ হাজার মানুষের বিশাল মহানগর ছিল না। বিভিন্ন অনুমানে স্থায়ী ও অস্থায়ী জনসংখ্যা মিলিয়ে কয়েকশ মানুষের মাত্রার একটি সম্প্রদায় এখানে অবস্থান করত বলে ধারণা করা হয়, যদিও নির্ভুল সংখ্যা জানা সম্ভব নয়।

এখানকার মানুষ সবাই স্থানীয় ছিল না। মানবদেহের অবশেষের গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে মাচু পিচুতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ইনকা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যক্তিরা ছিলেন। এটি রাজকীয় এস্টেটের ধারণার সঙ্গে ভালোভাবে মিলে যায়। শাসক পরিবারের জন্য কাজ করা সেবক, কারিগর, ধর্মীয় কর্মী এবং অন্যান্য বিশেষায়িত মানুষ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে আনা হয়ে থাকতে পারে।

এর ফলে মাচু পিচুকে একটি বিচ্ছিন্ন “গোপন শহর” হিসেবে দেখা বিভ্রান্তিকর। এটি দুর্গম ছিল, কিন্তু ইনকা বিশ্বের বাইরে ছিল না। সড়ক ও পথের মাধ্যমে এটি বৃহত্তর ইনকা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। লামা, শ্রমিক, কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তি এবং রাজপরিবারের সদস্যরা এখানে আসা-যাওয়া করতে পারতেন।

তাহলে এটি কি সামরিক দুর্গ ছিল?

প্রাকৃতিক অবস্থান অবশ্যই প্রতিরক্ষার জন্য সুবিধাজনক। খাড়া পাহাড় এবং সীমিত প্রবেশপথ আক্রমণ কঠিন করে তুলতে পারে। কিন্তু মাচু পিচুর স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য বিশাল সামরিক দুর্গের তুলনায় রাজকীয়, আবাসিক, কৃষি ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই শুধু সামরিক উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল—এমন ব্যাখ্যা বর্তমানে শক্তিশালী নয়।

আরেকটি পুরোনো ধারণা ছিল মাচু পিচু মূলত “সূর্যকুমারীদের” গোপন আশ্রয়স্থল। প্রাথমিক কঙ্কাল বিশ্লেষণে নারীদেহের সংখ্যা অনেক বেশি মনে হওয়ায় এই ধারণা জনপ্রিয় হয়েছিল। পরে উন্নত বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ও পুরুষের অনুপাত এতটা একপেশে নয়। ফলে শুধু নির্বাচিত নারীদের ধর্মীয় আশ্রম হিসেবে মাচু পিচুকে ব্যাখ্যা করার পুরোনো তত্ত্ব কার্যত পরিত্যক্ত হয়েছে।

মাচু পিচু কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল, সেই প্রশ্নও এর নির্মাণের উদ্দেশ্যের মতো আকর্ষণীয়। এখানে কোনো বিশাল যুদ্ধের মাধ্যমে স্প্যানিশরা নগরটি দখল ও ধ্বংস করেছিল—এমন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। বরং ষোড়শ শতকে পুরো ইনকা রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার সঙ্গে এর কার্যকারিতাও হারিয়ে যায়।

১৫২০-এর দশক থেকে ইউরোপীয় রোগ আন্দিজ অঞ্চলে বিপুল জনসংখ্যাগত সংকট সৃষ্টি করে। এরপর হুয়াসকার ও আতাহুয়ালপার গৃহযুদ্ধ এবং ১৫৩২ সাল থেকে স্প্যানিশ বিজয় ইনকা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেয়। যে রাজকীয় ব্যবস্থা মাচু পিচুতে শ্রমিক, খাদ্য ও সম্পদ সরবরাহ করত, সেটিই যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন দুর্গম এই এস্টেট বজায় রাখার প্রয়োজন ও সামর্থ্য দুটোই কমে যায়।

রোগ সরাসরি মাচু পিচুর জনসংখ্যাকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, তা নির্ভুলভাবে জানা যায় না। তাই “গুটিবসন্ত এসে পুরো নগরীর মানুষকে মেরে ফেলেছিল”—এমন নাটকীয় দাবি প্রমাণের চেয়ে বেশি নিশ্চিত হয়ে যায়। সম্ভবত বৃহত্তর ইনকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পতনই মাচু পিচু পরিত্যাগের প্রধান প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।

স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক নথিতে মাচু পিচু বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিজিত নগর হিসেবে সামনে আসে না। এ কারণেই একটি জনপ্রিয় ধারণা তৈরি হয়েছে যে স্প্যানিশরা কখনো স্থানটির অস্তিত্বই জানত না। বাস্তবতা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। স্থানীয় মানুষ অবশ্যই অঞ্চলটির সম্পর্কে জানত এবং সম্পূর্ণ ভূগোল থেকে এটি অদৃশ্য হয়ে যায়নি।

এখানেই “হারিয়ে যাওয়া নগরী” কথাটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাচু পিচু পশ্চিমা বিশ্বের কাছে দীর্ঘ সময় অল্প পরিচিত ছিল, কিন্তু স্থানীয় জনগণের কাছে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আশপাশে কৃষিকাজ চলত এবং স্থানটির অস্তিত্ব স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল।

১৯১১ সালে মার্কিন গবেষক ও অভিযাত্রী হাইরাম বিংহাম মাচু পিচুতে পৌঁছে আন্তর্জাতিকভাবে স্থানটিকে ব্যাপক পরিচিত করে তোলেন। তাঁকে অনেক সময় “মাচু পিচুর আবিষ্কারক” বলা হয়, কিন্তু এই শব্দটি বিভ্রান্তিকর। বিংহাম সেখানে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় পরিবার ও কৃষকেরা ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কে জানতেন এবং কিছু মানুষ এলাকাটিতে বসবাস বা কৃষিকাজও করছিলেন।

বিংহাম প্রথমে ধারণা করেছিলেন তিনি সম্ভবত স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে শেষ ইনকা প্রতিরোধের রাজধানী ভিলকাবাম্বা খুঁজে পেয়েছেন। পরে গবেষণায় স্পষ্ট হয় যে প্রকৃত ভিলকাবাম্বা অন্যত্র অবস্থিত। ফলে মাচু পিচুর পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষণার ইতিহাস নিজেই বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে।

বর্তমান প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ একত্র করলে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য চিত্রটি হলো—মাচু পিচু পাচাকুতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষ রাজকীয় এস্টেট, যেখানে রাজপরিবারের অবস্থান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কৃষি উৎপাদন, রাজনৈতিক সমাবেশ এবং পবিত্র ভূদৃশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম একত্রে চলতে পারত। এটিকে শুধু প্রাসাদ, শুধু মন্দির অথবা শুধু দুর্গ—কোনো একক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা সম্ভবত ভুল।

মাচু পিচুর অসাধারণত্ব এখানেই। এটি শুধু কয়েকটি নিখুঁত পাথরের ভবনের সমষ্টি নয়। এর স্থাপত্য, পানি ব্যবস্থাপনা, নিষ্কাশন, কৃষি সোপান এবং প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য একসঙ্গে পরিকল্পিত একটি ব্যবস্থা। পাহাড়ের ওপর একটি ভবন বসানোর পরিবর্তে ইনকা প্রকৌশলীরা পুরো পাহাড়কেই যেন স্থাপত্যের অংশে পরিণত করেছিলেন।

আর সেই কারণেই মাচু পিচুর সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো ভিনগ্রহবাসী, হারিয়ে যাওয়া অতিপ্রযুক্তি কিংবা গোপন সভ্যতার মধ্যে নেই। রহস্যটি আরও বাস্তব—কেন পাচাকুতি বা ইনকা শাসকগোষ্ঠী এই নির্দিষ্ট পাহাড়কে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল, এখানে অনুষ্ঠিত প্রতিটি ধর্মীয় আচারের প্রকৃত অর্থ কী ছিল এবং যারা এখানে বসবাস করত তারা নিজেদের এই স্থানকে কী নামে ও কী অর্থে চিনত, তার অনেকটাই আমরা আর জানি না।

মাচু পিচু আসলে মেঘের মধ্যে লুকিয়ে রাখা কোনো গোপন শহর ছিল না; এটি ছিল ইনকা রাষ্ট্রের ক্ষমতা, ধর্ম, প্রকৌশল এবং আন্দীয় পবিত্র ভূদৃশ্যের এক অসাধারণ মিলনস্থল। স্প্যানিশ বিজয়ের পর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এটিকে জীবিত রেখেছিল সেটি ভেঙে পড়লে পাহাড়ের এই রাজকীয় কেন্দ্রও ধীরে ধীরে তার মূল ভূমিকা হারায়। কিন্তু পাথর, সোপান ও জলনালাগুলো রয়ে যায়। শতাব্দী পরে সেগুলোই আজ আমাদের দেখায়—ইনকারা শুধু পাহাড়ের ওপর একটি নগর নির্মাণ করেনি; তারা পাহাড়, পানি, কৃষি ও স্থাপত্যকে একত্র করে এমন একটি সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য সৃষ্টি করেছিল, যার সম্পূর্ণ অর্থ এখনও আমাদের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।


আপনার পছন্দ হতে পারে