বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইনকা সভ্যতা: আন্দিজের বিশাল সাম্রাজ্য মাত্র কয়েক দশকে কীভাবে ধ্বংস হয়ে গেল?

সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

ইনকা সভ্যতা: আন্দিজের বিশাল সাম্রাজ্য মাত্র কয়েক দশকে কীভাবে ধ্বংস হয়ে গেল?
কয়েক দশকে ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন

ষোড়শ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালাজুড়ে এমন একটি সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল, যার অধীনে ছিল অসংখ্য জনগোষ্ঠী, হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক, বিশাল কৃষিক্ষেত্র, খাদ্য ও সামগ্রী সংরক্ষণের অগণিত গুদাম এবং পাহাড়ের গায়ে নির্মিত বিস্ময়কর নগর ও দুর্গ। এর শাসকের ক্ষমতা বর্তমান কলম্বিয়ার দক্ষিণাংশ থেকে ইকুয়েডর, পেরু ও বলিভিয়া হয়ে চিলি ও আর্জেন্টিনার কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ইনকারা তাদের রাষ্ট্রকে বলত তাওয়ানতিনসুয়ু, যার অর্থ মোটামুটি “চার অঞ্চল একত্রে”। অথচ ১৫৩২ সালে ফ্রান্সিসকো পিজারোর নেতৃত্বে স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের একটি ছোট দল পেরুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করার কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিশাল রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে।

ঘটনাটি এত নাটকীয় যে একটি জনপ্রিয় গল্প তৈরি হয়েছে—মাত্র ১৬৮ জন স্প্যানিশ এসে কয়েক মিলিয়ন মানুষের ইনকা সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছিল। সংখ্যাটি পিজারোর প্রাথমিক অভিযাত্রী দলের আকার বোঝাতে প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, কিন্তু পুরো বিজয়ের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে এটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। স্প্যানিশদের ঘোড়া, ইস্পাতের অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তারা একা একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুস্থ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি। তাদের আগমনের আগেই ইনকা রাষ্ট্র মহামারি, উত্তরাধিকার সংকট এবং ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পরে হাজার হাজার স্থানীয় মিত্রও স্প্যানিশদের পক্ষে যুদ্ধ করে।

এই পতনের বিস্ময় বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হয় সাম্রাজ্যটি কত দ্রুত গড়ে উঠেছিল। ইনকাদের পূর্বপুরুষেরা কুসকো অঞ্চলে আরও আগে বসবাস করলেও তাদের বৃহৎ সাম্রাজ্যিক সম্প্রসারণ প্রধানত পঞ্চদশ শতকে ঘটে। ঐতিহ্য অনুযায়ী পাচাকুতি ইনকা ইউপানকির শাসনামল থেকেই কুসকোকেন্দ্রিক রাষ্ট্র নাটকীয়ভাবে বিস্তার লাভ করে। তাঁর এবং পরবর্তী শাসকদের অধীনে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই ইনকারা আন্দিজের বিশাল অঞ্চল নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করে।

অর্থাৎ ইনকা সাম্রাজ্য যত বিশাল ছিল, তার অনেক অঞ্চলই ছিল অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক বিজয়। এই বাস্তবতা পরে স্প্যানিশদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইনকারা যেসব জনগোষ্ঠীকে কয়েক দশক আগে পরাজিত করেছিল, তাদের সবাই কুসকোর শাসনকে ভালোবাসত বা নিজেদের “ইনকা” পরিচয়ের অংশ মনে করত—এমন ধারণা ভুল।

তাওয়ানতিনসুয়ুর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল কুসকো। এখান থেকে চারটি বৃহৎ অঞ্চলের দিকে সড়ক ছড়িয়ে পড়েছিল। ইনকা শাসক বা সাপা ইনকা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ মর্যাদা ধারণ করতেন। তাঁর নিচে অভিজাত, আঞ্চলিক প্রশাসক এবং স্থানীয় নেতাদের জটিল স্তর কাজ করত।

ইনকাদের নিজস্ব বর্ণমালাভিত্তিক লিখনব্যবস্থা ছিল না, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা প্রশাসনিক তথ্য সংরক্ষণ করতে পারত না। কিপু নামে পরিচিত রঙিন দড়ি ও গিঁটের ব্যবস্থা ব্যবহার করে সংখ্যাগত তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য নথিবদ্ধ করা হতো। বিশেষজ্ঞ কিপুকামায়ুক এই ব্যবস্থা তৈরি ও পাঠ করতে পারতেন। কিপুতে সংখ্যার বাইরে ঠিক কত ধরনের তথ্য সংরক্ষিত হতো, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

সাম্রাজ্যের অন্যতম অসাধারণ অর্জন ছিল কাপাক ঞান, অর্থাৎ বিশাল আন্দীয় সড়কব্যবস্থা। ইনকারা অনেক পুরোনো পথকে সম্প্রসারণ ও একীভূত করে কয়েক দশ হাজার কিলোমিটারের একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। পাহাড়, মরুভূমি ও গভীর উপত্যকা অতিক্রম করে এই সড়ক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলকে যুক্ত করেছিল।

ঘোড়া বা চাকাযুক্ত পরিবহনের ওপর নির্ভর না করেও এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। প্রশিক্ষিত দৌড়বিদ বা চাসকি এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে বার্তা পৌঁছে দিত। লামার কাফেলা পণ্য বহন করত। গভীর গিরিখাতের ওপর উদ্ভিদতন্তুর দড়ি দিয়ে তৈরি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা হতো। সড়কের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে বিশ্রাম ও প্রশাসনিক স্থাপনাও ছিল।

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইনকারা অসাধারণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। আন্দিজের পাহাড়ি ঢালে সোপান কৃষিক্ষেত্র নির্মাণ করে তারা চাষযোগ্য জমির ব্যবহার বাড়ায় এবং পানি নিয়ন্ত্রণ করে। আলু, ভুট্টা, কুইনোয়াসহ বিভিন্ন ফসল ভিন্ন উচ্চতার অঞ্চলে উৎপাদিত হতো।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে কোলকা নামে গুদাম তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে খাদ্য, বস্ত্র, অস্ত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষণ করা যেত। সেনাবাহিনী, প্রশাসনিক কর্মী কিংবা সংকটের সময় জনগোষ্ঠীকে সরবরাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব গুদাম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উচ্চভূমির ঠান্ডা ও শুষ্ক পরিবেশ অনেক খাদ্য সংরক্ষণে সহায়তা করত।

রাষ্ট্রের জন্য শ্রম দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে মিতা নামে পরিচিত শ্রমদায়িত্বের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীগুলো নির্দিষ্ট সময় রাষ্ট্রের প্রকল্পে কাজ করত। সড়ক, সেতু, কৃষিক্ষেত্র, মন্দির ও প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণ থেকে শুরু করে সামরিক কাজ পর্যন্ত এই শ্রমব্যবস্থা ব্যবহার করা যেত। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করত।

এমন সংগঠিত রাষ্ট্র এত দ্রুত কীভাবে বিপর্যস্ত হলো?

এর প্রথম বড় উত্তরটি স্প্যানিশদের আগমনের আগেই শুরু হয়। ইউরোপীয়দের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের আগেই গুটিবসন্তসহ পুরোনো বিশ্বের রোগ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রোগটি ঠিক কোন পথে এবং কোন সময়ে প্রতিটি আন্দীয় অঞ্চলে পৌঁছেছিল, তার বিস্তারিত নিয়ে গবেষণা রয়েছে, কিন্তু ইউরোপীয় সংক্রামক রোগ যে ইনকা সমাজে বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছিল, তা স্পষ্ট।

ইনকা শাসক হুয়াইনা কাপাক সম্ভবত ১৫২০-এর দশকে একটি মহামারির সময় মারা যান। তাঁর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের একজন নিনান কুয়ুচিও একই সময়ে মারা গিয়েছিলেন বলে পরবর্তী বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ফলে সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সামনে আসে—হুয়াসকার ও আতাহুয়ালপা। হুয়াসকারের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল কুসকো, আর আতাহুয়ালপার শক্তিশালী সমর্থন ছিল সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে এবং হুয়াইনা কাপাকের অভিজ্ঞ সেনাপতিদের মধ্যে। তাদের বিরোধ দ্রুত একটি ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়।

এই যুদ্ধ শুধু দুই ভাইয়ের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছিল না। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অভিজাত গোষ্ঠী, সেনাবাহিনী এবং অঞ্চল এতে জড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ নিহত হয়, রাজনৈতিক আনুগত্য ভেঙে যায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর ওপর কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হয়। স্প্যানিশরা যখন ১৫৩২ সালে আন্দিজের রাজনৈতিক কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন ইনকা সাম্রাজ্য সদ্য একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শেষ করেছে।

আতাহুয়ালপার বাহিনী শেষ পর্যন্ত হুয়াসকারকে পরাজিত করে। আতাহুয়ালপা তখন কার্যত বিজয়ী। ঠিক এই মুহূর্তেই পিজারো তার ছোট স্প্যানিশ বাহিনী নিয়ে সামনে আসে। ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় রাজনৈতিক সংঘর্ষগুলোর একটি ঘটে ১৫৩২ সালের ১৬ নভেম্বর কাজামার্কায়

আতাহুয়ালপা বিশাল অনুসারী ও সামরিক শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও স্প্যানিশদের ছোট দলকে তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখেননি। পিজারোর লোকেরা কাজামার্কার একটি প্রাঙ্গণের চারপাশে অবস্থান নেয়। আতাহুয়ালপা যখন সেখানে প্রবেশ করেন, স্প্যানিশরা আকস্মিক আক্রমণ চালায়।

ঘোড়া, ইস্পাতের তলোয়ার, বর্ম এবং আগ্নেয়াস্ত্র ও কামানের শব্দ ইনকা বাহিনীর জন্য অপরিচিত যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। সংকীর্ণ প্রাঙ্গণে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। বহু অনুসারী নিহত হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—আতাহুয়ালপাকে জীবিত বন্দি করা হয়।

এটি ছিল বিপর্যয়কর রাজনৈতিক আঘাত। অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রাজকীয় ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ শাসককে বন্দি করা শুধু একজন মানুষকে আটক করা ছিল না; রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রকেই শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

বন্দিদশায় আতাহুয়ালপা মুক্তির বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য দেওয়ার প্রস্তাব করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে মূল্যবান ধাতব সামগ্রী কাজামার্কায় আনা হয়। পরবর্তীকালে এগুলোর বড় অংশ গলিয়ে ভাগ করা হয়। কিন্তু মুক্তিপণ সংগ্রহের পরও স্প্যানিশরা তাঁকে মুক্তি দেয়নি।

১৫৩৩ সালে একটি প্রহসনমূলক বিচারের পর আতাহুয়ালপাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই মুহূর্তটি ইনকা রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য আরও বড় সংকট সৃষ্টি করে। তবে এটিকে সাম্রাজ্যের তাৎক্ষণিক সমাপ্তি বলা যাবে না। ইনকা প্রতিরোধ তখনও বহু দশক চলবে।

স্প্যানিশ বিজয়ের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জনপ্রিয় গল্পে প্রায়ই উপেক্ষিত দিক ছিল স্থানীয় মিত্রদের ভূমিকা। ইনকা সাম্রাজ্যের বহু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুসকোর সম্পর্ক ছিল সংঘাতপূর্ণ। কেউ সম্প্রতি বিজিত হয়েছিল, কেউ কর ও শ্রমের বাধ্যবাধকতায় অসন্তুষ্ট ছিল, আবার কেউ নিজেদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে সুযোগ খুঁজছিল।

হুয়াঙ্কাসহ বিভিন্ন আন্দীয় জনগোষ্ঠীর সদস্যরা পরবর্তী অভিযানে স্প্যানিশদের গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করে। তাদের সংখ্যা অনেক সময় স্প্যানিশ যোদ্ধাদের তুলনায় বহুগুণ বেশি ছিল। ফলে “কয়েকশ স্প্যানিশ বনাম লক্ষ লক্ষ ইনকা” হিসেবে পুরো যুদ্ধকে দেখানো ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে বিকৃত করে। এটি ছিল স্প্যানিশ অভিযাত্রী, বিভিন্ন স্থানীয় মিত্র, ইনকা গৃহযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক জোটের জটিল সংঘর্ষ।

১৫৩৩ সালে স্প্যানিশ বাহিনী ও তাদের মিত্ররা কুসকোতে প্রবেশ করে। তারা ইনকা রাজপরিবারের সদস্য মানকো ইনকাকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, আশা করেছিল তাঁকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। কিন্তু মানকো দ্রুত বুঝতে পারেন যে তাঁর প্রকৃত স্বাধীনতা অত্যন্ত সীমিত।

১৫৩৬ সালে মানকো ইনকা একটি বিশাল বিদ্রোহ শুরু করেন। ইনকা বাহিনী কুসকো অবরোধ করে এবং একসময় স্প্যানিশ অবস্থান অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সাকসাইহুয়ামানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তীব্র যুদ্ধ হয়। একই সময়ে অন্যান্য এলাকাতেও প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়ে।

এই বিদ্রোহ দেখিয়ে দেয় যে কাজামার্কায় আতাহুয়ালপাকে বন্দি করলেই ইনকা সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু দীর্ঘ অবরোধ ধরে রাখা কঠিন ছিল। কৃষির মৌসুম, খাদ্য সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং স্প্যানিশদের স্থানীয় মিত্রদের কারণে ইনকা বাহিনী শেষ পর্যন্ত কুসকো পুনর্দখল করতে পারেনি।

মানকো ইনকা পরে আন্দিজের দুর্গম ভিলকাবাম্বা অঞ্চলে সরে যান। সেখানে একটি স্বাধীন নব্য-ইনকা রাষ্ট্র টিকে থাকে। অর্থাৎ ১৫৩৩ সালে কুসকো পতনের পরও ইনকা রাজনৈতিক প্রতিরোধ প্রায় চার দশক ধরে অব্যাহত ছিল।

এই সময়ের মধ্যে স্প্যানিশরাও নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পিজারো ও দিয়েগো দে আলমাগ্রোর অনুসারীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। ফলে বিজয় কোনো সুপরিকল্পিত, নির্বিঘ্ন ইউরোপীয় অভিযান ছিল না। আন্দিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছিল বহুস্তরীয় যুদ্ধ, বিদ্রোহ, জোট পরিবর্তন এবং মহামারির মধ্যে।

ইউরোপীয় রোগের প্রভাব এ সময় আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গুটিবসন্তের পাশাপাশি পরবর্তী দশকগুলোতে অন্যান্য সংক্রামক রোগও আমেরিকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এসব রোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের পূর্ববর্তী প্রতিরোধক্ষমতা ছিল না। যুদ্ধ, খাদ্য উৎপাদনের ব্যাঘাত এবং সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে রোগের প্রভাব যুক্ত হয়ে আন্দিজের জনসংখ্যায় বিপর্যয়কর পতন ঘটায়।

স্প্যানিশরা শুধু সামরিক বিজয়েই থামেনি। তারা ধীরে ধীরে নতুন ঔপনিবেশিক প্রশাসন, খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, করব্যবস্থা এবং শ্রমশোষণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ইনকা রাষ্ট্রের পুরোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক কাঠামোর অধীনে চলে যায় বা পরিবর্তিত হয়।

ভিলকাবাম্বায় ইনকা প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত ১৫৭২ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। সে বছর স্প্যানিশ বাহিনী ভিলকাবাম্বা দখল করে এবং শেষ স্বাধীন ইনকা শাসক তুপাক আমারু বন্দি হন। তাঁকে পরে কুসকোতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে স্বাধীন নব্য-ইনকা রাষ্ট্রের অবসান ঘটে।

অতএব “ইনকা সাম্রাজ্য কয়েক বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল”—বাক্যটি আংশিক সত্য হলেও অসম্পূর্ণ। ১৫৩২ থেকে ১৫৩৩ সালের মধ্যে সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও রাজধানীর ওপর স্প্যানিশ নিয়ন্ত্রণ নাটকীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু সংগঠিত ইনকা প্রতিরোধ ১৫৭২ পর্যন্ত চলেছিল। রাজনৈতিক পতন ছিল দ্রুত, কিন্তু সম্পূর্ণ সামরিক ও ঔপনিবেশিক দখল ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

তাহলে শেষ পর্যন্ত ইনকা সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণ কোনটি? শুধু স্প্যানিশ অস্ত্র নয়। শুধু গুটিবসন্তও নয়। শুধু গৃহযুদ্ধও নয়। বরং একাধিক সংকট একই সময়ে একে অপরকে শক্তিশালী করেছিল। মহামারি শাসক ও বিপুল জনগোষ্ঠীকে হত্যা করেছিল; উত্তরাধিকার সংকট গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করেছিল; গৃহযুদ্ধ সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল করেছিল; স্প্যানিশরা আতাহুয়ালপাকে বন্দি করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আঘাত করেছিল; ঘোড়া ও ইস্পাত সামরিক সুবিধা দিয়েছিল; আর অসন্তুষ্ট স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জোট স্প্যানিশ বাহিনীকে বিশাল জনবল দিয়েছিল।

ইনকা রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে এত দ্রুত শক্তিশালী করেছিল, সেগুলোর কিছু আবার সংকটের সময় দুর্বলতায় পরিণত হয়। সাপা ইনকার ব্যক্তিকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক ব্যবস্থা শাসক বন্দি হলে বিপর্যস্ত হয়। সড়ক নেটওয়ার্ক ইনকা সেনা ও বার্তা দ্রুত সরাতে সাহায্য করত, কিন্তু বিজয়ীরা সেই একই যোগাযোগপথ ব্যবহার করতে পারে। বহু বিজিত জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা বিস্তারকে সহজ করেছিল, কিন্তু তাদের আনুগত্য সবসময় গভীর ছিল না।

তবুও ইনকা সভ্যতা ১৫৭২ সালে মানুষের সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়নি। আন্দিজের কেচুয়া ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষা, কৃষি, খাদ্য, বস্ত্র, সামাজিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে ইনকা ও আরও প্রাচীন আন্দীয় সভ্যতার বহু উত্তরাধিকার আজও জীবিত। কুসকোর বহু ঔপনিবেশিক ভবনের নিচে এখনও ইনকা পাথরের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো কৃষি সোপান এখনও ব্যবহৃত হয় এবং কেচুয়া ভাষা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের অংশ।

মাচু পিচু, সাকসাইহুয়ামান কিংবা কুসকোর নিখুঁত পাথরের দেয়াল তাই কোনো রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া জাতির স্মৃতিচিহ্ন নয়। এগুলো এমন এক রাষ্ট্রের সাক্ষ্য, যা মাত্র কয়েক প্রজন্মে আন্দিজের ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলোর একটি তৈরি করেছিল, কিন্তু একই সময়ে মহামারি, গৃহযুদ্ধ, বিদেশি আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের এক অভূতপূর্ব সম্মিলিত সংকটের মুখে পড়েছিল।

ইনকা সাম্রাজ্যের পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—একটি সাম্রাজ্য যত বিশালই হোক, তার শক্তি শুধু সেনাবাহিনী বা স্থাপত্যে থাকে না; রাজনৈতিক ঐক্য, খাদ্যব্যবস্থা, নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও নির্ভর করে। ১৫৩২ সালে স্প্যানিশরা যখন কাজামার্কায় পৌঁছেছিল, তারা কোনো স্থিতিশীল সাম্রাজ্যের দরজায় কড়া নাড়েনি। তারা পৌঁছেছিল এমন এক মুহূর্তে যখন রোগ, উত্তরাধিকার সংকট ও গৃহযুদ্ধ তাওয়ানতিনসুয়ুর ভিত ইতোমধ্যেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই সংকটকে কাজে লাগিয়ে স্প্যানিশ অভিযাত্রী ও তাদের অসংখ্য স্থানীয় মিত্র যে রাজনৈতিক পরিবর্তন শুরু করেছিল, তা কয়েক দশকের মধ্যেই আন্দিজের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে