বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

তানজিমাত সংস্কার ও অটোমান আধুনিকায়ন: সেনাবাহিনী, আইন, শিক্ষা ও প্রশাসন বদলে সাম্রাজ্য রক্ষার প্রচেষ্টা

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

তানজিমাত সংস্কার ও অটোমান আধুনিকায়ন: সেনাবাহিনী, আইন, শিক্ষা ও প্রশাসন বদলে সাম্রাজ্য রক্ষার প্রচেষ্টা
তানজিমাত: অটোমান রাষ্ট্রকে আধুনিক করার মহাপ্রয়াস

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অটোমান শাসকদের সামনে প্রশ্নটি আর শুধু নতুন ভূখণ্ড জয়ের ছিল না। বরং আরও মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল—ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি, রাশিয়ার সম্প্রসারণ, বলকানের জাতীয়তাবাদ, প্রাদেশিক শক্তির উত্থান এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্যে এত বিশাল সাম্রাজ্যকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে? এই সংকটের উত্তর খুঁজতে গিয়েই অটোমানরা তাদের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে, যা তানজিমাত নামে পরিচিত।

“তানজিমাত” শব্দের অর্থ মোটামুটি পুনর্গঠন বা পুনর্বিন্যাস। সাধারণভাবে ১৮৩৯ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত সময়কে তানজিমাত যুগ বলা হয়। তবে এর শিকড় আরও আগে, বিশেষ করে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের শাসনামলে। আর এর প্রভাব ১৮৭৬ সালের পরও অটোমান রাষ্ট্রে থেকে যায়।

তানজিমাতকে শুধু “অটোমানরা ইউরোপীয় হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা যায় না। সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে বাঁচানো। আরও কার্যকর সেনাবাহিনী, নিয়মিত করব্যবস্থা, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রশাসন, নতুন আইন, শিক্ষিত আমলাতন্ত্র এবং বিভিন্ন ধর্মের প্রজাদের সাম্রাজ্যের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে আনা—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত অটোমান রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পের অংশ ছিল।

এই সংস্কারের পেছনে কয়েক দশকের সামরিক বিপর্যয় ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে ধারাবাহিক যুদ্ধে অটোমানরা ক্রিমিয়া ও কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হারিয়েছিল। গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পুরোনো সামরিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৮২৭ সালের নাভারিনোতে অটোমান-মিশরীয় নৌবহর ধ্বংস হয়। এরপর রুশ বাহিনী এদির্নে পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

একই সময়ে মিশরের মুহাম্মদ আলী পাশা এমন শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন যে তার পুত্র ইব্রাহিম পাশা অটোমান বাহিনীকে পরাজিত করে আনাতোলিয়ার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। অর্থাৎ সমস্যা শুধু ইউরোপীয় শক্তির কাছে পরাজয় নয়; সাম্রাজ্যের নিজের একটি প্রদেশও কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে কার্যকর সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারছিল।

এই পরিস্থিতির অনেক আগেই সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন তৃতীয় সেলিম। তার নিজাম-ই জেদিদ বা “নতুন ব্যবস্থা” ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত নতুন সেনাবাহিনী তৈরির প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু জানিসারি ও তাদের রাজনৈতিক সহযোগীদের বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেলিম নিজেই ক্ষমতা হারান।

সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ তাই বুঝেছিলেন যে সামরিক সংস্কার করতে হলে প্রথমে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভাঙতে হবে। ১৮২৬ সালে জানিসারিদের বিদ্রোহের সুযোগে তিনি তাদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক সামরিক ব্যবস্থা নেন। জানিসারি ব্যারাকে কামান ব্যবহার করা হয় এবং বাহিনীটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

অটোমান ইতিহাসে ঘটনাটি ভাকা-ই হায়রিয়্যে, অর্থাৎ “শুভ ঘটনা” নামে পরিচিত। নামটি অবশ্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে। বহু জানিসারি নিহত, বন্দী বা নির্বাসিত হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর ফল ছিল গভীর—কয়েক শতাব্দী ধরে সামরিক সংস্কারের অন্যতম বড় বাধা হয়ে ওঠা একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হলো।

এরপর দ্বিতীয় মাহমুদ নতুন কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। ইউরোপীয় সামরিক প্রশিক্ষণ, নতুন পোশাক, আধুনিক অস্ত্র, অফিসার শিক্ষা এবং সামরিক বিদ্যালয়ের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে তিনি শুধু সেনাবাহিনী নয়, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন।

পুরোনো দরবারকেন্দ্রিক প্রশাসনের পরিবর্তে আধুনিক মন্ত্রণালয়সদৃশ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। পররাষ্ট্র, অর্থ এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের কাজ আরও বিশেষায়িত করা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের পোশাকেও পরিবর্তন আসে; ফেজ অটোমান আমলাতান্ত্রিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় মাহমুদ প্রাদেশিক ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগী হন। কারণ অষ্টাদশ শতাব্দীতে বহু অঞ্চলে আয়ান বা স্থানীয় অভিজাতদের ক্ষমতা বেড়ে গিয়েছিল। কেন্দ্রের লক্ষ্য ছিল কর, সেনা ও প্রশাসনের ওপর ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ আবার শক্তিশালী করা।

১৮৩৯ সালে দ্বিতীয় মাহমুদের মৃত্যুর পর তার তরুণ পুত্র আবদুলমেজিদ প্রথম সিংহাসনে বসেন। তখনই অটোমানরা মিশরের মুহাম্মদ আলীর সঙ্গে নতুন সংকটে জড়িয়ে পড়েছিল। এমন এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেই তানজিমাতের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।

১৮৩৯ সালের ৩ নভেম্বর গুলহানে পার্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় ফরমান পাঠ করা হয়। এটি গুলহানে ফরমান বা হাত্ত-ই শরিফ অব গুলহানে নামে পরিচিত। এর পেছনে অন্যতম প্রধান সংস্কারক ছিলেন মুস্তাফা রেশিদ পাশা

ফরমানটিতে কয়েকটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করা হয়। প্রজাদের জীবন, সম্মান ও সম্পত্তির নিরাপত্তা, আরও নিয়মিত করব্যবস্থা এবং সুশৃঙ্খল সামরিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিচার ছাড়া শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা সীমিত করার কথাও বলা হয়।

আজকের দৃষ্টিতে এসব বিষয় স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু অটোমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এগুলোর গভীর তাৎপর্য ছিল। এর অর্থ ছিল রাষ্ট্র নিজেকেও ক্রমে লিখিত ও নিয়মিত আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

আগের ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ক্ষমতা, স্থানীয় রীতি, শরিয়াহ, সুলতানি কানুন এবং প্রশাসনিক প্রথা পাশাপাশি কাজ করত। তানজিমাতের লক্ষ্য ছিল এগুলোর ওপর আরও নিয়মিত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা।

কর সংস্কার ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরোনো ব্যবস্থায় অনেক অঞ্চলে কর সংগ্রহের অধিকার ব্যক্তিদের কাছে ইজারা দেওয়া হতো। এই ইলতিজাম ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত অর্থ পেলেও স্থানীয় করসংগ্রাহকদের অতিরিক্ত ক্ষমতা তৈরি হতে পারত এবং কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার অভিযোগ ছিল।

তানজিমাত সরকার আরও সরাসরি ও নিয়মিত কর সংগ্রহের চেষ্টা করে। ভূমি, সম্পত্তি, উৎপাদন ও জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহের জন্য নতুন জরিপ ও নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্র এখন তার প্রজাদের সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য জানতে চাইছিল।

এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আদমশুমারি, ভূমি নিবন্ধন এবং নতুন আমলাতান্ত্রিক নথিপত্রের বিস্তার যুক্ত ছিল। আধুনিক রাষ্ট্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য—মানুষ, জমি, কর ও সম্পদকে নথিবদ্ধ করা—অটোমান সাম্রাজ্যেও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সামরিক নিয়োগেও পরিবর্তনের চেষ্টা হয়। আগে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলের সামরিক দায়িত্ব একরকম ছিল না। তানজিমাত রাষ্ট্র আরও নিয়মিত কনস্ক্রিপশন বা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিল।

এর পেছনে শুধু সামরিক দক্ষতা নয়, কেন্দ্রীকরণের প্রশ্নও ছিল। একজন কৃষক যখন কেন্দ্রীয় সরকারের সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন, তখন রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। একইভাবে কর ও নিবন্ধনের মাধ্যমে ইস্তাম্বুলের সরকার স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীকে পাশ কাটিয়ে জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

তানজিমাতের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে আইনের ক্ষেত্রে। অটোমান আইনব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে শরিয়াহ আদালত, সুলতানি কানুন, স্থানীয় রীতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইনি ব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত ছিল।

উনিশ শতকে বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ায় নতুন ধরনের আইন ও আদালতের প্রয়োজন হয়। ১৮৫০ সালের বাণিজ্যিক আইন ফরাসি আইনের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। পরে ফৌজদারি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।

নতুন নিজামিয়ে আদালত ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রপ্রণীত আইন অনুযায়ী দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করা হতো। একই সময়ে শরিয়াহ আদালতও টিকে থাকে। ফলে পুরোনো ব্যবস্থা রাতারাতি বিলুপ্ত হয়নি; বরং একাধিক বিচারিক কাঠামো পাশাপাশি চলতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে মেজেল্লে নামে ইসলামী হানাফি আইনশাস্ত্রের ভিত্তিতে একটি আধুনিক দেওয়ানি আইনসংহতি তৈরি করা হয়। ১৮৬৯ থেকে ১৮৭৬ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রস্তুত এই আইন দেখায় যে অটোমান আধুনিকায়ন সবসময় সরাসরি ইউরোপীয় আইন অনুলিপি করা ছিল না। কখনো ইসলামী আইনকেও আধুনিক রাষ্ট্রের কোডিফায়েড কাঠামোয় পুনর্গঠন করা হয়েছে।

১৮৫৬ সালের ইসলাহাত ফরমানি বা সংস্কার ফরমান তানজিমাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ঘোষিত এই ফরমান মুসলিম ও অমুসলিম অটোমান প্রজাদের আইনগত অবস্থানের প্রশ্নে আরও বিস্তৃত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়।

খ্রিষ্টান ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর সরকারি চাকরি, শিক্ষা, বিচার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অধিক সমতার কথা বলা হয়। ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য কমিয়ে একটি বৃহত্তর অটোমান রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছিল।

এর পেছনে আদর্শিক এবং বাস্তব—দুই ধরনের কারণ ছিল। অটোমান সংস্কারকেরা বুঝতে পারছিলেন যে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বৈষম্য বজায় রেখে আধুনিক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র তৈরি করা কঠিন। একই সঙ্গে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় শক্তি অমুসলিমদের অধিকার প্রশ্নে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিল।

তবে ফরমান ঘোষণা আর বাস্তব সমতা প্রতিষ্ঠা এক বিষয় ছিল না। মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সমাজের বিভিন্ন অংশ এই পরিবর্তন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল। কিছু মুসলিম মনে করত তাদের ঐতিহাসিক বিশেষ অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার অনেক খ্রিষ্টান সম্প্রদায় কাগজে ঘোষিত অধিকার বাস্তবে যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ করত।

তানজিমাতের একটি মৌলিক রাজনৈতিক ধারণা ছিল অটোমানবাদ। লক্ষ্য ছিল ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সাম্রাজ্যের সব প্রজাকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যে আনা।

এই ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলকানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মুখে। গ্রিস ইতোমধ্যে স্বাধীন হয়েছে। সার্বিয়া ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। অন্যান্য বলকান জনগোষ্ঠীর মধ্যেও জাতীয় পরিচয় শক্তিশালী হচ্ছে। অটোমানবাদ ছিল এই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে একটি বিকল্প—তোমার ধর্ম বা ভাষা যাই হোক, তুমি একই অটোমান রাষ্ট্রের নাগরিক।

১৮৬৯ সালের অটোমান জাতীয়তা আইন এই ধারণাকে আরও আইনি রূপ দেয়। সাম্রাজ্যের জনগণকে একটি সাধারণ অটোমান নাগরিকত্বের অধীনে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন ছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুধু আইনি বৈষম্য থেকে তৈরি হয়নি; ভাষা, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি এর সঙ্গে জড়িত ছিল। ফলে নাগরিক সমতার প্রতিশ্রুতি দিলেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বন্ধ হয়নি।

শিক্ষা সংস্কার তানজিমাত রাষ্ট্রের আরেকটি মৌলিক স্তম্ভ ছিল। আধুনিক সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে প্রশিক্ষিত অফিসার দরকার, নতুন প্রশাসন চালাতে শিক্ষিত আমলা দরকার এবং নতুন আইন প্রয়োগ করতে বিচারক ও কর্মকর্তা দরকার। পুরোনো মাদ্রাসা ব্যবস্থা একা এই সব চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না।

তাই নতুন সামরিক, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। গণিত, ভূগোল, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিদেশি ভাষার মতো বিষয়ের গুরুত্ব বাড়ে। ইউরোপীয় ভাষা জানা কর্মকর্তারা পররাষ্ট্র ও কূটনীতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

ইস্তাম্বুলের মুলকিয়ে প্রশাসনিক বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান নতুন ধরনের পেশাদার আমলা তৈরির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সামরিক একাডেমিগুলোও নতুন অফিসার শ্রেণি তৈরি করে। পরবর্তী অটোমান রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য থেকেই উঠে আসবেন।

১৮৬৯ সালের মারিফ-ই উমুমিয়ে নিজামনামেসি, অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষা বিধি, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্তরভিত্তিক ও কেন্দ্রীয় কাঠামোয় সংগঠিত করার চেষ্টা করে। প্রাথমিক থেকে উচ্চতর বিদ্যালয় পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ার পরিকল্পনা ছিল।

বাস্তবে পুরো সাম্রাজ্যে একই গতিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। অর্থের অভাব, স্থানীয় পরিস্থিতি এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব বিদ্যালয় ব্যবস্থার কারণে অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য ছিল। তবুও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ধর্মনিরপেক্ষ বা আধুনিক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার ছিল অটোমান সমাজে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা।

নতুন বিদ্যালয় থেকে যে শিক্ষিত আমলা, কর্মকর্তা, শিক্ষক ও অফিসার শ্রেণি বেরিয়ে আসে, তারা পরে শুধু রাষ্ট্র চালায়নি; রাষ্ট্রের সমালোচনাও করেছে। অর্থাৎ তানজিমাত নিজের সংস্কারপন্থী এবং পরবর্তী সাংবিধানিক বিরোধী বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।

প্রশাসনিক সংস্কার আরও ব্যাপক ছিল। ১৮৬৪ সালের ভিলায়েত আইন প্রাদেশিক শাসনকে নতুনভাবে সংগঠিত করে। সাম্রাজ্যকে ভিলায়েত, সাঞ্জাক, কাজা এবং আরও ছোট প্রশাসনিক এককে সাজানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়।

প্রাদেশিক গভর্নরের অধীনে প্রশাসনিক পরিষদ তৈরি হয় এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদেরও কিছু ক্ষেত্রে যুক্ত করা হয়। কিন্তু মূল লক্ষ্য ছিল ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ প্রদেশে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া।

এই কেন্দ্রীকরণের জন্য যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য ছিল। একটি ফরমান যদি রাজধানী থেকে সিরিয়া বা বলকানের কোনো প্রদেশে পৌঁছাতে সপ্তাহ লাগে, তাহলে আধুনিক কেন্দ্রীয় প্রশাসন কার্যকর করা কঠিন।

তাই তানজিমাত যুগে ডাকব্যবস্থা, সড়ক, বাষ্পচালিত জাহাজ, টেলিগ্রাফ এবং রেলপথের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ে। বিশেষ করে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় টেলিগ্রাফের কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে ইস্তাম্বুল বিভিন্ন প্রাদেশিক কেন্দ্রের সঙ্গে টেলিগ্রাফে যুক্ত হতে থাকে।

এর প্রশাসনিক প্রভাব ছিল বিপ্লবাত্মক। আগে কোনো প্রাদেশিক গভর্নরকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বাধীনতা দিতে হতো। এখন রাজধানী দ্রুত নির্দেশ পাঠাতে এবং তথ্য পেতে পারছে। প্রযুক্তি অটোমান কেন্দ্রীকরণের বাস্তব হাতিয়ারে পরিণত হয়।

রেলপথের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রাথমিক অটোমান রেলপথগুলো ইউরোপীয় পুঁজির সহায়তায় নির্মিত হয়। এগুলো বাণিজ্য, যাত্রী ও কৃষিপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সেনাবাহিনী দ্রুত স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করে।

ভূমি ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আসে। ১৮৫৮ সালের ভূমি আইন জমির নিবন্ধন, মালিকানা ও ব্যবহারের সম্পর্ককে আরও নিয়মিত করার চেষ্টা করে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল জমির ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা, কর সংগ্রহ সহজ করা এবং ভূমির আইনি অবস্থা পরিষ্কার করা।

কিন্তু বাস্তব ফল সবসময় সরকারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মেলেনি। অনেক কৃষক কর বা সামরিক নিয়োগের ভয়ে নিজেদের নামে জমি নিবন্ধন করতে অনিচ্ছুক ছিল। কোনো কোনো অঞ্চলে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে বড় জমি নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে আধুনিকীকরণ কখনো নতুন সামাজিক বৈষম্যও সৃষ্টি করেছে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তানজিমাত যুগ ছিল পরিবর্তনের সময়। ১৮৩৮ সালের বালতা লিমান বাণিজ্য চুক্তি ব্রিটেনের সঙ্গে অটোমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামো দেয়। পরবর্তী চুক্তিগুলো ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের জন্য সাম্রাজ্যের বাজার আরও উন্মুক্ত করে।

এতে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় এবং ইজমির, বৈরুত, সালোনিকা ও আলেকজান্দ্রিয়ার মতো বন্দরনগর দ্রুত বিকশিত হয়। ইউরোপে কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল রপ্তানি বাড়ে এবং ইউরোপীয় শিল্পপণ্য অটোমান বাজারে আরও বেশি প্রবেশ করে।

কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও ছিল। ইউরোপের শিল্পায়িত অর্থনীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেক স্থানীয় উৎপাদক সমস্যায় পড়ে। অটোমান অর্থনীতি ক্রমে ইউরোপীয় বাণিজ্য ও পুঁজির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়, যেখানে শক্তির ভারসাম্য সবসময় অটোমানদের পক্ষে ছিল না।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে বিদেশি ঋণ। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে ১৮৫৪ সালে অটোমান সরকার প্রথম বড় বিদেশি ঋণ গ্রহণ করে। এরপর নতুন অবকাঠামো, সামরিক ব্যয় এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণের ব্যবহার দ্রুত বাড়ে।

লন্ডন ও প্যারিসের আর্থিক বাজার থেকে অর্থ পাওয়া প্রথম দিকে সরকারের জন্য সুবিধাজনক মনে হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ সুদ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ক্রমাগত নতুন ঋণ সাম্রাজ্যকে ঋণের চক্রে ফেলতে থাকে।

এটি তানজিমাতের অন্যতম বড় বৈপরীত্য। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার জন্য আধুনিক সেনাবাহিনী, বিদ্যালয়, প্রশাসন ও অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছিল; কিন্তু এসবের অর্থায়ন করতে গিয়ে রাষ্ট্র বিদেশি পুঁজির ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল।

সংস্কারের আরেকটি সমস্যা ছিল সাম্রাজ্যের বিশাল বৈচিত্র্য। বসনিয়া, বুলগেরিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আনাতোলিয়া, হিজাজ কিংবা উত্তর আফ্রিকায় একই প্রশাসনিক ব্যবস্থা একইভাবে কার্যকর করা সম্ভব ছিল না।

কেন্দ্রীকরণ অনেক অঞ্চলে স্থানীয় অভিজাত ও সম্প্রদায়ের পুরোনো ক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলে। ফলে তানজিমাত কখনো কখনো কেন্দ্রের ক্ষমতা বাড়ানোর বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরোধও সৃষ্টি করে।

ধর্মীয় সমতার প্রশ্নও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। আগে মুসলিম ও অমুসলিম প্রজাদের আইনগত অবস্থানে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। নতুন রাষ্ট্র যখন তাদের একটি সাধারণ নাগরিক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করে, তখন শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে।

কোনো কোনো অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ধর্মীয় পরিচয় এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ একসঙ্গে সহিংস সংঘর্ষের জন্ম দেয়। ১৮৬০ সালে মাউন্ট লেবানন ও দামেস্কে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখিয়ে দেয় যে শুধু আইন ঘোষণা করে সাম্রাজ্যের জটিল সামাজিক দ্বন্দ্ব সমাধান করা সম্ভব নয়।

ইউরোপীয় শক্তিগুলোও সংস্কারকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত। রাশিয়া অর্থোডক্স জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন তুলত, ফ্রান্স ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক দাবি করত এবং ব্রিটেন অটোমান ভূখণ্ডের অখণ্ডতা সমর্থন করলেও বাণিজ্যিক সুবিধা চাইত।

ফলে অমুসলিমদের অধিকার উন্নত করা একই সঙ্গে অটোমান অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।

তানজিমাত যুগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুস্তাফা রেশিদ পাশা। তার পর মেহমেদ এমিন আলি পাশা ও কেচেচিজাদে ফুয়াদ পাশা সংস্কারপন্থী আমলাতন্ত্রের নেতৃত্ব দেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু সুলতানের ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সম্ভব নয়; দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্থায়ী আমলাতন্ত্র দরকার।

এর ফলে অটোমান আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিক গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। মন্ত্রণালয়, পরিষদ, আইন কমিশন এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র আরও প্রতিষ্ঠাননির্ভর হয়ে ওঠে।

এটি সুলতানের ক্ষমতা শেষ করে দেয়নি। কিন্তু রাজনীতি আর শুধু প্রাসাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছিল না। নতুন আমলা শ্রেণি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা এবং নীতি তৈরির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে শুরু করে।

এই পরিবর্তন থেকেই পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন জন্ম নেয়—যদি রাষ্ট্র আইনের দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে সুলতানের ক্ষমতারও কি সাংবিধানিক সীমা থাকা উচিত?

১৮৬০ ও ১৮৭০-এর দশকে ইয়ং অটোমানস বা তরুণ অটোমান নামে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের একটি গোষ্ঠী এই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। নামিক কামাল, জিয়া পাশা এবং তাদের সহযোগীরা ইসলামী রাজনৈতিক ধারণা, অটোমান দেশপ্রেম এবং সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্বকে একত্র করার চেষ্টা করেন।

তাদের যুক্তি ছিল, শুধু ওপর থেকে প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের জনগণকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে হবে এবং সুলতানের ক্ষমতাকে সংবিধানের মধ্যে আনতে হবে।

এই রাজনৈতিক চিন্তার পেছনে তানজিমাতেরই প্রভাব ছিল। নতুন বিদ্যালয়, সংবাদপত্র, অনুবাদ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং আধুনিক আমলাতন্ত্র একটি নতুন রাজনৈতিক জনপরিসর তৈরি করেছিল।

তবে ১৮৭০-এর দশকে অটোমান রাষ্ট্র আবার গুরুতর সংকটে পড়ে। কৃষিতে সমস্যা, সরকারি ব্যয়, বিদেশি ঋণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক মন্দার কারণে রাজকোষ দুর্বল হয়ে যায়। ১৮৭৫ সালে অটোমান সরকার কার্যত বিদেশি ঋণের পরিশোধ স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

একই সময়ে বলকানে বিদ্রোহ ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র হয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় বিদ্রোহ, বুলগেরীয় আন্দোলন এবং সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর সঙ্গে যুদ্ধ সাম্রাজ্যের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে।

এই সংকটের মধ্যেই ১৮৭৬ সালে সুলতান আবদুলআজিজ ক্ষমতাচ্যুত হন। অল্প সময়ের জন্য পঞ্চম মুরাদ সিংহাসনে থাকার পর দ্বিতীয় আবদুলহামিদ সুলতান হন।

১৮৭৬ সালের ডিসেম্বরে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সংবিধান কানুন-ই এসাসি ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে সংসদীয় প্রতিনিধিত্বসহ সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।

এই ঘটনাকে তানজিমাতের দীর্ঘ রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি পরিণতি হিসেবে দেখা যায়। ১৮৩৯ সালে যে সংস্কার শুরু হয়েছিল প্রজাদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, চার দশকের মধ্যে সেটি সংবিধান, নাগরিকত্ব এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে পৌঁছে যায়।

তাহলে তানজিমাত কি সফল হয়েছিল?

এর উত্তর সরল “হ্যাঁ” বা “না” নয়। তানজিমাত অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডগত ভাঙন থামাতে পারেনি। গ্রিস ইতোমধ্যে স্বাধীন ছিল, বলকানের জাতীয় আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়নি। বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতাও শেষ পর্যন্ত গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে।

কিন্তু অন্যদিকে তানজিমাত অটোমান রাষ্ট্রকে গভীরভাবে পুনর্গঠন করেছিল। নতুন মন্ত্রণালয়, আধুনিক সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র, প্রাদেশিক প্রশাসন, নতুন আদালত, আইনসংহতি, নাগরিকত্বের ধারণা, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, টেলিগ্রাফ ও নতুন যোগাযোগব্যবস্থা—এসব সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়ে দেয়।

এই কারণেই তানজিমাতকে শুধু ব্যর্থ সংস্কারের তালিকা হিসেবে দেখা যায় না। অটোমান সাম্রাজ্য ১৮৩৯ সালের পর আরও আট দশকের বেশি সময় টিকে ছিল এবং এই সময়ে তার প্রশাসনিক কাঠামো আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক, কেন্দ্রীভূত ও নথিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল।

তবে এই আধুনিকায়নের মধ্যেই নতুন বৈপরীত্য জন্ম নেয়। কেন্দ্রীকরণ বাড়লে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। নাগরিক সমতার ঘোষণা পুরোনো সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে। আধুনিক শিক্ষা নতুন রাজনৈতিক বিরোধী শ্রেণি তৈরি করে। রেলপথ ও টেলিগ্রাফ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, আবার একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক ধারণাকেও দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।

অর্থাৎ তানজিমাত শুধু পুরোনো অটোমান সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেনি—এটি সেই সাম্রাজ্যকেই নতুন ধরনের রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে শুরু করেছিল।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত ছিল রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের সম্পর্কের মধ্যে। পুরোনো ব্যবস্থায় একজন প্রজা অনেকাংশে নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়, স্থানীয় অভিজাত এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তানজিমাত রাষ্ট্র তাকে সরাসরি নিবন্ধন করছে, কর নির্ধারণ করছে, সেনাবাহিনীতে ডাকছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষা দিচ্ছে এবং একটি সাধারণ নাগরিক পরিচয়ের মধ্যে আনতে চাইছে।

এই অর্থে তানজিমাত ছিল অটোমান আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রকল্প।

কিন্তু এর জন্য যে অর্থ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার ছিল, তা সবসময় সাম্রাজ্যের হাতে ছিল না। বিদেশি ঋণ, জাতীয়তাবাদ, রুশ চাপ এবং ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ সংস্কারের সুফলকে বারবার সীমিত করেছে।

তবুও দ্বিতীয় মাহমুদের জানিসারি বিলুপ্তি থেকে গুলহানে ফরমান, ১৮৫৬ সালের সংস্কার ফরমান, নতুন আদালত, শিক্ষা ব্যবস্থা, ভিলায়েত আইন এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৭৬ সালের সংবিধান পর্যন্ত একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা দেখা যায়। অটোমান নেতৃত্ব বুঝেছিল যে পুরোনো প্রতিষ্ঠান অপরিবর্তিত রেখে নতুন বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়।

তাই তানজিমাতের ইতিহাস শুধু ইউরোপকে অনুকরণ করার ইতিহাস নয়। এটি ছিল সামরিক পরাজয় ও ভূখণ্ড হারানোর মুখে একটি বহুজাতিক সাম্রাজ্যের নিজেকে পুনর্গঠন করে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা।

সেনাবাহিনী আধুনিক করা হয়েছিল যাতে রাশিয়া ও ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। আইন সংস্কার করা হয়েছিল যাতে আরও নিয়মিত রাষ্ট্র ও অর্থনীতি তৈরি হয়। শিক্ষা বিস্তার করা হয়েছিল নতুন অফিসার ও আমলা তৈরির জন্য। প্রাদেশিক প্রশাসন পুনর্গঠন করা হয়েছিল যাতে ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়। আর নাগরিক সমতার ধারণা সামনে আনা হয়েছিল যাতে ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি সাধারণ অটোমান রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করা যায়।

এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের সব সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। কিন্তু তানজিমাত ছাড়া উনিশ শতকের শেষভাগের অটোমান সাম্রাজ্যকে বোঝা অসম্ভব। কারণ এই যুগেই পুরোনো সাম্রাজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা একে অপরের সঙ্গে মিশতে শুরু করে—এবং সেই পরিবর্তনের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় সাংবিধানিক আন্দোলন, নতুন রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী, আধুনিক আমলাতন্ত্র এবং শেষ পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ যুগের নতুন ক্ষমতার লড়াই।


আপনার পছন্দ হতে পারে