বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এরিক দ্য রেড ও গ্রিনল্যান্ড: বরফের দেশে ভাইকিং উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার রোমাঞ্চকর ইতিহাস

সিরিজ: ভাইকিং যুগ: অভিযান, বিজয় ও নর্স সভ্যতার ইতিহাস

এরিক দ্য রেড ও গ্রিনল্যান্ড: বরফের দেশে ভাইকিং উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার রোমাঞ্চকর ইতিহাস
এরিক দ্য রেড ও বরফের দেশে নর্স বসতি

দশম শতকের শেষভাগে উত্তর আটলান্টিকের পশ্চিম প্রান্তে নর্স অভিযাত্রীরা এমন এক ভূখণ্ডে স্থায়ী সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল, যার অধিকাংশ অংশ আজও বিশাল বরফস্তরের নিচে ঢাকা। সেই অভিযানের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন এরিক দ্য রেড—একজন নর্স অভিযাত্রী, যিনি আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর পশ্চিমে যাত্রা করে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অনুসন্ধান করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি সেখানে ফিরে যান একটি সম্পূর্ণ বসতি স্থাপনকারী বহর নিয়ে। এর ফলে গ্রিনল্যান্ডে এমন একটি নর্স সমাজের জন্ম হয়, যা প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে উত্তর আটলান্টিকের এক দুর্গম প্রান্তে টিকে থাকবে।

এরিক দ্য রেডের পুরোনো নর্স নাম ছিল এরিক থরভাল্ডসন। “দ্য রেড” উপাধিটির কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যায় না, তবে সাধারণভাবে তাঁর লালচে চুল ও দাড়ির সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয়। তাঁর জীবনের প্রধান তথ্য এসেছে মধ্যযুগীয় আইসল্যান্ডীয় সাগা, বিশেষ করে Saga of the Greenlanders এবং Saga of Erik the Red থেকে। এসব রচনা ঘটনাগুলোর বহু পরে লিখিত হওয়ায় প্রতিটি নাটকীয় বিবরণকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে গ্রিনল্যান্ডে নর্স বসতির বৃহত্তর ইতিহাস সম্পর্কে একটি শক্তিশালী চিত্র পাওয়া যায়।

এরিকের পরিবার মূলত নরওয়ের ছিল। পরবর্তী ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা থরভাল্ড আসভাল্ডসন হত্যাকাণ্ডের কারণে নরওয়ে ছেড়ে আইসল্যান্ডে চলে যান। এরিক সেখানেই বড় হন এবং পরবর্তীতে নিজস্ব খামার ও পরিবার প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তাঁর জীবনও সহিংস বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনার পর আনুমানিক ৯৮২ সালের দিকে আইসল্যান্ডীয় সমাবেশ তাঁকে তিন বছরের জন্য নির্বাসিত করে।

এই নির্বাসনই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। এরিক পূর্বে শোনা পশ্চিমের একটি ভূখণ্ডের সন্ধানে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর আগে গুনবিয়র্ন উলফসন নামের এক নর্স নাবিক আইসল্যান্ডের পশ্চিমে অজানা ভূমি দেখেছিলেন বলে আইসল্যান্ডীয় ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ এরিক সম্পূর্ণ অজানা পৃথিবীর দিকে অন্ধভাবে যাত্রা করেননি; পশ্চিমে ভূমি থাকার কিছু নৌ-জ্ঞান নর্সদের মধ্যে সম্ভবত ইতোমধ্যেই ছিল।

আইসল্যান্ড থেকে গ্রিনল্যান্ডের দিকে যাত্রা সহজ ছিল না। মাঝখানে ছিল উত্তর আটলান্টিকের শত শত কিলোমিটার উত্তাল সমুদ্র। আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারত, কুয়াশা দিক নির্ণয় কঠিন করে তুলত এবং ভাসমান বরফ জাহাজের জন্য মারাত্মক বিপদ সৃষ্টি করতে পারত। আধুনিক মানচিত্র, উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় বা নির্ভরযোগ্য চৌম্বক দিকনির্দেশক ছাড়াই নর্স নাবিকদের সূর্য, তারকা, বাতাস, ঢেউ, পাখি এবং পূর্ববর্তী নৌ-অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হতো।

এরিক শেষ পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছান। কিন্তু বিশাল বরফস্তরে ঢাকা দ্বীপটির পূর্ব উপকূল বসতি স্থাপনের জন্য সহজ ছিল না। তিনি দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে অপেক্ষাকৃত আশ্রয়যুক্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ফিয়র্ডগুলো অনুসন্ধান করেন। এখানকার কিছু উপকূলীয় উপত্যকা গ্রীষ্মে সবুজ ঘাসে ঢাকা থাকত এবং পশুপালনের সুযোগ ছিল। গ্রিনল্যান্ড নামটি শুনে আজ যে সম্পূর্ণ বরফাচ্ছন্ন দৃশ্য কল্পনা করা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিমের এসব ফিয়র্ড তার তুলনায় অনেক বেশি বাসযোগ্য ছিল।

প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, এরিক নির্বাসনের প্রায় তিন বছর গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল অনুসন্ধান করেন। তিনি সম্ভাব্য খামারের জমি, ফিয়র্ড, উপকূল এবং নৌপথ সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করেন। ফলে আইসল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি শুধু একটি নতুন ভূমির গল্প নিয়ে যাননি; কোথায় বসতি স্থাপন করা সম্ভব, সে সম্পর্কেও বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল।

এই সময়েই দ্বীপটির “গ্রিনল্যান্ড” নামকরণের বিখ্যাত কাহিনি আসে। Saga of Erik the Red অনুযায়ী, এরিক মনে করেছিলেন আকর্ষণীয় নাম দিলে মানুষ সেখানে যেতে বেশি আগ্রহী হবে, তাই তিনি ভূখণ্ডটির নাম দেন Greenland বা “সবুজ ভূমি”। এই গল্পকে কখনো ইতিহাসের প্রথম সফল বিপণনকৌশলের মজার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে এটি একটি পরবর্তী সাহিত্যিক উৎসের বক্তব্য। নামকরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—গ্রিনল্যান্ড তখন বর্তমান সময়ের তুলনায় কিছুটা উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক জলবায়ুর একটি পর্যায়ের মধ্যে ছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে দ্বীপটি তখন বরফহীন বা সর্বত্র সবুজ ছিল। বিশাল অভ্যন্তরীণ বরফস্তর তখনও ছিল। নর্সদের বসবাসযোগ্য এলাকা মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের ফিয়র্ডঘেরা সীমিত উপকূলীয় অঞ্চলেই ছিল।

নির্বাসন শেষ হলে এরিক আইসল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং নতুন ভূমিতে বসতি স্থাপনের জন্য মানুষ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। আনুমানিক ৯৮৫ বা ৯৮৬ সালের দিকে একটি বড় বহর আইসল্যান্ড থেকে গ্রিনল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়। মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যে ২৫টি জাহাজ যাত্রা করার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১৪টি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছিল। অন্যগুলো ফিরে গিয়েছিল অথবা সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছিল বলে বর্ণনা করা হয়। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব না হলেও যাত্রার বিপজ্জনক প্রকৃতি নিয়ে সন্দেহ নেই।

এই বহরের যাত্রীরা শুধু যোদ্ধা বা অভিযাত্রী ছিল না। স্থায়ী সমাজ গড়তে প্রয়োজন ছিল নারী, পুরুষ, শিশু, কৃষক, কারিগর এবং গৃহস্থালির শ্রমশক্তি। তারা সঙ্গে নিয়ে যায় গরু, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া এবং সম্ভবত অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী। কৃষি সরঞ্জাম, বীজ, খাদ্য, কাপড়, কাঠ ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসও জাহাজে বহন করতে হতো। অর্থাৎ এটি ছিল একটি নতুন ভূখণ্ডে সম্পূর্ণ সমাজ স্থানান্তরের প্রচেষ্টা।

এরিক দক্ষিণ-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের একটি অঞ্চলে নিজের খামার প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল ব্রাত্তাহলিদ। বর্তমান কাসিয়ারসুক এলাকার কাছে এর অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। এটি পরবর্তী গ্রিনল্যান্ডীয় নর্স সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খামার ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এরিক নিজেও সেখানে একজন প্রভাবশালী প্রধান হিসেবে অবস্থান করেন।

গ্রিনল্যান্ডের নর্স বসতি প্রধানত দুটি অঞ্চলে গড়ে ওঠে—Eastern Settlement বা পূর্বাঞ্চলীয় বসতি এবং Western Settlement বা পশ্চিমাঞ্চলীয় বসতি। নামগুলো আধুনিক মানচিত্রে কিছুটা বিভ্রান্তিকর, কারণ উভয় অঞ্চলই মূলত গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের দিকে ছিল। Eastern Settlement ছিল আরও দক্ষিণে এবং জনসংখ্যায় বড়; Western Settlement ছিল আরও উত্তরে, বর্তমান নুক অঞ্চলের দিকে।

পরবর্তী সময়ে আরও ছোট Middle Settlement-এর কথাও ব্যবহৃত হয়েছে, যদিও এটি বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বসতির অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে গ্রিনল্যান্ডের নর্স অঞ্চলগুলোতে শত শত খামারের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ছিল সাধারণ ছোট খামার থেকে শুরু করে বড় অভিজাত সম্পত্তি।

নর্সরা গ্রিনল্যান্ডে মূলত পশুপালননির্ভর কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলে। গরু ছিল মর্যাদাপূর্ণ ও মূল্যবান, কিন্তু দীর্ঘ শীতে তাদের জন্য প্রচুর শুকনো ঘাস সংরক্ষণ করতে হতো। ভেড়া ও ছাগল তুলনামূলকভাবে কঠিন পরিবেশে বেশি কার্যকর ছিল। গ্রীষ্মের স্বল্প সময়ে যতটা সম্ভব ঘাস কেটে শীতের জন্য জমা করা ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

তবে শুধু কৃষি দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের নর্স সমাজ টিকে থাকেনি। তারা মাছ, সিল, সামুদ্রিক পাখি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করত। বিশেষ করে উত্তরের শিকার অভিযানে ওয়ালরাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওয়ালরাসের দাঁতের হাতির দাঁতের মতো মূল্যবান অংশ মধ্যযুগীয় ইউরোপে বিলাসবহুল সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হতো।

এই ওয়ালরাসের দাঁতই গ্রিনল্যান্ডকে ইউরোপীয় বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখার অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়। এর পাশাপাশি পশুর চামড়া, দড়ি এবং অন্যান্য উত্তরাঞ্চলীয় পণ্যও রপ্তানি হতে পারে। বিনিময়ে নর্সরা এমন জিনিস পেত যা গ্রিনল্যান্ডে সহজে পাওয়া যেত না—বিশেষ করে লোহা, উন্নত অস্ত্র, কাঠ এবং বিলাসপণ্য।

কাঠের সংকট ছিল বিশেষ সমস্যা। গ্রিনল্যান্ডে বড় নির্মাণকাজের উপযোগী বনভূমি ছিল অত্যন্ত সীমিত। তাই নর্সরা ভেসে আসা কাঠ সংগ্রহ করত এবং বাইরে থেকেও কাঠ আনত। এই প্রয়োজনই সম্ভবত তাদের আরও পশ্চিমে উত্তর আমেরিকার উপকূলের বনাঞ্চলের প্রতি আগ্রহের একটি কারণ ছিল।

এরিক দ্য রেডের পরিবারের মাধ্যমেই সেই পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয়। তাঁর ছেলে লেইফ এরিকসন পরে গ্রিনল্যান্ড থেকে আরও পশ্চিমে যাত্রা করে উত্তর আমেরিকার উপকূলে পৌঁছানোর সঙ্গে যুক্ত হন। নর্সরা সেই অঞ্চলের একটি অংশকে ভিনল্যান্ড নামে চিনত। আজ কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের ল'আন্স অক্স মেডোজে পাওয়া নর্স প্রত্নস্থল প্রমাণ করে যে প্রায় ১০০০ সালের দিকে নর্সরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল।

গ্রিনল্যান্ড তাই ভাইকিংদের পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণের শেষ গন্তব্য ছিল না; এটি আরও পশ্চিমে যাওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল। আইসল্যান্ড থেকে গ্রিনল্যান্ড এবং গ্রিনল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকা—এই ধারাবাহিক যাত্রা দেখায় নর্স নৌপ্রযুক্তি ও উত্তর আটলান্টিক সম্পর্কে তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান কতটা উন্নত ছিল।

এরিকের সময়েই গ্রিনল্যান্ডীয় সমাজে আরেকটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়—খ্রিস্টধর্মের বিস্তার। সাগা অনুযায়ী, লেইফ এরিকসন নরওয়েতে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে গ্রিনল্যান্ডে ফিরে আসেন। এরিক নিজে নতুন ধর্ম গ্রহণে অনাগ্রহী ছিলেন বলে কাহিনিতে বলা হয়েছে, কিন্তু তাঁর স্ত্রী থিওধিল্ড খ্রিস্টান হন এবং ব্রাত্তাহলিদের কাছে একটি ছোট গির্জা নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত।

পরবর্তী শতাব্দীতে গ্রিনল্যান্ডের নর্স সমাজ সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় জগতের অংশে পরিণত হয়। গির্জা নির্মিত হয়, গারদারে বিশপের আসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইউরোপীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ যে সমাজের সূচনা হয়েছিল একজন নির্বাসিত নর্স নেতার অভিযানের মাধ্যমে, সেটিই পরে সংগঠিত খ্রিস্টীয় উপনিবেশে পরিণত হয়।

তবে গ্রিনল্যান্ড নর্সদের আগমনের আগে বা পরে সম্পূর্ণ জনশূন্য বৃহত্তর আর্কটিক অঞ্চল ছিল—এমন ধারণাও সঠিক নয়। বিভিন্ন সময়ে আর্কটিক সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করেছে। নর্স বসতির পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে থুলে সংস্কৃতির মানুষ, আধুনিক ইনুইটদের পূর্বপুরুষ, গ্রিনল্যান্ডে বিস্তার লাভ করে। নর্স ও ইনুইট জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ ঠিক কতটা ছিল, তা নিয়ে গবেষণা চলমান; প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত প্রমাণ থেকে অন্তত কিছু যোগাযোগ ও সংঘর্ষের সম্ভাবনা বোঝা যায়।

সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, কয়েক শতাব্দী টিকে থাকার পর গ্রিনল্যান্ডের নর্স বসতিগুলো কেন অদৃশ্য হয়ে গেল। Western Settlement সম্ভবত চতুর্দশ শতকের মধ্যে পরিত্যক্ত হয়। বৃহত্তর Eastern Settlement পঞ্চদশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত টিকে ছিল বলে প্রমাণ রয়েছে। এরপর গ্রিনল্যান্ডে সংগঠিত নর্স সমাজের আর কোনো নিশ্চিত চিহ্ন দেখা যায় না।

একসময় এই পতনের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হতো। বাস্তবে কারণ সম্ভবত অনেক বেশি জটিল। মধ্যযুগের শেষভাগে উত্তর আটলান্টিকের জলবায়ু শীতল হতে থাকে, ফলে কৃষি ও পশুপালন কঠিন হয়ে ওঠে। সমুদ্রের বরফ বৃদ্ধি নৌযোগাযোগেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে ওয়ালরাসের দাঁতের চাহিদা কমে যাওয়া গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি অর্থনীতিকে দুর্বল করে।

ইউরোপের সঙ্গে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া, জনসংখ্যার সীমাবদ্ধতা, মাটির ক্ষয়, পশুখাদ্যের সংকট এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই নর্স গ্রিনল্যান্ডের পতনকে কোনো একটি আকস্মিক বিপর্যয়ের ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ দীর্ঘ সময় ধরে একে অপরকে শক্তিশালী করেছিল বলে মনে করা হয়।

এরিক দ্য রেড অবশ্য এই পতন দেখেননি। তিনি এমন এক সময়ে বেঁচেছিলেন যখন গ্রিনল্যান্ড ছিল নতুন সম্ভাবনার সীমান্ত। তাঁর উদ্যোগে আইসল্যান্ড থেকে আসা বসতি স্থাপনকারীরা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন পরিবেশে খামার, পরিবার, বাণিজ্য ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। তাদের বসতি ক্ষণস্থায়ী অভিযান ছিল না—এটি কয়েক শতাব্দীর একটি স্থায়ী সমাজে পরিণত হয়েছিল।

এই কারণেই এরিক দ্য রেডের গ্রিনল্যান্ড অভিযানকে শুধু একজন দুঃসাহসী নাবিকের গল্প হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ভাইকিং যুগে অভিবাসন ও উপনিবেশ স্থাপনের অসাধারণ উদাহরণ। নর্সরা এখানে কোনো সমৃদ্ধ ইউরোপীয় নগর দখল করেনি, কোনো রাজাকে পরাজিত করে রাজ্য ছিনিয়ে নেয়নি। বরং তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এমন এক কঠিন পরিবেশে পৌঁছেছিল, যেখানে টিকে থাকার জন্য তাদের কৃষি, পশুপালন, শিকার, বাণিজ্য এবং নৌযোগাযোগ—সবকিছুকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল।

এরিকের নির্বাসন দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রার দীর্ঘমেয়াদি ফল আরও বিস্ময়কর। গ্রিনল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত নর্স সমাজই পরবর্তী অভিযাত্রীদের উত্তর আমেরিকার আরও কাছে নিয়ে যায়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আইসল্যান্ডের পশ্চিমে একটি দূরবর্তী ভূমির সন্ধান থেকে শুরু হওয়া অভিযান উত্তর আটলান্টিকজুড়ে একটি নতুন নর্স জগতের জন্ম দেয়।

এরিক দ্য রেডের ইতিহাস তাই ভাইকিং যুগের সীমাহীন সমুদ্রযাত্রার অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত একজন নর্স প্রধান পশ্চিমের অজানা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন ভূমি অনুসন্ধান করেছিলেন, সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী সমাজ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বরফ, সমুদ্র ও বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সেই সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে ছিল। গ্রিনল্যান্ডের নর্স বসতি প্রমাণ করে, ভাইকিংদের ইতিহাস শুধু লুটপাট ও যুদ্ধের নয়—এটি নতুন পৃথিবীর সন্ধান, অভিবাসন, অভিযোজন এবং মানব বসতির সীমাকে আরও দূরে নিয়ে যাওয়ার ইতিহাসও।


আপনার পছন্দ হতে পারে