মঙ্গল গ্রহে মানুষ বসবাস করতে পারবে কি? লাল গ্রহে মানববসতির বাস্তব সম্ভাবনা ও কঠিন চ্যালেঞ্জ
মঙ্গলে মানববসতি—সম্ভাবনা, প্রযুক্তি ও টিকে থাকার লড়াই
মঙ্গল গ্রহে মানুষ বসবাস করতে পারবে কি—এই প্রশ্নের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, বর্তমান অবস্থায় মঙ্গলের খোলা পরিবেশে মানুষ এক মুহূর্তও স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারবে না, কিন্তু উপযুক্ত প্রযুক্তিনির্ভর সুরক্ষিত আবাসন তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি মানববসতি গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। তবে পৃথিবীতে একটি নতুন শহর নির্মাণ আর মঙ্গলে মানববসতি গড়ে তোলা একই ধরনের সমস্যা নয়। মঙ্গলে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বাতাস, স্বাভাবিক বায়ুচাপ, সহজলভ্য তরল পানি, কৃষিযোগ্য পরিবেশ, পর্যাপ্ত বিকিরণ সুরক্ষা কিংবা পৃথিবীর মতো মাধ্যাকর্ষণ—কোনোটিই নেই। ফলে মঙ্গলে বসবাসের অর্থ হবে একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম জীবনধারণ ব্যবস্থা তৈরি করে তার ভেতরে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা।
মঙ্গলকে মানববসতির সম্ভাব্য স্থান হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটি হলো এটি পৃথিবীর তুলনামূলক কাছের একটি পাথুরে গ্রহ। এর দিনও পৃথিবীর দিনের কাছাকাছি। মঙ্গলের একটি সৌরদিন প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট দীর্ঘ। ফলে মানুষের দৈনন্দিন ঘুম, কাজ ও বিশ্রামের ছন্দকে সেখানে মানিয়ে নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। মঙ্গলে ঋতু আছে, মেরু অঞ্চলে বরফ আছে এবং ভূগর্ভেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানির বরফ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব বৈশিষ্ট্য মঙ্গলকে শুক্র বা সৌরজগতের আরও প্রতিকূল অনেক স্থানের তুলনায় মানববসতির জন্য আকর্ষণীয় করে তোলে।
কিন্তু মঙ্গলের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুরু হয় তার বায়ুমণ্ডল থেকে। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা এবং এর প্রধান উপাদান কার্বন ডাই-অক্সাইড। মানুষের শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সেখানে কার্যত ব্যবহারযোগ্য পরিমাণে নেই। শুধু অক্সিজেনের অভাবই সমস্যা নয়; মঙ্গলের পৃষ্ঠের বায়ুচাপ পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের বায়ুচাপের এক শতাংশেরও কম। এত কম চাপে মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। তাই মঙ্গলে বাইরে বের হওয়ার সময় নভোচারীদের শুধু অক্সিজেনের মুখোশ পরলেই চলবে না; পুরো শরীরকে সুরক্ষিত রাখে এমন চাপযুক্ত মহাকাশ পোশাক প্রয়োজন হবে।
এই কারণেই মঙ্গলের ভবিষ্যৎ বাড়ি পৃথিবীর সাধারণ বাড়ির মতো হতে পারবে না। প্রতিটি আবাসনকে কার্যত একটি ক্ষুদ্র মহাকাশযানের মতো কাজ করতে হবে। ভেতরে নির্দিষ্ট বায়ুচাপ বজায় রাখতে হবে, অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে, অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করতে হবে, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বাতাসকে ক্রমাগত বিশুদ্ধ করতে হবে। কোনো দেয়ালে ছোট একটি ছিদ্রও গুরুতর বিপদের কারণ হতে পারে। ফলে আবাসনের বিভিন্ন অংশকে আলাদা বায়ুরোধী কক্ষে ভাগ করা হতে পারে, যাতে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরো বসতির বাতাস বেরিয়ে না যায়।
মঙ্গলের আরেকটি কঠিন সমস্যা হলো তাপমাত্রা। গ্রহটির গড় পৃষ্ঠতাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে এবং অঞ্চল, ঋতু ও দিনের সময় অনুসারে তাপমাত্রার বিশাল পরিবর্তন ঘটে। রাতে কিংবা মেরু অঞ্চলে তাপমাত্রা অত্যন্ত নিচে নেমে যেতে পারে। তাই মানববসতির আবাসন শুধু বায়ুরোধী হলেই হবে না, শক্তিশালী তাপ নিরোধক এবং নির্ভরযোগ্য উষ্ণীকরণ ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু আলো বা যন্ত্রপাতিই বন্ধ হবে না; দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে আবাসনের তাপমাত্রা, বাতাস পুনর্ব্যবস্থাপনা এবং জীবনরক্ষাকারী বহু ব্যবস্থা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি মানববসতির ক্ষেত্রে সম্ভবত আরও গুরুতর সমস্যা হলো মহাজাগতিক বিকিরণ। পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র এবং ঘন বায়ুমণ্ডল আমাদের সূর্য থেকে আসা উচ্চশক্তির কণা এবং দূর মহাকাশের মহাজাগতিক রশ্মির বড় অংশ থেকে রক্ষা করে। মঙ্গলে পৃথিবীর মতো বৈশ্বিক শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র নেই এবং বায়ুমণ্ডলও অত্যন্ত পাতলা। ফলে মঙ্গলের পৃষ্ঠে দীর্ঘ সময় থাকা মানুষের শরীর পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি বিকিরণের মুখোমুখি হবে।
এই বিকিরণ দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি, কোষ ও কলার ক্ষতি এবং স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভবিষ্যতের মঙ্গল ঘাঁটি সম্ভবত শুধু পাতলা ধাতব দেয়ালের তৈরি হবে না। আবাসনের ওপর মঙ্গলের মাটি বা পাথরের মোটা স্তর ব্যবহার করা যেতে পারে। আরও কার্যকর সমাধান হতে পারে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ আবাসন। প্রাকৃতিক লাভা নল বা ভূগর্ভস্থ গহ্বর ব্যবহারযোগ্য হলে সেগুলোও বিকিরণ ও ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাত থেকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে পারে।
মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে পানি একই সঙ্গে বড় সমস্যা এবং বড় সম্ভাবনা। পৃথিবী থেকে প্রতিদিনের পানির সম্পূর্ণ সরবরাহ নিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মত নয়। একজন মানুষের পানীয়, রান্না, স্বাস্থ্যবিধি এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি প্রয়োজন। তাই মঙ্গলবাসীদের ব্যবহৃত পানি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পুনরুদ্ধার করতে হবে। প্রস্রাব, নিঃশ্বাসের জলীয় বাষ্প এবং ব্যবহৃত পানির বড় অংশ বিশুদ্ধ করে আবার ব্যবহার করতে হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো মঙ্গলের স্থানীয় বরফ থেকে পানি সংগ্রহ করা। মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে বরফ দৃশ্যমান হলেও মানববসতির জন্য সবসময় মেরু অঞ্চল সুবিধাজনক নাও হতে পারে। তাই এমন অঞ্চল নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ যেখানে ভূগর্ভের তুলনামূলক অগভীর স্তরে পানির বরফ রয়েছে। সেই বরফযুক্ত মাটি সংগ্রহ করে উত্তপ্ত করা, জলীয় বাষ্প আলাদা করা এবং পরে তা বিশুদ্ধ করে তরল পানিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। এই পানি শুধু পান করার জন্য নয়, কৃষিকাজ এবং অক্সিজেন ও জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবেও অত্যন্ত মূল্যবান হবে।
অক্সিজেন উৎপাদন মঙ্গলের বসতির আরেকটি মৌলিক প্রযুক্তি। শুরুতে পৃথিবী থেকে অক্সিজেন নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও বড় মানববসতির জন্য তা কার্যকর সমাধান নয়। মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল থেকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন আলাদা করার প্রযুক্তি ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। ভবিষ্যতে অনেক বড় যন্ত্র ব্যবহার করে বসতির শ্বাসযোগ্য অক্সিজেনের একটি অংশ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। পানি বিদ্যুৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমেও হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করা যায়। ফলে মঙ্গলের বরফ কার্যত পানি, শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন এবং নির্দিষ্ট ধরনের রকেট জ্বালানি উৎপাদনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু শুধু পানি ও বাতাস পেলেই একটি মানবসমাজ টিকে থাকবে না। খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। কয়েকজন অভিযাত্রীর জন্য পৃথিবী থেকে শুকনো বা সংরক্ষিত খাবার পাঠানো সম্ভব, কিন্তু শত শত বা হাজার হাজার মানুষের স্থায়ী বসতির জন্য নিয়মিত পৃথিবী থেকে খাদ্য পাঠানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ফলে মঙ্গলে নিয়ন্ত্রিত কৃষিব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
সিনেমায় দেখানো স্বচ্ছ কাচের বিশাল গম্বুজের নিচে সরাসরি মঙ্গলের মাটিতে ফসল ফলানোর ধারণাটি বাস্তবে অনেক বেশি জটিল। মঙ্গলের মাটিতে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় জৈব উপাদানের অভাব রয়েছে এবং সেখানে পারক্লোরেটজাত রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতিও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রথম দিকের কৃষি সম্ভবত প্রক্রিয়াজাত মাটি অথবা মাটিবিহীন পদ্ধতিতে হবে। পানির মধ্যে দ্রবীভূত পুষ্টি ব্যবহার করে শিকড়কে খাদ্য দেওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম পরিবেশে উদ্ভিদ উৎপাদনের ব্যবস্থা বেশি কার্যকর হতে পারে।
কৃষিকক্ষকে আবাসনের মতোই চাপযুক্ত রাখতে হবে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, আলো, পানি ও পুষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মঙ্গলে সূর্যালোক পৃথিবীর তুলনায় দুর্বল, আবার ধুলোর ঝড়ের সময় সূর্যালোক আরও কমে যেতে পারে। ফলে প্রাকৃতিক আলোর পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত উদ্ভিদবর্ধক আলো ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে উদ্ভিদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কিছু অক্সিজেন তৈরি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবস্থাপনায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গলবাসীর জন্য বিদ্যুৎ আসলে জীবন। পৃথিবীর কোনো শহরে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জীবন অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে; মঙ্গলে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিপর্যয় জীবনঘাতী হতে পারে। অক্সিজেন উৎপাদন, পানি বিশুদ্ধকরণ, বায়ু চলাচল, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য উৎপাদন, যোগাযোগ, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং আবাসনের অসংখ্য ব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করবে।
সৌরবিদ্যুৎ মঙ্গলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র ব্যবস্থা হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। মঙ্গলের ধুলো সৌরফলকের ওপর জমতে পারে এবং বিস্তৃত ধুলোর ঝড়ে সূর্যালোক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। তাই শক্তি সঞ্চয়ের বড় ব্যবস্থা এবং বিকল্প বিদ্যুৎ উৎস দরকার হবে। ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎব্যবস্থা ভবিষ্যতের মঙ্গল ঘাঁটির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ সূর্যালোকের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে এটি দীর্ঘ সময় ধারাবাহিক বিদ্যুৎ দিতে পারে।
মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় ৩৮ শতাংশ। মানুষ দীর্ঘ সময় এই মাধ্যাকর্ষণে থাকলে শরীরে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন ঘটবে, সেটি এখনো বড় অজানা প্রশ্ন। আমরা জানি, প্রায় ওজনহীন পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকলে নভোচারীদের পেশি দুর্বল হয়, হাড়ের ঘনত্ব কমে এবং শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু পৃথিবীর ৩৮ শতাংশ মাধ্যাকর্ষণ কি এসব সমস্যা পুরোপুরি ঠেকাতে যথেষ্ট, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে যদি মঙ্গলে মানুষ শুধু কয়েক মাসের জন্য না গিয়ে বহু বছর থাকে অথবা সেখানে শিশু জন্ম নেয়। কম মাধ্যাকর্ষণে গর্ভাবস্থা, ভ্রূণের বৃদ্ধি, শিশুর হাড় ও পেশির বিকাশ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়বে—এসব বিষয়ে প্রত্যক্ষ মানবতথ্য নেই। তাই মঙ্গলে প্রথম মানুষ পৌঁছানো এবং সেখানে সত্যিকার অর্থে স্বনির্ভর বহু প্রজন্মের সমাজ গড়ে ওঠার মধ্যে বিশাল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবধান রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে মানসিক স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ। মঙ্গল থেকে পৃথিবীকে রাতের আকাশে পরিচিত বিশাল নীল গ্রহ হিসেবে দেখা যাবে না; পৃথিবী হবে দূরের একটি ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু। বসতির মানুষ মাসের পর মাস একই সীমিত আবাসনে একই ছোট দলের সঙ্গে থাকবে। বাইরে ইচ্ছামতো হাঁটতে যাওয়া, নদীর পাশে বসা, গাছপালার মধ্যে ঘোরা বা খোলা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। প্রতিবার বাইরে যেতে হলে বিশেষ পোশাক, বায়ুরোধী প্রবেশকক্ষ এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
পৃথিবীর সঙ্গে কথোপকথনও স্বাভাবিক হবে না। দুই গ্রহের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে একমুখী বেতার সংকেত পৌঁছাতে কয়েক মিনিট থেকে বিশ মিনিটেরও বেশি সময় লাগতে পারে। ফলে পৃথিবীর কারও সঙ্গে সরাসরি স্বাভাবিক কথোপকথন করা সম্ভব হবে না। জরুরি পরিস্থিতিতে মঙ্গলের বাসিন্দারা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনার অপেক্ষাও করতে পারবেন না। বসতিকে চিকিৎসা, প্রকৌশল, অগ্নিনির্বাপণ, খাদ্য উৎপাদন এবং জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেকটাই স্বনির্ভর হতে হবে।
চিকিৎসাব্যবস্থা তাই অত্যন্ত কঠিন একটি ক্ষেত্র। পৃথিবীতে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়া যায়। মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে জরুরি ভিত্তিতে ফিরে আসার কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। দুই গ্রহের কক্ষপথের অবস্থান, মহাকাশযানের সক্ষমতা এবং যাত্রাপথের ওপর নির্ভর করে যাতায়াতে বহু মাস লাগতে পারে। ফলে মঙ্গল ঘাঁটিতে অস্ত্রোপচার, নিবিড় চিকিৎসা, দাঁতের চিকিৎসা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগনির্ণয় এবং ওষুধ সংরক্ষণের যথেষ্ট সক্ষমতা থাকতে হবে।
মঙ্গলের সূক্ষ্ম ধুলোও অবহেলা করার মতো সমস্যা নয়। এই ধুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং যন্ত্রপাতি, মহাকাশ পোশাক, সিল, চলমান যন্ত্রাংশ ও সৌরফলকের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। বাইরে থেকে আবাসনে ফিরে আসার সময় ধুলো যেন ভেতরে প্রবেশ না করে, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দরকার হবে। ভবিষ্যতের মঙ্গল পোশাক এমনভাবে তৈরি করা হতে পারে যাতে পোশাকের মূল অংশ আবাসনের বাইরেই থাকে এবং মানুষ ভেতর থেকে সরাসরি পোশাকে প্রবেশ করতে পারে। এতে বাইরের ধুলো আবাসনের অভ্যন্তরে প্রবেশের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, পৃথিবী থেকে কতটা স্বাধীন হতে পারবে মঙ্গলবসতি? প্রথম কয়েক দশকের ঘাঁটি সম্ভবত পৃথিবীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকবে। উন্নত বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, ওষুধ, বিশেষ যন্ত্র, কম্পিউটার, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম এবং অসংখ্য খুচরা যন্ত্রাংশ পৃথিবী থেকে পাঠাতে হতে পারে। সত্যিকার স্থায়ী বসতি তখনই সম্ভব হবে, যখন মঙ্গলের মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসের বড় অংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি, মেরামত এবং পুনর্ব্যবহার করতে পারবে।
মঙ্গলের মাটি ও শিলা থেকে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন এবং অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করে ভবিষ্যতে নির্মাণসামগ্রী তৈরি করা যেতে পারে। মঙ্গলের মাটি ব্যবহার করে ইট বা অন্যান্য কাঠামোগত উপাদান তৈরি করা গেলে পৃথিবী থেকে বিপুল নির্মাণসামগ্রী বহনের প্রয়োজন কমবে। ত্রিমাত্রিক মুদ্রণজাত স্বয়ংক্রিয় নির্মাণপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ পৌঁছানোর আগেই রোবট আবাসনের বাইরের সুরক্ষা স্তর বা অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করতে পারে।
মঙ্গলে প্রথম মানববসতি তাই সম্ভবত বিশাল শহর হবে না। বরং কয়েকজন বা কয়েক ডজন মানুষের একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ঘাঁটি দিয়ে শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেখানে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, জীববিজ্ঞানী এবং বিভিন্ন কারিগরি বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে কাজ করবেন। পরে পানি, বিদ্যুৎ, খাদ্য উৎপাদন ও স্থানীয় শিল্পব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য হলে মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ানো যেতে পারে।
অনেক আলোচনায় মঙ্গলকে ভবিষ্যতে পৃথিবীর মতো করে তোলার কথা বলা হয়। এই ধারণাকে সাধারণভাবে গ্রহীয় পরিবেশ রূপান্তর বলা যায়—অর্থাৎ মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ঘন করা, তাপমাত্রা বাড়ানো এবং একসময় পৃষ্ঠে তরল পানি ও মানুষের জন্য সহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে এটি বাস্তবসম্মত প্রকল্প নয়। মঙ্গলের পরিবেশকে পুরো গ্রহজুড়ে পৃথিবীর মতো করে তুলতে কী পরিমাণ সম্পদ, শক্তি ও সময় লাগবে, তা আমাদের বর্তমান মানববসতি নির্মাণের ক্ষমতার তুলনায় অকল্পনীয়ভাবে বড়।
তাই নিকট ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য মঙ্গলকে পৃথিবীতে রূপান্তর করা নয়, বরং মঙ্গলের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ছোট ছোট পৃথিবীসদৃশ কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করা। একটি চাপযুক্ত আবাসনের ভেতরে বাতাস থাকবে, কৃষিকক্ষে গাছ জন্মাবে, পুনর্ব্যবহৃত পানি প্রবাহিত হবে এবং বাইরে থাকবে প্রায় প্রাণহীন, ঠান্ডা, শুষ্ক ও বিকিরণপূর্ণ মঙ্গল।
এখানেই মঙ্গলে বসবাসের ধারণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। প্রশ্নটি শুধু “মানুষ কি সেখানে পৌঁছাতে পারবে?” নয়। মানুষকে সেখানে নিরাপদে নামাতে হবে, জীবিত রাখতে হবে, খাদ্য ও পানি দিতে হবে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করতে হবে, যন্ত্র নষ্ট হলে মেরামত করতে হবে এবং বছরের পর বছর পৃথিবী থেকে দূরে একটি কার্যকর সমাজ বজায় রাখতে হবে। মঙ্গলে পৌঁছানো একটি মহাকাশ অভিযান; মঙ্গলে বসবাস করা একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা নির্মাণের প্রকল্প।
তাহলে মঙ্গল গ্রহে মানুষ কি সত্যিই বসবাস করতে পারবে? প্রযুক্তিগত দৃষ্টিতে উত্তরটি সম্ভবত হ্যাঁ—কিন্তু শুধুমাত্র অত্যন্ত সুরক্ষিত, কৃত্রিম ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশের মধ্যে। সেখানে পৃথিবীর মতো খোলা আকাশের নিচে বাড়ি বানিয়ে বসবাস করা যাবে না। প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি গ্লাস পানি, প্রতিটি খাবার, প্রতিটি উষ্ণ কক্ষ এবং প্রতিটি নিরাপদ রাতের পেছনে কাজ করবে জটিল প্রযুক্তি।
প্রথম মানব মঙ্গল ঘাঁটি নির্মিত হলেও সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিকল্প বলা যাবে না। একটি সত্যিকার স্বনির্ভর মঙ্গল সমাজ গড়ে তুলতে পানি আহরণ, খাদ্য উৎপাদন, বিকিরণ সুরক্ষা, চিকিৎসা, স্থানীয় উৎপাদন, শক্তি, পুনর্ব্যবহার এবং কম মাধ্যাকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদি মানবস্বাস্থ্যের মতো বহু সমস্যার নির্ভরযোগ্য সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে মঙ্গলে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান প্রায় শূন্য।
তবু মঙ্গলে মানববসতির ধারণা নিছক কল্পবিজ্ঞান নয়। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলোর অনেকটির প্রাথমিক রূপ ইতিমধ্যেই মানুষের হাতে রয়েছে—বন্ধ পরিবেশে জীবনধারণ ব্যবস্থা, পানি পুনর্ব্যবহার, মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস, স্বয়ংক্রিয় অনুসন্ধানযান, সৌর ও পারমাণবিক শক্তি, নিয়ন্ত্রিত কৃষি এবং স্থানীয় সম্পদ থেকে অক্সিজেন তৈরির পরীক্ষা তার উদাহরণ। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এসব প্রযুক্তিকে এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া, যা পৃথিবী থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে বছরের পর বছর নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে।
অতএব ভবিষ্যতের কোনো এক সময় মঙ্গলের লাল দিগন্তের নিচে মানুষের আলো জ্বলা অসম্ভব নয়। কিন্তু সেই আলো জ্বালিয়ে রাখা হবে সেখানে পৌঁছানোর চেয়েও কঠিন। মঙ্গলে মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু শক্তিশালী রকেট নয়; বরং পানি, বাতাস, খাদ্য, শক্তি, বিকিরণ সুরক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্ব্যবহার, স্থানীয় উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবস্বাস্থ্যের ওপর আমাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা। মানুষ যদি এসব সমস্যার নির্ভরযোগ্য সমাধান করতে পারে, তাহলে মঙ্গল একদিন শুধু অনুসন্ধানের গন্তব্য নয়, পৃথিবীর বাইরে মানুষের প্রথম দীর্ঘস্থায়ী আবাসস্থলও হয়ে উঠতে পারে।
চাঁদের অন্ধকার দিক আসলে কী? সেখানে কি কখনো সূর্যের আলো পড়ে না?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন কীভাবে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে বেড়ায়? কক্ষপথে ভেসে থাকার বিজ্ঞান
মহাবিশ্বে কতটি গ্যালাক্সি আছে? দৃশ্যমান মহাবিশ্বের অকল্পনীয় বিশালতার হিসাব
পৃথিবী যদি ব্ল্যাক হোলে পড়ে যায় তাহলে কী ঘটবে? শেষ মুহূর্তের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
মঙ্গল গ্রহের আকাশ লাল কিন্তু সূর্যাস্ত নীল কেন? ধুলোময় আকাশের বিস্ময়কর বিজ্ঞান
প্লুটো কেন আর গ্রহ নয়? সৌরজগতের নবম গ্রহ থেকে বামন গ্রহ হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস