বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্লুটো কেন আর গ্রহ নয়? সৌরজগতের নবম গ্রহ থেকে বামন গ্রহ হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস

  • Author: Admin
  • September 03, 2026
প্লুটো কেন আর গ্রহ নয়? সৌরজগতের নবম গ্রহ থেকে বামন গ্রহ হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
নবম গ্রহ থেকে বামন গ্রহ—প্লুটোর বদলে যাওয়া পরিচয়

১৯৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার লোয়েল মানমন্দিরে তরুণ জ্যোতির্বিদ ক্লাইড টমবাউ যখন আলোকচিত্রের পাতায় একটি ক্ষুদ্র বিন্দুর অবস্থান পরিবর্তন হতে দেখলেন, তখন তিনি সম্ভবত কল্পনাও করেননি যে তাঁর আবিষ্কৃত জগৎটি কয়েক দশক পর জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত পরিচয়সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হবে। নতুন বস্তুটির নাম রাখা হয় প্লুটো। দ্রুতই এটি সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে পাঠ্যবই, মানচিত্র এবং সাধারণ মানুষের কল্পনায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়। প্রায় ছিয়াত্তর বছর ধরে পৃথিবীর অসংখ্য শিক্ষার্থী শিখেছে—বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন এবং প্লুটো মিলিয়ে সৌরজগতে নয়টি গ্রহ। কিন্তু ২০০৬ সালে সেই পরিচিত তালিকা হঠাৎ বদলে যায়। প্লুটোকে আর পূর্ণাঙ্গ গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হলো না; তাকে দেওয়া হলো ‘বামন গ্রহের’ পরিচয়।

প্লুটোর এই পরিবর্তিত পরিচয় বোঝার জন্য প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। প্লুটোর নিজের মধ্যে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি যার কারণে সেটি গ্রহ থেকে বামন গ্রহ হয়ে গেছে। তার কক্ষপথ বদলে যায়নি, আকার হঠাৎ ছোট হয়ে যায়নি, কিংবা তার কোনো মৌলিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়নি। পরিবর্তন ঘটেছিল মানুষের বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসে। সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলে একের পর এক নতুন বস্তু আবিষ্কৃত হওয়ার পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়—ঠিক কোন ধরনের মহাজাগতিক বস্তুকে ‘গ্রহ’ বলা হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই প্লুটোর পুরোনো পরিচয় পুনর্বিবেচনা করা হয়।

প্লুটো আবিষ্কারের পেছনেও একটি আকর্ষণীয় ইতিহাস রয়েছে। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে কিছু জ্যোতির্বিদ মনে করেছিলেন, ইউরেনাস ও নেপচুনের কক্ষপথে দেখা দেওয়া কিছু অসংগতি হয়তো আরও দূরে থাকা অজানা কোনো গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাবের ফল। মার্কিন জ্যোতির্বিদ পার্সিভাল লোয়েল এমন একটি অজানা জগতের সন্ধানে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। তিনি কাল্পনিক সেই গ্রহের নাম দিয়েছিলেন ‘গ্রহ এক্স’। তাঁর জীবদ্দশায় সেটি আবিষ্কৃত না হলেও পরে লোয়েল মানমন্দিরে অনুসন্ধান আবার শুরু হয়। সেই কাজের দায়িত্ব পাওয়া ক্লাইড টমবাউ বিভিন্ন সময়ে তোলা আকাশের আলোকচিত্র তুলনা করে প্লুটোকে শনাক্ত করেন।

আবিষ্কারের সময় প্লুটোর প্রকৃত আকার সম্পর্কে খুব কমই জানা ছিল। দূরত্বের কারণে তখনকার দূরবীক্ষণযন্ত্রে এটি ছিল ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুর মতো। প্রথম দিকে অনেকে ধারণা করেছিলেন, প্লুটো হয়তো পৃথিবীর কাছাকাছি আকারের কিংবা অন্তত যথেষ্ট বড় একটি জগৎ। পর্যবেক্ষণ উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধারণাটি বদলাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, প্লুটোর ব্যাস প্রায় ২,৩৭৭ কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীর চাঁদের চেয়েও এটি ছোট। এমনকি সৌরজগতের বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক উপগ্রহও প্লুটোর চেয়ে বড়।

তবে শুধু ছোট হওয়ার কারণে প্লুটো গ্রহের মর্যাদা হারায়নি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গ্রহ হওয়ার জন্য কোনো বস্তু অবশ্যই পৃথিবী বা নেপচুনের মতো বিশাল হতে হবে—এমন নিয়ম নেই। প্লুটোর সমস্যাটি তার আকারের চেয়ে বেশি সম্পর্কিত তার কক্ষপথের পরিবেশ এবং সৌরজগতের অন্য ক্ষুদ্র জগতগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কের সঙ্গে।

প্লুটো সূর্য থেকে গড়ে প্রায় পাঁচশো নব্বই কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে তার প্রায় ২৪৮ পৃথিবী বছর লাগে। এর কক্ষপথ আটটি প্রধান গ্রহের কক্ষপথের তুলনায় অনেক বেশি উপবৃত্তাকার এবং হেলানো। প্লুটোর কক্ষপথ এমন যে এর কিছু অংশ নেপচুনের কক্ষপথের তুলনায় সূর্যের কাছাকাছি চলে আসে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্লুটো ও নেপচুনের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। তাদের কক্ষপথের মধ্যে একটি স্থিতিশীল মহাকর্ষীয় অনুরণন রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে দুই জগতকে নিরাপদ দূরত্বে রাখে।

প্লুটোর পরিচয় নিয়ে আসল সমস্যাটি স্পষ্ট হতে শুরু করে সৌরজগতের নেপচুনের বাইরের অঞ্চল সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ার পর। একসময় মনে করা হতো নেপচুন এবং প্লুটোর পর সৌরজগত প্রায় ফাঁকা। পরে জানা যায়, সেখানে রয়েছে বরফ, শিলা এবং জমাট উদ্বায়ী পদার্থে গঠিত বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র মহাজাগতিক বস্তু। এই বিস্তৃত অঞ্চলকে বলা হয় কুইপার বলয়। প্লুটো আসলে এই কুইপার বলয়ের অন্যতম বৃহৎ সদস্য।

বিশ শতকের শেষ দশক থেকে কুইপার বলয়ে একের পর এক বস্তু আবিষ্কৃত হতে থাকে। তখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেন, প্লুটো সম্পূর্ণ একাকী কোনো অস্বাভাবিক গ্রহ নয়; বরং এটি একই ধরনের অসংখ্য দূরবর্তী বরফময় জগতের একটি বৃহৎ প্রতিনিধি। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—প্লুটোকে যদি গ্রহ বলা হয়, তাহলে তার মতো অন্য বস্তুগুলোর ক্ষেত্রে কী করা হবে?

এই বিতর্ক আরও তীব্র হয় একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ২০০৫ সালে এরিস নামের একটি দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তুর আবিষ্কার ঘোষণা করা হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এরিসকে প্লুটোর কাছাকাছি কিংবা তার চেয়েও বড় বলে মনে হয়েছিল। পরে আরও নির্ভুল পরিমাপে জানা যায়, ব্যাসের হিসাবে প্লুটো সামান্য বড় হলেও এরিসের ভর বেশি। কিন্তু আবিষ্কারের সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—এরিস যদি প্লুটোর সমতুল্য একটি জগৎ হয়, তবে একে কি সৌরজগতের দশম গ্রহ বলা হবে?

এখান থেকেই সমস্যাটি শুধু প্লুটোকে নিয়ে থাকল না; বরং ‘গ্রহ’ শব্দটির বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিল। কারণ এরিসকে গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে একই ধরনের আরও কিছু বস্তু ভবিষ্যতে গ্রহের তালিকায় যুক্ত হতে পারত। সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা নয় থেকে দশ, তারপর এগারো বা তারও বেশি হয়ে যাওয়া নিজে কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়। আসল সমস্যা ছিল এমন একটি সুসংগত সংজ্ঞা তৈরি করা, যার মাধ্যমে একই নিয়ম সব মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়।

২০০৬ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানে সৌরজগতের একটি মহাজাগতিক বস্তুকে পূর্ণাঙ্গ গ্রহ হিসেবে গণ্য করার জন্য তিনটি প্রধান শর্ত নির্ধারণ করা হয়। প্রথমত, বস্তুটিকে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তার নিজের মহাকর্ষ এত শক্তিশালী হতে হবে যে বস্তুটি প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করতে পারে। তৃতীয়ত, তাকে নিজের কক্ষপথের আশপাশের অঞ্চল মহাকর্ষীয়ভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে পরিষ্কার করতে হবে।

প্লুটো প্রথম শর্ত সহজেই পূরণ করে। এটি সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে। দ্বিতীয় শর্তও পূরণ করে, কারণ নিজের মহাকর্ষের প্রভাবে প্লুটো প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করেছে। কিন্তু তৃতীয় শর্তে এসে প্লুটো আটকে যায়। নিজের কক্ষপথের আশপাশের অঞ্চলে প্লুটো একচ্ছত্র মহাকর্ষীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

‘কক্ষপথ পরিষ্কার করা’ কথাটি শুনে মনে হতে পারে একটি গ্রহের কক্ষপথের আশপাশে আর কোনো পাথর, গ্রহাণু বা ক্ষুদ্র বস্তু থাকতে পারবে না। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। পৃথিবীর কাছাকাছিও গ্রহাণু রয়েছে, বৃহস্পতির কক্ষপথের সঙ্গে সম্পর্কিত অসংখ্য ট্রোজান গ্রহাণু রয়েছে। কক্ষপথ পরিষ্কার করার অর্থ হলো দীর্ঘ সময় ধরে একটি জগৎ তার কক্ষপথের আশপাশের অন্যান্য বস্তুর তুলনায় মহাকর্ষীয়ভাবে এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে ওই অঞ্চলের গতিশীল কাঠামো মূলত তার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত।

পৃথিবী, বৃহস্পতি কিংবা নেপচুন নিজেদের কক্ষপথসংলগ্ন অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষীয় আধিপত্য বজায় রাখে। সৌরজগত গঠনের দীর্ঘ ইতিহাসে তারা আশপাশের বহু ক্ষুদ্র বস্তুকে নিজেদের মধ্যে টেনে নিয়েছে, সংঘর্ষের মাধ্যমে শোষণ করেছে, দূরে ছুড়ে দিয়েছে অথবা মহাকর্ষীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রেখেছে। প্লুটোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। এটি কুইপার বলয়ের অসংখ্য বস্তুর সঙ্গে একই বিস্তৃত কক্ষপথীয় অঞ্চল ভাগ করে অবস্থান করছে। অর্থাৎ প্লুটো ওই অঞ্চলের একচ্ছত্র মহাকর্ষীয় শাসক নয়; বরং বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সদস্য।

এই তৃতীয় শর্ত পূরণ করতে না পারার কারণেই প্লুটোকে পূর্ণাঙ্গ গ্রহের তালিকা থেকে সরিয়ে ‘বামন গ্রহ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। বামন গ্রহ এমন একটি মহাজাগতিক বস্তু, যা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, নিজের মহাকর্ষে প্রায় গোলাকার হয়েছে, অন্য কোনো গ্রহের উপগ্রহ নয়, কিন্তু নিজের কক্ষপথসংলগ্ন অঞ্চলকে মহাকর্ষীয়ভাবে পরিষ্কার করতে পারেনি। প্লুটোর পাশাপাশি এরিস, হাউমেয়া, মাকেমাকে এবং গ্রহাণুপুঞ্জের সেরেসও এই শ্রেণির স্বীকৃত সদস্য।

তবে ২০০৬ সালের সিদ্ধান্ত মোটেও বিতর্কহীন ছিল না। কিছু জ্যোতির্বিদ গ্রহের নতুন সংজ্ঞার বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, কোনো জগতের পরিচয় নির্ধারণে তার নিজস্ব ভৌত বৈশিষ্ট্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একটি বস্তু যদি নিজের মহাকর্ষে গোলাকার হয়, ভূতাত্ত্বিকভাবে জটিল হয় এবং একটি স্বতন্ত্র জগতের মতো আচরণ করে, তবে তার কক্ষপথের আশপাশে অন্য বস্তু থাকার কারণে তাকে গ্রহের মর্যাদা থেকে বাদ দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত—এই প্রশ্ন এখনো আলোচিত হয়।

আরেকটি বিতর্ক রয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের ২০০৬ সালের অধিবেশনে উপস্থিত সদস্যদের একটি অংশ চূড়ান্ত ভোটে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে কেউ কেউ মনে করেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত ছিল। তবে আনুষ্ঠানিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসে প্লুটো এখনো বামন গ্রহ হিসেবেই স্বীকৃত।

মজার বিষয় হলো, গ্রহের মর্যাদা হারানোর পর প্লুটোর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বরং আরও বেড়েছে। কারণ এখন প্লুটোকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র জগৎ হিসেবে নয়, বরং কুইপার বলয়ের বৃহৎ বরফময় জগতগুলোর প্রকৃতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ নমুনা হিসেবে দেখা হয়। প্লুটো অধ্যয়ন করলে সৌরজগতের প্রাথমিক ইতিহাস, বাইরের অঞ্চলে গ্রহীয় বস্তু গঠনের প্রক্রিয়া এবং কোটি কোটি বছর আগে সূর্যকে ঘিরে থাকা আদিম পদার্থ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

২০১৫ সালে মানুষের প্লুটো সম্পর্কে ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার নিউ হরাইজনস মহাকাশযান দীর্ঘ প্রায় সাড়ে নয় বছরের যাত্রা শেষে প্লুটোর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। এতদিন দূরের অস্পষ্ট আলোকবিন্দু হিসেবে পরিচিত প্লুটো প্রথমবার মানুষের সামনে একটি বিস্ময়কর জটিল জগৎ হিসেবে প্রকাশিত হয়।

নিউ হরাইজনসের পাঠানো ছবিতে প্লুটোর পৃষ্ঠে দেখা যায় বিশাল বরফের সমভূমি, পর্বতমালা, বিভিন্ন ধরনের ভূপ্রকৃতি এবং হৃদয়সদৃশ উজ্জ্বল অঞ্চল। এই হৃদয়াকৃতির বৃহৎ এলাকার নাম টমবাউ অঞ্চল। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্পুটনিক সমভূমি, যেখানে প্রধানত জমাট নাইট্রোজেনসহ বিভিন্ন বরফের উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে এমন ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে, যা নির্দেশ করে প্লুটো কোনো নিষ্প্রাণ, অপরিবর্তিত বরফের গোলক নয়।

প্লুটোর পৃষ্ঠে পানির বরফ দিয়ে তৈরি কয়েক কিলোমিটার উঁচু পর্বতও রয়েছে। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পানির বরফ সেখানে পৃথিবীর পাথরের মতো কঠিন আচরণ করতে পারে। অন্যদিকে নাইট্রোজেন, মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো পদার্থ জমাট অবস্থায় পৃষ্ঠের বিভিন্ন অঞ্চল গঠন করেছে। সূর্য থেকে বিপুল দূরত্ব সত্ত্বেও প্লুটোর ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে।

প্লুটোর একটি পাতলা বায়ুমণ্ডলও রয়েছে, যার প্রধান উপাদান নাইট্রোজেন। সূর্যের চারদিকে অত্যন্ত উপবৃত্তাকার কক্ষপথে চলার কারণে সূর্য থেকে প্লুটোর দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পৃষ্ঠের জমাট পদার্থের কিছু অংশ বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে যেতে পারে এবং পরে আবার জমে পৃষ্ঠে ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ এত দূরের ক্ষুদ্র জগতেও ঋতু ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের জটিল প্রক্রিয়া ঘটতে পারে।

প্লুটোর পাঁচটি পরিচিত উপগ্রহ রয়েছে—শ্যারন, স্টিক্স, নিক্স, কার্বেরস এবং হাইড্রা। এর মধ্যে শ্যারন এত বড় যে প্লুটোর তুলনায় এর আকার অস্বাভাবিকভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্যারনের ব্যাস প্লুটোর অর্ধেকেরও বেশি। প্লুটো ও শ্যারন একটি সাধারণ ভরকেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়, এবং সেই ভরকেন্দ্র প্লুটোর বাইরের দিকে অবস্থিত। এ কারণে প্লুটো-শ্যারন ব্যবস্থাকে কখনো কখনো অনানুষ্ঠানিকভাবে দ্বৈত জগতের মতো বিবেচনা করা হয়।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। প্লুটোকে বামন গ্রহ বলা হলেও ‘বামন গ্রহ’কে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘ গ্রহের উপশ্রেণি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেনি। অর্থাৎ ‘বামন নক্ষত্র’ যেমন একধরনের নক্ষত্র, সেই একই ভাষাগত যুক্তিতে ‘বামন গ্রহ’কে আনুষ্ঠানিকভাবে একধরনের গ্রহ বলা হচ্ছে না। বর্তমান শ্রেণিবিন্যাসে গ্রহ এবং বামন গ্রহ দুটি পৃথক শ্রেণি। এই নামকরণও বিতর্কের একটি কারণ।

প্লুটোর ঘটনা আসলে বিজ্ঞানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সুন্দর উদাহরণ। বিজ্ঞান কোনো অপরিবর্তনীয় নামের তালিকা নয়। নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হলে পুরোনো শ্রেণিবিন্যাস সংশোধন করা হয়। একসময় সেরেসকেও গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। ১৮০১ সালে আবিষ্কারের পর এটি সৌরজগতের নতুন গ্রহ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝের একই অঞ্চলে আরও অনেক অনুরূপ বস্তু আবিষ্কৃত হওয়ার পর সেরেসকে গ্রহাণু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। পরে তার গোলাকার আকৃতি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ২০০৬ সালে সেটি বামন গ্রহের স্বীকৃতি পায়। প্লুটোর ইতিহাসের সঙ্গে সেরেসের এই ঘটনার আশ্চর্য মিল রয়েছে।

অর্থাৎ প্লুটোর পতন ঘটেনি; বরং সৌরজগত সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বিস্তৃত হয়েছে। ১৯৩০ সালে প্লুটোর আশপাশের অঞ্চল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সীমিত। তখন তাকে একটি স্বতন্ত্র নবম গ্রহ হিসেবে দেখা যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু কুইপার বলয়ের অসংখ্য বস্তু এবং এরিসের মতো বৃহৎ জগত আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীদের হাতে এমন তথ্য আসে, যা আগের শ্রেণিবিন্যাসকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।

আজ সৌরজগতের স্বীকৃত প্রধান গ্রহ আটটি। প্লুটো তাদের তালিকায় নেই, কিন্তু তাই বলে তার গুরুত্ব কম নয়। বরং এটি আমাদের দেখিয়েছে, ‘গ্রহ’ শব্দটির আড়ালে কত জটিল মহাকর্ষীয়, কক্ষপথীয় এবং ঐতিহাসিক প্রশ্ন লুকিয়ে রয়েছে। প্লুটো একই সঙ্গে একটি বামন গ্রহ, কুইপার বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, বহু উপগ্রহবিশিষ্ট একটি জটিল জগৎ এবং সৌরজগতের বাইরের অঞ্চলের ইতিহাস বোঝার অন্যতম মূল্যবান গবেষণাক্ষেত্র।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া কোনো শাস্তি বা অবমূল্যায়ন নয়। বিজ্ঞান মহাজাগতিক বস্তুগুলোর মর্যাদা নির্ধারণ করে না; তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করার চেষ্টা করে। পৃথিবীকে মানুষ গ্রহ বলুক বা অন্য কোনো নাম দিক, পৃথিবীর প্রকৃতি বদলাবে না। একইভাবে প্লুটোর নামের পাশে ‘নবম গ্রহ’ না লিখে ‘বামন গ্রহ’ লিখলেও তার বরফের পর্বত, নাইট্রোজেনের সমভূমি, পাতলা বায়ুমণ্ডল, পাঁচটি উপগ্রহ কিংবা সূর্যকে ঘিরে শত শত বছরের দীর্ঘ যাত্রা বদলে যায়নি।

বরং প্লুটোর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সৌরজগত আটটি পরিচিত গ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কোনো সাধারণ পরিবার নয়। নেপচুনের বাইরেও রয়েছে অসংখ্য বরফময় জগৎ, ক্ষুদ্র বস্তু এবং অজানা অঞ্চল। প্লুটো সেই বিশাল সীমান্তের প্রথম বিখ্যাত প্রতিনিধি। একসময় আমরা তাকে সৌরজগতের শেষ গ্রহ মনে করেছিলাম; এখন জানি, সে আসলে আরও বিশাল এক অজানা জগতের প্রবেশদ্বার। আর সেই উপলব্ধিই সম্ভবত ‘নবম গ্রহ’ পরিচয়ের চেয়ে প্লুটোকে বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।


You may also like