বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ওয়ার্মহোল কি সত্যিই থাকতে পারে? মহাকাশের শর্টকাট নিয়ে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর ধারণা

ওয়ার্মহোল কি সত্যিই থাকতে পারে? মহাকাশের শর্টকাট নিয়ে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর ধারণা
স্থানকালের ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বের কাল্পনিক শর্টকাট—ওয়ার্মহোল

ওয়ার্মহোলের ধারণা শুনলে প্রথমেই মনে হতে পারে এটি কল্পবিজ্ঞানের কোনো গল্প—মহাকাশের এক প্রান্তে প্রবেশ করে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের অন্য প্রান্তে বেরিয়ে যাওয়ার এক রহস্যময় সুড়ঙ্গ। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, ওয়ার্মহোলের ধারণাটি নিছক কল্পকাহিনি থেকে জন্ম নেয়নি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ থেকেই এমন কিছু গাণিতিক সমাধান পাওয়া যায়, যেখানে স্থানকালের দুটি আলাদা অঞ্চল এক ধরনের সেতুর মাধ্যমে যুক্ত হতে পারে। তবে গণিত কোনো কিছুর অস্তিত্বের অনুমতি দিলেই প্রকৃতিতে সেটি অবশ্যই থাকবে—এমন নয়। এখানেই ওয়ার্মহোলকে ঘিরে বিজ্ঞানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নটি তৈরি হয়: প্রকৃতি কি সত্যিই এমন কোনো মহাজাগতিক শর্টকাট তৈরি করতে পারে?

ওয়ার্মহোল বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের স্থান ও সময় সম্পর্কে দৈনন্দিন ধারণা কিছুটা বদলাতে হয়। সাধারণ জীবনে আমরা স্থানকে তিনটি মাত্রায় দেখি—দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—আর সময়কে আলাদা একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি। সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্থান ও সময় একত্রে চার মাত্রার একটি কাঠামো তৈরি করে, যাকে স্থানকাল বলা হয়। ভর ও শক্তির উপস্থিতিতে এই স্থানকাল বেঁকে যায়। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে বলে আমরা যে মহাকর্ষ অনুভব করি, সাধারণ আপেক্ষিকতার ভাষায় সেটিকে সূর্যের ভরের কারণে সৃষ্ট স্থানকালের বক্রতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এই ধারণাটিই ওয়ার্মহোলের সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। একটি সমতল কাগজের ওপর দুটি বিন্দু কল্পনা করা যাক। কাগজের পৃষ্ঠ ধরে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যেতে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু কাগজটি যদি এমনভাবে ভাঁজ করা যায় যাতে দুটি বিন্দু একে অপরের কাছে চলে আসে, তবে কাগজের ভেতর দিয়ে একটি ছিদ্র করে অনেক ছোট পথে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে পৌঁছানো সম্ভব। ওয়ার্মহোলকে বোঝাতে এই উদাহরণটি বহুল ব্যবহৃত হলেও বাস্তব স্থানকাল অবশ্য দ্বিমাত্রিক কাগজ নয়। মূল ধারণাটি হলো, সাধারণ পথে দুটি অঞ্চল অত্যন্ত দূরে থাকলেও স্থানকালের জ্যামিতি এমনভাবে বিন্যস্ত হতে পারে যাতে তাদের মধ্যে একটি তুলনামূলক ছোট সংযোগপথ তৈরি হয়।

ওয়ার্মহোলের বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় আলবার্ট আইনস্টাইন ও নাথান রোজেনের কাজ থেকে। তাঁরা সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এমন একটি গাণিতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেন, যা পরে আইনস্টাইন-রোজেন সেতু নামে পরিচিত হয়। ধারণাগতভাবে এটি স্থানকালের দুটি অংশকে যুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে এই কাঠামোকেই ওয়ার্মহোলের প্রাথমিক রূপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু আইনস্টাইন-রোজেন সেতুকে চলচ্চিত্রে দেখা মহাকাশযাত্রার সুড়ঙ্গ মনে করলে ভুল হবে। প্রচলিত এই সমাধানে সেতুটি এমনভাবে আচরণ করে যে একজন পর্যটক বা মহাকাশযান নিরাপদে এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশে বেরিয়ে যেতে পারবে না। সংযোগটি এত দ্রুত বন্ধ হয়ে যেতে পারে যে তার মধ্য দিয়ে কার্যকরভাবে যাতায়াত করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ গাণিতিকভাবে একটি সেতু থাকলেও সেটি মানুষের ব্যবহারযোগ্য মহাজাগতিক দরজা হয়ে ওঠে না।

এখান থেকেই আসে অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলের ধারণা। এমন একটি ওয়ার্মহোল কল্পনা করা হয় যার দুটি মুখ থাকবে এবং তাদের মাঝখানে থাকবে একটি গলা বা সংযোগপথ। কোনো বস্তু একটি মুখ দিয়ে প্রবেশ করে গলার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে অন্য মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে। দুটি মুখ একই মহাবিশ্বের অত্যন্ত দূরবর্তী স্থানে থাকতে পারে, আবার কিছু তাত্ত্বিক মডেলে সেগুলো ভিন্ন স্থানকালীয় অঞ্চলের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। তবে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকে আমাদের পর্যবেক্ষণে প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায় না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়ার্মহোল ব্যবহার করে দূরবর্তী স্থানে দ্রুত পৌঁছানো মানেই স্থানীয়ভাবে আলোর চেয়ে দ্রুত চলা নয়। ধরা যাক, দুটি নক্ষত্রের মধ্যে স্বাভাবিক মহাকাশপথে দূরত্ব এক হাজার আলোকবর্ষ। কিন্তু একটি ওয়ার্মহোল যদি তাদের স্থানকালীয়ভাবে এমনভাবে যুক্ত করে যে সুড়ঙ্গের ভেতরের কার্যকর পথ মাত্র কয়েক হাজার কিলোমিটার হয়, তবে একটি মহাকাশযান তার নিজের আশপাশে আলোর চেয়ে কম গতিতে চলেও খুব অল্প সময়ে অন্য নক্ষত্রের কাছে পৌঁছাতে পারে। এখানে মহাকাশযান স্বাভাবিক স্থানীয় গতিসীমা ভাঙছে না; বরং দুটি স্থানের মধ্যে পথটির জ্যামিতিই ছোট হয়ে গেছে।

সমস্যা হলো, এমন অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলকে খোলা রাখা অত্যন্ত কঠিন। সাধারণ আপেক্ষিকতার বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্থিতিশীল অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলের জন্য এমন ধরনের পদার্থ বা শক্তিবিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে যা পরিচিত সাধারণ পদার্থের মতো আচরণ করে না। একে প্রায়ই বহিরাগত পদার্থ বলা হয়। এখানে “বহিরাগত” বলতে অন্য গ্রহের পদার্থ বোঝানো হচ্ছে না; বরং এমন ভৌত বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হচ্ছে যা ওয়ার্মহোলের গলা ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচিত বিষয় হলো ঋণাত্মক শক্তিঘনত্ব। দৈনন্দিন জগতে আমরা যে পদার্থ দেখি তার শক্তিঘনত্ব সাধারণত ধনাত্মক। কিন্তু কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত অঞ্চল ও সময়ের জন্য এমন প্রভাব দেখা দিতে পারে, যাকে একটি নির্দিষ্ট তুলনামূলক অর্থে ঋণাত্মক শক্তিঘনত্ব হিসেবে বর্ণনা করা যায়। ক্যাসিমির প্রভাব এ প্রসঙ্গে প্রায়ই আলোচনায় আসে। খুব কাছাকাছি দুটি পরিবাহী পাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের অনুমোদিত অবস্থার পরিবর্তনের কারণে পরিমাপযোগ্য বল সৃষ্টি হতে পারে। এই ঘটনা দেখায় যে কোয়ান্টাম শূন্যস্থান একেবারেই নিষ্ক্রিয় শূন্যতা নয়।

কিন্তু এখান থেকে বিশাল ওয়ার্মহোল বানানো সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। পরীক্ষাগারে দেখা ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম প্রভাব এবং একটি মানুষ বা মহাকাশযান বহন করতে সক্ষম স্থিতিশীল ওয়ার্মহোলের মধ্যে অকল্পনীয় ব্যবধান রয়েছে। প্রকৃতি কত পরিমাণে, কত সময়ের জন্য এবং কী ধরনের বিন্যাসে ঋণাত্মক শক্তিসদৃশ অবস্থা অনুমোদন করে, তার ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। ফলে অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলের গাণিতিক সমাধান থাকলেও সেটিকে বাস্তবে নির্মাণ বা স্থিতিশীল রাখার উপায় আমাদের জানা নেই।

ওয়ার্মহোল এবং কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব এখন শুধু তাত্ত্বিক ধারণা নয়। নক্ষত্রের গতিবিধি, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, উত্তপ্ত পদার্থের বিকিরণ এবং কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের অত্যন্ত ক্ষুদ্র কৌণিক অঞ্চলের পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন প্রমাণ তাদের উপস্থিতিকে শক্তভাবে সমর্থন করে। কিন্তু ওয়ার্মহোলের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নিশ্চিত পর্যবেক্ষণ নেই। কোনো মহাজাগতিক বস্তু অদ্ভুত আচরণ করলেই সেটিকে ওয়ার্মহোল বলা যায় না।

কৃষ্ণগহ্বরের একটি ঘটনা দিগন্ত থাকে। এই সীমা অতিক্রম করার পর কোনো বস্তু বা আলো বাইরে ফিরে আসতে পারে না। অন্যদিকে কল্পিত অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলের উদ্দেশ্যই হলো এক মুখ দিয়ে প্রবেশ করে অন্য মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া। বাইরে থেকে কিছু ওয়ার্মহোলের মহাকর্ষীয় আচরণ কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে আংশিকভাবে মিলতে পারে বলে বিভিন্ন তাত্ত্বিক গবেষণায় আলোচনা করা হয়েছে। এ কারণেই ভবিষ্যতে কোনো অস্বাভাবিক মহাকর্ষীয় বস্তু পাওয়া গেলে সেটি কৃষ্ণগহ্বর নাকি অন্য কোনো অতি-সংকুচিত বস্তু—তা নির্ধারণ করা সহজ নাও হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য ওয়ার্মহোল খুঁজতে সরাসরি কোনো “ওয়ার্মহোল শনাক্তকারী যন্ত্র” ব্যবহার করেন না। বরং তাত্ত্বিকভাবে হিসাব করা হয়, এমন বস্তু থাকলে তার চারপাশে আলো কীভাবে বাঁকবে, নক্ষত্র বা গ্যাস কীভাবে চলবে, মহাকর্ষীয় লেন্সিং কেমন হবে এবং সংঘর্ষ বা কম্পনের ফলে উৎপন্ন মহাকর্ষীয় তরঙ্গে কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে কি না। তারপর বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এসব পূর্বাভাস তুলনা করা সম্ভব।

মহাকর্ষীয় লেন্সিং এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কোনো ভারী বস্তু তার চারপাশের স্থানকাল বাঁকিয়ে পেছনের নক্ষত্র বা ছায়াপথের আলোকে বিকৃত করতে পারে। কৃষ্ণগহ্বর, নক্ষত্র ও ছায়াপথ—সবই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই প্রভাব সৃষ্টি করে। কোনো ওয়ার্মহোল থাকলে তার নির্দিষ্ট জ্যামিতি এমন আলোকপথ সৃষ্টি করতে পারে যা প্রচলিত বস্তুর তুলনায় ভিন্ন। তবে শুধু অস্বাভাবিক লেন্সিং দেখেই ওয়ার্মহোল প্রমাণ করা যাবে না। একই পর্যবেক্ষণের জন্য অন্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো বাদ দিতে হবে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গও ভবিষ্যতের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অত্যন্ত ঘন দুটি বস্তু পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেলে স্থানকালে শক্তিশালী তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষের পর উৎপন্ন সংকেতের বৈশিষ্ট্য সাধারণ আপেক্ষিকতার পূর্বাভাসের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কোনো অস্বাভাবিক অতি-সংকুচিত বস্তু বা কাল্পনিক ওয়ার্মহোল একই ধরনের সংঘর্ষে অংশ নিলে তার সংকেতে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এমন কোনো পার্থক্য পাওয়া গেলেও সেটিকে সরাসরি ওয়ার্মহোলের প্রমাণ হিসেবে ঘোষণা করার আগে বহু বিকল্প ব্যাখ্যা পরীক্ষা করতে হবে।

ওয়ার্মহোলের সঙ্গে সময়ভ্রমণের ধারণাও গভীরভাবে যুক্ত। অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলের দুটি মুখ যদি পরস্পরের তুলনায় ভিন্নভাবে চলাচল করে অথবা ভিন্ন মহাকর্ষীয় পরিবেশে অবস্থান করে, তবে আপেক্ষিকতার সময় প্রসারণের কারণে তাদের ঘড়ির মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে একটি মুখ দিয়ে প্রবেশ করে অন্য মুখ দিয়ে বের হওয়ার ঘটনা বাইরের পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে শুধু স্থানের নয়, সময়েরও শর্টকাট তৈরি করতে পারে।

এখানেই পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত কঠিন কার্যকারণ সমস্যা দেখা দেয়। যদি অতীতে ফিরে যাওয়ার মতো পথ তৈরি হয়, তবে কারণ ও ফলাফলের স্বাভাবিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন আপাত-বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বহুল আলোচিত পূর্বপুরুষ-বিরোধের কথা বলা যায়—কেউ যদি অতীতে ফিরে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটায় যাতে তার নিজের অস্তিত্বই অসম্ভব হয়ে যায়, তবে সে অতীতে গেল কীভাবে? এই ধরনের প্রশ্ন শুধু কল্পকাহিনির সমস্যা নয়; স্থানকালের নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামো কার্যকারণ নীতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে, সেটি মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানেরও প্রশ্ন।

কিছু পদার্থবিদ ধারণা করেছেন, প্রকৃতির গভীরতর নিয়ম হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই বাধা দেয়। কোয়ান্টাম প্রভাব ওয়ার্মহোলের সময়যন্ত্রসদৃশ বিন্যাসকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছে। তবে মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে একত্রিত করতে সক্ষম পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব এখনো আমাদের হাতে নেই। তাই এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তরও জানা যায়নি।

আরও গভীরে গেলে ওয়ার্মহোলের প্রশ্নটি কোয়ান্টাম মহাকর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সাধারণ আপেক্ষিকতা বিশাল নক্ষত্র, গ্রহ, ছায়াপথ ও কৃষ্ণগহ্বরের মতো বৃহৎ কাঠামোর মহাকর্ষ ব্যাখ্যায় অসাধারণ সফল। অন্যদিকে অণু-পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র স্তরের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে কোয়ান্টাম তত্ত্ব অত্যন্ত সফল। কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরের গভীর অঞ্চল, মহাবিশ্বের অত্যন্ত প্রাথমিক অবস্থা বা স্থানকালের অতি ক্ষুদ্র কাঠামোর মতো ক্ষেত্রে এই দুই কাঠামোকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। এখানেই বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় অসম্পূর্ণতা।

কিছু তাত্ত্বিক গবেষণায় এমন ধারণাও উঠে এসেছে যে কোয়ান্টাম জড়াজড়ি এবং স্থানকালের জ্যামিতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে। অত্যন্ত সরল ভাষায় বললে, দূরবর্তী কোয়ান্টাম ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কোনো ধরনের জ্যামিতিক সংযোগ একই গভীরতর বাস্তবতার দুটি প্রকাশ হতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে এসব ধারণাকে বাস্তব মহাকাশযান চলাচলের উপযোগী ওয়ার্মহোল আবিষ্কারের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলো মূলত মহাকর্ষ, তথ্য এবং স্থানকালের মৌলিক প্রকৃতি বোঝার প্রচেষ্টা।

আরেকটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বের জন্মের সময় ক্ষুদ্র ওয়ার্মহোল তৈরি হয়ে থাকতে পারে কি না। মহাবিশ্বের অত্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানকাল আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থায় ছিল। কোয়ান্টাম স্তরে স্থানকালের গঠন খুব অস্থির বা জটিল হয়ে থাকলে ক্ষুদ্র সংযোগপথের মতো কাঠামো সাময়িকভাবে দেখা দিতে পারে—এমন তাত্ত্বিক ধারণা রয়েছে। কিন্তু সেগুলো যদি কখনো থেকেও থাকে, আজ পর্যন্ত টিকে আছে কি না অথবা কোনোটি বৃহৎ আকার ধারণ করতে পারে কি না, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

বাস্তব মহাকাশযাত্রার দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়ার্মহোলের আকর্ষণ বোঝা সহজ। আমাদের নিকটতম নক্ষত্রগুলোতেও প্রচলিত প্রযুক্তিতে পৌঁছাতে বিপুল সময় লাগবে। ছায়াপথের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে আলোরও কয়েক দশ হাজার বছর প্রয়োজন। আর আমাদের ছায়াপথের বাইরে মহাজাগতিক দূরত্ব আরও অকল্পনীয়। যদি স্থিতিশীল ও অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোল সত্যিই প্রকৃতিতে থাকে এবং কোনোভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে দূরত্বের এই সমস্যার প্রকৃতিই বদলে যাবে।

কিন্তু একটি ওয়ার্মহোল পাওয়া গেলেও নিরাপদে তার মধ্য দিয়ে যাওয়া আলাদা সমস্যা। প্রবল জোয়ারীয় মহাকর্ষ কোনো মহাকাশযানকে ছিন্নভিন্ন করতে পারে। উচ্চশক্তির বিকিরণ প্রাণঘাতী হতে পারে। ওয়ার্মহোলের গলা অস্থিতিশীল হলে ভ্রমণকারী বেরিয়ে আসার আগেই সেটি ধসে পড়তে পারে। ভেতরের স্থানকালীয় জ্যামিতিও এমন হতে হবে যাতে যাত্রীর ওপর অসহনীয় মহাকর্ষীয় পার্থক্য সৃষ্টি না হয়। তাই “ওয়ার্মহোল আছে কি না” এবং “ওয়ার্মহোল দিয়ে মানুষ ভ্রমণ করতে পারবে কি না”—এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

বর্তমানে সবচেয়ে নির্ভুল বক্তব্য হলো—ওয়ার্মহোল সাধারণ আপেক্ষিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক সম্ভাবনা, কিন্তু প্রকৃতিতে বাস্তব ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব এখনো প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ করে মানুষ বা মহাকাশযান অতিক্রম করতে পারে এমন স্থিতিশীল ওয়ার্মহোলের জন্য যে ভৌত পরিস্থিতি প্রয়োজন বলে বিভিন্ন মডেলে দেখা যায়, তা প্রকৃতিতে বৃহৎ পরিসরে তৈরি করা সম্ভব কি না আমরা জানি না।

এই অনিশ্চয়তাই ওয়ার্মহোলকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এটি শুধু মহাকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত যাওয়ার স্বপ্ন নয়। ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের স্থানকালের প্রকৃতি, মহাকর্ষ, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র, শক্তির সীমাবদ্ধতা, কার্যকারণ এবং সময়ের মৌলিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। অর্থাৎ ওয়ার্মহোল বাস্তবে পাওয়া যাক বা না যাক, ধারণাটি আমাদের বর্তমান ভৌত তত্ত্বগুলোর সীমা পরীক্ষা করার একটি অসাধারণ পরীক্ষাগার।

হয়তো মহাবিশ্বে কোথাও কোনো ওয়ার্মহোল নেই এবং প্রকৃতির গভীর কোনো নিয়ম স্থিতিশীল অতিক্রমযোগ্য ওয়ার্মহোলকে অসম্ভব করে রেখেছে। আবার এমনও হতে পারে যে মহাবিশ্বের এমন কোনো অজানা পরিস্থিতিতে এই কাঠামো তৈরি হতে পারে, যা আমরা এখনো পর্যবেক্ষণ করতে পারিনি। আজকের বিজ্ঞান এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে প্রথমটিকেও নিশ্চিত করেনি, দ্বিতীয়টিকেও প্রমাণ করেনি। তাই ওয়ার্মহোলকে বাস্তব মহাজাগতিক সুড়ঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করা যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল, তেমনি কেবল কল্পকাহিনি বলে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়াও এর তাত্ত্বিক গুরুত্বকে ছোট করে দেখা।

মানুষ একসময় কৃষ্ণগহ্বরকেও মূলত সমীকরণের অদ্ভুত ফল হিসেবে দেখেছিল; পরে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ তাদের বাস্তব অস্তিত্বের শক্তিশালী প্রমাণ দিয়েছে। ওয়ার্মহোলের ভাগ্যে একই ঘটনা ঘটবে কি না আমরা জানি না। ভবিষ্যতের আরও সূক্ষ্ম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ, মহাকর্ষীয় লেন্সিং বিশ্লেষণ, কৃষ্ণগহ্বরসদৃশ অতি-সংকুচিত বস্তুর পরীক্ষা এবং কোয়ান্টাম মহাকর্ষের উন্নত তত্ত্ব হয়তো এই রহস্যের নতুন অংশ উন্মোচন করবে। ততদিন ওয়ার্মহোল থাকবে বিজ্ঞানের এক অসাধারণ সীমান্তে—যেখানে কঠোর গণিত, পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের সবচেয়ে সাহসী প্রশ্নগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে