সুপারকন্ডাক্টর কী? শূন্য বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ ও অতিপরিবাহিতার বিস্ময়
বিশেষ অবস্থায় পদার্থে তৈরি হয় প্রতিরোধহীন বিদ্যুৎপ্রবাহের পথ।
একটি বৈদ্যুতিক তার দিয়ে প্রবাহ চললে সাধারণত কিছু শক্তি তাপে পরিণত হয়। ঘরের যন্ত্রপাতি থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা—সবখানেই এই শক্তিক্ষয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছু পদার্থকে বিশেষ অবস্থায় নিয়ে গেলে তাদের বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ শূন্য হয়ে যায়। তখন স্থির বিদ্যুৎপ্রবাহ প্রতিরোধজনিত তাপক্ষয় ছাড়াই চলতে পারে। এমন পদার্থকে সুপারকন্ডাক্টর বা অতিপরিবাহী বলা হয়। বিষয়টি শুধু অত্যন্ত ভালো বিদ্যুৎ পরিবহনের উদাহরণ নয়; এটি পদার্থের একটি স্বতন্ত্র অবস্থা, যেখানে অসংখ্য কণার সম্মিলিত আচরণ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার বাইরে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
সাধারণ ধাতুতে বিদ্যুৎ বহন করে ইলেকট্রন। চলার সময় স্ফটিক কাঠামোর কম্পন, অমিশ্রণ ও বিভিন্ন ত্রুটির কারণে তাদের গতির পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে বৈদ্যুতিক শক্তির একটি অংশ তাপ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। ধাতু ঠান্ডা করলে কাঠামোর কম্পন কমে, তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধও কমে। কিন্তু অতিপরিবাহিতা কেবল এই ধারাবাহিক হ্রাসের চূড়ান্ত ধাপ নয়। নির্দিষ্ট সীমার নিচে পদার্থের বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় আচরণে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। সব ভালো পরিবাহী ধাতুও সাধারণ অবস্থায় অতিপরিবাহী হয় না।
১৯১১ সালে নেদারল্যান্ডসের পদার্থবিদ হেইকে কামারলিং ওনেস পারদকে অত্যন্ত ঠান্ডা করে এই ঘটনা আবিষ্কার করেন। প্রায় চার দশমিক দুই কেলভিন তাপমাত্রায় পারদের প্রতিরোধ হঠাৎ শূন্যে নেমে যায়। এটি শূন্যের নিচে প্রায় দুইশ ঊনসত্তর ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। যে তাপমাত্রার নিচে কোনো পদার্থ অতিপরিবাহী অবস্থায় প্রবেশ করে, তাকে সংকট তাপমাত্রা বলা হয়। এই সীমা পদার্থভেদে আলাদা; কোনো অতিপরিবাহীকে অনেক বেশি ঠান্ডা করতে হয়, অন্যটি তুলনামূলক উঁচু তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে।
অতিপরিবাহিতার ব্যাখ্যায় কুপার জোড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। প্রচলিত অতিপরিবাহীতে স্ফটিক কাঠামোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে দুটি ইলেকট্রনের মধ্যে কার্যকর আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। একই ধরনের ঋণাত্মক আধান থাকা সত্ত্বেও তারা তখন পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত জোড়া গঠন করে। বহু জোড়া মিলিত হয়ে একটি সমন্বিত কোয়ান্টাম অবস্থা তৈরি করে। এটি পাশাপাশি বাঁধা দুটি ছোট বলের মতো সরল ছবি নয়। এই সম্মিলিত অবস্থার বৈশিষ্ট্যই সাধারণ প্রতিরোধ সৃষ্টি করা প্রক্রিয়াগুলোকে বাধা দেয়। তবে সব ধরনের অতিপরিবাহীর জোড়া গঠনের প্রক্রিয়া একইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
শূন্য প্রতিরোধের অর্থ বোঝার জন্য একটি বন্ধ অতিপরিবাহী বলয় কল্পনা করা যায়। উপযুক্ত অবস্থায় এতে প্রবাহ চালু করলে সাধারণ প্রতিরোধের কারণে তা ক্ষয় হয় না। কিন্তু এখান থেকে বিনা খরচে অসীম শক্তি পাওয়া যাবে—এমন ধারণা ভুল। প্রবাহ তৈরি করতে শক্তি লাগে, আর সেই শক্তি চৌম্বক ক্ষেত্রসহ ব্যবস্থার মধ্যে সঞ্চিত থাকে। বাইরে কাজে লাগানোর জন্য শক্তি বের করে নিলে সঞ্চিত শক্তি কমবে। অতিপরিবাহী শক্তি তৈরি করে না; নির্দিষ্ট ধরনের শক্তিক্ষয় এড়ানোর সুযোগ দেয়।
এর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রতি বিশেষ প্রতিক্রিয়া। উপযুক্ত অবস্থায় অতিপরিবাহী তার অভ্যন্তর থেকে চৌম্বক ক্ষেত্র বহিষ্কার করে, যাকে মাইসনার প্রভাব বলা হয়। এই বৈশিষ্ট্য দেখায় যে অতিপরিবাহী শুধু প্রতিরোধহীন সাধারণ পরিবাহী নয়। তবে সব পরিস্থিতিতে ক্ষেত্র পুরোপুরি বাইরে থাকে না। দ্বিতীয় ধরনের অতিপরিবাহীতে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সরু ঘূর্ণির আকারে চৌম্বক প্রবাহ ঢুকতে পারে। তাই অতিপরিবাহীর ভেতরে কখনোই কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র প্রবেশ করে না—এমন বক্তব্য সঠিক নয়।
চুম্বক ভাসিয়ে রাখার পরিচিত প্রদর্শনী এই চৌম্বকীয় আচরণেরই আকর্ষণীয় প্রকাশ। অতিপরিবাহীর প্রতিক্রিয়া চুম্বকের ওজনের বিপরীতে বল তৈরি করতে পারে। আবার কিছু অতিপরিবাহীর ক্ষুদ্র ত্রুটি চৌম্বক প্রবাহের ঘূর্ণিগুলোকে আটকে রাখে। এতে চুম্বক ও অতিপরিবাহীর আপেক্ষিক অবস্থান স্থিতিশীল হতে পারে। তবে ঠান্ডা করলেই যেকোনো ধাতুর ওপর চুম্বক ভাসবে না। উপযুক্ত পদার্থ, যথেষ্ট কম তাপমাত্রা এবং সঠিক চৌম্বকীয় বিন্যাস দরকার। ভাসমানতার দৃশ্য যত সহজ দেখায়, তার পেছনের পদার্থবিজ্ঞান ততটাই সূক্ষ্ম।
অতিপরিবাহী অবস্থার কয়েকটি সীমা রয়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে, চৌম্বক ক্ষেত্র বেশি হলে অথবা প্রবাহের ঘনত্ব নির্দিষ্ট সীমা ছাড়ালে অতিপরিবাহিতা নষ্ট হতে পারে। শক্তিশালী চুম্বকে কোনো অংশ হঠাৎ স্বাভাবিক প্রতিরোধী অবস্থায় ফিরে গেলে সেখানে দ্রুত তাপ তৈরি হয়। এই ঘটনাকে কোয়েঞ্চ বলা হয়। সঞ্চিত শক্তি নিরাপদে সরানো না গেলে যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বাস্তব অতিপরিবাহী ব্যবস্থায় শীতলীকরণের পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ, সুরক্ষা ও শক্তি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ তাপমাত্রার অতিপরিবাহী নামটি শুনে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার কথা মনে হতে পারে। বাস্তবে কথাটি ঐতিহাসিক তুলনা বোঝায়। কিছু তামা-অক্সাইডভিত্তিক অতিপরিবাহী তরল নাইট্রোজেনের তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে, যা তরল হিলিয়ামের তুলনায় ব্যবহারিক সুবিধা দেয়। কিন্তু তরল নাইট্রোজেনও অত্যন্ত ঠান্ডা—প্রায় ঋণাত্মক একশ ছিয়ানব্বই ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার তুলনামূলক উষ্ণ অবস্থায় অতিপরিবাহিতা দেখানো কিছু পদার্থের জন্য বিপুল চাপ দরকার হয়। গবেষণাগারে একটি ক্ষুদ্র নমুনার সাফল্য তাই সরাসরি ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক তারের সমান নয়।
ইতিমধ্যে চিকিৎসার চৌম্বকীয় চিত্রগ্রহণ যন্ত্রে অতিপরিবাহী চুম্বক ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ক্ষেত্র তৈরি করতে এটি কার্যকর। কণা ত্বরকেও উচ্চশক্তির কণার পথ নিয়ন্ত্রণে অতিপরিবাহী চুম্বক গুরুত্বপূর্ণ। কিছু চৌম্বকীয় ভাসমান রেলব্যবস্থা, অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিমাপক এবং কোয়ান্টাম গণনার যন্ত্রেও এর ব্যবহার রয়েছে। তবে অতিপরিবাহী তারের প্রতিরোধ শূন্য হলেই পুরো যন্ত্রের শক্তি খরচ শূন্য হয় না। শীতলীকরণ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য শক্তি লাগে; পরিবর্তনশীল প্রবাহ বা চৌম্বক ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ক্ষয় হতে পারে।
ব্যাপক ব্যবহারের পথে বাধা শুধু ঠান্ডা রাখার খরচ নয়। কিছু অতিপরিবাহী ভঙ্গুর, দীর্ঘ নমনীয় তারে তৈরি করা কঠিন, আবার সংযোগ ও উৎপাদনও ব্যয়বহুল হতে পারে। ভবিষ্যতের কাঙ্ক্ষিত পদার্থকে তাই তুলনামূলক উষ্ণ তাপমাত্রায় কাজ করার পাশাপাশি স্বাভাবিক চাপ, শক্তিশালী ক্ষেত্র ও বড় প্রবাহও সহ্য করতে হবে। সুপারকন্ডাক্টরের বিস্ময় এখানেই: এটি দেখায়, পদার্থের কণাগুলো সম্মিলিতভাবে আচরণ করলে বিদ্যুৎ পরিবহনের পরিচিত নিয়ম কতটা বদলে যেতে পারে। সেই অবস্থাকে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কীভাবে কোটি মানুষের মধ্যে একটি মুখ খুঁজে পায়?
ফাইভজি কীভাবে কাজ করে? ফোরজির সঙ্গে গতি ও প্রযুক্তির পার্থক্য
পদার্থ ও প্রতিপদার্থের সংঘর্ষে কী ঘটে? বিনাশ ও শক্তির বিজ্ঞান
জিন থেরাপি কী? ত্রুটিপূর্ণ জিন সংশোধন করে রোগ চিকিৎসার সম্ভাবনা
কম্পিউটার ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়? ডিভাইসের ক্ষতি ও নিরাপদ থাকার উপায়
টেলিস্কোপ কীভাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু দেখে? আলোর যাত্রা ও প্রযুক্তির বিজ্ঞান