বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যান্টিয়েটামের যুদ্ধ ও মুক্তির ঘোষণা: লিংকনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ

অ্যান্টিয়েটামের যুদ্ধ ও মুক্তির ঘোষণা: লিংকনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
অ্যান্টিয়েটামের রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে মুক্তির পথে

শাইলোর রক্তক্ষয় যখন আমেরিকাকে দীর্ঘ যুদ্ধের বাস্তবতা বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তখন পূর্বাঞ্চলে রিচমন্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল জর্জ বি. ম্যাকক্লেলানের বিশাল বাহিনী। কিন্তু ১৮৬২ সালের বসন্তের সেই আশাও দ্রুত বিজয় এনে দেয়নি। পেনিনসুলা অভিযানে ইউনিয়ন সৈন্যরা কনফেডারেট রাজধানীর কাছে পৌঁছালেও জুনের শেষ ও জুলাইয়ের শুরুর সেভেন ডেজ যুদ্ধগুলোতে রবার্ট ই. লির আক্রমণে পিছিয়ে যায়। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে লিংকনের সামনে আরেকটি প্রশ্ন বড় হচ্ছিল: দাসপ্রথাকে অক্ষত রেখে বিদ্রোহ সম্পূর্ণ দমন করা সম্ভব কি?

যুদ্ধের শুরুতে ফেডারেল সরকারের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউনিয়নের অখণ্ডতা রক্ষা। লিংকন ব্যক্তিগতভাবে দাসপ্রথার বিরোধী হলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিদ্যমান রাজ্যগুলোতে সেটি বিলোপের ক্ষমতা নিয়ে সতর্ক ছিলেন। মেরিল্যান্ড, কেন্টাকি, মিসৌরি ও ডেলাওয়্যারের মতো দাসপ্রথাসমর্থিত রাজ্য ইউনিয়নে থাকায় রাজনৈতিক হিসাবও জটিল ছিল। হঠাৎ সার্বিক বিলোপের উদ্যোগ তাদের বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এই আশঙ্কা তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছিল।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তবতা বদলাচ্ছিল। দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ নিজেরাই পালিয়ে ইউনিয়ন শিবিরে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। তাঁরা শ্রম, স্থানীয় ভূগোলের জ্ঞান এবং শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ফেডারেল বাহিনীকে সাহায্য করতেন। তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি সুরক্ষা দেওয়া হবে—সেনা কর্মকর্তাদের সেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল। মুক্তির সংগ্রাম তাই শুধু ওয়াশিংটনের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল না; দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের নিজের উদ্যোগও নীতির পরিবর্তন ঘটাচ্ছিল।

১৮৬১ সালে জেনারেল বেঞ্জামিন বাটলার সামরিক কাজে ব্যবহৃত পলাতক দাসদের মালিকের কাছে ফেরত দিতে অস্বীকার করে তাঁদের ‘যুদ্ধের নিষিদ্ধ সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করেন। পরে কংগ্রেসের বাজেয়াপ্তকরণ আইন বিদ্রোহীদের দাসশ্রমের ওপর অধিকারে আঘাত করে। ১৮৬২ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন, ডি.সি.-তে ক্ষতিপূরণভিত্তিক দাসপ্রথা বিলোপ হয়; জুনে ফেডারেল ভূখণ্ডে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়। এসব পদক্ষেপ সামগ্রিক মুক্তির সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ভিত্তি প্রসারিত করছিল।

দক্ষিণের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে দাসশ্রমের সরাসরি সম্পর্কও স্পষ্ট হচ্ছিল। দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ খাদ্য উৎপাদন, দুর্গ নির্মাণ, পরিবহন ও অন্যান্য কাজে বাধ্য হওয়ায় শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের সেনাবাহিনীতে যাওয়া সহজ হতো। সেই শ্রমব্যবস্থায় আঘাত করা মানে কনফেডারেসির যুদ্ধক্ষমতা দুর্বল করা। লিংকনের কাছে দাসমুক্তি ক্রমে নৈতিক প্রশ্নের পাশাপাশি সামরিক প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

১৮৬২ সালের জুলাইয়ে লিংকন মন্ত্রিসভায় মুক্তির ঘোষণার খসড়া উপস্থাপন করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সিওয়ার্ড পরামর্শ দেন, সামরিক বিপর্যয়ের মধ্যে ঘোষণা দিলে সেটিকে দুর্বল সরকারের মরিয়া উদ্যোগ মনে হতে পারে। একটি উপযুক্ত সামরিক সাফল্যের পর প্রকাশ করা ভালো। ফলে অ্যান্টিয়েটামের যুদ্ধ লিংকনের মনে হঠাৎ দাসমুক্তির ধারণা সৃষ্টি করেনি; এটি আগে থেকে প্রস্তুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করার রাজনৈতিক সুযোগ এনে দেয়।

সেই সুযোগ অবশ্য তৈরি হয়েছিল বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে। আগস্টের শেষে দ্বিতীয় বুল রান যুদ্ধে ইউনিয়নের পরাজয়ের পর লি সেপ্টেম্বরের শুরুতে পোটোম্যাক নদী পেরিয়ে মেরিল্যান্ডে প্রবেশ করেন। তিনি ভার্জিনিয়ার ওপর যুদ্ধের চাপ কমাতে, নতুন রসদ সংগ্রহ করতে এবং উত্তরের মাটিতে সাফল্য অর্জন করতে চাইছিলেন। এমন বিজয় উত্তরের জনমত দুর্বল করতে এবং কনফেডারেসির আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াতে পারে—এই সম্ভাবনাও ছিল।

লিকে মোকাবিলা করতে ম্যাকক্লেলান আবার ইউনিয়নের প্রধান বাহিনী পরিচালনা করেন। ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর সৈন্যদের হাতে লির হারিয়ে যাওয়া একটি সামরিক নির্দেশের অনুলিপি আসে, যাতে কনফেডারেট বাহিনীর বিভক্ত অবস্থানের তথ্য ছিল। সুযোগটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ম্যাকক্লেলান শত্রুর শক্তি অতিরঞ্জিত করার প্রবণতা থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেননি। সাউথ মাউন্টেনে সংঘর্ষের পর দুই বাহিনী মেরিল্যান্ডের শার্পসবার্গের কাছে অ্যান্টিয়েটাম খালের আশপাশে মুখোমুখি হয়।

১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৬২ ভোরে অ্যান্টিয়েটামের যুদ্ধ শুরু হয়। উত্তরের দিকে ভুট্টাখেত, ইস্ট উডস এবং ডাঙ্কার চার্চের আশপাশে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। একই জমি বারবার হাতবদল হয়। ইউনিয়নের বিভিন্ন বাহিনী পর্যায়ক্রমে যুদ্ধে প্রবেশ করায় তাদের সংখ্যাগত সুবিধা সব জায়গায় একসঙ্গে কার্যকর হয়নি। লি বিপন্ন অংশে সৈন্য সরিয়ে প্রতিরক্ষা টিকিয়ে রাখার সুযোগ পান।

দিনের মাঝামাঝি একটি নিচু গ্রামীণ সড়ক ঘিরে ভয়াবহ লড়াই হয়। কনফেডারেট প্রতিরক্ষাকারীরা সড়কটিকে প্রাকৃতিক পরিখার মতো ব্যবহার করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান ভেঙে যায়। স্থানটি পরে ‘ব্লাডি লেন’ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু এই সাফল্যের পরও ইউনিয়ন বাহিনী এমন সমন্বিত আঘাত করতে পারেনি, যা লির প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিত।

দক্ষিণ প্রান্তে অ্যামব্রোজ বার্নসাইডের সৈন্যদের অ্যান্টিয়েটাম খালের ওপর সরু পাথরের সেতু পার হতে দীর্ঘ সময় লাগে। সেতু দখলের পর তাদের অগ্রযাত্রা কনফেডারেট অবস্থান বিপন্ন করে। ঠিক তখন হার্পার্স ফেরি থেকে এ. পি. হিলের সৈন্যরা এসে পাল্টা আক্রমণ চালায়। ইউনিয়নের শেষ বড় অগ্রগতি থেমে যায়। দিনশেষে কোনো পক্ষই প্রতিপক্ষের বাহিনী ধ্বংস করতে পারেনি।

এক দিনে প্রায় ২৩ হাজার সৈন্য নিহত, আহত, বন্দি বা নিখোঁজ হন; নিহত ছিলেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার। সংখ্যাগুলো এক নয়—২৩ হাজারকে মৃত্যুসংখ্যা বলা ভুল। অ্যান্টিয়েটাম আমেরিকার সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী একক দিন হিসেবে পরিচিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের ফল কৌশলগতভাবে অনির্ণীত হলেও লি পরে ভার্জিনিয়ায় ফিরে যান। তাঁর উত্তর অভিযান থেমে যাওয়ায় ইউনিয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য দাবি করতে পারে।

লিংকন সেই সুযোগ গ্রহণ করেন। ২২ সেপ্টেম্বর ১৮৬২ তিনি প্রাথমিক মুক্তির ঘোষণা প্রকাশ করেন। এতে জানানো হয়, ১ জানুয়ারি ১৮৬৩ তারিখেও যেসব রাজ্য বা নির্দিষ্ট অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে থাকবে, সেখানকার দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ স্বাধীন বলে ঘোষিত হবেন। অর্থাৎ এটি সেপ্টেম্বরেই সবার মুক্তি কার্যকর করেনি; বিদ্রোহী এলাকাগুলোর জন্য ভবিষ্যৎ কার্যকর তারিখ নির্ধারণ করেছিল।

কনফেডারেট রাজ্যগুলো নির্ধারিত সময়ে ইউনিয়নে ফিরে আসেনি। ১ জানুয়ারি ১৮৬৩ লিংকন চূড়ান্ত মুক্তির ঘোষণা জারি করেন। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধকালীন ক্ষমতার ভিত্তিতে তিনি নির্দিষ্ট বিদ্রোহী এলাকায় দাসত্বে আবদ্ধ মানুষদের স্বাধীন ঘোষণা করেন। ফেডারেল সামরিক ও নৌ কর্তৃপক্ষকে সেই স্বাধীনতা স্বীকার ও বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

ঘোষণাটির সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়নে থাকা দাসপ্রথাসমর্থিত সীমান্তরাজ্যগুলো এর আওতায় পড়েনি। টেনেসি এবং লুইজিয়ানা ও ভার্জিনিয়ার কিছু নির্দিষ্ট এলাকাও বাদ ছিল। ফলে এটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দাসপ্রথা বিলোপকারী আইন ছিল না। সামরিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিদ্রোহী অঞ্চলের জন্য ব্যবহৃত ক্ষমতাই এর ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণ করেছিল; অনুগত রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল।

তবু ঘোষণাটিকে নিছক প্রতীক বলা ভুল। কনফেডারেট নিয়ন্ত্রণাধীন অধিকাংশ এলাকায় তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও ইউনিয়ন বাহিনী এগোনোর সঙ্গে মুক্তির কার্যকর পরিসর বাড়তে থাকে। পালিয়ে আসা মানুষদের স্বাধীনতার দাবিও নতুন সরকারি ভিত্তি পায়। যুদ্ধ জিতে দাসমালিকদের পুরোনো অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমে সংকুচিত হয়। ইউনিয়নের বিজয় ও দাসমুক্তি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।

চূড়ান্ত ঘোষণায় উপযুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের সশস্ত্র বাহিনীতে গ্রহণের কথাও বলা হয়। আগে থেকেই সীমিত কিছু নিয়োগের উদ্যোগ থাকলেও এরপর কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য সংগ্রহ ব্যাপকতর হয়। তাঁরা নিজেদের ও পরিবারের স্বাধীনতার জন্য সরাসরি যুদ্ধ করতে পারেন। অবশ্য বৈষম্যমূলক বেতন, পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা এবং বন্দি হলে বিশেষ বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্বাধীনতার স্বীকৃতি সঙ্গে সঙ্গে সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেনি।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও যুদ্ধের অর্থ বদলে যায়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নীতিনির্ধারকদের কাছে কনফেডারেসিকে সমর্থন করা এখন আরও স্পষ্টভাবে দাসপ্রথার পক্ষ নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। তবে বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকানোর কৃতিত্ব একা ঘোষণার নয়; সামরিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উত্তরের ভেতরেও বিরোধিতা অব্যাহত থাকে—সব ইউনিয়ন সমর্থক দাসমুক্তির সমর্থক ছিলেন না।

অ্যান্টিয়েটাম লির বাহিনীকে ধ্বংস করেনি, আর মুক্তির ঘোষণা এক দিনে সব শৃঙ্খল ভাঙেনি। কিন্তু দুটি ঘটনা মিলে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। দেশজুড়ে স্থায়ী বিলোপের জন্য পরে ত্রয়োদশ সাংবিধানিক সংশোধনী প্রয়োজন হবে। আপাতত ১৮৬৩ সালের শুরুতে ইউনিয়নের সামনে নতুন দায়িত্ব: যে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের মাধ্যমে তাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা। সামনে গেটিসবার্গ ও ভিক্সবার্গে সেই সংগ্রামের আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে