বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের বুকে প্রথম অভিযান: পতাকা, পাথর ও অ্যাপোলো ১১-এর বিজ্ঞান

সিরিজ: চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ: ১৯৬৯

চাঁদের বুকে প্রথম অভিযান: পতাকা, পাথর ও অ্যাপোলো ১১-এর বিজ্ঞান
প্রথম পদচিহ্নের পর চাঁদে শুরু হয় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান।

নীল আর্মস্ট্রংয়ের প্রথম পদার্পণ এবং বাজ অলড্রিনের নিচে নামার পর চাঁদের বুকে মানুষের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের সামনে তখনও অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাকি। ঈগলের বাইরে অক্সিজেন, বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণব্যবস্থার সীমিত সরবরাহ নিয়ে দুই নভোচারীকে নমুনা সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং পরীক্ষাযন্ত্র স্থাপন করতে হবে। অ্যাপোলো ১১-এর চন্দ্রপৃষ্ঠ অভিযান ছিল প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটি সুপরিকল্পিত কর্মপর্ব। এর প্রতিটি কাজের মূল্য ছিল আলাদা: কিছু বিশ্ববাসীর কাছে ঐতিহাসিক বার্তা পৌঁছাবে, অন্যগুলো বিজ্ঞানীদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করবে।

নিরাপত্তার কারণে নমুনা সংগ্রহের শুরুতেই আর্মস্ট্রং একটি ছোট জরুরি নমুনা নিয়েছিলেন। কোনো সমস্যায় দ্রুত ফিরে যেতে হলেও যাতে চন্দ্রমাটি পৃথিবীতে পৌঁছায়, সেটিই ছিল উদ্দেশ্য। এরপর দুই নভোচারী চলাফেরা ও কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকেন। কম মাধ্যাকর্ষণে ওজন কমলেও শরীর ও সরঞ্জামের জড়তা উধাও হয়নি। থামা, ঘোরা বা ভারসাম্য রাখা তাই সতর্কতার সঙ্গে করতে হচ্ছিল। স্যুটের শক্ত জয়েন্ট এবং পিঠের ব্যাকপ্যাক নিচু হয়ে কাজ করাও কঠিন করে তুলেছিল।

অলড্রিনের প্রথম দিকের কাজগুলোর একটি ছিল সৌরবায়ুর কণা সংগ্রহের পরীক্ষা স্থাপন করা। খুঁটিতে লাগানো একটি পাতলা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল সূর্যের দিকে মুখ করে মেলে দেওয়া হয়। দেখতে সাধারণ হলেও পরীক্ষাটির পরিকল্পনা ছিল সূক্ষ্ম। সূর্য থেকে ছুটে আসা চার্জযুক্ত কণার কিছু অংশ ফয়েলে আটকে যাবে; পরে সেটি পৃথিবীতে নিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে। যত বেশি সময় ফয়েল উন্মুক্ত রাখা যায়, তত বেশি কণা সংগ্রহের সুযোগ। এজন্য এটি তুলনামূলক শুরুতেই বসানো হয়েছিল।

মার্কিন পতাকা স্থাপন ছিল অভিযানের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি। তবে চাঁদে বাতাস নেই বলে পৃথিবীর মতো পতাকা নিজে থেকে মেলে থাকবে না। সেটির ওপরের প্রান্ত ধরে রাখতে একটি অনুভূমিক দণ্ড ব্যবহার করা হয়। দণ্ড পুরোপুরি প্রসারিত না হওয়ায় কাপড়ে ভাঁজ থেকে যায়। খুঁটি বসাতে গিয়ে নভোচারীদের নাড়াচাড়ায় পতাকা দুলেছিল। ছবিতে পতাকার ঢেউখেলানো চেহারার কারণ ছিল দণ্ড ও কাপড়ের ভাঁজ, চন্দ্রপৃষ্ঠের বাতাস নয়। শক্ত মাটিতে খুঁটি গভীরভাবে ঢোকানোও তাঁদের জন্য সহজ ছিল না।

পতাকাটি যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের প্রতীক ছিল; চাঁদের ভূখণ্ড দখলের ঘোষণা ছিল না। ঈগলের অবতরণ ধাপে লাগানো স্মারক ফলকে পৃথিবীর মানুষের প্রথম পদার্পণ এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তির উদ্দেশ্যে আগমনের বার্তা ছিল। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন রেডিও সংযোগে দুই নভোচারীর সঙ্গে কথা বলেন। এসব আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত শেষ করেও তাঁদের মূল কর্মসূচিতে ফিরতে হয়েছিল। প্রতীকী উপস্থিতির পাশাপাশি চাঁদকে সরাসরি পরীক্ষা করা ছিল অভিযানের অপরিহার্য দায়িত্ব, যার জন্য সীমিত সময় আগেই ভাগ করে রাখা হয়েছিল।

নমুনা সংগ্রহে তাঁরা লম্বা হাতলযুক্ত স্কুপ ও চিমটা ব্যবহার করেন। শুধু চোখে আকর্ষণীয় পাথর বেছে নেওয়া যথেষ্ট ছিল না; মাটি, বিভিন্ন আকারের খণ্ড এবং সংগ্রহের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কিছু নমুনা তোলার আগে ছবি নেওয়া হয়, যাতে পৃথিবীতে গবেষকেরা তার আশপাশের পরিবেশ বুঝতে পারেন। সরু নল মাটিতে ঢুকিয়ে স্তরসহ নমুনা নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। এতে পৃষ্ঠের নিচে কণার বিন্যাস সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল। তবে মাটির প্রতিরোধের কারণে নল ঢোকানোর গভীরতা সীমিত হয়েছিল।

সব মিলিয়ে অ্যাপোলো ১১ পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে প্রায় ২১.৬ কিলোগ্রাম চন্দ্রপাথর ও মাটি। এই পরিমাণ শুধু পাথরের ওজন নয়; এর মধ্যে সূক্ষ্ম ধুলা ও ছোট খণ্ডও ছিল। নমুনাগুলো বিশেষ পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। চন্দ্রপৃষ্ঠে তাঁদের পক্ষে রাসায়নিক গঠন বা বয়স নির্ণয় করা সম্ভব ছিল না। সেই কাজ হবে পৃথিবীর গবেষণাগারে। তাই সংগ্রহের সময় নমুনার পরিচয়, অবস্থান এবং সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিজ্ঞানীরা পরে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফল মিলিয়ে ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস পুনর্গঠন করবেন।

পরে বিশ্লেষণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিলার ধরন স্পষ্ট হয়: ব্যাসল্ট ও ব্রেচিয়া। ব্যাসল্ট গলিত শিলা ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধার ফল। অ্যাপোলো ১১-এর ব্যাসল্ট দেখায়, প্রশান্তির সাগরের ভূমি প্রাচীন আগ্নেয় লাভার সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ব্যাসল্টের বয়স প্রায় ৩৬০ থেকে ৩৯০ কোটি বছর এবং অনেক নমুনায় টাইটানিয়ামের পরিমাণ বেশি ছিল। এই বয়স পুরো চাঁদের জন্মকাল নয়; নির্দিষ্ট শিলা জমাট বাঁধার সময় নির্দেশ করে। ফলে বিজ্ঞানীরা চাঁদের সৃষ্টি ও পরবর্তী আগ্নেয় কার্যকলাপকে পৃথকভাবে বিচার করতে পারেন।

ব্রেচিয়া তৈরি হয়েছে বিভিন্ন শিলাখণ্ড একত্র হয়ে। চাঁদে মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে শিলা ভাঙা, ছিটকে পড়া এবং আবার সংযুক্ত হওয়া এই ধরনের পাথর গঠনের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। মাটিতে ক্ষুদ্র কাচজাত কণা ও ভাঙা খনিজও পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায়, চন্দ্রপৃষ্ঠ আগ্নেয় কার্যকলাপ এবং অসংখ্য আঘাত—উভয়ের ইতিহাস বহন করছে। সেখানে বায়ু ও প্রবাহিত পানির ক্ষয়প্রক্রিয়া পৃথিবীর মতো কাজ করে না। দীর্ঘদিনের আঘাত ও মহাকাশের পরিবেশ পৃষ্ঠের শিলা ধীরে ধীরে গুঁড়িয়ে রেগোলিথের আবরণ তৈরি করেছে।

মাটির ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সূক্ষ্ম ধুলায় বুটের ছাপ স্পষ্ট থাকছিল এবং কণা স্যুট ও যন্ত্রে লেগে যাচ্ছিল। ওপরের আলগা স্তরের নিচে অপেক্ষাকৃত শক্ত অংশ পাওয়া যাচ্ছিল। নভোচারীদের পর্যবেক্ষণ, ছবি ও নমুনা থেকে প্রকৌশলীরা মাটির ভার বহনের ক্ষমতা এবং সরঞ্জাম ব্যবহারের সমস্যা বিচার করেন। ভবিষ্যতের অভিযানের জন্য এটি জরুরি তথ্য ছিল। শুধু চাঁদের অতীত জানা নয়, সেখানে মানুষ কীভাবে নিরাপদে কাজ করবে, সেই প্রশ্নেরও প্রাথমিক উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল।

চাঁদের কম্পন পর্যবেক্ষণের জন্য স্থাপন করা হয় প্যাসিভ সিসমিক পরীক্ষাযন্ত্র। সূক্ষ্ম আন্দোলন শনাক্ত করার ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রটি নভোচারীদের চলাফেরার সংকেতও ধরতে পারত। উদ্দেশ্য ছিল চন্দ্রকম্পন ও আঘাতজনিত কম্পন পর্যবেক্ষণ করে অভ্যন্তর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া। তবে অ্যাপোলো ১১-এর যন্ত্রের সীমিত কার্যকাল থেকে চাঁদের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ গঠন নির্ধারণ করা যায়নি। এটি চন্দ্রভূকম্পবিদ্যার প্রথম ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তী অ্যাপোলো অভিযানের বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন।

আরেকটি যন্ত্র ছিল লেজার রেঞ্জিং রেট্রোরিফ্লেক্টর, বিশেষ প্রতিফলকসমৃদ্ধ একটি প্যানেল। পৃথিবী থেকে পাঠানো লেজারের সামান্য অংশ এর সাহায্যে উৎসের দিকে ফিরে আসে। আলো যাওয়া ও ফেরার সময় মেপে পৃথিবী–চাঁদের দূরত্ব নির্ণয় করা যায়। প্যানেলটির নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ দরকার হয় না। পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি পরিমাপ, অন্যান্য প্রতিফলকের তথ্যসহ, চাঁদের কক্ষপথ, ঘূর্ণন এবং পৃথিবী থেকে ধীরে দূরে সরে যাওয়ার হার বুঝতে সাহায্য করে। এগুলো প্রথম দিনের তাৎক্ষণিক ফল নয়; বহু বছরের পর্যবেক্ষণের অর্জন।

সৌরবায়ুর ফয়েলটি প্রায় ৭৭ মিনিট উন্মুক্ত রাখার পর গুটিয়ে পৃথিবীতে ফেরানোর জন্য সংরক্ষণ করা হয়। গবেষণাগারে আটকে থাকা কণা বিশ্লেষণ করে সৌরবায়ুর উপাদান ও আইসোটোপের অনুপাত সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। চাঁদে পৃথিবীর মতো ঘন বায়ুমণ্ডল না থাকায় এই কণা সরাসরি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। একটি সাধারণ ফয়েল সূর্যের পদার্থ পরীক্ষার নমুনা হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে চন্দ্রনমুনার প্রাথমিক পরীক্ষায় জীবনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; কিন্তু একটি এলাকার নমুনা থেকে পুরো চাঁদের সব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করার সুযোগও ছিল না।

কাজের সময়সীমা শেষ হলে নমুনা, ফয়েল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ ঈগলে তোলা হয়। পরীক্ষার কিছু যন্ত্র পৃষ্ঠে থেকে গেল, আর সংগ্রহ করা বস্তুগুলোর বৈজ্ঞানিক মূল্য তখনও মূলত ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন প্রমাণ করেছিলেন, মানুষ চাঁদে হেঁটে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু নমুনাগুলো পৃথিবীতে পৌঁছানো পর্যন্ত অভিযান অসম্পূর্ণ। এবার তাঁদের ক্যাবিন বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে হবে, তারপর ঈগলের ঊর্ধ্বাংশ চালিয়ে চন্দ্রপৃষ্ঠ ছেড়ে মাইকেল কলিন্সের কলাম্বিয়ার সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রস্তুতি নিতে হবে।