বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদে প্রথম পদার্পণ: আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনের ঐতিহাসিক অবতরণ

সিরিজ: চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ: ১৯৬৯

চাঁদে প্রথম পদার্পণ: আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনের ঐতিহাসিক অবতরণ
ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেস: অন্য জগতে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন।

চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে অ্যাপোলো ১১ পৃথিবী থেকে যাত্রার প্রধান বাধাগুলো অতিক্রম করেছিল। কিন্তু সামনে থাকা কাজটি আগের সব পরীক্ষার চেয়ে আলাদা: মানুষবাহী একটি যানকে চন্দ্রপৃষ্ঠে নিরাপদে নামানো। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন লুনার মডিউল ‘ঈগল’ প্রস্তুত করছিলেন, আর মাইকেল কলিন্স থাকছিলেন ‘কলাম্বিয়া’ কমান্ড মডিউলে। এখন দুই সহযাত্রীকে নিয়ে ঈগল নিচে নামবে; কলিন্স কক্ষপথে থেকে তাঁদের ফেরার অপেক্ষা করবেন। অবতরণের সাফল্য নির্ভর করছিল যন্ত্র, হিসাব এবং মানুষের সিদ্ধান্তের সমন্বয়ের ওপর।

আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন ঈগলে ঢুকে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নির্দেশনা ব্যবস্থা এবং ইঞ্জিনের প্রস্তুতি পরীক্ষা করেন। তাঁদের পদবির কারণে একটি বিভ্রান্তি হতে পারে: অলড্রিন ছিলেন লুনার মডিউল পাইলট, কিন্তু অবতরণের সময় যান পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব ছিল কমান্ডার আর্মস্ট্রংয়ের। অলড্রিন উচ্চতা, গতি, জ্বালানি ও কম্পিউটারের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে জানাচ্ছিলেন। একজন বাইরে তাকিয়ে ভূমি বিচার করবেন, অন্যজন যন্ত্রের তথ্য পড়বেন—এই কাজের বিভাজন শেষ মুহূর্তে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কলাম্বিয়া থেকে বিচ্ছেদের পর কলিন্স ঈগলের বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

এরপর ঈগলের অবতরণ ইঞ্জিন অল্প সময় চালিয়ে কক্ষপথের নিচের অংশ চন্দ্রপৃষ্ঠের প্রায় ১৫ কিলোমিটার ওপরে নামিয়ে আনা হয়। সেখান থেকেই শুরু হবে মূল অবতরণ। চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই বলে প্যারাস্যুট ব্যবহার করে গতি কমানোর সুযোগ ছিল না। কক্ষপথে ছুটতে থাকা যানটির সামনের দিকে প্রচণ্ড গতি ইঞ্জিন দিয়েই কমাতে হতো। একই সঙ্গে উচ্চতাও নিয়ন্ত্রণ করতে হতো, যাতে যানটি ধীরে ধীরে পৃষ্ঠের দিকে নামে। চন্দ্রাবতরণ ছিল সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত রকেটচালিত অবতরণ, সাধারণভাবে নিচে পড়ে যাওয়া নয়।

অবতরণস্থল নির্বাচিত হয়েছিল সি অব ট্র্যাঙ্কুইলিটি বা প্রশান্তির সাগর অঞ্চলে। নামের মধ্যে সাগর থাকলেও সেখানে পানি ছিল না; এটি প্রাচীন লাভা প্রবাহে তৈরি বিস্তৃত সমভূমি। তুলনামূলক সমতল ভূমি, অবতরণের উপযোগী অবস্থান এবং আলোছায়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় অঞ্চলটি বেছে নেওয়া হয়। তবে দূর থেকে তোলা ছবিতে সব ছোট গর্ত বা পাথর বোঝা সম্ভব ছিল না। সম্ভাব্য নিরাপদ এলাকা নির্বাচন করা গেলেও শেষ কয়েকশ মিটারে নভোচারীদের চোখে দেখা ভূমির ওপর নির্ভর করতে হতো।

বিশ্বসময় অনুযায়ী প্রায় ১৯টা ০৫ মিনিটে ঈগলের মূল অবতরণ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে কম্পিউটার নির্ধারিত পথে ইঞ্জিন পরিচালনা করছিল, আর দুই নভোচারী তথ্য যাচাই করছিলেন। অবতরণ রাডার চন্দ্রপৃষ্ঠের দূরত্ব ও গতির তথ্য সরবরাহ করছিল, যা কম্পিউটারের হিসাব সংশোধনে দরকার ছিল। এ সময় যোগাযোগেও কিছু সমস্যা দেখা দেয়। হিউস্টনের নিয়ন্ত্রকদের জানতে হচ্ছিল, ঈগল সঠিক পথে আছে কি না এবং অবতরণ চালিয়ে যাওয়া নিরাপদ হবে কি না। প্রতিটি তথ্যের অর্থ দ্রুত বুঝতে পারাই ছিল তাঁদের কাজ।

ঠিক এই পর্যায়ে কম্পিউটারে দেখা দেয় ১২০২ সতর্কসংকেত, পরে ১২০১-ও আসে। এগুলো কম্পিউটারের কাজ পরিচালনার সীমা অতিক্রম করার সতর্কতা ছিল। রঁদেভু রাডার-সংক্রান্ত অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণের কারণে কম্পিউটারের ওপর অপ্রত্যাশিত চাপ পড়ছিল। কিন্তু যন্ত্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তার সফটওয়্যার কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে অবতরণের অপরিহার্য কাজ চালিয়ে যেতে পারছিল। হিউস্টনে জ্যাক গারম্যান ও নির্দেশনা কর্মকর্তা স্টিভ বেলস পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তাঁদের বিচার অনুযায়ী অবতরণ চালানো সম্ভব ছিল; সেই অনুমোদন ঈগলে পাঠানো হয়।

এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব ছিল বিরাট। সতর্কসংকেত শুনেই অভিযান বাতিল করলে প্রথম চন্দ্রাবতরণ থেমে যেত; আবার প্রকৃত বিপদ উপেক্ষা করলে নভোচারীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ত। সতর্কসংকেতের অর্থ বোঝা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা সচল আছে কি না যাচাই করেই এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মহাকাশযানের কম্পিউটার ও ভূমির প্রশিক্ষিত দলের যৌথ কাজ এখানে কার্যকর হয়। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন উদ্বেগের মধ্যেও তাঁদের নির্ধারিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান। সামনে আরও কঠিন সমস্যা অপেক্ষা করছিল, যা কম্পিউটারের কোনো সংকেত দিয়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল না।

ঈগল সামনের দিকে কাত হয়ে নিচের ভূমি স্পষ্ট দেখার সুযোগ তৈরি করলে আর্মস্ট্রং বুঝতে পারেন, নির্ধারিত পথে নামলে একটি বড় গর্তের কাছে পাথরভরা এলাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। তিনি কম্পিউটার-সহায়ক আধা-স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণে যানটিকে সেই বিপজ্জনক স্থান পেরিয়ে নিয়ে যান। অলড্রিন তখন উচ্চতা ও নামার গতির তথ্য পড়ে যাচ্ছিলেন। আর্মস্ট্রং নিরাপদ ভূমি খুঁজছিলেন, আর অলড্রিন নিশ্চিত করছিলেন যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগুলো তাঁর কাছে পৌঁছায়। যানের ভেতরে দুজনের মনোযোগ আলাদা কাজে থাকলেও উদ্দেশ্য ছিল এক।

নিরাপদ স্থান খুঁজতে অতিরিক্ত সময় লাগায় অবতরণের জ্বালানি কমে আসছিল। হিউস্টন থেকে প্রথমে ৬০ সেকেন্ড, পরে ৩০ সেকেন্ডের সতর্কবার্তা আসে। এগুলো নির্ধারিত জ্বালানি সীমা ও অভিযান বাতিল করার হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল; ইঞ্জিন ঠিক ত্রিশ সেকেন্ড পর বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সরল অর্থ নয়। তবু পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত চাপপূর্ণ। প্রয়োজনে অবতরণ ধাপ ফেলে ঊর্ধ্বাংশের ইঞ্জিন চালিয়ে ফিরে যেতে হতো। নিচে নামার শেষ পর্যায়ে ইঞ্জিনের প্রবাহে ধুলা ছড়িয়ে পড়ায় ভূমি দেখাও কঠিন হয়ে উঠছিল।

অবশেষে ঈগলের পায়ের নিচে থাকা একটি স্পর্শনির্ণায়ক দণ্ড মাটি ছুঁলে অলড্রিন সংযোগের আলো জ্বলার কথা জানান। ইঞ্জিন বন্ধ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং যানটি চন্দ্রপৃষ্ঠে স্থির হয়। ২০ জুলাই বিশ্বসময় প্রায় ২০টা ১৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে মানুষের প্রথম চন্দ্রাবতরণ সফল হয়। আর্মস্ট্রং হিউস্টনকে জানান, এটি ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেস, ঈগল অবতরণ করেছে। কিন্তু নিরাপদে নামার পরও তাঁদের প্রথম কাজ ছিল উদ্‌যাপন নয়; যানের অবস্থা পরীক্ষা এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।

এখানে অবতরণ ও পদার্পণের সময়ের পার্থক্য বোঝা জরুরি। ঈগল নেমেছিল ২০ জুলাই, কিন্তু আর্মস্ট্রং বাইরে পা রাখেন ২১ জুলাই বিশ্বসময় প্রায় ০২টা ৫৬ মিনিটে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে তখন ২০ জুলাই রাত ১০টা ৫৬ মিনিট। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের হিসাবে মুহূর্তটি ছিল ২১ জুলাই সকাল ৮টা ৫৬ মিনিট। ফলে ‘২০ জুলাই প্রথম পদার্পণ’ কথাটি মার্কিন তারিখ অনুযায়ী প্রচলিত। অবতরণ এবং প্রথম পা রাখার মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা ব্যবধান ছিল।

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে তাঁদের পিঠের জীবনরক্ষাকারী ব্যাকপ্যাক, অক্সিজেন, শীতলীকরণ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ পরীক্ষা করতে হয়। চাঁদের শূন্য পরিবেশে স্যুটই শরীরের চারপাশে চাপ বজায় রাখবে এবং শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করবে। ক্যাবিনের চাপ কমিয়ে হ্যাচ খোলার পর আর্মস্ট্রং ধীরে বাইরে বের হন। মই দিয়ে নামতে নামতে তিনি টেলিভিশন ক্যামেরার ব্যবস্থা সক্রিয় করেন। প্রথমে ঈগলের গোলাকার ফুটপ্যাডে দাঁড়িয়ে নিচের মাটি দেখেন এবং আবার মইয়ে ওঠা সম্ভব কি না পরীক্ষা করেন। প্রতিটি পদক্ষেপে ফিরতে পারার নিশ্চয়তা জরুরি ছিল।

তারপর আর্মস্ট্রং বাঁ পা বাড়িয়ে চন্দ্রপৃষ্ঠ স্পর্শ করেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো জগতে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন তৈরি হয়। তিনি মুহূর্তটিকে একজন মানুষের ছোট পদক্ষেপ এবং মানবজাতির বিশাল অগ্রযাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেন। এরপর মাটির সূক্ষ্ম গুঁড়ো প্রকৃতি ও চলাফেরার অভিজ্ঞতা জানান। দ্রুত একটি জরুরি নমুনাও সংগ্রহ করেন, যাতে কোনো কারণে কাজ বন্ধ করে ফিরতে হলেও কিছু চন্দ্রমাটি পৃথিবীতে নেওয়া যায়। ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্যেও তাঁর কাজ পরিচালিত হচ্ছিল নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক ও নিরাপত্তাগত অগ্রাধিকারে।

প্রায় উনিশ মিনিট পরে অলড্রিনও নিচে নামেন। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ হওয়ায় হাঁটা, ভারসাম্য রাখা ও ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল অপরিচিত। স্যুটের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করতে হচ্ছিল। তাঁদের সামনে ধূসর ভূমি, কালো আকাশ এবং সূর্যের আলোয় তীব্র ছায়া। দূরে নয়, ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ঈগল—একমাত্র যান যা তাঁদের আবার কক্ষপথে ফিরিয়ে নিতে পারবে। এখন প্রথম পদার্পণের পর শুরু হবে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাযন্ত্র স্থাপন এবং সীমিত সময়ের মধ্যে চন্দ্রপৃষ্ঠ অনুসন্ধানের পরবর্তী অধ্যায়।