বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যাপোলো ১১-এর অভিযান: ১৬ জুলাই ১৯৬৯ চাঁদের পথে তিন নভোচারী

সিরিজ: চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ: ১৯৬৯

অ্যাপোলো ১১-এর অভিযান: ১৬ জুলাই ১৯৬৯ চাঁদের পথে তিন নভোচারী
১৬ জুলাই ১৯৬৯: চাঁদের পথে অ্যাপোলো ১১-এর যাত্রা।

দীর্ঘ প্রস্তুতি, দুর্ঘটনা থেকে শেখা এবং ধারাবাহিক পরীক্ষার পর ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাপোলো কর্মসূচি তার নির্ধারিত লক্ষ্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। অ্যাপোলো-১০ চাঁদের কাছে গিয়ে অবতরণের প্রায় পুরো প্রক্রিয়ার মহড়া সম্পন্ন করেছে; এবার বাকি ছিল সত্যিকার অর্থে চন্দ্রপৃষ্ঠে নামা। সেই দায়িত্ব পেয়েছিলেন নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। তাঁদের যাত্রা শুধু তিন ব্যক্তির অভিযান ছিল না। পৃথিবীতে কর্মরত প্রকৌশলী, চিকিৎসক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রকদের বিশাল ব্যবস্থাকে সঙ্গে নিয়েই তাঁরা চাঁদের উদ্দেশে রওনা হবেন।

অ্যাপোলো ১১-এর কমান্ডার আর্মস্ট্রং ছিলেন অভিজ্ঞ পরীক্ষামূলক বিমানের পাইলট। জেমিনি-৮ অভিযানে মহাকাশযানের অনিয়ন্ত্রিত ঘূর্ণন সামলে তাঁর জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আগেই প্রমাণিত হয়েছিল। লুনার মডিউল পাইলট অলড্রিন মহাকাশে দুটি যানের মিলিত হওয়ার কৌশল নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করেছিলেন এবং জেমিনি-১২-তে মহাশূন্যে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কমান্ড মডিউল পাইলট কলিন্স জেমিনি-১০-এর অভিজ্ঞ নভোচারী ছিলেন। তিনজনের দক্ষতা পরস্পরের পরিপূরক ছিল, আর চন্দ্রাভিযানের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল।

অভিযানের দুটি মহাকাশযানের আলাদা নাম দেওয়া হয়েছিল। কমান্ড মডিউল ছিল ‘কলাম্বিয়া’, আর লুনার মডিউল ‘ঈগল’। পৃথিবী থেকে চাঁদের পথে তিনজনই কলাম্বিয়ায় থাকবেন। চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন ঈগলে উঠে পৃষ্ঠে নামবেন; কলিন্স মূল যানে থেকে কক্ষপথে ঘুরবেন। পরে ঈগলের ঊর্ধ্বাংশ ফিরে এসে কলাম্বিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে। সুতরাং কলিন্সের কাজ ছিল প্রত্যাবর্তনের অপরিহার্য সংযোগটি সচল রাখা। চাঁদে নামা দুই সহযাত্রীকে ফেরত নেওয়ার জন্য তাঁকে প্রস্তুত থাকতে হতো।

অভিযানের আগে প্রশিক্ষণে শুধু যন্ত্র চালানো শেখানো হয়নি; সম্ভাব্য ব্যর্থতার পরিস্থিতিও বারবার অনুশীলন করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণে ইঞ্জিনের সমস্যা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, ডকিং ব্যর্থতা কিংবা চাঁদের কাছে ইঞ্জিন না জ্বলার মতো ঘটনায় কী করতে হবে, তার পদ্ধতি নির্ধারিত ছিল। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন অবতরণযানের সিমুলেটরে প্রশিক্ষণ নেন এবং ভূতাত্ত্বিক নমুনা সংগ্রহ শেখেন। কলিন্স অনুশীলন করেন নেভিগেশন ও পুনর্মিলনের কাজ। নির্ধারিত কাজের পাশাপাশি বিপদে অভিযান থামিয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্তও প্রশিক্ষণের অংশ ছিল।

১৬ জুলাইয়ের ভোরে তিন নভোচারী ঘুম থেকে উঠে স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও সকালের খাবার শেষ করেন। এরপর সহায়ক দলের তত্ত্বাবধানে স্পেসস্যুট পরেন। স্যুটের সংযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অক্সিজেন সরবরাহ পরীক্ষা করা হয়। একটি বিশেষ গাড়িতে তাঁদের লঞ্চপ্যাডে নিয়ে যাওয়া হয়; সেখান থেকে লিফটে উঠে রকেটের প্রায় মাথায় থাকা কমান্ড মডিউলে প্রবেশ করেন। ছোট ক্যাবিনে তাঁরা নির্ধারিত আসনে শুয়ে বাঁধা অবস্থায় থাকেন। হ্যাচ বন্ধ করার পরও উৎক্ষেপণের আগে মহাকাশযান ও ভূমির নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যে বহু পরীক্ষা চলতে থাকে।

লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ-তে দাঁড়ানো স্যাটার্ন ফাইভের উচ্চতা ছিল প্রায় ১১১ মিটার। জ্বালানিসহ তার ভর ছিল প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন। এই বিশাল রকেটের অধিকাংশই ছিল জ্বালানি ও তা বহনের কাঠামো; শীর্ষে নভোচারীদের থাকার জায়গা তুলনায় অত্যন্ত ছোট। প্রথম ধাপের পাঁচটি এফ-১ ইঞ্জিন একসঙ্গে প্রায় ৭৫ লাখ পাউন্ড বলের সমতুল্য থ্রাস্ট তৈরি করত। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রমের প্রথম কাজটি করতে হতো বিপুল শক্তি ব্যয় করে, এরপর ধাপে ধাপে হালকা হয়ে রকেট আরও গতি অর্জন করত।

স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে, অর্থাৎ সমন্বিত বিশ্বসময় ১৩টা ৩২ মিনিটে, অ্যাপোলো ১১ উৎক্ষেপিত হয়। তার আগেই প্রথম ধাপের ইঞ্জিনগুলো চালু করে কার্যক্ষমতা যাচাই করা হয়েছিল। তারপর রকেট ধরে রাখা ব্যবস্থা মুক্ত করা হলে স্যাটার্ন ফাইভ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। উপকূলজুড়ে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশনের সামনে থাকা মানুষ দেখছিলেন সেই মুহূর্ত। কিন্তু নভোচারীদের কাছে এটি ছিল প্রবল কম্পন, ত্বরণ ও যন্ত্রের তথ্য পর্যবেক্ষণের সময়। তাঁদের নিয়মিত জানাতে হচ্ছিল, মহাকাশযানের অবস্থা স্বাভাবিক আছে কি না।

উৎক্ষেপণের প্রায় দুই মিনিট চল্লিশ সেকেন্ড পর প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়। ব্যবহৃত ধাপটি বিচ্ছিন্ন হলে দ্বিতীয় ধাপের পাঁচটি জে-২ ইঞ্জিন মহাকাশযানকে আরও ওপরে এবং দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপর তৃতীয় ধাপের একটি জে-২ ইঞ্জিন চালু হয়। খালি হয়ে যাওয়া ধাপ ফেলে দেওয়া রকেটকে অপ্রয়োজনীয় ভর বহন থেকে মুক্ত করেছিল। প্রায় বারো মিনিটের মধ্যে অ্যাপোলো ১১ পৃথিবীর সাময়িক কক্ষপথে পৌঁছায়। উৎক্ষেপণের সাফল্য তখনও চাঁদের পথে যাত্রার নিশ্চয়তা ছিল না; আগে সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা যাচাই করতে হতো।

এই সাময়িক কক্ষপথে নভোচারী ও ভূমির নিয়ন্ত্রকেরা মহাকাশযান, নেভিগেশন এবং তৃতীয় ধাপের অবস্থা পরীক্ষা করেন। কোনো গুরুতর সমস্যা থাকলে চাঁদের পথে যাওয়ার পরিবর্তে পৃথিবীতে ফেরার সুযোগ তখনও ছিল। চন্দ্রযাত্রার জন্য তৃতীয় ধাপের ইঞ্জিন আবার চালু করতে হতো। সেটিই ছিল ট্রান্সলুনার ইনজেকশন—পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার পথ থেকে চাঁদের দিকে দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রবেশের প্রক্রিয়া। নির্ধারিত সময় ও সঠিক দিকে ইঞ্জিন চালানো জরুরি ছিল, কারণ সামান্য ভুলও দূরের গন্তব্যে বড় বিচ্যুতি তৈরি করতে পারত।

উৎক্ষেপণের প্রায় দুই ঘণ্টা চুয়াল্লিশ মিনিট পর তৃতীয় ধাপের ইঞ্জিন পুনরায় চালু হয়। প্রায় ছয় মিনিটের এই চালনায় মহাকাশযানের গতি বাড়ে এবং তার গতিপথ চাঁদের দিকে প্রসারিত হয়। তবে এরপর পুরো পথ ইঞ্জিন চালিয়ে যেতে হয়নি। মহাশূন্যে চলমান যানকে এগিয়ে রাখতে অবিরাম ধাক্কা দেওয়ার প্রয়োজন নেই; পৃথিবী ও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব বিবেচনায় হিসাব করা পথে সেটি চলতে থাকে। পরবর্তী ইঞ্জিন চালনাগুলো মূলত গতিপথ সংশোধন ও চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন হবে।

চাঁদের পথে রওনা হওয়ার পর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল কলাম্বিয়াকে ঈগলের সঙ্গে যুক্ত করা। উৎক্ষেপণের সময় লুনার মডিউল তৃতীয় ধাপের ওপর একটি আবরণের মধ্যে রাখা ছিল। কলিন্স কমান্ড ও সার্ভিস মডিউলকে আলাদা করে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘোরান। তারপর ধীরে এগিয়ে কলাম্বিয়ার সামনের ডকিং ব্যবস্থা ঈগলের সঙ্গে যুক্ত করেন। সংযোগ নিশ্চিত হলে লুনার মডিউলটি তার অবস্থান থেকে বের করে আনা হয়। এই ডকিং সফল না হলে চাঁদে নামার পরিকল্পনা কার্যকর করা যেত না, যদিও পৃথিবীতে ফেরার সম্ভাবনা থাকত।

পরবর্তী প্রায় তিন দিনের যাত্রায় নভোচারীরা যন্ত্র পরীক্ষা, নেভিগেশন পর্যবেক্ষণ, খাবার গ্রহণ ও বিশ্রামের নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করেন। গতিপথে প্রয়োজনীয় সংশোধনও করা হয়। জানালা দিয়ে পৃথিবী ক্রমশ ছোট হতে দেখা গেলেও তাঁদের কাজের কেন্দ্র ছিল পরিমাপ ও হিসাব। পৃথিবীর পর্যবেক্ষণকেন্দ্র মহাকাশযানের অবস্থান নির্ণয় করছিল, আর কলাম্বিয়ার যন্ত্র দিয়ে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে নেভিগেশনের তথ্য যাচাই করা হতো। এত দূরের অভিযানে অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা থাকা নিরাপদ যাত্রার অন্যতম শর্ত ছিল।

মহাকাশযানের কম্পিউটার চালনায় সহায়তা করলেও সিদ্ধান্তের পুরো দায়িত্ব তার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। নভোচারী, কম্পিউটার ও ভূমির নিয়ন্ত্রকেরা একে অন্যের তথ্য যাচাই করতেন। যোগাযোগের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ব্যবহৃত হয়েছিল, যাতে পৃথিবী ঘুরলেও যোগাযোগ বজায় রাখা যায়। চাঁদের দূরত্বে একমুখী রেডিও সংকেত পৌঁছাতে প্রায় ১.৩ সেকেন্ড লাগত। ফলে কথোপকথনে বিলম্ব ছিল। হিউস্টন পরামর্শ দিতে পারত, কিন্তু মহাকাশযানের ভেতরের প্রত্যেকটি কাজ তাৎক্ষণিকভাবে নিজে করে দিতে পারত না।

১৯ জুলাই অ্যাপোলো ১১ চাঁদের কাছে পৌঁছায়। কক্ষপথে ঢোকার জন্য শুধু কাছ দিয়ে যাওয়া যথেষ্ট ছিল না; সার্ভিস মডিউলের প্রধান ইঞ্জিন চালিয়ে গতি কমাতে হতো। এই গুরুত্বপূর্ণ চালনা হয় চাঁদের আড়ালে, যখন পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি রেডিও যোগাযোগ বন্ধ ছিল। নির্ধারিত সময়ে মহাকাশযান আবার দৃশ্যমান হলে যোগাযোগ ফিরে আসে এবং কক্ষপথে প্রবেশের সাফল্য নিশ্চিত হয়। কয়েক দিন আগে ফ্লোরিডা থেকে যাত্রা করা তিনজন মানুষ তখন সত্যিই অন্য একটি জগতের চারপাশে ঘুরছিলেন।

তবু চাঁদে পৌঁছানো এবং চাঁদে নামা ছিল দুটি পৃথক পরীক্ষা। কলাম্বিয়া ও ঈগলের যন্ত্র, অবতরণস্থলের অবস্থান এবং দুই যানের বিচ্ছেদের প্রস্তুতি আবার যাচাই করতে হয়। সামনে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনের জন্য অপেক্ষা করছিল এমন একটি অবতরণ, যা কোনো মানুষ আগে করেনি; কলিন্সকে থাকতে হবে কক্ষপথের মূল যানে। ১৬ জুলাইয়ের উৎক্ষেপণ তাঁদের চাঁদের দরজায় পৌঁছে দিয়েছিল, কিন্তু অভিযানের সবচেয়ে অনিশ্চিত অংশ তখনও বাকি। পরবর্তী পর্যায়ে ঈগলকে আলাদা হয়ে নামতে হবে চাঁদের ‘সি অব ট্র্যাঙ্কুইলিটি’ অঞ্চলের দিকে।