বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নারীদের হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বেশি কেন? হাড় ক্ষয়ের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ

নারীদের হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বেশি কেন? হাড় ক্ষয়ের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ
নারীদের হাড়ের শক্তি রক্ষায় সচেতনতা জরুরি

হাড়কে বাইরে থেকে শক্ত ও অপরিবর্তনীয় কাঠামো মনে হলেও এটি আসলে জীবন্ত কলা। পুরোনো হাড়ের অংশ নিয়মিত ভেঙে অপসারিত হয় এবং তার জায়গায় নতুন হাড় তৈরি হয়। জীবনের প্রথম কয়েক দশকে সাধারণত হাড় তৈরির হার বেশি থাকে। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, হাড় ভাঙার হার নতুন হাড় তৈরির হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমতে শুরু করে।

নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণভাবে নারীদের হাড়ের আকার ও মোট হাড়ের ভর পুরুষদের তুলনায় কম থাকে। ফলে বয়সজনিত হাড় ক্ষয় শুরু হলে তাঁদের হাতে থাকা হাড়ের প্রাথমিক সঞ্চয়ও তুলনামূলক কম হতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে ঋতুবন্ধের সময়।

নারী হরমোনের ভূমিকা

নারী হরমোনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো হাড়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করা। এটি হাড় ভাঙার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঋতুবন্ধের সময় ডিম্বাশয় থেকে এই হরমোনের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে হাড় ভাঙার সঙ্গে যুক্ত কোষগুলোর কার্যক্রম তুলনামূলক বেড়ে যেতে পারে এবং হাড়ের খনিজ ঘনত্ব দ্রুত কমতে পারে।

এ কারণেই ঋতুবন্ধের পরবর্তী কয়েক বছর নারীদের হাড়ের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়। আগে থেকেই হাড়ের ঘনত্ব কম থাকলে এই পরিবর্তনের ফলে অস্থিক্ষয়ের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

নারীদের সর্বোচ্চ হাড়ের ভর তুলনামূলক কম হতে পারে

শৈশব, কৈশোর ও তরুণ বয়সে হাড়ে যে পরিমাণ খনিজ জমা হয়, তা ভবিষ্যতের হাড়ের শক্তির ভিত্তি তৈরি করে। এই সময় পর্যাপ্ত পুষ্টি, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না থাকলে সর্বোচ্চ হাড়ের ভর প্রত্যাশিত মাত্রায় নাও পৌঁছাতে পারে।

ফলে পরবর্তী জীবনে স্বাভাবিকভাবে হাড় ক্ষয় শুরু হলে দুর্বলতার সীমায় পৌঁছাতে তুলনামূলক কম সময় লাগতে পারে।

কোন নারীদের হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি?

সব নারীর ঝুঁকি সমান নয়। বয়স ও ঋতুবন্ধের পাশাপাশি ব্যক্তির শারীরিক গঠন, পারিবারিক ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং কিছু রোগ ও ওষুধ হাড়ের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

অল্প বয়সে ঋতুবন্ধ হলে

স্বাভাবিকের তুলনায় কম বয়সে ঋতুবন্ধ হলে হাড় দীর্ঘ সময় ধরে নারী হরমোনের নিম্নমাত্রার প্রভাবে থাকে। কোনো কারণে ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা অল্প বয়সে কমে গেলেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শরীরের ওজন অত্যন্ত কম হলে

অত্যন্ত কম ওজন বা খুব কম শরীরের চর্বি হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত শক্তি ও পুষ্টি না পাওয়া, কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ অথবা অতিরিক্ত ব্যায়ামের সঙ্গে মাসিক অনিয়ম যুক্ত হলে হাড় তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়েই ভবিষ্যতের জন্য উল্লেখযোগ্য হাড়ের ভর তৈরি হয়।

পরিবারে অস্থিক্ষয় বা নিতম্ব ভাঙার ইতিহাস থাকলে

হাড়ের ঘনত্বে বংশগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব রয়েছে। বাবা বা মায়ের অস্থিক্ষয় অথবা সামান্য আঘাতে নিতম্ব ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে ব্যক্তির ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট ধরনের স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করলে হাড়ের গঠন ও ক্যালসিয়াম ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ওষুধও হাড়ের ঘনত্বে প্রভাব ফেলতে পারে।

নিজে থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চললে হাড়ের ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে

থাইরয়েড বা প্যারাথাইরয়েডের কিছু সমস্যা, অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ এবং কিছু হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে হাড় ক্ষয়ের সম্পর্ক থাকতে পারে।

হাড় দুর্বল হচ্ছে কি না কীভাবে বুঝবেন?

হাড় ক্ষয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো এটি দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই এগোতে পারে। রক্তচাপ বাড়লে যেমন মাপা যায় বা জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে, হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকলে সাধারণত তেমন কোনো তাৎক্ষণিক অনুভূতি তৈরি হয় না।

তাই অস্থিক্ষয়কে অনেক সময় নীরব সমস্যা বলা হয়।

সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া

স্বাভাবিক অবস্থায় যে ধরনের পড়ে যাওয়া বা আঘাতে হাড় ভাঙার কথা নয়, তেমন ঘটনায় হাড় ভেঙে গেলে হাড়ের দুর্বলতা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কবজি, মেরুদণ্ড ও নিতম্বের হাড় ভাঙা বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।

উচ্চতা কমে যাওয়া

মেরুদণ্ডের কশেরুকা দুর্বল হয়ে ধীরে ধীরে চেপে যেতে পারে। একাধিক কশেরুকায় এমন পরিবর্তন হলে একজন নারী কয়েক বছরের মধ্যে আগের তুলনায় খাটো হয়ে যেতে পারেন।

পিঠ বাঁকা হয়ে যাওয়া

মেরুদণ্ডের সামনের অংশে বারবার চাপজনিত ভাঙন হলে পিঠ সামনের দিকে বাঁকা হতে পারে। অনেক সময় মানুষ এটিকে স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ মনে করেন, অথচ এর পেছনে দুর্বল কশেরুকা থাকতে পারে।

হঠাৎ পিঠে ব্যথা

কখনো দুর্বল কশেরুকায় চাপজনিত ভাঙনের কারণে হঠাৎ তীব্র পিঠের ব্যথা হতে পারে। আবার কিছু কশেরুকার ভাঙন খুব সামান্য ব্যথা বা প্রায় কোনো লক্ষণ ছাড়াই ঘটতে পারে।

তাই শুধু ব্যথা না থাকাকে শক্ত হাড়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যায় না।

হাড়ের ঘনত্ব কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?

হাড় কতটা শক্তিশালী তা মূল্যায়নের জন্য বিশেষ ধরনের হাড়ের খনিজ ঘনত্ব পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত নিতম্ব ও কোমরের মেরুদণ্ডের হাড় পরীক্ষা করা হয়, কারণ অস্থিক্ষয়জনিত গুরুত্বপূর্ণ ভাঙনের সঙ্গে এই স্থানগুলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসক ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, পূর্বে হাড় ভাঙার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস, ওষুধের ব্যবহার এবং অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেন।

শুধু পরীক্ষার একটি সংখ্যা দেখেই ভবিষ্যতে হাড় ভাঙবে কি না নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ হাড় ভাঙার ঝুঁকি শুধু ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে না। পড়ে যাওয়ার প্রবণতা, পেশির শক্তি, ভারসাম্য, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্যান্য রোগও গুরুত্বপূর্ণ।

ঋতুবন্ধের পর সব নারীর একই বয়সে একই পরীক্ষা প্রয়োজন হবে এমন নয়। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির ভিত্তিতে কখন পরীক্ষা করা উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের সঙ্গে নির্ধারণ করা ভালো।

নারীরা কীভাবে হাড় শক্ত রাখতে পারেন?

হাড়ের যত্ন শুধু বৃদ্ধ বয়সে শুরু করার বিষয় নয়। কৈশোর ও তরুণ বয়সে যত ভালো হাড়ের ভর তৈরি করা যায়, পরবর্তী জীবনের জন্য তত বড় সঞ্চয় তৈরি হয়। আবার মধ্যবয়স ও ঋতুবন্ধের পর লক্ষ্য থাকে হাড় ক্ষয়ের গতি কমানো এবং পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো।

ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার

দুধ, দই, ছোট মাছের খাওয়ার উপযোগী কাঁটাসহ অংশ এবং বিভিন্ন ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন বয়সভেদে পরিবর্তিত হয়। তাই সবার জন্য একই মাত্রার ক্যালসিয়াম বড়ি প্রয়োজন হয় না।

খাবার থেকে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম পাওয়া গেলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত পরিপূরক গ্রহণের দরকার নাও হতে পারে।

ভিটামিন ডি

ক্যালসিয়াম শোষণ এবং হাড়ের স্বাভাবিক খনিজায়নের জন্য ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যালোকের সাহায্যে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে, আবার কিছু খাবার থেকেও এটি পাওয়া যায়। ঘাটতির ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা বা পরিপূরক প্রয়োজন হতে পারে।

ওজন বহনকারী ব্যায়াম

হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এবং শরীরের ওজন বহন করে করা বিভিন্ন ব্যায়াম হাড়কে যান্ত্রিক উদ্দীপনা দেয়। শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশি শক্তিশালী করতেও সাহায্য করে।

পেশি শক্তিশালী হওয়ার আরেকটি সুবিধা হলো শরীরের ভারসাম্য ভালো থাকে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে। বয়স্ক নারীদের হাড় ভাঙা প্রতিরোধে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়ানো

ধূমপান হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত মদ্যপানও হাড়ের ক্ষতি এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই হাড় রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এসব অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীদের হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বেশি হওয়ার পেছনে শুধু বয়স নয়; হরমোনের পরিবর্তন, প্রাথমিক হাড়ের ভর, পুষ্টি, শারীরিক সক্রিয়তা, রোগ, ওষুধ এবং বংশগত বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে কাজ করে। অস্থিক্ষয় অনেক সময় হাড় ভাঙার আগ পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট সতর্কসংকেত দেয় না। তাই বিশেষ করে ঋতুবন্ধের পর ঝুঁকির কারণগুলো চিহ্নিত করা, যথাযথ পুষ্টি ও ব্যায়াম বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মাধ্যমে হাড়ের স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করাই দীর্ঘমেয়াদে হাড় শক্ত রাখার কার্যকর উপায়।


আপনার পছন্দ হতে পারে