বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

খাবারের পর হাঁটা কেন উপকারী? রক্তে শর্করা, হজম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা

খাবারের পর হাঁটা কেন উপকারী? রক্তে শর্করা, হজম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা
খাবারের পর অল্প হাঁটাও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে

খাওয়ার পর সাধারণত আমাদের শরীরের কাজের ধরনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়। খাবারের শর্করা পরিপাকের পর গ্লুকোজে ভেঙে রক্তে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ভাত, রুটি, আলু, মিষ্টি কিংবা অন্যান্য শর্করাসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এই সময় অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন নিঃসরণ করে, যা রক্তের গ্লুকোজকে বিভিন্ন কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।

খাওয়ার পর যদি দীর্ঘ সময় বসে বা শুয়ে থাকা হয়, তখন শরীরের বড় পেশিগুলোর কার্যক্রম খুব কম থাকে। বিপরীতে অল্প সময় হাঁটলেও পা, নিতম্ব ও শরীরের অন্যান্য বড় পেশি সক্রিয় হয়। সক্রিয় পেশির শক্তির প্রয়োজন হয় এবং সেই শক্তির অন্যতম উৎস হলো গ্লুকোজ।

ফলে খাবারের পর হাঁটা রক্তে সদ্য প্রবেশ করা গ্লুকোজ ব্যবহারে সহায়তা করতে পারে। এ কারণেই খাবারের পর হাঁটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য সুবিধাগুলোর একটি হলো খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এর জন্য ঘণ্টাব্যাপী কঠিন ব্যায়ামের প্রয়োজন হয় না। খাবারের পর স্বল্প সময়ের হালকা থেকে মাঝারি গতির হাঁটাও উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে দিনের প্রধান খাবারগুলোর পর নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার অভ্যাস ভাঙতেও সাহায্য করে।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে খাবারের পর হাঁটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। সমস্যা তৈরি হতে পারে যখন এই বৃদ্ধি বারবার অত্যধিক হয় অথবা শরীর গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়ে।

পেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করতে শুরু করে

হাঁটার সময় পায়ের পেশিগুলো বারবার সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। সক্রিয় পেশি শক্তি তৈরির জন্য গ্লুকোজ গ্রহণ করে। ফলে রক্তে থাকা গ্লুকোজের একটি অংশ দ্রুত ব্যবহার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এই কারণে খাবারের পর দীর্ঘ সময় নিশ্চল থাকার তুলনায় কিছুক্ষণ হাঁটা খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

একবার দীর্ঘ হাঁটার বদলে খাবারের পর ছোট হাঁটার আলাদা সুবিধা থাকতে পারে

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে ত্রিশ মিনিট হাঁটেন কিন্তু দুপুর ও রাতের খাবারের পর কয়েক ঘণ্টা বসে থাকেন। অন্যদিকে আরেকজন ব্যক্তি প্রতিটি প্রধান খাবারের পর দশ মিনিট করে হাঁটেন।

দুজনের মোট হাঁটার সময় সমান হলেও দ্বিতীয় পদ্ধতিতে হাঁটা সরাসরি খাবারের পরের সময়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে যখন রক্তে গ্লুকোজ বাড়ছে, তখনই পেশি সক্রিয় হচ্ছে। খাবার-পরবর্তী শর্করা নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সময় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিশেষ করে যাঁদের রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে বা যাঁদের দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের জন্য খাবারের পর হাঁটার অভ্যাস উপকারী হতে পারে। তবে রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করলে ব্যায়ামের সময় ও মাত্রা ব্যক্তিভেদে ঠিক করা দরকার, কারণ কিছু ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যেতে পারে।

হজম, হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণে কী ভূমিকা থাকতে পারে?

খাবারের পর হাঁটার সুবিধা শুধু রক্তে শর্করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে এটি দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর সহজ একটি উপায়।

হজমে সহায়ক হতে পারে

খাওয়ার পর খুব দ্রুত বা কঠোর ব্যায়াম অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু আরামদায়ক গতির হালকা হাঁটা ভিন্ন বিষয়। এটি শরীরকে সচল রাখে এবং পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিশীলতায় সহায়তা করতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের পর ধীরে হাঁটলে পেট ভার লাগা বা দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার অস্বস্তি কম অনুভূত হতে পারে। তবে খাওয়ার পর পেটব্যথা, বুকজ্বালা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট পরিপাকজনিত সমস্যা থাকলে হাঁটাকে চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস ভাঙে

আধুনিক জীবনযাত্রায় একটি বড় সমস্যা হলো দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে থাকা। দুপুরের খাবারের পর আবার কাজের টেবিলে বসা কিংবা রাতের খাবারের পর দীর্ঘ সময় টেলিভিশন বা মুঠোফোন দেখা খুব সাধারণ অভ্যাস।

প্রতিটি খাবারের পর দশ থেকে পনেরো মিনিট হাঁটলে দিনের মোট বসে থাকার সময় কমে এবং শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ে। অর্থাৎ আলাদাভাবে ব্যায়ামের জন্য দীর্ঘ সময় বের করতে না পারলেও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই চলাফেরার সুযোগ তৈরি হয়।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য সামগ্রিকভাবে উপকারী

নিয়মিত হাঁটা হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী শারীরিক কার্যক্রম। খাবারের পর হাঁটাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করলে সপ্তাহজুড়ে মোট শারীরিক সক্রিয়তার পরিমাণ সহজেই বাড়তে পারে।

যেমন প্রতিদিন দুপুর ও রাতের খাবারের পর মাত্র পনেরো মিনিট করে হাঁটলেও দিনে ত্রিশ মিনিট এবং সাত দিনে মোট সাড়ে তিন ঘণ্টা হাঁটা হয়ে যায়।

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে

দশ মিনিট হাঁটলেই শরীরের প্রচুর চর্বি গলে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। খাবারের পর হাঁটার ওজনসংক্রান্ত সুবিধা মূলত দীর্ঘমেয়াদি।

হাঁটার সময় শরীর অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে। প্রতিদিন নিয়মিত কয়েকবার হাঁটলে সপ্তাহ ও মাসের হিসাবে মোট শক্তি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। খাদ্যাভ্যাসও পরিমিত থাকলে এটি শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

তবে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে পরে হাঁটলেই সেই অতিরিক্ত শক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে—এমন ধারণাও ভুল। হাঁটা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নয়; বরং তার পরিপূরক।

খাবারের কতক্ষণ পর এবং কতক্ষণ হাঁটা ভালো?

খাবারের পর হাঁটার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়। মূল বিষয় হলো খাবারের পর দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না থাকা এবং নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হালকা চলাফেরা শুরু করা।

কখন শুরু করবেন?

খাওয়া শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই হালকা হাঁটা শুরু করা যেতে পারে, যদি কোনো অস্বস্তি না থাকে। খুব ভারী খাবার খেলে সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত হাঁটার পরিবর্তে কিছুটা সময় নিয়ে ধীর গতিতে শুরু করা আরামদায়ক হতে পারে।

খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে শুরু করার সময়ের কাছাকাছি হাঁটলে পেশি সেই গ্লুকোজ ব্যবহারের সুযোগ পায়। তাই কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরিবর্তে খাবারের পরবর্তী সময়ে হাঁটা বিশেষভাবে অর্থবহ।

কতক্ষণ হাঁটবেন?

শুরুতে দশ মিনিট একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। অভ্যাস না থাকলে পাঁচ মিনিট দিয়েও শুরু করা যায়। পরে স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী দশ, পনেরো বা বিশ মিনিট পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

প্রতিটি খাবারের পর হাঁটতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দুপুর ও রাতের খাবারের পর হাঁটা দিয়েও অভ্যাস শুরু করা যায়।

কত দ্রুত হাঁটবেন?

খাবারের পর হাঁটার উদ্দেশ্য কঠিন শরীরচর্চা করা নয়। এমন গতিতে হাঁটা যেতে পারে যাতে শরীর সচল হয়, শ্বাস কিছুটা দ্রুত হয় কিন্তু স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায়।

ভারী খাবারের পরপরই দৌড়ানো বা অত্যন্ত দ্রুত হাঁটা অনেকের পেটে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা পেট মোচড়ানোর কারণ হতে পারে। তাই আরামদায়ক হাঁটাই সাধারণত বেশি ব্যবহারিক।

কীভাবে খাবারের পর হাঁটাকে নিয়মিত অভ্যাস করবেন?

খাবারের পর হাঁটার বড় সুবিধা হলো এর জন্য আলাদা ব্যায়ামাগার, বিশেষ পোশাক বা জটিল সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমনভাবে অভ্যাসটি তৈরি করা, যাতে দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর সরাসরি সোফায় বসার পরিবর্তে দশ মিনিট হাঁটা যেতে পারে। বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে বাড়ির ভেতর, বারান্দা, ছাদ বা নিরাপদ করিডরেও হাঁটা যায়। কর্মস্থলে দুপুরের খাবারের পর ভবনের আশপাশে কয়েক মিনিট হাঁটাও কার্যকর অভ্যাস হতে পারে।

তবে হাঁটার কারণে যদি মাথা ঘোরা, বুকব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে হাঁটা বন্ধ করে কারণ মূল্যায়ন করা জরুরি। হৃদ্‌রোগ, গুরুতর শারীরিক সীমাবদ্ধতা বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করলে ব্যক্তিগতভাবে উপযুক্ত ব্যায়ামের মাত্রা চিকিৎসকের সঙ্গে নির্ধারণ করা ভালো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাবারের পর হাঁটাকে খাবারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন চলাফেরার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। অল্প সময়ের হাঁটাও নিয়মিত করা গেলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা কমানো, দৈনিক শক্তি ব্যয় বাড়ানো এবং সামগ্রিক শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধির মতো একাধিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।


আপনার পছন্দ হতে পারে