বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্রান ক্যাসেল: ড্রাকুলার দুর্গের কিংবদন্তি বনাম রোমানিয়ার সত্যিকারের ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

ব্রান ক্যাসেল: ড্রাকুলার দুর্গের কিংবদন্তি বনাম রোমানিয়ার সত্যিকারের ইতিহাস
ব্রান ক্যাসেল—ড্রাকুলার কিংবদন্তির আড়ালে সত্যিকারের ইতিহাস

ট্রান্সিলভানিয়ার পাহাড়ে কুয়াশায় ঢাকা একটি পাথুরে চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্রান ক্যাসেল দেখলে ড্রাকুলার গল্প মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। সরু সিঁড়ি, উঁচু টাওয়ার, অনিয়মিত ছাদ, গোপন পথের মতো করিডর এবং চারদিকে কার্পাথিয়ান পর্বতমালার অন্ধকার বন—সব মিলিয়ে দুর্গটি যেন কোনো গথিক ভৌতিক উপন্যাসের জন্যই তৈরি। পর্যটনজগতেও এটি বহুদিন ধরে “ড্রাকুলার ক্যাসেল” নামে প্রচারিত। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো—বিশ্বজুড়ে ড্রাকুলার দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই স্থানের সঙ্গে ব্রাম স্টোকারের কাল্পনিক কাউন্ট ড্রাকুলার সরাসরি সম্পর্ক নেই, আর ঐতিহাসিক ভ্লাদ তৃতীয় ড্রাকুলার সঙ্গেও এর সম্পর্ক অত্যন্ত সীমিত ও অনিশ্চিত।

ব্রান ক্যাসেলের প্রকৃত ইতিহাস ভ্যাম্পায়ার দিয়ে নয়, বরং বাণিজ্যপথ, সীমান্ত প্রতিরক্ষা এবং মধ্যযুগীয় ট্রান্সিলভানিয়ার রাজনীতি দিয়ে শুরু হয়। বর্তমান দুর্গের এলাকাটি কার্পাথিয়ান পর্বতমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথের কাছে অবস্থিত। এই পথ দিয়ে ট্রান্সিলভানিয়া এবং ওয়ালাকিয়ার মধ্যে মানুষ ও পণ্য চলাচল করত। ফলে যে শক্তি এই পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, সে একই সঙ্গে সামরিক চলাচল ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত।

বর্তমান পাথরের দুর্গের আগে এই অঞ্চলে একটি পুরোনো প্রতিরক্ষা স্থাপনা ছিল বলে জানা যায়। ত্রয়োদশ শতকে টিউটনিক নাইটরা এলাকায় একটি কাঠের দুর্গ নির্মাণ করেছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেটি বর্তমান ব্রান ক্যাসেল নয় এবং পরবর্তী সংঘাতে সেই প্রাথমিক স্থাপনা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বর্তমান দুর্গের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা ঘটে ১৩৭৭ সালে। হাঙ্গেরির রাজা প্রথম লুই ব্রাশভের স্যাক্সন অধিবাসীদের ব্রান অঞ্চলে একটি পাথরের দুর্গ নির্মাণের অধিকার দেন। স্থানীয় স্যাক্সন সম্প্রদায় নিজেদের শ্রম ও সম্পদ ব্যবহার করে দুর্গ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ব্রানকে শুধু কোনো রাজপরিবারের ব্যক্তিগত প্রাসাদ হিসেবে তৈরি করা হয়নি; এর জন্মের পেছনে ছিল সীমান্ত সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ

দুর্গটির অবস্থানই এর সামরিক গুরুত্ব বোঝায়। খাড়া পাথরের ওপর নির্মিত হওয়ায় নিচের গিরিপথ পর্যবেক্ষণ করা সহজ ছিল। প্রাচীর, টাওয়ার এবং নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ ছোট একটি বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ পথ পাহারা দেওয়ার সুযোগ দিত। পাশাপাশি এখানে শুল্ক আদায়ের ব্যবস্থাও ছিল। ট্রান্সিলভানিয়া ও ওয়ালাকিয়ার মধ্যে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ীদের পণ্য থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো।

এই বাস্তব ইতিহাসের কোথাও ভ্যাম্পায়ার ছিল না।

ড্রাকুলার সঙ্গে ব্রান ক্যাসেলের সম্পর্ক বুঝতে হলে প্রথমে তিনটি আলাদা বিষয়কে পৃথক করতে হয়—ব্রান ক্যাসেল, ঐতিহাসিক ভ্লাদ তৃতীয় এবং ব্রাম স্টোকারের কাল্পনিক কাউন্ট ড্রাকুলা। জনপ্রিয় সংস্কৃতি এই তিনটিকে এমনভাবে একত্র করেছে যে আজ অনেকের কাছে এগুলো একই গল্পের অংশ বলে মনে হয়।

ঐতিহাসিক ভ্লাদ তৃতীয় ছিলেন পঞ্চদশ শতকের ওয়ালাকিয়ার শাসক। তিনি আনুমানিক ১৪৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ইতিহাসে Vlad Țepeș বা ভ্লাদ দ্য ইমপেলার নামেও পরিচিত। তাঁর পিতা ভ্লাদ দ্বিতীয় ছিলেন Order of the Dragon নামের একটি খ্রিষ্টীয় নাইট সংগঠনের সদস্য এবং “Dracul” উপাধির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই তাঁর পুত্রের “Dracula” নামের ঐতিহাসিক উৎস—অর্থাৎ মূলত Dracul-এর পুত্র

ভ্লাদের শাসনকাল ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের জটিল ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সময়। তিনি ওয়ালাকিয়ার সিংহাসন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং অটোমানদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন। তাঁর সবচেয়ে কুখ্যাত পরিচয় এসেছে শত্রু ও অপরাধীদের শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য। সমসাময়িক ও পরবর্তী বিভিন্ন প্রচারপুস্তিকা তাঁর নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ বিবরণ ছড়িয়ে দেয়, যদিও এসব বিবরণের কিছু অংশ রাজনৈতিক প্রচারণা ও অতিরঞ্জনের প্রভাবেও গড়ে উঠেছিল।

কিন্তু ভ্লাদ তৃতীয় ব্রান ক্যাসেলে বসবাস করতেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র ছিল ওয়ালাকিয়া। ব্রান দুর্গের সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে বিভিন্ন দাবি রয়েছে, কিন্তু সেগুলো থেকে এটিকে তাঁর ব্যক্তিগত দুর্গ বা প্রধান বাসস্থান বলা যায় না। এমনকি তিনি কোনো সময় অল্প সময়ের জন্য এখানে বন্দি ছিলেন—এই জনপ্রিয় দাবিটিও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।

ভ্লাদের সঙ্গে বেশি দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত দুর্গগুলোর মধ্যে পোয়েনারি দুর্গ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওয়ালাকিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এই দুর্গের সঙ্গে ভ্লাদের বাস্তব সামরিক ইতিহাসের সম্পর্ক ব্রানের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। অথচ পর্যটন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে পোয়েনারির চেয়ে ব্রানই “ড্রাকুলার দুর্গ” হিসেবে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হয়েছে।

এর কারণ খুঁজতে গেলে পৌঁছাতে হয় উনিশ শতকের শেষভাগের আয়ারল্যান্ডে। ১৮৯৭ সালে ব্রাম স্টোকার প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত গথিক উপন্যাস Dracula উপন্যাসের কাউন্ট ড্রাকুলা ট্রান্সিলভানিয়ার একটি দুর্গে বসবাসকারী অতিপ্রাকৃত ভ্যাম্পায়ার। চরিত্রটি শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকে, মানুষের রক্ত পান করে এবং পরে ইংল্যান্ডে আতঙ্ক ছড়ায়।

ব্রাম স্টোকার নিজে রোমানিয়া সফর করেছিলেন—এমন প্রমাণ নেই। তিনি বই, মানচিত্র এবং বিভিন্ন লিখিত উৎস ব্যবহার করে ট্রান্সিলভানিয়ার পরিবেশ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর উপন্যাসে বর্ণিত কাউন্ট ড্রাকুলার দুর্গের অবস্থান ও গঠন বাস্তব ব্রান ক্যাসেলের সঙ্গে সরাসরি মেলে না। স্টোকার ব্রান ক্যাসেলকে তাঁর ড্রাকুলার বাসস্থান হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন—এমন নির্ভরযোগ্য দলিলও নেই।

তাহলে ব্রান কীভাবে ড্রাকুলার দুর্গ হয়ে গেল?

এর একটি বড় কারণ হলো দুর্গটির দৃশ্যগত চরিত্র। খাড়া পাথরের ওপর দাঁড়ানো মধ্যযুগীয় টাওয়ার, কার্পাথিয়ান পাহাড়, ঘন বন এবং ট্রান্সিলভানিয়ার অবস্থান—ড্রাকুলাকে ঘিরে আধুনিক মানুষের কল্পনার সঙ্গে এটি অসাধারণভাবে মানিয়ে যায়। চলচ্চিত্র, পর্যটন প্রচার এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ব্রানকে কাল্পনিক ড্রাকুলার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। ইতিহাসের তুলনায় দৃশ্যমান গল্পটি এত শক্তিশালী ছিল যে “ড্রাকুলার ক্যাসেল” পরিচয় বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

কিন্তু ড্রাকুলার কিংবদন্তির বাইরে ব্রান ক্যাসেলের নিজের ইতিহাস অনেক বেশি সমৃদ্ধ। মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের শুরুতে দুর্গটি ট্রান্সিলভানিয়া ও ওয়ালাকিয়ার সীমান্ত অঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সীমান্ত ও সামরিক প্রযুক্তি বদলে যাওয়ায় এর প্রতিরক্ষামূলক গুরুত্ব কমতে থাকে।

দুর্গের মালিকানা ও প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় এটি ব্রাশভ শহরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক ক্ষয়, অগ্নিকাণ্ড এবং সংস্কারের কারণে দুর্গটির স্থাপত্যও বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আজ যে ব্রান ক্যাসেল দেখা যায়, সেটিকে সরাসরি চতুর্দশ শতকের অপরিবর্তিত দুর্গ মনে করা ঠিক নয়।

এর ইতিহাসে নতুন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। ট্রান্সিলভানিয়া রোমানিয়ার অংশ হওয়ার পর ১৯২০ সালে ব্রাশভ শহর ব্রান ক্যাসেলটি রোমানিয়ার রানি মারিকে উপহার দেয়। এখান থেকেই দুর্গটি মধ্যযুগীয় সীমান্ত ঘাঁটি থেকে আধুনিক রাজকীয় বাসভবনে নতুন পরিচয় লাভ করে।

রানি মারি ছিলেন আধুনিক রোমানিয়ার ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত রাজকীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং রোমানিয়ার রাজা প্রথম ফের্দিনান্দের স্ত্রী ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা এবং যুদ্ধোত্তর রোমানিয়ার আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার কারণে তিনি দেশে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

ব্রান ক্যাসেল ছিল রানি মারির প্রিয় বাসস্থানগুলোর একটি। তাঁর সময় দুর্গের ভেতরকে আরও আরামদায়ক রাজকীয় আবাসে রূপ দেওয়া হয়। স্থপতি কারেল লিমান দুর্গটির পুনর্গঠন ও আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিদ্যুৎ, পানি এবং আধুনিক জীবনযাত্রার বিভিন্ন সুবিধা যোগ করা হলেও মধ্যযুগীয় চরিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।

রানি মারির প্রভাব ব্রানের বর্তমান পরিবেশে গভীর। দুর্গের কক্ষ, আসবাব এবং সাজসজ্জায় যে উষ্ণ রাজকীয় আবাসিক চরিত্র দেখা যায়, তার বড় অংশ ড্রাকুলা নয়, রোমানিয়ার রাজপরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। এই বাস্তব ইতিহাস জনপ্রিয় ভ্যাম্পায়ার কিংবদন্তির আড়ালে প্রায়ই চাপা পড়ে যায়।

১৯৩৮ সালে রানি মারির মৃত্যুর পর দুর্গটি তাঁর কন্যা প্রিন্সেস ইলিয়ানার কাছে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইলিয়ানা মানবিক ও চিকিৎসাসেবামূলক কাজে সক্রিয় ছিলেন এবং ব্রান অঞ্চলেও তাঁর কার্যক্রম ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর রোমানিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমূল বদলে যায়।

১৯৪৭ সালে রাজা প্রথম মিহাইকে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং রোমানিয়ায় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে ব্রান ক্যাসেল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রাজপরিবারের সদস্যরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং দুর্গটি পরে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

কমিউনিস্ট শাসনের পতনের বহু বছর পর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্গটি প্রিন্সেস ইলিয়ানার উত্তরাধিকারীদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে এটি ঐতিহাসিক জাদুঘর ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হতে থাকে। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্রানে আসেন—অনেকেই প্রথমে ড্রাকুলার গল্পে আকৃষ্ট হয়ে, পরে দুর্গটির বাস্তব ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।

ব্রান ক্যাসেলের অভ্যন্তরও হলিউডের ড্রাকুলা চলচ্চিত্রে দেখা বিশাল অন্ধকার প্রাসাদের মতো নয়। এখানে রয়েছে ছোট ও মাঝারি আকারের কক্ষ, কাঠের ছাদ, সরু সিঁড়ি, অভ্যন্তরীণ আঙিনা এবং বিভিন্ন স্তরকে যুক্ত করা করিডর। দুর্গের একটি বিখ্যাত সরু গোপন সিঁড়ি দীর্ঘ সময় আড়ালে ছিল এবং পরে সংস্কারের সময় পুনরাবিষ্কৃত হয়। এসব বৈশিষ্ট্য দুর্গটিকে রহস্যময় অনুভূতি দিলেও সেগুলোর বাস্তব উদ্দেশ্য ছিল মধ্যযুগীয় ও পরবর্তী যুগের স্থাপত্যিক প্রয়োজন।

ব্রানের গল্প তাই ইতিহাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে তার অসাধারণ উদাহরণ। ভ্লাদ দ্য ইমপেলার ছিলেন বাস্তব মানুষ, কিন্তু তিনি ভ্যাম্পায়ার ছিলেন না। কাউন্ট ড্রাকুলা একটি সাহিত্যিক চরিত্র, কিন্তু তাঁর দুর্গ ব্রান ছিল না। আর ব্রান ক্যাসেল বাস্তব দুর্গ, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটিকে ভ্লাদের প্রধান বাসস্থান বলা যায় না। এই তিনটি সত্য আলাদা করলেই ড্রাকুলার দুর্গের রহস্য অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায়।

তবুও ড্রাকুলার কিংবদন্তিকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক বলা যায় না। কিংবদন্তিটিই ব্রানকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করেছে এবং ট্রান্সিলভানিয়ার গথিক কল্পচিত্রের সঙ্গে দুর্গটির নাম স্থায়ীভাবে যুক্ত করেছে। বাস্তব ইতিহাসের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লোককথা ও সাহিত্যিক কল্পনাকে ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ না করে দুটিকে পাশাপাশি বোঝা।

কার্পাথিয়ান পাহাড়ের কুয়াশার মধ্যে ব্রান ক্যাসেল আজও এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে তাকে ঘিরে ড্রাকুলার গল্প কেন এত জনপ্রিয় হয়েছে, তা বুঝতে কষ্ট হয় না। কিন্তু দুর্গটির সত্যিকারের ইতিহাস কাল্পনিক ভ্যাম্পায়ারের গল্পের চেয়েও দীর্ঘ ও বহুস্তরীয়। চতুর্দশ শতকের সীমান্ত প্রতিরক্ষা, স্যাক্সন বণিকদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, ট্রান্সিলভানিয়া ও ওয়ালাকিয়ার রাজনৈতিক সম্পর্ক, রোমানিয়ার রানি মারির রাজকীয় জীবন এবং বিংশ শতকের রাজনৈতিক পরিবর্তন—সবই এর দেয়ালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

তাই ব্রান ক্যাসেলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রহস্য সম্ভবত কোনো অন্ধকার কক্ষে লুকিয়ে থাকা ভ্যাম্পায়ার নয়। বরং একটি বাস্তব মধ্যযুগীয় সীমান্ত দুর্গ কীভাবে এমন এক কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেল, যে চরিত্রের স্রষ্টা দুর্গটিকে তাঁর গল্পের বাসস্থান হিসেবেই নির্দিষ্ট করেননি—সেই রূপান্তরই ব্রানের সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্প। ড্রাকুলার কিংবদন্তি মানুষকে ব্রানের দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসে, কিন্তু দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলে অপেক্ষা করে রোমানিয়ার সম্পূর্ণ ভিন্ন, বাস্তব এবং আরও গভীর ইতিহাস।


আপনার পছন্দ হতে পারে