বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ের সংঘর্ষ হলে পৃথিবীর কী হবে? দুই ছায়াপথের মহাজাগতিক ভবিষ্যৎ

অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ের সংঘর্ষ হলে পৃথিবীর কী হবে? দুই ছায়াপথের মহাজাগতিক ভবিষ্যৎ
অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ের মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

রাতের পরিষ্কার আকাশে আমরা যে অসংখ্য নক্ষত্র দেখি, তার প্রায় সবই আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কিওয়ের অংশ। এই বিশাল নক্ষত্রজগতের মধ্যেই রয়েছে সূর্য, পৃথিবী এবং আমাদের পুরো সৌরজগৎ। কিন্তু মিল্কিওয়ে মহাবিশ্বে একা নয়। আমাদের কাছাকাছি আরেকটি বিশাল সর্পিল ছায়াপথ রয়েছে—অ্যান্ড্রোমিডা। বর্তমানে এটি পৃথিবী থেকে প্রায় পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। এত দূরে থাকা সত্ত্বেও অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের মহাজাগতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, কারণ মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রোমিডা পরস্পরের মহাকর্ষীয় প্রভাবে আবদ্ধ।

দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করে আসছেন, কয়েকশ কোটি বছরের মধ্যে এই দুই বিশাল ছায়াপথ একে অপরের অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর ছায়াপথে পরিণত হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সূক্ষ্ম পরিমাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—আগের ধারণার তুলনায় সরাসরি সংঘর্ষের ভবিষ্যৎ কিছুটা বেশি অনিশ্চিত। অ্যান্ড্রোমিডার পাশ দিয়ে মিল্কিওয়ে কতটা কাছ দিয়ে যাবে, তাদের পার্শ্বগত গতি কত এবং স্থানীয় ছায়াপথগোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যের মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করবে—এসবের ওপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ফলে “অ্যান্ড্রোমিডা নিশ্চিতভাবেই একটি নির্দিষ্ট সময়ে মিল্কিওয়ের সঙ্গে ধাক্কা খাবে”—এভাবে বিষয়টিকে দেখা ঠিক নয়। বরং সম্ভাব্য অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎ এবং দীর্ঘমেয়াদি একীভবন হিসেবে ঘটনাটিকে বোঝা বেশি যথার্থ।

এখানে “সংঘর্ষ” শব্দটি শুনে পৃথিবীর সঙ্গে কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রের প্রচণ্ড ধাক্কার দৃশ্য কল্পনা করা স্বাভাবিক। কিন্তু ছায়াপথের সংঘর্ষ মোটেও দুটি কঠিন বস্তুর সংঘর্ষের মতো নয়। একটি ছায়াপথের অধিকাংশ অংশই কার্যত শূন্য স্থান। মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রোমিডা প্রত্যেকটিতে বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র থাকলেও একটি নক্ষত্র থেকে আরেকটির মধ্যকার দূরত্ব এত বিশাল যে দুই ছায়াপথ পরস্পরের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় দুটি নক্ষত্রের সরাসরি ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

সূর্যের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রও আমাদের থেকে চার আলোকবর্ষের বেশি দূরে। অথচ একটি নক্ষত্রের প্রকৃত ব্যাস সেই দূরত্বের তুলনায় নগণ্য। বিষয়টিকে কল্পনা করতে গেলে মনে রাখতে হবে, ছায়াপথকে আমরা ছবিতে ঘন উজ্জ্বল বস্তু হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এর নক্ষত্রগুলো বিশাল শূন্যতার মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। তাই অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ে একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করলেও অধিকাংশ নক্ষত্র কোনো কিছুর সঙ্গে সরাসরি ধাক্কা না খেয়েই অতিক্রম করবে।

তাহলে সংঘর্ষটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ নক্ষত্রগুলোর সরাসরি ধাক্কার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে মহাকর্ষ। দুটি বিশাল ছায়াপথ কাছাকাছি এলে তাদের সম্মিলিত মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র একে অপরের আকৃতি বদলে দিতে শুরু করবে। মিল্কিওয়ের পরিচিত চাকতির গঠন বিকৃত হতে পারে, অ্যান্ড্রোমিডার সর্পিল বাহুগুলোও প্রসারিত ও বেঁকে যেতে পারে। বিপুলসংখ্যক নক্ষত্র নতুন কক্ষপথে চলে যাবে। কিছু নক্ষত্র ছায়াপথের বাইরের অঞ্চলে ছিটকে যেতে পারে, আবার কিছু কেন্দ্রীয় অঞ্চলের দিকে চলে আসতে পারে।

দুই ছায়াপথের কাছাকাছি আসার সময় দীর্ঘ নাক্ষত্রিক স্রোত সৃষ্টি হতে পারে। মহাকর্ষের টানে ছায়াপথের বাইরের অংশ থেকে নক্ষত্র, গ্যাস ও ধূলি টেনে বেরিয়ে বিশাল লেজের মতো কাঠামো তৈরি হতে পারে। দূর থেকে দেখলে পুরো ঘটনাটি সম্ভবত মহাবিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় দৃশ্য হবে। কিন্তু এর সময়কাল মানুষের পরিচিত কোনো বিপর্যয়ের মতো কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন বা কয়েক বছরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ছায়াপথের এই পরিবর্তন ঘটবে কোটি কোটি বছরের সময়সীমায়।

পৃথিবী যদি তখনও বর্তমান অবস্থায় থাকত এবং কোনো পর্যবেক্ষক রাতের আকাশ দেখতে পারত, তাহলে আকাশের চেহারা আজকের তুলনায় অকল্পনীয়ভাবে আলাদা হতে পারত। বর্তমানে অ্যান্ড্রোমিডা অন্ধকার আকাশে খালি চোখে একটি ক্ষীণ আলোকচ্ছটা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু দুই ছায়াপথ কাছাকাছি আসতে থাকলে অ্যান্ড্রোমিডা ক্রমে বড় হতে থাকবে। একসময় এর উজ্জ্বল কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং বিস্তৃত নাক্ষত্রিক কাঠামো আকাশের বিশাল অংশজুড়ে দৃশ্যমান হতে পারত।

আরও কাছাকাছি অবস্থায় পৃথিবীর আকাশে দুটি ছায়াপথের বিকৃত নক্ষত্রস্রোত, ধূলির অঞ্চল এবং নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির উজ্জ্বল এলাকা দেখা যেতে পারত। রাতের আকাশে পরিচিত মিল্কিওয়ের আলোকিত রেখাটিও বর্তমান রূপ হারিয়ে ফেলত। তবে এই পরিবর্তন মানুষের চোখে প্রতিদিন দৃশ্যমান গতিতে ঘটত না। একটি মানবজীবনের তুলনায় ঘটনাটি এত ধীর যে আকাশকে প্রায় স্থির বলেই মনে হতো।

পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই মহাজাগতিক ঘটনায় সৌরজগত কি তার বর্তমান অবস্থানে থাকবে? এর উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। দুই ছায়াপথের মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়ায় সূর্যের ছায়াপথীয় কক্ষপথ বদলে যেতে পারে। বর্তমানে সূর্য মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। ভবিষ্যতের ঘনিষ্ঠ মিথস্ক্রিয়ায় সূর্য ও তার আশপাশের নক্ষত্রগুলো নতুন কক্ষপথে চলে যেতে পারে।

সৌরজগৎ মিল্কিওয়ের বর্তমান অঞ্চল থেকে আরও বাইরের দিকে সরে যেতে পারে। আবার একীভূত ছায়াপথের অন্য কোনো অঞ্চলেও এর স্থান হতে পারে। খুব বিরল পরিস্থিতিতে কোনো নক্ষত্র ছায়াপথের অনেক দূরের প্রান্তে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। কিন্তু সৌরজগতের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়া আর পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়া একই বিষয় নয়। সূর্যের মহাকর্ষ পৃথিবীসহ গ্রহগুলোকে শক্তভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে। পুরো সৌরজগতের ওপর বাইরের মহাকর্ষীয় পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে ধীরে কাজ করলে গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে তাদের নিজস্ব কক্ষপথ ধরে রাখতে পারে।

অর্থাৎ মিল্কিওয়ে ও অ্যান্ড্রোমিডার ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতের মুহূর্তে পৃথিবী হঠাৎ সূর্যের কক্ষপথ থেকে ছিটকে যাবে—এমনটি প্রত্যাশিত ফল নয়। ছায়াপথীয় মহাকর্ষ সূর্যের পুরো ব্যবস্থাটিকেই নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সৌরজগতের ভেতরের শক্তিশালী মহাকর্ষীয় বন্ধন ভেঙে দেওয়া অনেক কঠিন।

তবে একটি কাছাকাছি নক্ষত্রের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎ ঘটলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। অন্য কোনো নক্ষত্র সৌরজগতের খুব কাছ দিয়ে গেলে তার মহাকর্ষ দূরবর্তী ধূমকেতু ও বরফময় বস্তুগুলোর কক্ষপথ পরিবর্তন করতে পারে। সৌরজগতের বহুদূরের বরফময় অঞ্চল থেকে কিছু বস্তু ভেতরের দিকে পাঠানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ছায়াপথের একীভবন ঘটলেই এমন একটি নক্ষত্র নিশ্চিতভাবে সূর্যের খুব কাছে চলে আসবে—এমন কোনো কারণ নেই।

দুই ছায়াপথের গ্যাসমেঘগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নক্ষত্রের তুলনায় আলাদা। গ্যাস বিশাল অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। ফলে দুটি ছায়াপথ পরস্পরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় গ্যাসীয় অঞ্চলগুলো সংকুচিত ও আলোড়িত হতে পারে। এই সংকোচন নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির হার বাড়াতে পারে। মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে অল্প সময়ের জন্য একীভূত ব্যবস্থার কিছু অঞ্চলে অসংখ্য নতুন নক্ষত্র জন্ম নিতে পারে।

নতুন বৃহৎ নক্ষত্রের জন্ম মানে ভবিষ্যতে আরও অতিনবতারা বিস্ফোরণের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে পৃথিবীর ক্ষতি করার জন্য একটি অতিনবতারাকে সৌরজগতের যথেষ্ট কাছাকাছি ঘটতে হবে। শুধু ছায়াপথে অতিনবতারার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই পৃথিবী বিপজ্জনক বিকিরণে আক্রান্ত হবে, এমন নয়। এখানে দূরত্বই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ে যদি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে একীভূত হয়, তাহলে কয়েকবার কাছাকাছি আসা ও দূরে সরে যাওয়ার পর তাদের পৃথক পরিচিত আকৃতি হারিয়ে যেতে পারে। মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া ধীরে ধীরে দুটি ব্যবস্থাকে একটি বৃহৎ ছায়াপথে পরিণত করতে পারে। জনপ্রিয় বিজ্ঞান আলোচনায় এই ভবিষ্যৎ একীভূত ছায়াপথকে কখনো কখনো মিল্কোমিডা নামে ডাকা হয়। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নাম নয়।

দুটি ছায়াপথের কেন্দ্রে রয়েছে অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর। মিল্কিওয়ের কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরের নাম স্যাজিটারিয়াস এ-স্টার। অ্যান্ড্রোমিডার কেন্দ্রেও আরও ভারী একটি কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে। ছায়াপথ দুটি একীভূত হলে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তাদের কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরগুলোও কাছাকাছি আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত তারা যুগল ব্যবস্থা তৈরি করে পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে একীভূত হতে পারে এবং শক্তিশালী মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে।

এতে পৃথিবীকে কৃষ্ণগহ্বর গিলে ফেলবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। সৌরজগৎ ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে বহু দূরে রয়েছে। একটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের প্রভাব তার আশপাশে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও সেটি দূরের সব নক্ষত্রকে নির্বিচারে নিজের মধ্যে টেনে নেয় না। একটি ছায়াপথ নিজেই কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে পড়ে যায় না; নক্ষত্রগুলো ছায়াপথের সামগ্রিক ভরের মহাকর্ষীয় প্রভাবে কক্ষপথে চলতে থাকে।

কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে আশ্চর্য দিক হলো, অ্যান্ড্রোমিডা হয়তো পৃথিবীর ভবিষ্যতের প্রধান বিপদই নয়। কারণ এই মহাজাগতিক ঘটনা পূর্ণমাত্রায় ঘটার আগেই সূর্য নিজেই পৃথিবীকে আজকের প্রাণের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল করে তুলতে পারে।

সূর্যের বয়স বর্তমানে প্রায় চারশ ষাট কোটি বছর। এটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে এর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরির প্রক্রিয়ার ফলে দীর্ঘ সময়ে এর অভ্যন্তরীণ গঠন বদলায়। এর সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের শক্তি বিকিরণের পরিমাণও বাড়ে। ফলে আজ থেকে প্রায় একশ কোটি বছর পর পৃথিবী বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সৌরশক্তি পেতে পারে।

এটি পৃথিবীর জীবনের জন্য অ্যান্ড্রোমিডার চেয়েও অনেক আগে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাষ্পীভবন বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘ সময়ে কার্বনচক্র, বায়ুমণ্ডল এবং মহাসাগরের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। একপর্যায়ে জটিল প্রাণের জন্য পৃথিবী অত্যন্ত প্রতিকূল হয়ে উঠতে পারে। আরও দীর্ঘ সময়ে সমুদ্রের বিশাল অংশ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অর্থাৎ অ্যান্ড্রোমিডা যখন আকাশে বিশাল হয়ে উঠবে, তখন আজকের মতো নীল সমুদ্র, সবুজ বন এবং প্রাণসমৃদ্ধ পৃথিবী আদৌ থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। মানুষ বা মানুষের উত্তরসূরি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণ তখন পৃথিবীতে থাকবে কি না, তা তো আরও অনিশ্চিত। কয়েকশ কোটি বছর এমন একটি সময়সীমা, যার তুলনায় মানবসভ্যতার পুরো লিখিত ইতিহাস প্রায় একটি মুহূর্তের সমান।

এরপর সূর্যের নিজের জীবনের আরও নাটকীয় অধ্যায় আসবে। প্রায় পাঁচশ কোটি বছরের কাছাকাছি ভবিষ্যতে সূর্য তার কেন্দ্রীয় হাইড্রোজেন জ্বালানির বড় অংশ শেষ করে বর্তমান প্রধান-পর্যায়ের অবস্থা ছেড়ে ধীরে ধীরে লাল দানব পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তখন সূর্যের আকার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং অভ্যন্তরীণ সৌরজগতের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

বুধ ও শুক্রের ভবিষ্যৎ তখন অত্যন্ত বিপজ্জনক। পৃথিবী সূর্যের প্রসারণে সরাসরি গ্রাস হবে কি না, তা সূর্যের ভর হারানো, পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন এবং সূর্যের বাইরের স্তরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু একটি বিষয় অনেক বেশি নিশ্চিত—লাল দানব পর্যায় আসার বহু আগেই পৃথিবীর বর্তমান জীবনধারণযোগ্য পরিবেশ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা।

এই কারণেই “অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ের সংঘর্ষে পৃথিবী ধ্বংস হবে কি?” প্রশ্নটির বৈজ্ঞানিক উত্তর কিছুটা বিস্ময়কর। ছায়াপথের সংঘর্ষ নিজে পৃথিবীর জন্য সরাসরি ধ্বংসাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। পৃথিবী কোনো অ্যান্ড্রোমিডার নক্ষত্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হবে—এমন দৃশ্য সিনেমার জন্য আকর্ষণীয় হলেও বাস্তব জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রত্যাশিত চিত্র নয়।

বরং সৌরজগৎ বিশাল মহাকর্ষীয় পরিবর্তনের মধ্যেও একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা হিসেবে টিকে যেতে পারে। সূর্যের ছায়াপথীয় ঠিকানা বদলে যেতে পারে, রাতের আকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে পারে এবং মিল্কিওয়ের পরিচিত সর্পিল কাঠামো বিলুপ্ত হতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি ভাগ্য নির্ধারণে সূর্যের বিবর্তন সম্ভবত ছায়াপথের সংঘর্ষের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। সংবাদ বা চলচ্চিত্রে “দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষ” কথাটি শুনলে মনে হয় একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটবে। বাস্তবে ছায়াপথের একীভবন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্রথম ঘনিষ্ঠ অতিক্রমের পর দুটি ছায়াপথ আবার দূরে সরে যেতে পারে। তারপর পারস্পরিক মহাকর্ষ আবার তাদের কাছে আনতে পারে। প্রতিবারই তাদের গঠন আরও বিকৃত হবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা একটি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল বৃহৎ ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।

এই প্রক্রিয়ায় আমাদের পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডলগুলোর চেহারাও আর থাকবে না। অবশ্য অ্যান্ড্রোমিডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করারও দরকার নেই—নক্ষত্রগুলোর নিজস্ব গতির কারণে কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ বছরেই বর্তমান নক্ষত্রমণ্ডলের আকৃতি ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। কয়েকশ কোটি বছর পরে আজকের পরিচিত আকাশের মানচিত্রের সঙ্গে ভবিষ্যতের আকাশের প্রায় কোনো মিলই থাকবে না।

যদি কল্পনা করা যায় যে কোনোভাবে একটি পর্যবেক্ষক সেই সুদূর ভবিষ্যতের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছে, তার রাতের আকাশ মানব ইতিহাসের দেখা যেকোনো আকাশের চেয়ে নাটকীয় হতে পারে। অ্যান্ড্রোমিডার বিশাল নাক্ষত্রিক চাকতি আকাশজুড়ে প্রসারিত, মিল্কিওয়ের গঠন বিকৃত, দীর্ঘ নাক্ষত্রিক স্রোত চারদিকে ছড়িয়ে আছে এবং নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির অঞ্চল উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। লক্ষ লক্ষ বছরের ব্যবধানে সেই দৃশ্যও বদলে যাবে।

তবে সেই পর্যবেক্ষকের সামনে হয়তো নীল সমুদ্র থাকবে না, শ্বাস নেওয়ার মতো বর্তমান বায়ুমণ্ডল থাকবে না এবং পৃথিবী সম্ভবত আজকের মতো জীবন্ত গ্রহও থাকবে না। মহাবিশ্বের এই বিশাল ঘটনাকে তাই পৃথিবীর সম্ভাব্য ধ্বংসের গল্পের চেয়ে সময়ের বিশালতার গল্প হিসেবে দেখা বেশি অর্থবহ।

আমরা এমন একটি গ্রহে বাস করছি, যা একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে; সেই নক্ষত্র আবার একটি বিশাল ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে; সেই ছায়াপথ আবার আরও বহু ছায়াপথের সঙ্গে মহাকর্ষীয়ভাবে সম্পর্কিত। পৃথিবীকে স্থির মনে হলেও মহাজাগতিক尺度ে কিছুই সত্যিকার অর্থে স্থির নয়। নক্ষত্র জন্মায় ও মারা যায়, ছায়াপথের আকৃতি বদলে যায়, ছায়াপথ পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় এবং মহাবিশ্ব ক্রমাগত বিবর্তিত হয়।

অ্যান্ড্রোমিডা ও মিল্কিওয়ের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ একীভবন সেই বিবর্তনেরই একটি অসাধারণ উদাহরণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ছায়াপথও চিরস্থায়ী নয়। আজ আমরা যে মিল্কিওয়েকে নিজের মহাজাগতিক ঠিকানা বলে জানি, সুদূর ভবিষ্যতে তার বর্তমান রূপ আর নাও থাকতে পারে।

পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্য তাই কোনো আকস্মিক মহাজাগতিক বিস্ফোরণ নয়। যদি পৃথিবী ও সৌরজগৎ সেই সময় পর্যন্ত অস্তিত্বশীল থাকে, তবে তারা একটি ধীরে বদলে যাওয়া মহাকাশের সাক্ষী হতে পারে—যেখানে আকাশে অ্যান্ড্রোমিডা ক্রমে বিশাল হয়েছে, দুই ছায়াপথের নক্ষত্রগুলো নতুন কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমাদের সূর্য একটি সম্পূর্ণ নতুন ছায়াপথীয় পরিবেশের অংশ হয়ে গেছে।

কিন্তু পৃথিবীর জীবনের ঘড়ি অন্য গতিতে চলছে। অ্যান্ড্রোমিডার সঙ্গে মিল্কিওয়ের মহাজাগতিক নৃত্য সম্পূর্ণ হওয়ার অনেক আগেই সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা আমাদের গ্রহের পরিবেশকে আমূল বদলে দিতে পারে। তাই অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের দিকে এগিয়ে আসার গল্প যতটা না পৃথিবীর আসন্ন ধ্বংসের গল্প, তার চেয়ে অনেক বেশি এটি মহাবিশ্বের বিশাল সময়, পরিবর্তনশীল ছায়াপথ এবং আমাদের ক্ষুদ্র অথচ অসাধারণ পৃথিবীর মহাজাগতিক অবস্থানের গল্প।


আপনার পছন্দ হতে পারে