বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লেজার কীভাবে কাজ করে এবং সাধারণ আলো থেকে এটি এত আলাদা কেন? আলোর বিস্ময়কর বিজ্ঞানের সহজ ব্যাখ্যা

লেজার কীভাবে কাজ করে এবং সাধারণ আলো থেকে এটি এত আলাদা কেন? আলোর বিস্ময়কর বিজ্ঞানের সহজ ব্যাখ্যা
একই আলো, কিন্তু অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ—লেজারের বিজ্ঞান

রাতে একটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালালে তার আলো ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একটি টর্চ জ্বালালে আলোকে কিছুটা নির্দিষ্ট দিকে পাঠানো যায়, কিন্তু দূরে যেতে যেতে সেই আলোকরশ্মিও ক্রমে প্রশস্ত হয়ে যায়। অথচ একটি লেজার নির্দেশকের ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু অনেক দূরের দেয়ালেও তুলনামূলকভাবে ছোট ও উজ্জ্বল দেখা যায়। আরও শক্তিশালী লেজার দিয়ে ধাতু কাটা যায়, চোখের সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচার করা যায়, অত্যন্ত নির্ভুলভাবে দূরত্ব মাপা যায়, আবার আলোকতন্তুর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্যও পাঠানো যায়। লেজারও আলো, কিন্তু এর আলো এমনভাবে উৎপন্ন ও নিয়ন্ত্রিত হয় যে সাধারণ আলোর তুলনায় এর আচরণ অনেক বেশি সুশৃঙ্খল।

আলোকে বোঝার জন্য প্রথমে ফোটনের ধারণাটি জানা দরকার। আলো একদিকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের মতো আচরণ করে, অন্যদিকে শক্তির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঞ্জ হিসেবেও আচরণ করে। এই শক্তিপুঞ্জকে ফোটন বলা হয়। একটি ফোটনের শক্তি তার কম্পাঙ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। কম্পাঙ্ক যত বেশি, ফোটনের শক্তিও তত বেশি। দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন রং আসলে বিভিন্ন কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তুলনামূলক বেশি, আর বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তুলনামূলক কম।

সাধারণ বাতির আলো তৈরির প্রক্রিয়া বেশ বিশৃঙ্খল। উত্তপ্ত বস্তু, বৈদ্যুতিক বাতি কিংবা অনেক ধরনের আলোকউৎসে বিপুলসংখ্যক পরমাণু বা অণু স্বাধীনভাবে আলো নির্গত করে। কোন কণা ঠিক কখন ফোটন ছাড়বে, কোন দিকে ছাড়বে এবং নির্গত তরঙ্গের দশা কী হবে—এসবের মধ্যে সাধারণত সুসংগঠিত সম্পর্ক থাকে না। ফলে আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমষ্টি হিসেবে বের হয়।

লেজারের মূল রহস্য এখানেই। লেজারে আলোকে শুধু উৎপন্ন করা হয় না; এমন একটি ভৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোকে বর্ধিত করা হয় যাতে উৎপন্ন ফোটনগুলোর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী সামঞ্জস্য তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে পরমাণু বা অণুর শক্তিস্তর এবং “উদ্দীপিত বিকিরণ” নামে পরিচিত একটি বিশেষ ঘটনা।

একটি পরমাণুর ইলেকট্রন ইচ্ছামতো যেকোনো শক্তি ধারণ করতে পারে না। পরমাণুর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত শক্তিস্তর থাকে। একটি ইলেকট্রন যদি বাইরের কোনো উৎস থেকে যথেষ্ট শক্তি গ্রহণ করে, তবে সেটি নিম্ন শক্তিস্তর থেকে উচ্চ শক্তিস্তরে যেতে পারে। এই অবস্থাকে উত্তেজিত অবস্থা বলা হয়। তবে উত্তেজিত অবস্থা সাধারণত স্থায়ী নয়। কিছু সময় পরে ইলেকট্রন আবার নিম্ন শক্তিস্তরে ফিরে আসে এবং দুই শক্তিস্তরের পার্থক্যের সমান শক্তি একটি ফোটন হিসেবে নির্গত হতে পারে।

এই স্বাভাবিকভাবে ঘটে যাওয়া আলো নির্গমনকে স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণ বলা হয়। এখানে কখন ফোটন বের হবে এবং কোন দিকে যাবে, তা নিয়ন্ত্রিত নয়। সাধারণ আলোর অনেক উৎসে এ ধরনের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু লেজারের জন্য শুধু এই প্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়।

ধরা যাক, একটি পরমাণুর ইলেকট্রন ইতিমধ্যে উত্তেজিত অবস্থায় রয়েছে। ঠিক সেই সময় এমন শক্তির একটি ফোটন পরমাণুটির কাছে এল, যার শক্তি উত্তেজিত ও নিম্ন শক্তিস্তরের ব্যবধানের সঙ্গে মিলে যায়। বিশেষ পরিস্থিতিতে আগত ফোটনটি উত্তেজিত পরমাণুকে নিম্ন শক্তিস্তরে ফিরে যেতে প্ররোচিত করতে পারে। তখন পরমাণুটি আরেকটি ফোটন নির্গত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ফোটনটি উদ্দীপক ফোটনের সঙ্গে একই কম্পাঙ্ক, একই দিক এবং নির্দিষ্ট দশাসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারে। এটাই উদ্দীপিত বিকিরণ।

ফলে শুরুতে একটি উপযুক্ত ফোটন থাকলে সেটি আরেকটি অনুরূপ ফোটন সৃষ্টি করতে সাহায্য করতে পারে। এরপর এই দুই ফোটন আরও উত্তেজিত পরমাণুর সঙ্গে ক্রিয়া করে আরও ফোটন তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে এভাবে আলোর তীব্রতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। লেজারের নামের ধারণাটিও মূলত উদ্দীপিত বিকিরণের মাধ্যমে আলো বর্ধনের এই নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে বাস্তবে একটি লেজার তৈরি করতে শুধু কয়েকটি উত্তেজিত পরমাণু যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সক্রিয় মাধ্যম। এটি কঠিন পদার্থ, গ্যাস, তরল, অর্ধপরিবাহী কিংবা বিশেষ ধরনের আলোকতন্তুও হতে পারে। লেজারের ধরন অনুযায়ী এই মাধ্যম পরিবর্তিত হয়। সক্রিয় মাধ্যমের পরমাণু, অণু বা অন্যান্য শক্তিবাহক অবস্থাগুলোই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত আলো তৈরির কাজে অংশ নেয়।

সক্রিয় মাধ্যমকে প্রথমে বাইরে থেকে শক্তি দিতে হয়। এই শক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়াকে শক্তি সঞ্চালন বলা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক প্রবাহ, আলোকঝলক, অন্য একটি লেজার কিংবা রাসায়নিক বিক্রিয়া—বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই শক্তি দেওয়া সম্ভব। উদ্দেশ্য হলো সক্রিয় মাধ্যমের যথেষ্টসংখ্যক কণাকে উচ্চ শক্তিস্তরে নিয়ে যাওয়া।

এখানে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় নিম্ন শক্তিস্তরে থাকা কণার সংখ্যা বেশি থাকে। কিন্তু কার্যকর লেজার ক্রিয়ার জন্য এমন অবস্থা দরকার, যেখানে লেজার ক্রিয়ায় অংশ নেওয়া উচ্চ শক্তিস্তরে কণার সংখ্যা সংশ্লিষ্ট নিম্ন শক্তিস্তরের তুলনায় বেশি হয়। এই অবস্থাকে জনসংখ্যা বিপর্যাস বলা হয়। এটি তৈরি না হলে আগত ফোটন নতুন ফোটন তৈরির চেয়ে মাধ্যমের দ্বারা শোষিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি হতে পারে।

জনসংখ্যা বিপর্যাস তৈরি হওয়ার পর সক্রিয় মাধ্যমের কোনো একটি উত্তেজিত কণা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি উপযুক্ত ফোটন ছেড়ে দিতে পারে। সেই ফোটন অন্য উত্তেজিত কণাকে উদ্দীপিত করে দ্বিতীয় ফোটন সৃষ্টি করতে পারে। তারপর এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। কিন্তু আলোকে আরও শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল করার জন্য লেজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা থাকে—আলোকগহ্বর।

সাধারণ একটি লেজারের সক্রিয় মাধ্যমের দুই পাশে দুটি দর্পণ কল্পনা করা যায়। একটি দর্পণ প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিফলক। অন্যটি আংশিক প্রতিফলক, অর্থাৎ অধিকাংশ আলো ফিরিয়ে দিলেও অল্প অংশ বাইরে বের হতে দেয়। সক্রিয় মাধ্যমে উৎপন্ন আলো এই দুই দর্পণের মধ্যে বারবার সামনে-পেছনে চলাচল করে।

প্রতিবার সক্রিয় মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় উপযুক্ত ফোটন আরও উত্তেজিত কণাকে উদ্দীপিত করে নতুন ফোটন সৃষ্টি করতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট দিকের আলো ক্রমে বর্ধিত হতে থাকে। আলোকগহ্বর এমন আলোকরূপগুলোকে বেশি সুবিধা দেয়, যেগুলো গহ্বরের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অবশেষে আংশিক প্রতিফলক দর্পণ দিয়ে বর্ধিত আলোর একটি অংশ বাইরে বেরিয়ে আসে। এটিই আমরা লেজার রশ্মি হিসেবে দেখি।

এই ব্যবস্থা বোঝার পর সাধারণ আলো ও লেজারের প্রথম বড় পার্থক্যটি পরিষ্কার হয়—দিকনির্দেশনা। একটি সাধারণ বাতির ফোটন অসংখ্য দিকে ছড়িয়ে যায়। প্রতিফলক ও লেন্স ব্যবহার করে টর্চের আলোকে একটি দিকে কেন্দ্রীভূত করা গেলেও তা পুরোপুরি সমান্তরাল হয় না। লেজারের আলোকগহ্বর ও রশ্মির গঠন এমন যে বেরিয়ে আসা আলো অত্যন্ত সংকীর্ণ কৌণিক বিস্তারে অগ্রসর হতে পারে। তাই দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেও লেজার রশ্মি তুলনামূলকভাবে কম ছড়ায়।

তবে লেজার রশ্মি একেবারেই ছড়ায় না—এ ধারণা ভুল। বাস্তবে আলোর তরঙ্গধর্মের কারণে বিচ্ছুরণ ঘটে এবং কোনো বাস্তব লেজার রশ্মিই অসীম দূরত্ব পর্যন্ত একই ব্যাস বজায় রাখতে পারে না। অত্যন্ত উন্নত লেজারেও কিছু কৌণিক বিস্তার থাকে। কিন্তু সাধারণ আলোকউৎসের তুলনায় এই বিস্তার এত কম হতে পারে যে লেজারকে অত্যন্ত দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুর দিকে নির্ভুলভাবে পাঠানো সম্ভব হয়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সুসংগতি। একটি সাধারণ আলোকউৎসে অসংখ্য পরমাণু স্বাধীনভাবে আলো ছাড়ে। ফলে তাদের তরঙ্গের দশার মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক থাকে না। লেজারে উদ্দীপিত বিকিরণ এবং আলোকগহ্বরের নির্বাচনী প্রভাবের কারণে আলোর মধ্যে উচ্চমাত্রার দশাসম্পর্ক তৈরি করা যায়। এই সুসংগতিই লেজারকে হস্তক্ষেপভিত্তিক অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপ, ত্রিমাত্রিক আলোকচিত্র এবং অন্যান্য নির্ভুল আলোকপ্রযুক্তিতে বিশেষভাবে কার্যকর করে।

তৃতীয় পার্থক্যটি বর্ণালিগত বিশুদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সূর্যের আলো বা একটি সাদা বাতির আলোতে বহু তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকে। প্রিজমের মধ্য দিয়ে সাদা আলো পাঠালে বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হওয়ার কারণ এটিই। অনেক লেজার তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সংকীর্ণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিসরে আলো উৎপন্ন করতে পারে। কথ্য ভাষায় একে প্রায়ই একবর্ণী আলো বলা হয়। তবে বাস্তব লেজারের বর্ণালিও একেবারে শূন্য প্রস্থের একটি মাত্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য নয়; লেজারের ধরন ও নকশা অনুযায়ী তার একটি নির্দিষ্ট বর্ণালিগত প্রস্থ থাকে।

চতুর্থ বড় বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্থানে শক্তি কেন্দ্রীভূত করার ক্ষমতা। লেজারের আলো অত্যন্ত দিকনির্দেশিত এবং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় সুসংগত হওয়ায় উপযুক্ত লেন্স দিয়ে এটিকে খুব ছোট একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করা যায়। ফলে সেই ক্ষুদ্র অঞ্চলে শক্তির ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি হতে পারে। শিল্পকারখানায় শক্তিশালী লেজার দিয়ে ধাতু কাটা, ছিদ্র করা বা ঝালাই করার পেছনে এই নীতিই কাজ করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লেজার মানেই অত্যন্ত শক্তিশালী আলো নয়। একটি ছোট লেজার নির্দেশকের মোট ক্ষমতা অনেক সাধারণ বাতির মোট আলোকক্ষমতার তুলনায় খুবই কম হতে পারে। পার্থক্য হলো সেই শক্তি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বাতির শক্তি বিশাল কঠিন কোণে ছড়িয়ে যায়, কিন্তু লেজারের শক্তি একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ রশ্মির মধ্যে থাকতে পারে। আবার লেন্স দিয়ে সেটিকে আরও ছোট এলাকায় কেন্দ্রীভূত করা যায়। তাই মোট ক্ষমতা তুলনামূলক কম হলেও চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গে লেজার বিপজ্জনক হতে পারে।

লেজারের রংও তার সক্রিয় মাধ্যম ও শক্তিস্তরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোন শক্তিস্তর থেকে কোন শক্তিস্তরে পরিবর্তনের মাধ্যমে ফোটন তৈরি হচ্ছে, তার ওপর ফোটনের শক্তি এবং তাই আলোর কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্ভর করে। এ কারণেই বিভিন্ন ধরনের লেজার বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো উৎপন্ন করে। আবার সব লেজার দৃশ্যমানও নয়। অবলোহিত কিংবা অতিবেগুনি অঞ্চলেও লেজার তৈরি করা যায়। চোখে রশ্মি দেখা যাচ্ছে না বলে সেটি নিরাপদ—এমন ধারণা তাই বিপজ্জনক।

অর্ধপরিবাহী লেজার আধুনিক প্রযুক্তিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র আকারের এই লেজারগুলোতে অর্ধপরিবাহী পদার্থের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে আলো তৈরি করা হয়। আলোকতন্তু যোগাযোগ, তথ্যপাঠ ব্যবস্থা এবং অসংখ্য বৈদ্যুতিন যন্ত্রে এ ধরনের লেজারের ব্যবহার রয়েছে। আকারে অত্যন্ত ছোট হওয়া সত্ত্বেও সঠিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এগুলো দ্রুত আলোকসংকেত তৈরি করতে পারে।

আলোকতন্তু যোগাযোগে লেজারের গুরুত্ব আরও গভীর। একটি আলোকতন্তুর মধ্য দিয়ে আলোকসংকেত পাঠিয়ে তথ্য বহন করা যায়। লেজারের সংকীর্ণ বর্ণালি, দ্রুত নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা এবং নির্দিষ্ট পথে আলো পাঠানোর সুবিধা উচ্চগতির যোগাযোগব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। আলোর উপস্থিতি, অনুপস্থিতি কিংবা আরও জটিল পরিবর্তনের মাধ্যমে তথ্য সংকেতে রূপান্তরিত হয় এবং দূরের প্রান্তে সেই আলোকসংকেত আবার বৈদ্যুতিক তথ্যে রূপান্তর করা যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে লেজারের ব্যবহারও এর নিয়ন্ত্রণযোগ্যতার ফল। চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ক্ষমতা, স্পন্দনের সময়কাল এবং আলোকবিন্দুর আকার নির্বাচন করে বিশেষ ধরনের কলার ওপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন। চোখের চিকিৎসা, ত্বকের বিভিন্ন চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং আরও বহু ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের লেজার ব্যবহৃত হয়। তবে সব চিকিৎসার জন্য একই লেজার ব্যবহার করা হয় না; কোন জৈব পদার্থ কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো কতটা শোষণ করে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দূরত্ব পরিমাপেও লেজারের বিশেষ সুবিধা রয়েছে। একটি ক্ষুদ্র আলোকস্পন্দন লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠিয়ে সেটি প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসতে কত সময় নিল তা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপা যায়। আলোর বেগ জানা থাকায় এই সময় থেকে দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব। একই মূলনীতি ব্যবহার করে ভূমির ত্রিমাত্রিক মানচিত্র, ভবনের গঠন, বনভূমির উচ্চতা এবং নানা বস্তুর অবস্থান পরিমাপ করা যায়।

লেজারের আরেকটি বিস্ময়কর ব্যবহার হলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপ। সুসংগত আলোর তরঙ্গ একে অপরের সঙ্গে হস্তক্ষেপ করলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিবর্তনও দৃশ্যমান সংকেতে রূপ নিতে পারে। কোনো পথের দৈর্ঘ্য সামান্য পরিবর্তিত হলে দুটি আলোকতরঙ্গের আপেক্ষিক দশাও পরিবর্তিত হয়। এই নীতি ব্যবহার করে এমন ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য পরিবর্তনও শনাক্ত করা সম্ভব, যা সাধারণ যান্ত্রিক মাপযন্ত্র দিয়ে নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন।

লেজারকে তাই শুধু “খুব উজ্জ্বল আলো” হিসেবে ভাবলে এর প্রকৃত বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব বোঝা যায় না। এর মূল শক্তি হলো আলোর ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো তৈরি হবে, রশ্মি কোন দিকে যাবে, কতটা সংকীর্ণ থাকবে, কতক্ষণ স্থায়ী হবে এবং কত ক্ষুদ্র স্থানে কেন্দ্রীভূত হবে—লেজার প্রযুক্তিতে এসব বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সাধারণ আলো ও লেজার শেষ পর্যন্ত একই মৌলিক প্রকৃতির তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ। লেজারের জন্য আলাদা কোনো রহস্যময় পদার্থ বা বিশেষ ধরনের আলোককণা নেই। পার্থক্যটি মূলত ফোটনগুলো কীভাবে উৎপন্ন হচ্ছে এবং তাদের পারস্পরিক বৈশিষ্ট্য কতটা নিয়ন্ত্রিত। সাধারণ বাতির আলোকে তুলনা করা যায় এমন একটি জনসমাগমের সঙ্গে, যেখানে সবাই নিজ নিজ সময়ে বিভিন্ন দিকে হাঁটছে। আদর্শীকৃতভাবে লেজার রশ্মিকে তুলনা করা যায় এমন একটি সুসংগঠিত দলের সঙ্গে, যেখানে সদস্যরা প্রায় একই দিকে এবং পারস্পরিক ছন্দ বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে।

আর এই সুশৃঙ্খলতার জন্ম হয় পরমাণুর নির্দিষ্ট শক্তিস্তর, বাহ্যিক শক্তি সরবরাহ, জনসংখ্যা বিপর্যাস, উদ্দীপিত বিকিরণ এবং আলোকগহ্বরের সম্মিলিত ক্রিয়ায়। একটি ফোটন আরেকটি সমবৈশিষ্ট্যের ফোটন তৈরিতে সহায়তা করে, দর্পণগুলো আলোকে সক্রিয় মাধ্যমের মধ্য দিয়ে বারবার চালায়, আলো ক্রমে বর্ধিত হয় এবং শেষে নিয়ন্ত্রিত একটি অংশ অত্যন্ত দিকনির্দেশিত রশ্মি হিসেবে বেরিয়ে আসে।

এই কারণেই লেজার একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের একটি অসাধারণ আবিষ্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম মৌলিক হাতিয়ার। দোকানের পণ্য শনাক্তকরণ থেকে আলোকতন্তু যোগাযোগ, শিল্পকারখানার ধাতু কাটা থেকে চিকিৎসা, ভূভাগের মানচিত্র তৈরি থেকে মহাকাশে দূরত্ব পরিমাপ—অসংখ্য ক্ষেত্রে একই মৌলিক নীতি কাজ করছে। সাধারণ আলো যেখানে মূলত চারদিকে ছড়িয়ে পড়া আলোকশক্তি, সেখানে লেজার দেখায় সেই একই আলোকে পরমাণু পর্যায়ের ভৌত নিয়ম কাজে লাগিয়ে কতটা সুশৃঙ্খল, নির্ভুল এবং কার্যকর করে তোলা সম্ভব।


আপনার পছন্দ হতে পারে