বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কোয়ান্টাম ইন্টারনেট কী? ভবিষ্যতের যোগাযোগ কি হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব হবে?

  • Author: Admin
  • September 06, 2026
কোয়ান্টাম ইন্টারনেট কী? ভবিষ্যতের যোগাযোগ কি হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব হবে?
কোয়ান্টাম যোগাযোগের নিরাপদ ভবিষ্যৎ

আজকের ইন্টারনেটে আমরা যে ছবি পাঠাই, বার্তা লিখি, টাকা স্থানান্তর করি বা দূরের কোনো যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করি, তার প্রায় সবকিছুই শেষ পর্যন্ত প্রচলিত তথ্যের আদান-প্রদানের ওপর নির্ভরশীল। এই তথ্যকে শূন্য ও একের ধারায় প্রকাশ করা যায় এবং উপযুক্ত যন্ত্র দিয়ে তা অনুলিপি, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। তথ্য গোপন রাখতে তাই জটিল গাণিতিক পদ্ধতিতে তাকে এমনভাবে রূপান্তর করা হয়, যাতে অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সহজে তার অর্থ উদ্ধার করতে না পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের ধারণা এই ব্যবস্থার ওপর শুধু আরও শক্তিশালী গোপন সংকেত বসানোর কথা বলে না; এটি যোগাযোগের মৌলিক ভৌত ভিত্তিটিই বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

কোয়ান্টাম ইন্টারনেট হলো এমন একটি যোগাযোগব্যবস্থার ধারণা, যেখানে দূরে থাকা কোয়ান্টাম যন্ত্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে কোয়ান্টাম অবস্থা বিনিময় করতে পারবে এবং প্রয়োজনে তাদের মধ্যে কোয়ান্টাম জড়াজড়ি সৃষ্টি করা যাবে। এখানে তথ্য বহনের জন্য আলোর ক্ষুদ্রতম শক্তিকণা অর্থাৎ ফোটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। প্রচলিত ইন্টারনেটের মতো শুধু সাধারণ তথ্য পাঠানোই এর উদ্দেশ্য নয়; বরং এমন কিছু কাজ সম্ভব করা, যা কেবল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেই করা যায়।

বিষয়টি বোঝার জন্য প্রথমে কোয়ান্টাম তথ্যের বিশেষত্ব বুঝতে হবে। প্রচলিত গণনায় তথ্যের মৌলিক একক বিট সাধারণত শূন্য অথবা এক অবস্থায় থাকে। কোয়ান্টাম গণনায় ব্যবহৃত কোয়ান্টাম বিট পরিমাপের আগে শূন্য ও একের সম্ভাব্য অবস্থার একটি বিশেষ সমন্বয়ে থাকতে পারে। একে উপরিস্থাপন বলা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হলো কোয়ান্টাম জড়াজড়ি।

দুটি কোয়ান্টাম কণা এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে যে তাদের পৃথক স্বাধীন অবস্থা দিয়ে পুরো ব্যবস্থাটিকে যথাযথভাবে বর্ণনা করা যায় না। এই সম্পর্কই কোয়ান্টাম জড়াজড়ি। কণাদুটি অনেক দূরে সরিয়ে নেওয়া হলেও তাদের যৌথ কোয়ান্টাম সম্পর্ক বজায় থাকতে পারে, যদি পরিবেশের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত মিথস্ক্রিয়ায় সেটি নষ্ট না হয়। ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম যোগাযোগব্যবস্থায় দূরের দুটি কেন্দ্রের মধ্যে এমন জড়াজড়ি তৈরি ও বণ্টন করা অন্যতম প্রধান প্রযুক্তিগত লক্ষ্য।

তবে এখানে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। জড়াজড়ি ব্যবহার করে আলোর চেয়ে দ্রুত ইচ্ছামতো বার্তা পাঠানো যায় না। এক প্রান্তে পরিমাপ করলেই অন্য প্রান্তে ব্যবহারযোগ্য কোনো অর্থপূর্ণ বার্তা তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে যায় না। কোয়ান্টাম যোগাযোগের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রচলিত যোগাযোগপথেরও প্রয়োজন হয়। ফলে কোয়ান্টাম ইন্টারনেট আপেক্ষিকতার গতিসীমা ভেঙে কোনো অতিপ্রাকৃত তাৎক্ষণিক যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করবে না।

কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের নিরাপত্তা নিয়ে এত আগ্রহের একটি প্রধান কারণ হলো কোয়ান্টাম অবস্থাকে নির্বিচারে দেখে নেওয়া যায় না। একটি অজানা কোয়ান্টাম অবস্থা পরিমাপ করতে গেলে সাধারণত সেই অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ কোনো গুপ্তশ্রোতা যদি যোগাযোগের মাঝখানে কোয়ান্টাম সংকেত গোপনে পরীক্ষা করতে চায়, তবে তার হস্তক্ষেপের চিহ্ন পরিসংখ্যানগতভাবে ধরা পড়তে পারে। এই বৈশিষ্ট্য থেকেই কোয়ান্টাম চাবি বণ্টনের ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

গোপন বার্তা আদান-প্রদানের জন্য প্রেরক ও প্রাপকের কাছে একটি নিরাপদ গোপন চাবি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ব্যবস্থায় সেই চাবি স্থাপন বা বিনিময়ের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে গাণিতিক সমস্যার কঠিনতার ওপর। যথেষ্ট শক্তিশালী গণনাযন্ত্র বা কোনো অজানা কার্যকর পদ্ধতি পাওয়া গেলে কিছু প্রচলিত সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কোয়ান্টাম চাবি বণ্টনে নিরাপত্তার ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে প্রকৃতির কোয়ান্টাম নিয়ম থেকে।

ধরা যাক, একজন প্রেরক ধারাবাহিকভাবে ফোটনের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে চাবি তৈরির উপাদান পাঠাচ্ছেন। মাঝপথে কোনো গুপ্তশ্রোতা যদি সেগুলো পরিমাপ করে আবার পাঠানোর চেষ্টা করে, তবে সব ক্ষেত্রে সে সঠিক পরিমাপের ভিত্তি জানবে না। ভুলভাবে পরিমাপ করার ফলে মূল কোয়ান্টাম অবস্থায় পরিবর্তন ঘটতে পারে। পরে প্রেরক ও প্রাপক তাদের তথ্যের একটি ছোট অংশ তুলনা করে ত্রুটির হার পরীক্ষা করলে অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেন। সন্দেহজনক হলে সেই চাবি বাতিল করে নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।

এখানেই প্রচলিত গুপ্তলিপি ও কোয়ান্টাম নিরাপত্তার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। সাধারণভাবে কোনো চোর যদি একটি গোপন তথ্য নিখুঁতভাবে অনুলিপি করে এবং মূল তথ্যটি অক্ষত রেখে যায়, তবে মালিক হয়তো বুঝতেই পারবেন না যে চুরি হয়েছে। কিন্তু অজানা কোয়ান্টাম অবস্থা নিখুঁতভাবে ইচ্ছামতো অনুলিপি করার ওপর মৌলিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই নীতিকে সাধারণভাবে কোয়ান্টাম অনুলিপি-অসম্ভবতার নীতি বলা যায়। নিরাপদ কোয়ান্টাম যোগাযোগের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখান থেকে সরাসরি বলা ঠিক হবে না যে কোয়ান্টাম ইন্টারনেট মানেই এমন ইন্টারনেট, যাকে কোনোভাবেই হ্যাক করা যাবে না। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম কোনো নির্দিষ্ট যোগাযোগপদ্ধতির নিরাপত্তা অত্যন্ত শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু বাস্তব ব্যবস্থা শুধু ফোটন আর কোয়ান্টাম বিট দিয়ে তৈরি হয় না। সেখানে আলোক উৎস, শনাক্তকারী, নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র, সাধারণ কম্পিউটার, পরিচালন ব্যবস্থা, ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাই, সফটওয়্যার এবং মানুষের ব্যবহার—সবকিছুই থাকে। এই স্তরগুলোর যেকোনো একটিতে দুর্বলতা থাকলে আক্রমণ সম্ভব।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোয়ান্টাম পদ্ধতিতে অত্যন্ত নিরাপদভাবে একটি গোপন চাবি তৈরি করা হলো, কিন্তু ব্যবহারকারীর কম্পিউটার ক্ষতিকর সফটওয়্যারে আক্রান্ত। সে ক্ষেত্রে আক্রমণকারী চাবি তৈরির কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াকে ভাঙতে না পারলেও কম্পিউটারের স্মৃতি, পর্দা, নথি বা ব্যবহারকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য চুরি করতে পারে। একইভাবে কোনো যন্ত্রের বাস্তব নির্মাণে ত্রুটি থাকলে তাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ পদ্ধতির বাস্তবায়ন থেকেও তথ্য ফাঁস হতে পারে। তাই কোয়ান্টাম নিরাপত্তাকে পুরো তথ্যব্যবস্থার নিরাপত্তার সমার্থক ভাবা ভুল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন। নামটি শুনে মনে হতে পারে কোনো বস্তু এক স্থান থেকে অদৃশ্য হয়ে অন্য স্থানে হাজির হবে। বাস্তবে এখানে বস্তু স্থানান্তরের কথা বলা হয় না। কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের মাধ্যমে উপযুক্ত জড়াজড়ি এবং প্রচলিত তথ্য আদান-প্রদান ব্যবহার করে একটি কোয়ান্টাম অবস্থার তথ্য দূরের অন্য একটি কোয়ান্টাম ব্যবস্থায় পুনর্গঠন করা যায়। প্রক্রিয়াটি এমনভাবে ঘটে যে মূল অজানা অবস্থাটি একই সঙ্গে অপরিবর্তিত অবস্থায় রেখে নিখুঁত দ্বিতীয় অনুলিপি তৈরি করা হয় না।

এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ দূরত্বে কোয়ান্টাম তথ্য সরাসরি পাঠানো কঠিন। সাধারণ আলোকতন্তুর মধ্য দিয়ে ফোটন পাঠালে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ফোটন হারিয়ে যায়। প্রচলিত যোগাযোগে দুর্বল সংকেতকে মাঝপথে গ্রহণ, পড়া, শক্তিশালী করা এবং আবার পাঠানো যায়। কিন্তু অজানা কোয়ান্টাম অবস্থাকে ঠিক একইভাবে পড়ে নিয়ে নির্বিচারে নতুন অনুলিপি বানানো যায় না। ফলে প্রচলিত সংকেত পুনরাবৃত্তিকারী যন্ত্রের সরল ধারণা এখানে কাজ করে না।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য কোয়ান্টাম পুনরাবৃত্তিকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর লক্ষ্য হলো পুরো দূরত্বে একটি ভঙ্গুর কোয়ান্টাম সংকেত সরাসরি পাঠানোর বদলে পথটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা। প্রথমে পাশাপাশি থাকা অংশগুলোর মধ্যে জড়াজড়ি তৈরি করা যায়। পরে বিশেষ কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ছোট অংশগুলোর জড়াজড়িকে যুক্ত করে আরও দূরের দুটি প্রান্তের মধ্যে কার্যকর জড়াজড়ি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে। বাস্তবে এটি করতে নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম স্মৃতি, অত্যন্ত দক্ষ ফোটন শনাক্তকরণ, ত্রুটি নিয়ন্ত্রণ এবং সূক্ষ্ম সময় সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।

কোয়ান্টাম স্মৃতির কাজও সাধারণ স্মৃতির তুলনায় অনেক কঠিন। একটি কোয়ান্টাম অবস্থা পরিবেশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত মিথস্ক্রিয়ায় দ্রুত তার সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য হারাতে পারে। তাপ, কম্পন, তড়িৎচুম্বকীয় গোলযোগ কিংবা আশপাশের কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া কোয়ান্টাম সামঞ্জস্য নষ্ট করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে কোয়ান্টাম অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হিসেবে বোঝা যায়। তাই একটি ব্যবহারযোগ্য কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে কোয়ান্টাম অবস্থা যথেষ্ট সময় ধরে সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সঠিকভাবে ব্যবহার করা বিরাট প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ দূরত্বের যোগাযোগে কৃত্রিম উপগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে বা উচ্চতায় আলোক সংকেতের ক্ষয় অনেক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ স্থলভিত্তিক আলোকতন্তুর তুলনায় ভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে ভূমির দুটি দূরবর্তী কেন্দ্রের মধ্যে উপগ্রহের মাধ্যমে কোয়ান্টাম চাবি বণ্টন বা জড়াজড়ি বণ্টনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে স্থলভিত্তিক আলোকতন্তু, মুক্ত আকাশপথের আলোক যোগাযোগ এবং উপগ্রহ—এই তিন ধরনের অবকাঠামো একত্রে একটি বৃহৎ কোয়ান্টাম যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হতে পারে।

কিন্তু ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম ইন্টারনেট বর্তমান ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দেবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। বরং সম্ভাব্য বাস্তব চিত্র হলো প্রচলিত ও কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক পাশাপাশি কাজ করবে। সাধারণ ওয়েবসাইট দেখা, ভিডিও চালানো, সামাজিক যোগাযোগ বা বিশাল নথি স্থানান্তরের জন্য বর্তমান ধরনের তথ্যব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট কার্যকর থাকবে। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতে পারে নিরাপদ চাবি বণ্টন, দূরবর্তী কোয়ান্টাম গণনাযন্ত্র সংযোগ, বিতরণকৃত কোয়ান্টাম গণনা, অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপ এবং বিশেষ বৈজ্ঞানিক কাজে।

দূরের কোয়ান্টাম গণনাযন্ত্রগুলোকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে গণনার নতুন কাঠামোও তৈরি হতে পারে। একটি বিশাল কোয়ান্টাম যন্ত্র নির্মাণের বদলে একাধিক ছোট কোয়ান্টাম যন্ত্রকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বিত করার ধারণা গবেষকদের কাছে আকর্ষণীয়। ভবিষ্যতে কোনো ব্যবহারকারী দূরের কোয়ান্টাম গণনাকেন্দ্রের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন, আবার বিভিন্ন গবেষণাগার তাদের কোয়ান্টাম সম্পদ পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে জটিল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারে।

বিতরণকৃত পরিমাপও আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। জড়াজড়ি ব্যবহার করে দূরে থাকা একাধিক সংবেদকের পরিমাপকে বিশেষভাবে সমন্বিত করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অধিক সূক্ষ্মতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। সময় নির্ণয়, মৌলিক পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা, ভূভৌত পর্যবেক্ষণ কিংবা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ক্ষেত্র পরিমাপের মতো কাজে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এখানে কোয়ান্টাম ইন্টারনেট এবং কোয়ান্টাম-পরবর্তী গুপ্তলিপির পার্থক্যও বোঝা জরুরি। কোয়ান্টাম-পরবর্তী গুপ্তলিপি এমন গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা শক্তিশালী কোয়ান্টাম গণনাযন্ত্রের আক্রমণের বিরুদ্ধেও টিকে থাকার জন্য তৈরি করা হয়। এটি চালাতে আবশ্যিকভাবে কোয়ান্টাম ইন্টারনেট দরকার হয় না। বর্তমান প্রচলিত কম্পিউটার ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপরই এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব। অন্যদিকে কোয়ান্টাম যোগাযোগ সরাসরি কোয়ান্টাম ভৌত বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগায়। ভবিষ্যতের নিরাপত্তাব্যবস্থায় এই দুই পদ্ধতি প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে পরস্পরের পরিপূরকও হতে পারে।

কোয়ান্টাম গণনাযন্ত্রের অগ্রগতি বর্তমান ইন্টারনেট নিরাপত্তার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও এই আলোচনার অংশ। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত কিছু প্রকাশ্য-চাবিভিত্তিক গোপন সংকেত পদ্ধতির নিরাপত্তা এমন গাণিতিক সমস্যার ওপর নির্ভর করে, যেগুলো প্রচলিত কম্পিউটারের জন্য অত্যন্ত কঠিন। যথেষ্ট বড় ও ত্রুটিসহিষ্ণু কোয়ান্টাম গণনাযন্ত্র তৈরি করা গেলে নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম গণনাপদ্ধতি এসবের কিছু অংশকে গুরুতরভাবে দুর্বল করতে পারে। তাই কোয়ান্টাম যুগের আগেই নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থায় রূপান্তর গুরুত্বপূর্ণ।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরেকটি ঝুঁকি। কোনো আক্রমণকারী আজ এনক্রিপ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে রেখে দিতে পারে, যদিও এখন সেটি পড়তে পারছে না। ভবিষ্যতে শক্তিশালী গণনাপদ্ধতি হাতে এলে পুরোনো সংরক্ষিত তথ্যের গোপন সংকেত ভাঙার চেষ্টা করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় গোপন রাখা দরকার এমন সরকারি, গবেষণা, আর্থিক বা শিল্পসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে তাই ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকি বর্তমান থেকেই বিবেচনা করতে হয়।

কোয়ান্টাম ইন্টারনেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো মাত্রা বৃদ্ধি। একটি পরীক্ষাগারে কয়েকটি যন্ত্রের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত কোয়ান্টাম যোগাযোগ দেখানো আর একটি দেশজুড়ে হাজার হাজার কেন্দ্রের নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন সমস্যা। প্রতিটি সংযোগে ক্ষয়, শব্দ, ত্রুটি, সময় সমন্বয়, কোয়ান্টাম স্মৃতির স্থায়িত্ব এবং বিভিন্ন নির্মাতার যন্ত্রের পারস্পরিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য নতুন নিয়মাবলি, পথ নির্বাচন পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার হবে।

বর্তমান ইন্টারনেটে তথ্যের প্যাকেট এক পথ বন্ধ হলে অন্য পথে যেতে পারে। কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে পথ নির্বাচন আরও জটিল হতে পারে, কারণ এখানে শুধু কোন পথ খোলা আছে তা জানলেই হবে না; কোন পথে যথেষ্ট মানসম্পন্ন জড়াজড়ি তৈরি করা যাবে, কতক্ষণ সেটি ধরে রাখা যাবে, কোন কেন্দ্রের স্মৃতি খালি আছে এবং ত্রুটির হার কত—এসবও বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ক পরিচালনা শুধু যোগাযোগ প্রকৌশলের সমস্যা নয়, এটি একই সঙ্গে পদার্থবিদ্যা, গণনাবিজ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রণ প্রকৌশলের সমস্যা।

তাহলে কি কোয়ান্টাম ইন্টারনেট সত্যিই হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব করে দেবে? উত্তরটি নির্ভর করছে আমরা হ্যাক বলতে কী বোঝাচ্ছি তার ওপর। যদি প্রশ্ন হয়, নির্দিষ্ট ধরনের কোয়ান্টাম যোগাযোগপথে কেউ অদৃশ্যভাবে কোয়ান্টাম সংকেত পরিমাপ করে একই অবস্থা নিখুঁতভাবে রেখে দিতে পারবে কি না, তাহলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আক্রমণকারীর ওপর অত্যন্ত কঠোর মৌলিক সীমা আরোপ করে। কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়, পুরো নেটওয়ার্কের কোনো যন্ত্র, সফটওয়্যার, ব্যবহারকারী বা পরিচয়ব্যবস্থা কখনো আক্রান্ত হবে না কি না, তাহলে উত্তর অবশ্যই না।

বাস্তব নিরাপত্তা সবসময় বহুস্তরবিশিষ্ট। শক্তিশালী দরজার তালা থাকলেও কেউ যদি মালিকের কাছ থেকে চাবি প্রতারণা করে নিয়ে যায়, তালার শক্তি তাকে রক্ষা করবে না। একইভাবে কোয়ান্টাম যোগাযোগ অত্যন্ত শক্তিশালী ভৌত নিরাপত্তা দিতে পারলেও ভুয়া পরিচয়, ক্ষতিকর সফটওয়্যার, দুর্বল যন্ত্র, ভুল বিন্যাস, অভ্যন্তরীণ অসৎ ব্যক্তি কিংবা ব্যবহারকারীর অসাবধানতার মতো সমস্যা থেকেই যাবে। তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করতে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রচলিত তথ্যনিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থাও অপরিহার্য থাকবে।

আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো বিশ্বাসযোগ্য কেন্দ্র। কিছু প্রাথমিক কোয়ান্টাম যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে মাঝপথে এমন কেন্দ্র ব্যবহার করা হতে পারে, যেগুলোকে বিশ্বাস করতে হয়। যদি সেই কেন্দ্র আক্রান্ত হয়, পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। উন্নত কোয়ান্টাম পুনরাবৃত্তিকারী ও প্রান্ত-থেকে-প্রান্ত জড়াজড়িভিত্তিক নেটওয়ার্কের অন্যতম আকর্ষণ হলো ভবিষ্যতে এই ধরনের মধ্যবর্তী বিশ্বাসের প্রয়োজন কমিয়ে আনার সম্ভাবনা।

একটি পূর্ণাঙ্গ কোয়ান্টাম ইন্টারনেট গড়ে উঠলে আমরা সম্ভবত আজকের ইন্টারনেটের অনুরূপ একটি নতুন ভৌত অবকাঠামো পাব, কিন্তু তার কাজ হবে ভিন্ন। সেখানে কোনো কোয়ান্টাম গণনাকেন্দ্র একটি নেটওয়ার্ক কেন্দ্রের সঙ্গে জড়াজড়ি তৈরি করতে চাইবে, কেন্দ্রটি অন্য কেন্দ্রের মাধ্যমে উপযুক্ত পথ খুঁজবে, কোয়ান্টাম স্মৃতিতে অস্থায়ী অবস্থা সংরক্ষিত হবে এবং প্রয়োজনমতো জড়াজড়ি বিনিময়ের মাধ্যমে দূরের দুটি যন্ত্রকে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি প্রচলিত ইন্টারনেট সেই পুরো প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সাধারণ তথ্য বহন করতে পারে।

এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ তাই শুধু আরও দ্রুত ইন্টারনেট তৈরির গল্প নয়। কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের মূল আকর্ষণ গতি নয়; বরং এমন ধরনের যোগাযোগ ও সমন্বয় সম্ভব করা, যা প্রচলিত তথ্যব্যবস্থায় সরাসরি করা যায় না। এটি নিরাপত্তার নতুন ভিত্তি দিতে পারে, দূরের কোয়ান্টাম যন্ত্রকে যুক্ত করতে পারে এবং গণনা ও পরিমাপের নতুন পদ্ধতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

আজকের ইন্টারনেটের জন্মের প্রথম যুগে যেমন খুব কম মানুষ অনুমান করতে পেরেছিল যে একদিন ব্যাংক, ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন, সংবাদ, মানচিত্র, সামাজিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের বিশাল অংশ একই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করবে, কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনই পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন। বর্তমানে প্রযুক্তিটির বহু অংশ গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে এবং বৃহৎ, সর্বজনীন কোয়ান্টাম ইন্টারনেট গড়ে তোলার জন্য এখনও বহু প্রকৌশলগত বাধা অতিক্রম করতে হবে।

তবু এর সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। মানবসভ্যতা এতদিন তথ্য নিরাপদ রাখার জন্য প্রধানত কঠিন গাণিতিক সমস্যার ওপর নির্ভর করেছে। কোয়ান্টাম যোগাযোগ সেই নিরাপত্তার সঙ্গে প্রকৃতির মৌলিক নিয়মকেও যুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করছে। এর ফলে হ্যাকিং পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবে না, কিন্তু যোগাযোগের নির্দিষ্ট কিছু স্তরে গোপন আড়িপাতা অনেক বেশি কঠিন এবং শনাক্তযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম ইন্টারনেট তাই হ্যাকারহীন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এমন এক যোগাযোগব্যবস্থার সম্ভাবনা, যেখানে তথ্য রক্ষার লড়াইয়ে প্রথমবারের মতো প্রকৃতির কোয়ান্টাম নিয়ম নিজেই নিরাপত্তার অন্যতম প্রহরী হয়ে উঠতে পারে।


You may also like