বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এমআরআই যন্ত্র শরীর না কেটেই ভেতরের ছবি তোলে কীভাবে? চুম্বক, বেতার তরঙ্গ ও হাইড্রোজেন পরমাণুর বিস্ময়কর বিজ্ঞান

  • Author: Admin
  • September 06, 2026
এমআরআই যন্ত্র শরীর না কেটেই ভেতরের ছবি তোলে কীভাবে? চুম্বক, বেতার তরঙ্গ ও হাইড্রোজেন পরমাণুর বিস্ময়কর বিজ্ঞান
চুম্বক ও হাইড্রোজেনের সংকেতে শরীরের অদৃশ্য ভেতর

মানুষের শরীরের ভেতরে কী ঘটছে তা জানার জন্য একসময় চিকিৎসকদের অনেকাংশে শারীরিক পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার অথবা সীমিত ধরনের চিত্রায়নের ওপর নির্ভর করতে হতো। অথচ আধুনিক এমআরআই যন্ত্র মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম গঠন, মেরুদণ্ড, সন্ধি, পেশি, অস্থিমজ্জা, স্নায়ু, হৃদ্‌যন্ত্রসহ শরীরের বহু নরম কলার অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি তৈরি করতে পারে—শরীরে ছুরি চালানো তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর আয়নায়নকারী বিকিরণও ব্যবহার করতে হয় না। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, একটি বিশাল নলাকার যন্ত্রের মধ্যে মানুষকে ঢুকিয়ে দিলেই যেন তার শরীরের ভেতর দেখা যাচ্ছে। বাস্তবে এর পেছনে কাজ করে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, বেতার কম্পাঙ্কের তরঙ্গ, হাইড্রোজেন পরমাণুর কেন্দ্রকের চৌম্বক ধর্ম, অত্যন্ত সূক্ষ্ম সংকেত গ্রহণব্যবস্থা এবং জটিল গাণিতিক গণনা।

এমআরআইয়ের মূল রহস্য বুঝতে হলে প্রথমেই শরীরের পানির দিকে তাকাতে হয়। মানুষের শরীরের একটি বড় অংশ পানি দিয়ে গঠিত। পানির প্রতিটি অণুতে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে। আবার চর্বিসহ শরীরের বিভিন্ন জৈব পদার্থেও প্রচুর হাইড্রোজেন রয়েছে। হাইড্রোজেনের কেন্দ্রকে সাধারণত একটি প্রোটন থাকে। এই প্রোটনের এমন একটি মৌলিক ধর্ম রয়েছে, যার কারণে অত্যন্ত সরলভাবে একে ক্ষুদ্র চুম্বকের মতো কল্পনা করা যায়। এমআরআই যন্ত্র মূলত শরীরের অসংখ্য হাইড্রোজেন কেন্দ্রকের এই চৌম্বক আচরণকে কাজে লাগায়।

স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরের অসংখ্য হাইড্রোজেন কেন্দ্রকের চৌম্বক অভিমুখ এলোমেলোভাবে বিন্যস্ত থাকে। ফলে বৃহৎ পরিসরে তাদের প্রভাব অনেকটাই পরস্পরকে বাতিল করে দেয়। কিন্তু একজন মানুষকে এমআরআই যন্ত্রের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রধান চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে রাখা হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। হাইড্রোজেন কেন্দ্রকগুলোর একটি সামান্য অতিরিক্ত অংশ প্রধান চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুকূলে এমনভাবে বিন্যস্ত হয় যে শরীরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু পরিমাপযোগ্য সামগ্রিক চৌম্বকত্ব তৈরি হয়। এমআরআইয়ের পরবর্তী পুরো প্রক্রিয়ার ভিত্তিই হলো এই সামগ্রিক চৌম্বকত্ব।

তবে হাইড্রোজেন কেন্দ্রকগুলোকে স্থির হয়ে থাকা ক্ষুদ্র দিকনির্দেশকের মতো ভাবলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে তারা একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে ঘূর্ণনধর্মী অগ্রগতি প্রদর্শন করে। এই কম্পাঙ্ক প্রধান চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ চৌম্বক ক্ষেত্র যত শক্তিশালী হবে, সংশ্লিষ্ট কম্পাঙ্কও তত পরিবর্তিত হবে। এই নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের সঙ্গে মিল রেখে শক্তি প্রয়োগ করাই এমআরআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

এবার যন্ত্র শরীরের নির্বাচিত অঞ্চলে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গ প্রয়োগ করে। এই তরঙ্গকে এমনভাবে দেওয়া হয় যাতে হাইড্রোজেন কেন্দ্রকগুলো শক্তি গ্রহণ করে এবং তাদের সামগ্রিক চৌম্বকত্বের অবস্থা পরিবর্তিত হয়। সহজভাবে বললে, প্রধান চৌম্বক ক্ষেত্র তাদের যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রেখেছিল, বেতার তরঙ্গ সাময়িকভাবে সেই অবস্থা বদলে দেয়। নির্দিষ্ট সময় পর বেতার তরঙ্গ বন্ধ করে দেওয়া হলে কেন্দ্রকগুলো আবার আগের ভারসাম্যের দিকে ফিরে যেতে শুরু করে।

এই ফিরে যাওয়ার ঘটনাটিই এমআরআই চিত্র তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইড্রোজেন কেন্দ্রকগুলো ভারসাম্যের দিকে ফেরার সময় তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত তড়িৎচৌম্বকীয় সংকেত গ্রহণ করা যায়। রোগীর শরীরের কাছে স্থাপন করা বিশেষ গ্রহণকারী কুণ্ডলী এই অত্যন্ত দুর্বল সংকেত শনাক্ত করে। এরপর সেই সংকেত বৈদ্যুতিক উপাত্তে রূপান্তরিত হয়ে কম্পিউটারে পৌঁছায়। অর্থাৎ এমআরআই যন্ত্র কোনো সাধারণ আলোকচিত্রগ্রাহকের মতো শরীরের ভেতরের সরাসরি ছবি তোলে না; বরং শরীর থেকে পাওয়া অসংখ্য সংকেত সংগ্রহ করে সেগুলোর ভিত্তিতে গাণিতিকভাবে ছবি নির্মাণ করে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—শরীরের সব হাইড্রোজেন যদি সংকেত দেয়, তাহলে যন্ত্র কীভাবে বুঝবে কোন সংকেতটি মস্তিষ্কের কোন অংশ থেকে এসেছে অথবা কোনটি হাঁটুর নির্দিষ্ট অংশ থেকে এসেছে? এর উত্তর হলো পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র। প্রধান শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের পাশাপাশি এমআরআই যন্ত্রে বিশেষ কুণ্ডলী থাকে, যেগুলো খুব দ্রুত সামান্য পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এগুলো শরীরের অবস্থানভেদে মোট চৌম্বক ক্ষেত্রকে সামান্য পরিবর্তন করে।

এই পরিবর্তনের ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানের হাইড্রোজেন কেন্দ্রকের কম্পাঙ্ক ও পর্যায়ে সূক্ষ্ম পার্থক্য সৃষ্টি করা যায়। যন্ত্র এই পার্থক্য বিশ্লেষণ করে নির্ণয় করতে পারে কোন সংকেত শরীরের কোন স্থান থেকে এসেছে। অনেকটা বিশাল একটি অন্ধকার ঘরে অসংখ্য ঘণ্টা থাকলে এবং প্রতিটি অবস্থানের ঘণ্টাকে সামান্য আলাদা সুর দেওয়া হলে শুধু শব্দ বিশ্লেষণ করেই কোন শব্দ কোথা থেকে এসেছে তা বোঝার মতো। এমআরআইতে অবশ্য প্রক্রিয়াটি এর চেয়ে বহুগুণ জটিল এবং গাণিতিকভাবে অনেক বেশি সূক্ষ্ম।

একটি নির্দিষ্ট স্তরের ছবি তৈরি করতে প্রথমে শরীরের একটি অংশ নির্বাচন করা হয়। এরপর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংকেতের মধ্যে সংযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন দিক থেকে বারবার পরিমাপ করা সংকেত একটি বিশেষ উপাত্তক্ষেত্রে জমা হয়। এই কাঁচা উপাত্ত মানুষের চোখে দেখার মতো কোনো শারীরিক ছবি নয়। কম্পিউটার গাণিতিক রূপান্তরের সাহায্যে এই উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং শেষ পর্যন্ত শরীরের একটি দ্বিমাত্রিক স্তরচিত্র তৈরি করে। একের পর এক বহু স্তর সংগ্রহ করলে সেগুলো থেকে ত্রিমাত্রিক গঠনও পুনর্গঠন করা সম্ভব।

এমআরআইয়ের অসাধারণ ক্ষমতা শুধু শরীরের কোথায় কত হাইড্রোজেন রয়েছে তা দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধরনের কলায় থাকা হাইড্রোজেন কেন্দ্রক বেতার তরঙ্গের উত্তেজনা শেষ হওয়ার পর একই গতিতে ভারসাম্যে ফিরে আসে না। তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার আচরণ স্থানীয় রাসায়নিক ও আণবিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। এই ফিরে আসার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিককে শিথিলন বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিথিলন বৈশিষ্ট্যকে সাধারণভাবে টি-এক ও টি-দুই নামে চিহ্নিত করা হয়।

টি-এক মূলত প্রধান চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক বরাবর সামগ্রিক চৌম্বকত্ব পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন কলায় এই পুনরুদ্ধারের সময় আলাদা হওয়ায় তাদের উজ্জ্বলতা বা অন্ধকারের মাত্রায় পার্থক্য তৈরি করা যায়। অন্যদিকে টি-দুই কেন্দ্রকগুলোর পারস্পরিক পর্যায়গত সামঞ্জস্য কত দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন কলায় এই হারও ভিন্ন। যন্ত্রের বেতার তরঙ্গের ক্রম, অপেক্ষার সময় এবং সংকেত সংগ্রহের সময় পরিবর্তন করে চিকিৎসকের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ছবি তৈরি করা যায়।

এ কারণেই একই মস্তিষ্কের এমআরআই বিভিন্ন ধরনের ছবিতে একেবারে ভিন্ন দেখাতে পারে। কোনো চিত্রে চর্বিযুক্ত অংশ তুলনামূলক উজ্জ্বল হতে পারে, অন্য চিত্রে তরল অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখা যেতে পারে। আবার বিশেষ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ধরনের তরলের সংকেত দমন করে আশপাশের অস্বাভাবিক পরিবর্তন আরও স্পষ্ট করা যায়। তাই এমআরআই ছবি আসলে শরীরের সাধারণ আলোকচিত্র নয়; এটি নির্দিষ্ট ভৌত বৈশিষ্ট্যকে দৃশ্যমান করার জন্য পরিকল্পিত সংকেতভিত্তিক মানচিত্র।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র পরীক্ষায় এমআরআই এত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ, সাদা পদার্থ, মস্তিষ্ক-মেরুরস এবং বিভিন্ন সূক্ষ্ম নরম কলার মধ্যে পার্থক্য খুব ভালোভাবে দেখানো যায়। মেরুদণ্ডের চাকতি, স্নায়ুর ওপর চাপ, বিভিন্ন সন্ধির তরুণাস্থি, পেশি, বন্ধনী ও রজ্জুর আঘাতের মতো সমস্যাও এমআরআইতে বিস্তারিতভাবে দেখা সম্ভব। তবে সব রোগ নির্ণয়ে এমআরআই সর্বোত্তম নয়। হাড়ের নির্দিষ্ট আঘাত, ফুসফুসের কিছু অবস্থা অথবা জরুরি পরিস্থিতিতে অন্য চিত্রায়ন পদ্ধতি বেশি উপযোগী হতে পারে।

এমআরআইয়ের আরও উন্নত রূপ শরীরের গঠন ছাড়াও বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। বিসরণভিত্তিক এমআরআই পানির অণুগুলো কলার মধ্যে কীভাবে চলাচল করছে তা পরিমাপ করে। মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে কোনো অংশে তীব্র আঘাত শুরু হলে পানির অণুর চলাচলের ধরন দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ধরনের বিসরণ চিত্রায়ন খুব প্রাথমিক পর্যায়ের মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহজনিত ক্ষতি শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কার্যকরী এমআরআই আবার মস্তিষ্কের সক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত রক্তের অক্সিজেনমাত্রার পরিবর্তন কাজে লাগায়। মস্তিষ্কের কোনো অঞ্চল বেশি সক্রিয় হলে সেখানে রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন ব্যবহারের ধরন পরিবর্তিত হয়। অক্সিজেনযুক্ত ও অক্সিজেনহীন হিমোগ্লোবিনের চৌম্বক আচরণের সূক্ষ্ম পার্থক্য থেকে সংকেতের পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পারেন নির্দিষ্ট কাজ, শব্দ, দৃশ্য বা নড়াচড়ার সময় মস্তিষ্কের কোন অঞ্চলগুলোর কার্যকলাপের সঙ্গে পরিবর্তন সম্পর্কিত। তবে এটি সরাসরি স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের ছবি নয়; বরং তার সঙ্গে সম্পর্কিত রক্তের পরিবর্তনের একটি পরোক্ষ পরিমাপ।

এমআরআই করার সময় রোগী যে জোরে ঠকঠক, টকটক বা ধাক্কার মতো শব্দ শুনতে পান, তার পেছনেও রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান। পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির কুণ্ডলীগুলো প্রধান শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে দ্রুত চালু ও বন্ধ হওয়ার সময় তাদের ওপর বল সৃষ্টি হয়। এর ফলে কুণ্ডলী ও আশপাশের কাঠামোতে দ্রুত কম্পন তৈরি হতে পারে এবং সেখান থেকেই তীব্র শব্দের সৃষ্টি হয়। এ কারণে পরীক্ষার সময় সাধারণত কান সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

অনেকে মনে করেন এমআরআই মানেই শরীর বিকিরণের মধ্যে রাখা হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ এমআরআইতে এক্স-রশ্মি বা গামা রশ্মির মতো আয়নায়নকারী বিকিরণ ব্যবহার করা হয় না। এখানে মূলত শক্তিশালী স্থির চৌম্বক ক্ষেত্র, পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বেতার কম্পাঙ্কের তড়িৎচৌম্বকীয় শক্তি ব্যবহৃত হয়। এ কারণেই এক্স-রশ্মিভিত্তিক চিত্রায়নের সঙ্গে এমআরআইয়ের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তবে আয়নায়নকারী বিকিরণ না থাকলেই যে কোনো পরিস্থিতিতে এমআরআই ঝুঁকিহীন—এমন ধারণাও সঠিক নয়।

শক্তিশালী চুম্বকের কারণে এমআরআই কক্ষে ধাতব বস্তু নিয়ে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর নিয়ম থাকে। উপযুক্ত ফেরোম্যাগনেটিক বস্তু প্রবল আকর্ষণে দ্রুত যন্ত্রের দিকে ছুটে যেতে পারে। আবার শরীরের ভেতরে থাকা কিছু পুরোনো বা অনুপযুক্ত ধাতব বস্তু, বৈদ্যুতিন যন্ত্র অথবা নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিস্থাপিত চিকিৎসা উপকরণ চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সমস্যাজনকভাবে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। আধুনিক অনেক প্রতিস্থাপিত যন্ত্র অবশ্য নির্দিষ্ট শর্তে এমআরআই উপযোগী করে তৈরি করা হয়। তাই পরীক্ষা করার আগে রোগীর শরীরে কোনো প্রতিস্থাপিত যন্ত্র, ধাতব খণ্ড বা বিশেষ চিকিৎসা উপকরণ রয়েছে কি না তা বিস্তারিতভাবে যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বেতার কম্পাঙ্কের শক্তির একটি অংশ শরীর শোষণও করতে পারে, ফলে সামান্য তাপ উৎপন্ন হতে পারে। এমআরআই ব্যবস্থা এই শক্তি শোষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করে। পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র খুব দ্রুত বদলালে শরীরের স্নায়ুতে ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হয়। তাই আধুনিক যন্ত্রে বিভিন্ন নিরাপত্তা সীমা ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থাকে।

কিছু এমআরআই পরীক্ষায় বৈপরীত্য বৃদ্ধিকারী পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এগুলো নির্দিষ্ট কলা, রক্তনালি বা অস্বাভাবিক অংশকে আশপাশের তুলনায় আরও স্পষ্ট করে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তবে প্রত্যেক এমআরআই পরীক্ষায় এমন পদার্থ দরকার হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, পরীক্ষার উদ্দেশ্য এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর ব্যবহার নির্ধারিত হয়।

এমআরআইতে রোগীকে স্থির থাকতে বলা হয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণে। যন্ত্র যখন একটি ছবি তৈরির জন্য পর্যায়ক্রমে অসংখ্য সংকেত সংগ্রহ করছে, তখন শরীর নড়ে গেলে সংকেতের অবস্থানগত সম্পর্ক বদলে যায়। ফলে তৈরি ছবিতে ঝাপসা ভাব, রেখা অথবা অন্য ধরনের বিকৃতি দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্ক বা হাঁটুর মতো অপেক্ষাকৃত স্থির অঙ্গের ছবি নেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও হৃদ্‌যন্ত্র, শ্বাসপ্রশ্বাসে নড়াচড়া করা বুক কিংবা উদরের চিত্রায়নে বিশেষ কৌশল দরকার হয়। অনেক ক্ষেত্রে হৃদ্‌স্পন্দন বা শ্বাসের সঙ্গে সংকেত সংগ্রহের সময় মিলিয়ে নেওয়া হয়।

এমআরআইয়ের ছবি এত পরিষ্কার হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এর বৈপরীত্য পরিবর্তনের বিপুল সুযোগ। একই অঙ্গের ছবি বিভিন্ন বেতার তরঙ্গক্রম, পুনরাবৃত্তির সময়, সংকেত গ্রহণের সময়, চৌম্বক পরিবর্তনের বিন্যাস এবং অন্যান্য পরামিতি বদলে তৈরি করা যায়। ফলে চিকিৎসক শুধু অঙ্গটির আকৃতি দেখেন না; একই এলাকার বিভিন্ন ভৌত বৈশিষ্ট্যের আলাদা আলাদা মানচিত্রও দেখতে পারেন। কোথাও পানি বেড়েছে কি না, কোনো কলার স্বাভাবিক গঠন বদলেছে কি না, রক্তপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য কেমন অথবা কোনো ক্ষত আশপাশের কলা থেকে কীভাবে আলাদা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন ধরনের এমআরআই চিত্র ব্যবহার করা হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পর্দায় যে মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড বা হাঁটুর পরিষ্কার স্তরচিত্র দেখা যায়, সেটি কোনো ক্ষুদ্র আলোকচিত্রগ্রাহক শরীরের ভেতরে গিয়ে তুলে আনে না। প্রথমে শক্তিশালী চুম্বক শরীরের হাইড্রোজেন কেন্দ্রকের সামগ্রিক চৌম্বক আচরণকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় আনে। এরপর বেতার তরঙ্গ তাদের শক্তির অবস্থা সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে। পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র সংকেতের সঙ্গে অবস্থানের তথ্য যুক্ত করে। কেন্দ্রকগুলো ভারসাম্যের দিকে ফেরার সময় তৈরি হওয়া সংকেত গ্রহণকারী কুণ্ডলী ধরে। তারপর কম্পিউটার বিপুল পরিমাণ উপাত্ত গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে একটি দৃশ্যমান ছবি তৈরি করে।

অর্থাৎ এমআরআই আসলে শরীরের ভেতর সরাসরি “দেখে” না; এটি শরীরকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভৌত প্রশ্ন করে এবং হাইড্রোজেন কেন্দ্রকের প্রতিক্রিয়াকে সংকেত হিসেবে শোনে। সেই সংকেতের শক্তি, সময়, কম্পাঙ্ক, পর্যায় ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেই তৈরি হয় আমাদের পরিচিত এমআরআই ছবি। মানুষের শরীরের পানি ও চর্বির মধ্যে থাকা অসংখ্য হাইড্রোজেন কেন্দ্রক, যাদের অস্তিত্ব আমরা দৈনন্দিন জীবনে অনুভবই করি না, তারাই এখানে শরীরের গভীর অংশের তথ্য বহনকারী ক্ষুদ্র সংকেত উৎসে পরিণত হয়। শক্তিশালী চুম্বক, বেতার তরঙ্গ, সূক্ষ্ম সংকেত গ্রহণ এবং জটিল গণিতের এই সমন্বয়ই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়—যার সাহায্যে শরীর না কেটেই জীবন্ত মানুষের ভেতরের গঠনকে স্তরের পর স্তর দৃশ্যমান করা সম্ভব।


You may also like