বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহেঞ্জোদারো: পরিকল্পিত প্রাচীন শহরটি কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল?

Series: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য

  • Author: Admin
  • August 29, 2026
মহেঞ্জোদারো: পরিকল্পিত প্রাচীন শহরটি কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল?
মহেঞ্জোদারো

আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলে সিন্ধু নদের কাছাকাছি এমন একটি শহর গড়ে উঠেছিল, যার নগর পরিকল্পনা আজও বিস্ময় সৃষ্টি করে। পোড়ানো ইটের ঘর, সুশৃঙ্খল রাস্তা, অসংখ্য কূপ, বাড়ির নিজস্ব স্নানের স্থান এবং রাস্তার নিচ দিয়ে চলে যাওয়া নিকাশিনালা—সব মিলিয়ে মহেঞ্জোদারো ছিল প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত নগরকেন্দ্রগুলোর একটি। অথচ খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে এই বিশাল শহরের নগরজীবন ক্রমশ দুর্বল হয়ে যায় এবং একসময় এটি পরিত্যক্ত হয়। কোনো বিজয়ী সম্রাটের শিলালিপি নেই, কোনো নিশ্চিত মহাযুদ্ধের বিবরণ নেই, এমনকি শহরের মানুষের লেখা ভাষাও আমরা পড়তে পারি না। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের আকর্ষণ করে—এত উন্নত মহেঞ্জোদারো কেন হারিয়ে গেল?

‘মহেঞ্জোদারো’ শহরটির প্রাচীন নাম নয়। সিন্ধি ভাষায় বর্তমান নামটির অর্থ সাধারণভাবে ‘মৃতদের ঢিবি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। শহরটির বাসিন্দারা নিজেদের নগরকে কী নামে ডাকত, তা জানা যায়নি। কারণ সিন্ধু সভ্যতার রহস্যময় লিখনপদ্ধতি এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে মিশর বা মেসোপটেমিয়ার মতো এখানকার শাসক, প্রশাসক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম আমাদের জানা নেই।

মহেঞ্জোদারোর বিকাশ সিন্ধু সভ্যতার পরিণত নগরপর্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সময় হরপ্পা, ধোলাভিরা, রাখিগড়ি এবং অন্যান্য নগরের পাশাপাশি মহেঞ্জোদারো বিশাল সিন্ধু সাংস্কৃতিক জগতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

শহরটির মোট জনসংখ্যা ঠিক কত ছিল, তা নির্ধারণ করা কঠিন। বিভিন্ন অনুমানে কয়েক দশ হাজার মানুষের কথা বলা হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি ছিল একটি বৃহৎ ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর। এর বিস্তৃত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা প্রমাণ করে যে নগরটি দীর্ঘ সময় ধরে বৃদ্ধি, পুনর্নির্মাণ ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

মহেঞ্জোদারোর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য ছিল নগর পরিকল্পনা। প্রধান রাস্তা ও অপেক্ষাকৃত ছোট গলিগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত ছিল যে নগরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ সম্ভব হতো। বাড়িগুলো সাধারণত রাস্তার দিকে বিশাল খোলা সম্মুখভাগ না রেখে ভেতরের উঠানকে কেন্দ্র করে নির্মিত হতো। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ঘরের অভ্যন্তরে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা দুটোই বজায় রাখা সম্ভব ছিল।

আরও বিস্ময়কর হলো নির্মাণে ব্যবহৃত ইট। সিন্ধু সভ্যতার বহু স্থানের মতো মহেঞ্জোদারোতেও মানসম্মত অনুপাতের পোড়ানো ইট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এত বড় শহরে দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের নির্মাণমান বজায় থাকা কোনো ধরনের সামাজিক নিয়ম, প্রশিক্ষিত নির্মাণশ্রমিক এবং সংগঠিত উৎপাদনের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

তবে মহেঞ্জোদারোকে অন্য অনেক প্রাচীন শহর থেকে আলাদা করে তার পানি ও নিকাশিব্যবস্থা। শহরে বিপুলসংখ্যক কূপ ছিল। অনেক বাড়ির নিজস্ব বা কাছাকাছি কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করা যেত। ফলে বাসিন্দাদের পানি পাওয়ার জন্য একটি মাত্র কেন্দ্রীয় উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো না।

বহু বাড়িতে ইটের তৈরি স্নানের স্থান ছিল। এসব স্থান থেকে ব্যবহৃত পানি ছোট নালার মাধ্যমে বাইরে বের হয়ে রাস্তার বড় নিকাশিনালায় পৌঁছাত। কিছু নালা ঢেকে রাখা ছিল এবং পরিষ্কার করার সুবিধাও ছিল। কোথাও বর্জ্য জমা রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দেখা যায়।

চার হাজার বছরেরও বেশি আগে একটি নগরে বাড়ির ব্যবহৃত পানি পরিকল্পিতভাবে রাস্তার নিকাশিনালায় সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা মহেঞ্জোদারোর সবচেয়ে অসাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। এটি শুধু প্রকৌশল দক্ষতা নয়, নগরজীবন পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমন্বয়েরও প্রমাণ।

শহরটির সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা গ্রেট বাথ বা বৃহৎ স্নানাগার। একটি উঁচু অংশে অবস্থিত আয়তাকার এই জলাধারে দুই পাশ দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে। জলাধারকে জলরোধী রাখতে পোড়ানো ইট ও বিটুমিনজাত উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। কাছেই পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল।

গ্রেট বাথের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানা যায়নি। সাধারণ স্নানের জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল, নাকি ধর্মীয় বা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানের জন্য—এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে পরবর্তী দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে আচারগত স্নানের গুরুত্ব বিবেচনায় এটিকে ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু লিখিত দলিল পাঠ করা না যাওয়ায় এই ব্যাখ্যা এখনো অনুমান।

আরও একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, মহেঞ্জোদারোতে মিশরের পিরামিড, মেসোপটেমিয়ার জিগুরাত বা পরবর্তী যুগের বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো কোনো নিশ্চিত রাজকীয় স্থাপনা পাওয়া যায়নি। কোনো শাসকের বিশাল মূর্তি বা সুস্পষ্ট রাজকীয় সমাধিও নেই।

এটি সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রহস্যময় করে তুলেছে। এত বড় শহরের রাস্তা, ইট, পানি, নিকাশি এবং বাণিজ্যিক মান নিয়ন্ত্রণ করতে সংগঠিত কর্তৃত্বের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই কর্তৃত্বের দৃশ্যমান মুখটি কোথায়?

মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া বিখ্যাত পাথরের ক্ষুদ্র ভাস্কর্যটিকে একসময় ‘পুরোহিত-রাজা’ বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সত্যিই পুরোহিত, রাজা কিংবা উভয়ই ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই। নামটি আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ফল।

একইভাবে বিখ্যাত ব্রোঞ্জের ‘নৃত্যরত তরুণী’ মূর্তিটি শহরের ধাতুশিল্পের দক্ষতার অসাধারণ উদাহরণ। ক্ষুদ্র মূর্তিটি ‘লস্ট-ওয়াক্স’ পদ্ধতির উন্নত ধাতু ঢালাই প্রযুক্তির সাক্ষ্য বহন করে। অলংকারে সজ্জিত মানবমূর্তিটির ভঙ্গি সিন্ধু শিল্পের এক জীবন্ত দিক প্রকাশ করে, যদিও তার পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান অজানা।

শহরের অর্থনীতি ছিল বৈচিত্র্যময়। মৃৎশিল্প, পুঁতি তৈরি, ধাতুশিল্প, শাঁখের কাজ এবং অন্যান্য কারুশিল্পের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মানসম্মত ওজন বাণিজ্য ও পণ্য পরিমাপে নিয়মিত ব্যবস্থার উপস্থিতি নির্দেশ করে।

সিলমোহরগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ। স্টিয়াটাইট পাথরের ছোট সিলে ষাঁড়, তথাকথিত ইউনিকর্নসদৃশ প্রাণী, হাতি, গণ্ডার এবং অন্যান্য চিত্রের সঙ্গে রহস্যময় সিন্ধু চিহ্ন দেখা যায়। এগুলো বাণিজ্যিক পরিচয়, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা অথবা ধর্মীয় প্রতীকের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।

মহেঞ্জোদারো বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থারও অংশ ছিল। মেসোপটেমীয় লেখায় ‘মেলুহহা’ নামের একটি অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাকে সাধারণভাবে সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মেসোপটেমিয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সিন্ধু ধরনের সিল ও অন্যান্য সামগ্রী পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ মহেঞ্জোদারোর অর্থনীতি শুধু আশপাশের কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। দূরপাল্লার বাণিজ্য এবং বিশেষায়িত কারুশিল্পও নগরের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল। এই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়লে বৃহৎ নগর ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যেতে পারত।

কিন্তু মহেঞ্জোদারোর পতনের প্রশ্নে প্রথমে যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো বন্যা

সিন্ধু নদ এবং তার বিস্তৃত সমভূমি যেমন কৃষির জন্য উর্বর পরিবেশ তৈরি করেছিল, তেমনি বন্যার বিপদও সৃষ্টি করত। মহেঞ্জোদারোর প্রত্নস্তরে বারবার পুনর্নির্মাণ এবং ভূমি উঁচু করার প্রমাণ রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন, শহরটি দীর্ঘ ইতিহাসে একাধিক গুরুতর বন্যার মুখোমুখি হয়েছিল।

বন্যা হলে শুধু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কূপ দূষিত হতে পারে, নিকাশিব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং রাস্তা ও গুদাম ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। একই ঘটনা বারবার ঘটলে শহর পুনর্নির্মাণের অর্থনৈতিক ব্যয় ক্রমশ বাড়তে থাকে।

তবে একটি বিশাল বন্যা এসে মহেঞ্জোদারোকে একদিনে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল—এমন প্রমাণ নেই। নগরটি বহু পর্যায়ে পুনর্নির্মিত হয়েছে। ফলে বন্যা সম্ভবত একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপ ছিল, একক চূড়ান্ত কারণ নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নদীব্যবস্থার পরিবর্তন। সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলো ভূতাত্ত্বিক সময়ে গতিপথ পরিবর্তন করেছে। নদী যদি কোনো নগরের কাছ থেকে সরে যায়, তাহলে পানি, কৃষি, পরিবহন এবং বাণিজ্য একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার নদী অতিরিক্ত কাছে চলে এলে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন। বিভিন্ন জলবায়ুবিষয়ক গবেষণায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও কৃষিভিত্তিক নগর অর্থনীতির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বড় শহর নিজে নিজের খাদ্য উৎপাদন করে না। আশপাশের কৃষকরা উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করে শহরে পাঠালে তবেই হাজার হাজার কারিগর, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক কর্মী সেখানে বসবাস করতে পারে। কৃষির উদ্বৃত্ত কমে গেলে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বৃহৎ নগরজীবনের ভিত্তি।

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৯০০ সালের পর পুরো সিন্ধু সভ্যতায় যে পরিবর্তন দেখা যায়, তা মহেঞ্জোদারোর সমস্যাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রাখে। বড় শহরের গুরুত্ব কমতে থাকে, দূরপাল্লার বাণিজ্যে পরিবর্তন আসে, সিল ও মানসম্মত ওজনের ব্যবহার হ্রাস পায় এবং অনেক অঞ্চলে মানুষ অপেক্ষাকৃত ছোট বসতিতে চলে যায়।

এই পরিবর্তনকে বর্তমানে অনেক গবেষক নগরায়ণের পতন বা ডি-আরবানাইজেশন হিসেবে দেখেন। অর্থাৎ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি; বরং যে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর বিশাল নগরগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি বদলে গিয়েছিল।

কিন্তু একসময় মহেঞ্জোদারোর পতনের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প জনপ্রিয় ছিল। শহরে পাওয়া কিছু মানব কঙ্কাল দেখে ধারণা করা হয়েছিল যে বহিরাগত আর্য আক্রমণকারীরা শহরের মানুষকে হত্যা করেছিল। এই ধারণা বিংশ শতাব্দীর কিছু পুরোনো ব্যাখ্যায় বিশেষভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

পরবর্তী প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তথাকথিত ‘গণহত্যার শিকার’ কঙ্কালগুলো একই সময়ে একই সহিংস ঘটনার শিকার হয়েছিল—এমন প্রমাণ নেই। শহরজুড়ে কোনো একক বিশাল যুদ্ধ বা আক্রমণের ধ্বংসস্তরও পাওয়া যায়নি।

ফলে আর্য বাহিনী এসে মহেঞ্জোদারো ধ্বংস করেছিল—এই পুরোনো সরল ব্যাখ্যা বর্তমানে গ্রহণযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নয়।

মহেঞ্জোদারো নিয়ে আরও বিচিত্র দাবি ইন্টারনেটে প্রচলিত। কখনো বলা হয়, শহরটি কোনো প্রাচীন পারমাণবিক বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়েছিল এবং সেখানে অস্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেছে। এসব দাবির নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই। শহরে পারমাণবিক বিস্ফোরণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাস্তব ইতিহাস বরং আরও আকর্ষণীয়, কারণ এখানে একটি উন্নত নগরকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া বহু পরিবর্তন দেখা যায়। নদীর আচরণ বদলাচ্ছে, বন্যা পুনর্নির্মাণের চাপ বাড়াচ্ছে, জলবায়ু কৃষির ধরন পরিবর্তন করছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হচ্ছে এবং পুরো সিন্ধু অঞ্চলের জনবসতির কেন্দ্র পরিবর্তিত হচ্ছে।

মহেঞ্জোদারো সম্ভবত কোনো এক সকালে ধ্বংস হয়ে যায়নি; শহরটি ধীরে ধীরে এমন একটি পৃথিবীর অংশ হয়ে পড়েছিল, যেখানে এত বড় নগর ধরে রাখার অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও পরিবেশগত সুবিধা আর আগের মতো ছিল না।

পরবর্তী পর্যায়ের মহেঞ্জোদারোতে নির্মাণমানের কিছু পরিবর্তনও দেখা যায়। পুরোনো বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে ছোট ঘর তৈরি, পূর্ববর্তী স্থাপত্যের পুনর্ব্যবহার এবং নগর পরিকল্পনার আগের শৃঙ্খলার পরিবর্তনকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তবে ‘পতন’ মানেই সম্পূর্ণ সামাজিক বিশৃঙ্খলা নয়। মানুষ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছিল। কৃষিপদ্ধতি পরিবর্তন, ছোট বসতিতে স্থানান্তর এবং নতুন অঞ্চলে জনসংখ্যার বিস্তার সম্ভবত অভিযোজনের অংশ ছিল।

এ কারণেই প্রশ্নটি ‘মহেঞ্জোদারোর মানুষ কোথায় অদৃশ্য হলো?’ না হয়ে হওয়া উচিত—‘কেন তারা আর মহেঞ্জোদারোর মতো বিশাল শহরে বসবাসের প্রয়োজন অনুভব করল না?’

এই দৃষ্টিভঙ্গি সিন্ধু সভ্যতার পতনকে অনেক বেশি পরিষ্কার করে। সভ্যতার মানুষগুলো হারিয়ে যায়নি; হারিয়ে গিয়েছিল তাদের নির্দিষ্ট নগরব্যবস্থা। পরবর্তী দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে হরপ্পা যুগের মানুষের জৈবিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার বিভিন্ন মাত্রা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে সিন্ধু সমাজের সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও লিখনব্যবস্থা আর আগের রূপে ফিরে আসেনি।

মহেঞ্জোদারো কয়েক হাজার বছর মাটির নিচে চাপা থাকার পর বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের সামনে পূর্ণ গুরুত্ব নিয়ে ফিরে আসে। ১৯২০-এর দশকে আর. ডি. ব্যানার্জির অনুসন্ধান এবং পরবর্তী খনন প্রমাণ করে যে এখানে অত্যন্ত প্রাচীন একটি নগরসভ্যতার বিশাল কেন্দ্র ছিল। এর আবিষ্কার দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা আমূল বদলে দেয়।

আজও শহরটির বড় অংশ অনাবিষ্কৃত বা সীমিতভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্মুক্ত প্রত্নস্থল সংরক্ষণ একটি গুরুতর সমস্যা। ভূগর্ভস্থ লবণ, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং পরিবেশগত ক্ষয় প্রাচীন ইটের কাঠামোকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কিন্তু মহেঞ্জোদারোর সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য এখনো তার নীরব লিখনপদ্ধতি। যদি সিন্ধু লিপি একদিন নির্ভরযোগ্যভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়, তাহলে হয়তো জানা যাবে শহরের প্রশাসন কীভাবে চলত, এর বাসিন্দারা কোন ভাষায় কথা বলত এবং তাদের সমাজে কারা ক্ষমতাবান ছিল।

ততদিন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিকদের নির্ভর করতে হবে ইট, নালা, কূপ, পাত্র, সিল, মানুষের হাড়, উদ্ভিদের অবশেষ এবং মাটির স্তরের ওপর। এগুলো একত্রে যে ছবি তৈরি করে, সেখানে আকস্মিক রহস্যময় ধ্বংসের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া একটি সমাজের গল্পই বেশি স্পষ্ট।

মহেঞ্জোদারোর পরিত্যক্ত রাস্তার দিকে তাকালে তাই সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় শুধু এই নয় যে শহরটি একসময় হারিয়ে গিয়েছিল। আরও বিস্ময়কর হলো, হাজার হাজার বছর আগে এর বাসিন্দারা এমন একটি নগর নির্মাণ করেছিল যেখানে পানি সরবরাহ, স্নান, বর্জ্য নিষ্কাশন এবং আবাসিক পরিকল্পনাকে দৈনন্দিন নগরজীবনের মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

মহেঞ্জোদারোকে সম্ভবত কোনো একটি যুদ্ধ, বন্যা বা দুর্যোগ হত্যা করেনি। বারবার বন্যা, নদীব্যবস্থার পরিবর্তন, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের দুর্বলতা, কৃষি ও বাণিজ্যের রূপান্তর এবং বৃহত্তর সিন্ধু নগরব্যবস্থার পতন ধীরে ধীরে শহরটির প্রয়োজনীয়তাই কমিয়ে দিয়েছিল। একসময় যে রাস্তা দিয়ে হাজার হাজার মানুষ চলাচল করত, সেখানে নীরবতা নেমে আসে—আর সেই নীরব শহরই হাজার হাজার বছর পরে প্রমাণ করে যে দক্ষিণ এশিয়ায় নগর পরিকল্পনার ইতিহাস আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন।