বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হাইড্রোজেন জ্বালানি কি ভবিষ্যতের পেট্রোলের বিকল্প হতে পারবে? সম্ভাবনা, প্রযুক্তি, খরচ ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ

  • Author: Admin
  • August 28, 2026
হাইড্রোজেন জ্বালানি কি ভবিষ্যতের পেট্রোলের বিকল্প হতে পারবে? সম্ভাবনা, প্রযুক্তি, খরচ ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ
হাইড্রোজেন জ্বালানি কি ভবিষ্যতের পেট্রোলের বিকল্প হতে পারবে?

হাইড্রোজেনকে ভবিষ্যতের জ্বালানি বলা নতুন কোনো ধারণা নয়। বহু দশক ধরেই বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এমন একটি শক্তির উৎস খুঁজছেন, যা পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমাবে, বায়ুদূষণ হ্রাস করবে এবং একই সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহন ও ভারী শিল্পে ব্যবহার করা যাবে। সেই অনুসন্ধানে হাইড্রোজেন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ এটি ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন না করেও যানবাহন চালানো সম্ভব। কিন্তু হাইড্রোজেনকে শুধু ‘পরিষ্কার জ্বালানি’ বললেই পুরো সত্য বলা হয় না। এটি কতটা পরিবেশবান্ধব হবে, তা মূলত নির্ভর করে হাইড্রোজেনটি কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে তার ওপর।

পেট্রোলের সঙ্গে হাইড্রোজেনের সবচেয়ে মৌলিক পার্থক্য হলো, পেট্রোল প্রকৃতি থেকে পাওয়া অপরিশোধিত খনিজ তেল পরিশোধন করে তৈরি করা হয়, কিন্তু পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন বিপুল পরিমাণে আলাদাভাবে জমা নেই। হাইড্রোজেন বিভিন্ন যৌগের মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। পানির অণুতেও হাইড্রোজেন রয়েছে, আবার প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেনেও এটি রয়েছে। তাই হাইড্রোজেনকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে পরিণত করতে প্রথমে অন্য পদার্থ থেকে আলাদা করতে হয়। এই কাজেই শক্তি লাগে। এ কারণে হাইড্রোজেনকে প্রাথমিক শক্তির উৎসের চেয়ে শক্তি বহনকারী মাধ্যম হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।

বর্তমানে শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত হাইড্রোজেনের একটি বড় অংশ জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি করা হয়। মিথেনকে উচ্চ তাপমাত্রায় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করিয়ে হাইড্রোজেন পাওয়া যায়। সমস্যা হলো, এই প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডও তৈরি হয়। অর্থাৎ গাড়ির নিষ্কাশন নল দিয়ে কার্বন না বেরোলেও হাইড্রোজেন তৈরির কারখানায় যদি বিপুল কার্বন নির্গত হয়, তাহলে সামগ্রিক পরিবেশগত লাভ অনেকটাই কমে যায়।

হাইড্রোজেনের বিভিন্ন উৎপাদনপদ্ধতিকে বোঝাতে প্রচলিতভাবে নানা রঙের নাম ব্যবহার করা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত এবং উৎপাদনের সময় সৃষ্ট কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেওয়া হাইড্রোজেনকে সাধারণত ধূসর হাইড্রোজেন বলা হয়। একই ধরনের উৎপাদনের সঙ্গে কার্বন ধরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা যুক্ত হলে তাকে নীল হাইড্রোজেন বলা হয়। আর নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করলে উৎপাদিত হাইড্রোজেনকে বলা হয় সবুজ হাইড্রোজেন। দীর্ঘমেয়াদে পেট্রোলের সত্যিকারের পরিচ্ছন্ন বিকল্প হতে হলে হাইড্রোজেন অর্থনীতিকে মূলত সবুজ হাইড্রোজেনের দিকেই যেতে হবে।

সবুজ হাইড্রোজেন তৈরির কেন্দ্রে রয়েছে তড়িৎ বিশ্লেষণ। বিশেষ যন্ত্রে পানির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে পানির অণুকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করা হয়। সেই বিদ্যুৎ যদি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ বা অন্য কোনো নিম্ন-কার্বন উৎস থেকে আসে, তাহলে হাইড্রোজেন উৎপাদনের সামগ্রিক কার্বন নিঃসরণ খুব কম রাখা সম্ভব। ভবিষ্যতে এমন অঞ্চল, যেখানে প্রচুর সূর্যালোক বা শক্তিশালী বাতাস পাওয়া যায়, সেখানে বিপুল নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার একটি অংশ হাইড্রোজেনে রূপান্তর করা যেতে পারে। ফলে হাইড্রোজেন এক অর্থে বিদ্যুৎকে রাসায়নিক শক্তি হিসেবে সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

গাড়িতে হাইড্রোজেন ব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত পদ্ধতি হলো জ্বালানি কোষ। হাইড্রোজেনচালিত জ্বালানি-কোষ গাড়িকে বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির মতোই মনে হতে পারে। কারণ এর চাকাও বৈদ্যুতিক মোটর ঘোরায়। পার্থক্য হলো, ব্যাটারিচালিত গাড়িতে আগে থেকে ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ জমা রাখা হয়, আর হাইড্রোজেন জ্বালানি-কোষ গাড়ি নিজের সঙ্গে বহন করা হাইড্রোজেন থেকে চলার সময়ই বিদ্যুৎ তৈরি করে।

গাড়ির উচ্চচাপের আধারে হাইড্রোজেন জমা থাকে। সেই হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষে প্রবেশ করে এবং বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে তড়িৎ-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই বিক্রিয়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যা মোটর চালায় এবং প্রয়োজনে ছোট ব্যাটারিতেও সাময়িকভাবে জমা থাকে। বিক্রিয়ার প্রধান উপজাত হলো পানি। ফলে প্রচলিত পেট্রোল ইঞ্জিনের মতো কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড কিংবা জ্বালানি দহনের অন্যান্য দূষক গাড়ির নিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে বের হয় না।

এখানেই হাইড্রোজেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি দেখা যায়। একটি পেট্রোলচালিত গাড়িতে জ্বালানির রাসায়নিক শক্তিকে দহনের মাধ্যমে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি তাপ হিসেবে নষ্ট হয়। জ্বালানি কোষে সরাসরি তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ তৈরি হওয়ায় প্রচলিত অন্তর্দহন ইঞ্জিনের তুলনায় দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। বৈদ্যুতিক মোটর নিজেও অত্যন্ত দক্ষ। ফলে হাইড্রোজেন গাড়িতে পিস্টন, জটিল গিয়ারব্যবস্থা ও দহনপ্রক্রিয়ার অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে না।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—বিদ্যুৎ যদি শুরুতেই পাওয়া যায়, তাহলে সেই বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যাটারিতে জমিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানো হবে না কেন? কেন বিদ্যুৎ দিয়ে প্রথমে হাইড্রোজেন তৈরি করতে হবে, তারপর সেটি সংকুচিত বা অন্যভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, পরিবহন করতে হবে এবং শেষে জ্বালানি কোষে আবার বিদ্যুতে রূপান্তর করতে হবে? প্রতিটি ধাপেই কিছু শক্তি হারিয়ে যায়। এই শক্তি-রূপান্তরের ধারাবাহিক ক্ষতিই সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে হাইড্রোজেনের অন্যতম বড় দুর্বলতা।

ব্যাটারিচালিত গাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে আসা বিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে সরাসরি ব্যাটারিতে যায় এবং সেখান থেকে মোটর চালায়। হাইড্রোজেন ব্যবস্থায় একই বিদ্যুৎ প্রথমে তড়িৎ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়। এরপর হাইড্রোজেনকে পরিশোধন, সংকোচন, সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে শক্তি লাগে। পরে জ্বালানি কোষে হাইড্রোজেনকে আবার বিদ্যুতে রূপান্তরের সময়ও শক্তির একটি অংশ হারায়। ফলে একই পরিমাণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারিচালিত গাড়ি সাধারণত হাইড্রোজেন জ্বালানি-কোষ গাড়ির তুলনায় বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।

তবে হাইড্রোজেনের এমন কিছু সুবিধা রয়েছে, যেখানে ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর অন্যতম হলো দ্রুত জ্বালানি ভরা। বড় ব্যাটারি পূর্ণ করতে দ্রুত চার্জিং ব্যবস্থাতেও একটি নির্দিষ্ট সময় লাগে। অন্যদিকে উপযুক্ত হাইড্রোজেন ভরার কেন্দ্রে একটি হাইড্রোজেন গাড়িতে তুলনামূলক অল্প সময়ে জ্বালানি নেওয়া সম্ভব। দীর্ঘ দূরত্বে চলা বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে এই সময়ের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ একটি ট্রাক যতক্ষণ চার্জ নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, ততক্ষণ সেটি আয় সৃষ্টি করতে পারবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওজন। দূরপাল্লার ভারী ট্রাককে সম্পূর্ণ ব্যাটারিতে চালাতে হলে অনেক ক্ষেত্রে বিশাল ব্যাটারির প্রয়োজন হতে পারে। ব্যাটারির ওজন বেড়ে গেলে পণ্য বহনের জন্য উপলব্ধ ওজন কমে যেতে পারে। হাইড্রোজেন ব্যবস্থারও আধার, জ্বালানি কোষ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের ওজন রয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট ধরনের ভারী পরিবহনে এটি দীর্ঘ পাল্লা ও দ্রুত জ্বালানি গ্রহণের সুবিধা দিতে পারে। তাই ভবিষ্যতে হাইড্রোজেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজার ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি না হয়ে দূরপাল্লার ভারী পরিবহন, বাস, কিছু রেলব্যবস্থা, জাহাজ, শিল্পকারখানা এবং বিশেষ পরিবহনব্যবস্থা হতে পারে।

হাইড্রোজেনের বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা হলো এর সংরক্ষণ। এটি অত্যন্ত হালকা গ্যাস এবং স্বাভাবিক অবস্থায় এর আয়তন অনেক বেশি। গাড়িতে পর্যাপ্ত হাইড্রোজেন বহন করতে হলে সাধারণত অত্যন্ত উচ্চচাপে সংকুচিত করে বিশেষ শক্তিশালী আধারে রাখতে হয়। এই আধার সাধারণ পেট্রোলের ট্যাংকের মতো সহজ নয়। উচ্চচাপ সহ্য করার জন্য বিশেষ উপাদান, বহুস্তরীয় নির্মাণ ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা দরকার। ফলে পুরো ব্যবস্থার খরচ বেড়ে যায়।

হাইড্রোজেনকে তরল করেও সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু তার জন্য অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা প্রয়োজন। এত নিচু তাপমাত্রায় হাইড্রোজেনকে তরল অবস্থায় রাখা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন এবং শক্তিব্যয়ী। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করলে তাপ প্রবেশের কারণে তরল হাইড্রোজেনের কিছু অংশ আবার গ্যাসে পরিণত হওয়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই পেট্রোলের মতো একটি সাধারণ ট্যাংকে ঢেলে মাসের পর মাস রেখে দেওয়ার সুবিধা হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে নেই।

হাইড্রোজেনের অণু অত্যন্ত ছোট হওয়ায় পাইপ, সংযোগস্থল ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে ফুটো হওয়ার ঝুঁকিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিছু ধাতু দীর্ঘদিন হাইড্রোজেনের সংস্পর্শে থাকলে ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। তাই বর্তমান প্রাকৃতিক গ্যাসের সব পাইপলাইন কোনো পরিবর্তন ছাড়াই হাইড্রোজেন পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কোথাও বিদ্যমান অবকাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব, আবার কোথাও নতুন পাইপলাইন, সংকোচনব্যবস্থা ও সংরক্ষণকেন্দ্র তৈরি করতে হতে পারে।

নিরাপত্তার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য এবং বাতাসের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশলে সহজে জ্বলতে পারে। তবে এটিকে দেখে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয় যে হাইড্রোজেন গাড়ি স্বভাবতই পেট্রোল গাড়ির চেয়ে বিপজ্জনক। পেট্রোলও অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। নিরাপত্তা নির্ভর করে আধারের নকশা, চাপ নিয়ন্ত্রণ, ফুটো শনাক্তকরণ, বায়ু চলাচল, স্বয়ংক্রিয় বন্ধব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার সময় জ্বালানির আচরণ বিবেচনা করে পুরো ব্যবস্থাটি কীভাবে নির্মিত হয়েছে তার ওপর। আধুনিক হাইড্রোজেন গাড়ির আধার কঠোর আঘাত, চাপ ও অগ্নি-সহনশীলতার মান মাথায় রেখে তৈরি করা হয়।

হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো অবকাঠামোর দ্বন্দ্ব। মানুষ হাইড্রোজেন গাড়ি কিনতে চাইবে না যদি পর্যাপ্ত জ্বালানি ভরার কেন্দ্র না থাকে। আবার ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে হাইড্রোজেন কেন্দ্র তৈরি করতে চাইবে না যদি রাস্তায় পর্যাপ্ত হাইড্রোজেন গাড়ি না থাকে। পেট্রোলের শত বছরের বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থার বিপরীতে হাইড্রোজেনকে উৎপাদনকেন্দ্র, পরিবহনব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার এবং জ্বালানি ভরার কেন্দ্র প্রায় নতুন করে গড়ে তুলতে হচ্ছে।

এখানে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির একটি বিশাল সুবিধা রয়েছে। বিদ্যুতের অবকাঠামো পৃথিবীর প্রায় সব শহরেই আগে থেকে আছে। বাড়ি, কার্যালয়, বিপণিবিতান ও মহাসড়কের পাশে চার্জিং ব্যবস্থা বসিয়ে সেই বিদ্যমান বিদ্যুৎব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করা যায়। কিন্তু হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে নতুন সরবরাহশৃঙ্খল তৈরি করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এ কারণেই ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারে হাইড্রোজেনকে শুধু পেট্রোলের সঙ্গে নয়, দ্রুত উন্নত হতে থাকা ব্যাটারি প্রযুক্তির সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

খরচের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ সস্তা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, তড়িৎ বিশ্লেষণ যন্ত্র, পানি, সংকোচন ও সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন। উৎপাদনের পর সেটিকে ব্যবহারস্থলে পৌঁছানোর খরচও যোগ হয়। তবে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দাম কমা, বৃহৎ হাইড্রোজেন প্রকল্প নির্মাণ, তড়িৎ বিশ্লেষণ প্রযুক্তির উন্নতি এবং উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে সবুজ হাইড্রোজেনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।

হাইড্রোজেনের সম্ভাবনাকে শুধু গাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। ইস্পাত, রাসায়নিক সার, পরিশোধনাগার এবং উচ্চ তাপমাত্রা প্রয়োজন এমন শিল্পে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। সেখানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ থেকে তৈরি হাইড্রোজেন সরাসরি অথবা হাইড্রোজেন থেকে তৈরি অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ হাইড্রোজেনের ভবিষ্যৎ হয়তো পেট্রোলচালিত ব্যক্তিগত গাড়ির প্রতিটি জায়গা দখল করার মধ্যে নয়; বরং যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা কঠিন, সেসব ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন শক্তির সেতু হিসেবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে।

জাহাজ চলাচলেও হাইড্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও বিশুদ্ধ হাইড্রোজেন সব ধরনের জাহাজের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক সমাধান নাও হতে পারে। হাইড্রোজেন ব্যবহার করে অ্যামোনিয়ার মতো অন্য জ্বালানি তৈরি করা যায়, যা দীর্ঘ দূরত্বের সামুদ্রিক পরিবহনে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে হাইড্রোজেন থেকে কৃত্রিম তরল জ্বালানি তৈরি করে এমন ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে সরাসরি বিদ্যুতায়ন অত্যন্ত কঠিন।

বিমান চলাচলে বিষয়টি আরও জটিল। উড়োজাহাজে জ্বালানির শক্তি-ঘনত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতিরিক্ত ওজন সরাসরি উড্ডয়নের দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। হাইড্রোজেনের ভর অনুযায়ী শক্তির পরিমাণ আকর্ষণীয় হলেও এর আয়তনগত ঘনত্ব কম। তরল হাইড্রোজেন ব্যবহারের জন্য বড় ও বিশেষভাবে নিরোধক আধার দরকার। ফলে ভবিষ্যতের হাইড্রোজেনচালিত উড়োজাহাজ বর্তমান উড়োজাহাজের নকশার সাধারণ পরিবর্তন নাও হতে পারে; পুরো কাঠামো নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হতে পারে।

হাইড্রোজেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হতে পারে নবায়নযোগ্য শক্তি সংরক্ষণে। সৌরবিদ্যুৎ দিনে উৎপাদিত হয়, কিন্তু রাতেও বিদ্যুৎ দরকার। বায়ুবিদ্যুতের উৎপাদনও বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। কোনো সময় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ তৈরি হলে সেই বিদ্যুৎ দিয়ে হাইড্রোজেন উৎপাদন করে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পরে সেই হাইড্রোজেন শিল্পে, পরিবহনে অথবা আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব। যদিও বিদ্যুৎকে হাইড্রোজেনে এবং পরে আবার বিদ্যুতে রূপান্তর করলে উল্লেখযোগ্য শক্তি হারায়, দীর্ঘমেয়াদি বা মৌসুমি শক্তি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কার্যকর হতে পারে।

পানি ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। সবুজ হাইড্রোজেন তৈরির তড়িৎ বিশ্লেষণে বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন। বৈশ্বিক পানির ব্যবহারের তুলনায় সম্ভাব্য হাইড্রোজেন উৎপাদনের পানির চাহিদাকে অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনাযোগ্য করা সম্ভব হলেও শুষ্ক অঞ্চলে বড় প্রকল্প স্থাপনের সময় স্থানীয় পানির প্রাপ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সমুদ্রের পানি ব্যবহার করতে হলে আগে তা লবণমুক্ত ও উপযুক্তভাবে পরিশোধন করতে হবে। তাই শুধু প্রচুর সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যায় বলেই কোনো মরু অঞ্চল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদর্শ হাইড্রোজেন উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে যায় না; পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বন্দর অবকাঠামো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

পেট্রোলের আরেকটি সুবিধা হলো এর অসাধারণ সহজ সরবরাহব্যবস্থা। অপরিশোধিত তেল জাহাজে পরিবহন করা যায়, পরিশোধনাগারে পেট্রোল তৈরি করা যায় এবং তরল অবস্থায় তুলনামূলক সহজে ট্যাংকারে বহন ও ভূগর্ভস্থ আধারে সংরক্ষণ করা যায়। হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য শক্তি পরিবহনের জন্য অনেক বেশি জটিল ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু গাড়ির নিষ্কাশন নল থেকে কী বের হচ্ছে তা দেখে দুটি জ্বালানির তুলনা করলে ভুল হবে। উৎপাদন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত পুরো জীবনচক্র বিবেচনা করতে হবে।

এই জীবনচক্র বিশ্লেষণই হাইড্রোজেন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব শিক্ষা দেয়। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করে সেই হাইড্রোজেন দিয়ে গাড়ি চালানোকে কেবল গাড়ি থেকে কার্বন বের হয় না বলে পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা বলা যাবে না। একইভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করে উৎপাদনের কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দিলে সমস্যাটি গাড়ি থেকে কারখানায় স্থানান্তরিত হয় মাত্র। হাইড্রোজেনের পরিবেশগত মূল্য নির্ধারণ করতে হলে ‘গাড়িটি কী নির্গত করছে’ নয়, বরং ‘হাইড্রোজেনটি কোথা থেকে এসেছে’—এই প্রশ্নটি আগে করতে হবে।

তাহলে কি ভবিষ্যতে পেট্রোল পাম্পের জায়গায় সর্বত্র হাইড্রোজেন কেন্দ্র দেখা যাবে? বর্তমান প্রযুক্তিগত গতিপথ বিচার করলে ব্যক্তিগত যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে এমন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়। ছোট ও মাঝারি গাড়িতে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্যাটারির দাম কমছে, শক্তি ধারণক্ষমতা বাড়ছে, দ্রুত চার্জিং উন্নত হচ্ছে এবং চার্জিং অবকাঠামো বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সম্পূর্ণ নতুন হাইড্রোজেন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার অর্থনৈতিক যুক্তি অনেক অঞ্চলে দুর্বল হতে পারে।

কিন্তু এর অর্থ হাইড্রোজেন ব্যর্থ প্রযুক্তি নয়। বরং ভবিষ্যতের জ্বালানিব্যবস্থা সম্ভবত একক কোনো প্রযুক্তির ওপর দাঁড়াবে না। শহরের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যাটারিচালিত হতে পারে, দূরপাল্লার নির্দিষ্ট ভারী যান হাইড্রোজেন ব্যবহার করতে পারে, জাহাজ হাইড্রোজেনজাত জ্বালানি ব্যবহার করতে পারে, ইস্পাত কারখানায় সবুজ হাইড্রোজেন কয়লার বিকল্প হতে পারে এবং অতিরিক্ত সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ হাইড্রোজেন হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষিত হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শক্তিব্যবস্থা হবে বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বিত কাঠামো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পেট্রোলের বিকল্প বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি। যদি প্রশ্ন হয়, পৃথিবীর প্রতিটি পেট্রোলচালিত ব্যক্তিগত গাড়ির জায়গায় কি একদিন হাইড্রোজেন গাড়ি চলে আসবে—তাহলে তার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে সীমিত। কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়, পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমাতে হাইড্রোজেন কি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে—তাহলে উত্তর অনেক বেশি ইতিবাচক।

হাইড্রোজেন সম্ভবত ভবিষ্যতের ‘নতুন পেট্রোল’ হবে না; বরং এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিবাহক হবে, যা ব্যাটারি ও সরাসরি বিদ্যুতায়ন যেখানে কার্যকর নয়, সেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এর সাফল্য নির্ভর করবে সস্তা সবুজ বিদ্যুৎ, উন্নত তড়িৎ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি, নিরাপদ সংরক্ষণ, দক্ষ পরিবহন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের ওপর। এসব সমস্যার সমাধান যত দ্রুত হবে, হাইড্রোজেনের ব্যবহারও তত বিস্তৃত হবে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পেট্রোল মানুষের পরিবহনব্যবস্থাকে গড়ে তুলেছে। তাই তাকে প্রতিস্থাপন করা শুধু নতুন একটি জ্বালানি আবিষ্কারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খনি ও তেলক্ষেত্র, পরিশোধনাগার, জাহাজ, পাইপলাইন, পেট্রোল পাম্প, গাড়ি নির্মাতা, বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির বিশাল অবকাঠামো। হাইড্রোজেনকে সফল হতে হলে এই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবেও প্রতিযোগিতা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের প্রশ্নটি সম্ভবত ‘পেট্রোল না হাইড্রোজেন’ এতটা সরল হবে না। বরং প্রশ্ন হবে কোন কাজে কোন শক্তিব্যবস্থা সবচেয়ে দক্ষ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশসম্মত। যেখানে সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব, সেখানে বিদ্যুতায়ন এগিয়ে থাকতে পারে। যেখানে বিশাল ব্যাটারি ব্যবহার কঠিন, দীর্ঘ দূরত্ব, উচ্চ তাপমাত্রা অথবা দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সংরক্ষণের প্রয়োজন, সেখানে হাইড্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই হাইড্রোজেনকে পেট্রোলের একক উত্তর হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন শক্তিব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। পেট্রোলের যুগ শেষ হলে তার জায়গায় হয়তো একটি মাত্র জ্বালানি আসবে না; বরং বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, সবুজ হাইড্রোজেন ও হাইড্রোজেনজাত জ্বালানির সমন্বয়েই গড়ে উঠবে পরবর্তী শক্তির যুগ।