বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জ্যাকোবিন ও জিরোন্দিনদের দ্বন্দ্ব: দান্তোঁ, মারা ও রোবসপিয়েরের ভূমিকা

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

জ্যাকোবিন ও জিরোন্দিনদের দ্বন্দ্ব: দান্তোঁ, মারা ও রোবসপিয়েরের ভূমিকা
যুদ্ধ, ক্ষুধা ও বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল রাষ্ট্রের শত্রু।

রাজা ও রানির বিচারকে ঘিরে যে প্রশ্নটি ক্রমেই তীব্র হয়েছিল, তা হলো—প্রজাতন্ত্রের শত্রু কে এবং তাকে চিহ্নিত করার অধিকার কার? এর উত্তর খুঁজতে হলে ঘটনাপ্রবাহে কিছুটা ফিরে যেতে হয়। মেরি আঁতোয়ানেতের মৃত্যুদণ্ডের আগেই বিপ্লবী শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নেওয়া প্রতিনিধিরা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধ এবং জনতার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে পরস্পরের প্রতিপক্ষে পরিণত হন।

এই দ্বন্দ্ব বুঝতে প্রথমেই একটি প্রচলিত সরলীকরণ সংশোধন করা দরকার। জ্যাকোবিন ও জিরোন্দিনরা আধুনিক অর্থে সুসংগঠিত দুটি রাজনৈতিক দল ছিল না। জ্যাকোবিন ছিল রাজনৈতিক ক্লাব ও তার দেশব্যাপী শাখার নেটওয়ার্ক। পরবর্তী সময়ে জিরোন্দিন নামে পরিচিত অনেক নেতাও একসময় এর সদস্য ছিলেন। জাতীয় কনভেনশনে উঁচু আসনে বসা উগ্রপন্থী প্রতিনিধিরা মঁতানিয়ার নামে পরিচিত হন। তাঁদের সঙ্গে জ্যাকোবিনদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও দুটি পরিচয় পুরোপুরি সমার্থক ছিল না।

জিরোন্দিনদেরও শুধু জিরোন্দ অঞ্চল থেকে আসা প্রতিনিধি মনে করা ভুল। ব্রিসো, ভেরনিও, রোলাঁ এবং তাঁদের সহযোগীরা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ছিলেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সংবাদপত্র, রাজনৈতিক আলোচনা এবং কিছু সাধারণ অবস্থান তাঁদের একত্র করেছিল। তাঁরা প্রজাতন্ত্র, সম্পত্তির অধিকার ও প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন সমর্থন করতেন। কিন্তু প্যারিসের সংগঠিত জনতা যেন সমগ্র ফ্রান্সের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর কর্তৃত্ব না করে, সে বিষয়ে তাঁরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। রাজধানীর প্রভাবই হয়ে ওঠে বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র।

অন্যদিকে মঁতানিয়ারদের শক্তি বাড়ছিল প্যারিসের সেকশন, রাজনৈতিক ক্লাব এবং সাঁ-কুলোত আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে। সাঁ-কুলোতদের মধ্যে কারিগর, দোকানদার, শ্রমজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীরা ছিলেন; তাঁদের সবাই নিঃসম্পত্তি মজুর ছিলেন না। তাঁরা সাশ্রয়ী খাদ্য, মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহি চাইতেন। জাতীয় সার্বভৌমত্ব তাঁদের কাছে শুধু নির্বাচনে ভোট দেওয়া নয়; প্রয়োজনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগের অধিকারও ছিল। জিরোন্দিনদের কাছে এই ধারণা প্রতিনিধিত্বমূলক স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক মনে হতো।

যুদ্ধ নিয়ে বিরোধ রাজতন্ত্র পতনের আগেই শুরু হয়েছিল। ব্রিসো ও তাঁর সহযোগীরা বিশ্বাস করতেন, বিদেশি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিপ্লবকে শক্তিশালী করবে। রোবসপিয়ের আশঙ্কা করেছিলেন, অপরিকল্পিত যুদ্ধ পরাজয়, সামরিক একনায়কত্ব কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ তৈরি করবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিপর্যয় দেখা দিলে উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের বিচারবুদ্ধি ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে নীতিগত মতপার্থক্য ধীরে ধীরে নৈতিক অভিযোগে বদলে যায়: ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যক্তি কি কেবল অদক্ষ, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে বিপ্লবকে বিপদে ফেলছেন?

১৭৯২ সালের সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ড এই সম্পর্ক আরও বিষাক্ত করে। জিরোন্দিনরা প্যারিসের সহিংসতা এবং উগ্র সংবাদপত্রের প্রচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। মঁতানিয়ারদের অনেকে পাল্টা বলেন, রাজধানী বিদেশি আক্রমণের মুখে বিপ্লব রক্ষা করেছে, অথচ প্রতিপক্ষ সেই জনতাকেই অপরাধী করছে। রাজা ষোড়শ লুইয়ের বিচারেও বিভাজন বাড়ে। কিছু জিরোন্দিন রায় জনগণের অনুমোদনে পাঠানোর পক্ষে ছিলেন; উগ্রপন্থীরা একে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করার বিপজ্জনক উদ্যোগ হিসেবে দেখেন। তবে জিরোন্দিনদের সবাই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী ছিলেন না।

এই সংঘর্ষে জঁ-পল মারা সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর ল’আমি দ্য প্যুপল সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং উচ্চপদস্থদের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ প্রচার করত। মারা মনে করতেন, বিপ্লব বারবার বিপদে পড়ছে কারণ ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর ভাষা অনেক সময় প্রকাশ্য সহিংসতার আহ্বানে পৌঁছাত। তিনি অসন্তোষকে এমন এক রাজনৈতিক ভাষা দেন, যেখানে বিরোধীকে ভুল প্রমাণ করার চেয়ে বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে উন্মোচন করা বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।

জর্জ দান্তোঁর ভূমিকা ছিল আলাদা। ১৭৯২ সালের আগস্টে বিচারমন্ত্রী হয়ে তিনি জরুরি প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক সংগঠনে প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি শক্তিশালী বক্তা এবং বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সমঝোতা করতে সক্ষম নেতা ছিলেন। ১৭৯৩ সালের মার্চে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, রাষ্ট্র পরিচালিত বিচারব্যবস্থা কার্যকর না হলে জনতা আবার নিজের হাতে প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু এই উদ্যোগ গণহিংসা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক অপরাধ বিচারের বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে, যার ব্যবহার পরে আরও ব্যাপক হয়।

রোবসপিয়েরের প্রভাব গড়ে ওঠে নৈতিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক বক্তৃতা এবং জ্যাকোবিন ক্লাবে ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে। তিনি সাধারণ নাগরিকের অধিকার, দুর্নীতিবিরোধিতা এবং প্রজাতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তির কথা বলতেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জনগণের জীবনধারণের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সংকট তীব্র হলে তিনি বিরোধী গোষ্ঠীকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তবু তাঁকে শুরু থেকেই সর্বক্ষমতাধর শাসক ভাবা ভুল; গণনিরাপত্তা কমিটিতে তিনি যোগ দেন ১৭৯৩ সালের জুলাইয়ে, জিরোন্দিনদের পতনের পরে।

১৭৯৩ সালের বসন্তে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে খারাপ হয়। ব্রিটেনসহ নতুন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিস্তৃত হয়, নেরভিন্ডেনে ফরাসি পরাজয় ঘটে এবং জেনারেল দ্যুমুরিয়ে শত্রুপক্ষে চলে যান। তাঁর সঙ্গে জিরোন্দিন নেতাদের পূর্বঘনিষ্ঠতা রাজনৈতিক আক্রমণের সুযোগ দেয়। পশ্চিম ফ্রান্সের ভঁদেতে বিদ্রোহ এবং বাধ্যতামূলক সৈন্যসংগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রাষ্ট্রের দুর্বলতা বাড়ায়। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিও চলছিল। সীমান্তে পরাজয়, দেশের ভেতরে বিদ্রোহ এবং বাজারে সংকট—তিনটি সমস্যাই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছিল।

এপ্রিল মাসে জিরোন্দিনদের উদ্যোগে মারাকে বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়, কিন্তু তিনি খালাস পান। সমর্থকদের উল্লাসে তাঁর প্রত্যাবর্তন প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক পরাজয়ে পরিণত হয়। এরপর কনভেনশনের বারোজনের কমিশন প্যারিস কমিউন ও উগ্র আন্দোলনের কর্মকাণ্ড তদন্ত করতে শুরু করে। আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার রাজধানীর সেকশনগুলোকে আরও ক্ষুব্ধ করে। জিরোন্দিনরা নির্বাচিত পরিষদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাইছিলেন; প্যারিসের উগ্রপন্থীরা দেখছিলেন তাঁদের সংগঠন ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা। আপসের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়।

৩১ মে থেকে ২ জুন প্যারিসে অভ্যুত্থান ঘটে। ২ জুন ফ্রাঁসোয়া আঁরিওর নেতৃত্বাধীন জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও সশস্ত্র জনতা কনভেনশন ঘিরে ফেলে। চাপের মুখে প্রধান জিরোন্দিন প্রতিনিধিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ গৃহীত হয়। এটি সাধারণ সংসদীয় ভোটে সরকার পরিবর্তন ছিল না; সশস্ত্র রাজধানীর চাপ জাতীয় প্রতিনিধিত্বের গঠন বদলে দিয়েছিল। কনভেনশনের মধ্যবর্তী বৃহৎ অংশ, যাঁরা ‘সমতল’ নামে পরিচিত ছিলেন, সংকটের মধ্যে মঁতানিয়ারদের প্রাধান্য মেনে নেন।

জিরোন্দিনদের অপসারণে ঐক্য ফিরে আসেনি। বিভিন্ন প্রাদেশিক শহরে প্যারিসের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছড়ায়; এসব আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও সামাজিক ভিত্তি এক ছিল না। জুলাইয়ে শার্লত কর্দে মারাকে হত্যা করলে তিনি বিপ্লবী শহিদে পরিণত হন। অক্টোবরে প্রধান জিরোন্দিনদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড হয়। দান্তোঁ ও রোবসপিয়েরও পরে পৃথক পথে যান। তিন নেতা এক পরিকল্পনায় বিপ্লবকে উগ্র করেননি; যুদ্ধ, জনতার চাপ, বিশেষ বিচারব্যবস্থা এবং পারস্পরিক সন্দেহ তাঁদের ভিন্ন উদ্যোগকে দমনের দিকে মিলিয়ে দিয়েছিল। এখন প্রজাতন্ত্র রক্ষার নামে জরুরি ক্ষমতাকে স্থায়ী রাজনৈতিক পদ্ধতিতে পরিণত করার পথ খুলে গেল—যার পরবর্তী অধ্যায় সন্ত্রাসের রাজত্ব।


আপনার পছন্দ হতে পারে