ফরাসি বিপ্লবের যুদ্ধ ও রাজতন্ত্রের পতন: ১৭৯২ সালে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব
সীমান্তে যুদ্ধ, রাজধানীতে অভ্যুত্থান—রাজতন্ত্র পেরিয়ে প্রজাতন্ত্রের জন্ম।
রাজাকে সংবিধানের মধ্যে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পথে গিয়েছিল। কিন্তু এই পরিবর্তন কোনো অনিবার্য পরিণতি ছিল না। ১৭৯১ সালের সংবিধান কার্যকর হওয়ার সময়ও বহু প্রতিনিধি বিশ্বাস করতেন, রাজা ও নির্বাচিত আইনসভা একসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবেন। কয়েক মাসের মধ্যেই বিদেশি যুদ্ধ সেই সমঝোতার দুর্বলতা উন্মোচন করে। ১৭৯২ সালে সীমান্তের সামরিক সংকট এবং রাজধানীর রাজনৈতিক অবিশ্বাস পরস্পরকে বাড়িয়ে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়।
যুদ্ধের আশঙ্কা বিপ্লবের শুরু থেকেই ছিল। দেশত্যাগী অভিজাতেরা সীমান্তের বাইরে সংগঠিত হচ্ছিলেন এবং ইউরোপের রাজদরবারগুলো ফ্রান্সের পরিবর্তন উদ্বেগের সঙ্গে দেখছিল। ১৭৯১ সালের আগস্টে অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় লেওপোল্ড ও প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রিডরিখ উইলিয়ামের পিলনিৎস ঘোষণায় ফরাসি রাজপরিবারের অবস্থাকে ইউরোপীয় রাজাদের যৌথ উদ্বেগ বলা হয়। ঘোষণাটি শর্তসাপেক্ষ ছিল, সরাসরি যুদ্ধের চূড়ান্ত নির্দেশ নয়; কিন্তু ফ্রান্সে তা বিদেশি হস্তক্ষেপের হুমকি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
ফরাসি আইনসভায় জাক-পিয়ের ব্রিসো ও তাঁর সহযোগীরা যুদ্ধের পক্ষে প্রচার চালান। তাঁদের আশা ছিল, যুদ্ধ বিপ্লবের শত্রুদের দুর্বল করবে, জাতীয় ঐক্য বাড়াবে এবং রাজদরবারের প্রকৃত অবস্থান প্রকাশ করবে। অন্যদিকে ষোড়শ লুই ও রাজদরবারের অনেকে সামরিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে হারানো কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখছিলেন। পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্য থেকে বিপ্লবী রাজনীতিক এবং রাজদরবার একই যুদ্ধকে সমর্থন করেছিল। তবে সবাই একমত ছিলেন না; রোবেসপিয়ের সতর্ক করেছিলেন, যুদ্ধ স্বাধীনতার বদলে সামরিক কর্তৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ দমন বাড়াতে পারে।
১৭৯২ সালের ২০ এপ্রিল ফ্রান্স অস্ট্রিয়ার হাবসবুর্গ শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রুশিয়া অস্ট্রিয়ার পাশে দাঁড়ায়। বিপ্লবী উচ্ছ্বাস থাকলেও ফরাসি সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। বহু অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দেশত্যাগ করেছিলেন; নিয়মিত সৈন্য ও নতুন স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলার ব্যবধান ছিল। অস্ট্রিয়ান নেদারল্যান্ডসের দিকে প্রথম অভিযানগুলো ব্যর্থ হয়। আতঙ্ক ও অবিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পশ্চাদপসরণের সময় জেনারেল থেওবাল দ্য দিয়োঁ নিজ সৈন্যদের হাতে নিহত হন।
এই ব্যর্থতা সামরিক সমস্যাকে দ্রুত রাজনৈতিক অভিযোগে পরিণত করে। অস্ত্র, নেতৃত্ব ও সরবরাহের দুর্বলতার পাশাপাশি বিশ্বাসঘাতকতার গুজব ছড়ায়। রাজার বিদেশি যোগাযোগ এবং ভারেনের পলায়নচেষ্টা তখনও মানুষের স্মৃতিতে তাজা। শপথপ্রত্যাখ্যানকারী যাজকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্যারিসের কাছে স্বেচ্ছাসেবক শিবির গঠনের মতো প্রস্তাবে রাজার ভেটো সন্দেহ বাড়ায়। তাঁর সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগকেই অনেকে জাতীয় প্রতিরক্ষায় বাধা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। আইনগত ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্রমে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল।
২০ জুন বিক্ষোভকারীরা তুলেরি প্রাসাদে প্রবেশ করে রাজার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। রাজা সেদিন ক্ষমতায় টিকে যান, কিন্তু প্রাসাদের নিরাপত্তা ও তাঁর মর্যাদা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১১ জুলাই আইনসভা ঘোষণা করে, পিতৃভূমি বিপন্ন। স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ এবং জনসমাবেশ তীব্র হয়। প্রদেশ থেকে আসা ফেদেরে যোদ্ধারা প্যারিসের আন্দোলনে যুক্ত হন। মার্সেই থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবকেরা যে যুদ্ধগান জনপ্রিয় করেন, সেটিই পরে ‘লা মার্সেইয়েজ’ নামে পরিচিত হয়।
এই সময় ব্রান্সউইকের ডিউকের নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর ঘোষণা পরিস্থিতিকে বিস্ফোরক করে। ২৫ জুলাই জারি করা ঘোষণায় রাজপরিবারের ক্ষতি হলে প্যারিসের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুমকি ছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাজাকে রক্ষা করা, কিন্তু ফল হয় উল্টো। বিদেশি বাহিনী যখন রাজার নিরাপত্তার নামে রাজধানীকে শাস্তির হুমকি দিল, তখন বহু প্যারিসবাসীর কাছে রাজদরবার ও আক্রমণকারীদের স্বার্থ এক বলে মনে হলো। রাজতন্ত্র রক্ষার ভাষাই রাজতন্ত্রবিরোধী অভ্যুত্থানের যুক্তি জোগাল।
প্যারিসের সেকশনগুলো—স্থানীয় রাজনৈতিক সমাবেশ—রাজাকে অপসারণের দাবি জোরদার করে। সাঁ-কুলোত নামে পরিচিত কর্মজীবী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ফেদেরে এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর একাংশ যুক্ত হয়। ৯ আগস্ট রাত থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে বিদ্রোহী প্যারিস কমিউন গঠিত হয়। ফলে রাজধানীতে বৈধ প্রশাসনের পাশাপাশি অভ্যুত্থান পরিচালনাকারী নতুন কর্তৃত্ব দাঁড়ায়। আন্দোলন আর কেবল আবেদন বা মিছিলের পর্যায়ে ছিল না; প্রাসাদ দখল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হচ্ছিল।
১০ আগস্ট সকালে সশস্ত্র জনতা তুলেরির দিকে অগ্রসর হয়। প্রাসাদ রক্ষায় সুইস গার্ড এবং অন্য রক্ষীরা ছিলেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভক্ত ছিল। সংঘর্ষের আগে রাজপরিবার কাছের আইনসভার আশ্রয়ে চলে যায়। এরপর প্রাসাদে তীব্র লড়াই শুরু হয়। সুইস রক্ষীদের গুলিতে আক্রমণকারীদের বহুজন হতাহত হন; পরে বিদ্রোহীরা প্রাসাদ দখল করে। রাজা রক্ষীদের লড়াই বন্ধ করার নির্দেশ পাঠালেও বিশৃঙ্খলার মধ্যে বহু সুইস সৈন্য নিহত হন।
১০ আগস্টের অভ্যুত্থান সাংবিধানিক রাজতন্ত্রকে কার্যত শেষ করে দেয়। আইনসভা রাজাকে সাময়িকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং নতুন সংবিধান রচনার জন্য জাতীয় কনভেনশন নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়। রাজপরিবারকে পরে তঁপল কারাগারে রাখা হয়। তবে সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পুরোনো নির্বাহী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর আইনসভা, অস্থায়ী নির্বাহী পরিষদ এবং প্যারিস কমিউনের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক অনিশ্চিত থাকে। নতুন বিচারমন্ত্রী দান্তোঁ এই জরুরি পরিস্থিতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
এদিকে মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের ভেতরে অগ্রসর হচ্ছিল। লংভি এবং পরে ভারদাঁর পতন রাজধানীতে আক্রমণের আতঙ্ক বাড়ায়। স্বেচ্ছাসেবকেরা সীমান্তে চলে গেলে কারাগারে আটক বিপ্লববিরোধীরা বিদ্রোহ করবে—এমন আশঙ্কা ছড়ায়। ২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর প্যারিসের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে যাজক ও রাজনৈতিক সন্দেহভাজনের পাশাপাশি সাধারণ অপরাধে আটক মানুষও ছিলেন। আনুমানিক এগারোশ থেকে চৌদ্দশ মানুষ নিহত হন। সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ড দেখায়, জাতীয় নিরাপত্তার আতঙ্ক কীভাবে বিচারপ্রক্রিয়াকে সরিয়ে গণহিংসার পথ খুলে দিতে পারে।
এই হত্যাকাণ্ডকে পুরো প্যারিসবাসীর একযোগে সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ভুল। তুলনামূলক সীমিতসংখ্যক হত্যাকারী, স্থানীয় উদ্যোগ, উসকানি এবং কর্তৃপক্ষের ব্যর্থ বা নিষ্ক্রিয় প্রতিক্রিয়া এতে ভূমিকা রাখে। দায় ও পূর্বপরিকল্পনার মাত্রা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে। তবে ঘটনাটি বিপ্লবী শিবিরের বিভাজন গভীর করে এবং বিদেশে বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রচারের শক্তিশালী উপাদান হয়। স্বাধীনতার নামে প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা তখন নিজের রাজধানীতেই বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল।
সীমান্তে অবশ্য পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০ সেপ্টেম্বর ভালমিতে কেলারমান ও দ্যুমুরিয়ের ফরাসি বাহিনী প্রুশীয় অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দেয়। যুদ্ধটি প্রধানত কামানের লড়াই এবং অবস্থান ধরে রাখার পরীক্ষা ছিল; বিপুল শত্রুবাহিনী ধ্বংসের ঘটনা নয়। কিন্তু ফরাসি সৈন্যরা ভেঙে পড়েনি—এটাই ছিল নির্ণায়ক। মিত্রবাহিনী পরে সরবরাহসংকট, অসুস্থতা ও অন্যান্য সমস্যার মধ্যে পশ্চাদপসরণ করে। ভালমি প্রমাণ করে, বিপ্লবী ফ্রান্স সামরিক চাপের মুখে টিকে থাকতে পারে।
একই সময়ে নির্বাচিত জাতীয় কনভেনশন কাজ শুরু করে। পুরুষদের ভোটাধিকারের পরিসর আগের তুলনায় বিস্তৃত হলেও অংশগ্রহণ কম ছিল এবং নারীরা বাদ পড়েন। ২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ কনভেনশন রাজতন্ত্র বিলোপ করে; পরদিন সরকারি নথিতে প্রজাতন্ত্রের প্রথম বছরের হিসাব শুরু হয়। যুদ্ধ রাজাকে সন্দেহের কেন্দ্রে এনেছিল, তুলেরি আক্রমণ তাঁর ক্ষমতা ভেঙেছিল, আর কনভেনশন সেই পরিবর্তনকে রাষ্ট্রের নতুন ভিত্তিতে রূপ দেয়। এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন সামনে: ক্ষমতাচ্যুত লুইকে কি সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিচার করা হবে, এবং তাঁর বেঁচে থাকা কি প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
অ্যাঞ্জেল ফলস: পৃথিবীর সর্বোচ্চ জলপ্রপাতের পানি এত উঁচু থেকে নামে কীভাবে?
তাকলামাকান মরুভূমি: বালুর সমুদ্রের নিচে হারানো নগর ও প্রাচীন মানুষের ইতিহাস
প্যাটাগোনিয়া: দক্ষিণ আমেরিকার বন্য ভূখণ্ড এত অসাধারণ কেন?
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের পর পুনর্নির্মাণ: ক্রিস্টোফার রেন, সেন্ট পলস ও অগ্নিনিরাপত্তা
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডে দ্বিতীয় চার্লস: আগুন নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্দশা ও অগ্নিসংযোগের গুজব
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের চার দিন: সেন্ট পলসসহ হাজারো বাড়ি ধ্বংসের ইতিহাস