বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভার্জিনিয়া উলফ: সাহিত্য ও নারীবাদী চিন্তায় বিপ্লবের ইতিহাস

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

ভার্জিনিয়া উলফ: সাহিত্য ও নারীবাদী চিন্তায় বিপ্লবের ইতিহাস
নিজের ঘর, স্বাধীন চিন্তা ও সাহিত্যে নতুন দিগন্ত

ইতিহাস বদলে দেওয়া সব বিপ্লব রাজপথে শুরু হয়নি। কিছু বিপ্লব জন্ম নিয়েছে লেখার টেবিলে, যখন কেউ প্রশ্ন করেছেন—সমাজের অর্ধেক মানুষের অভিজ্ঞতা সাহিত্যে এত কম জায়গা পায় কেন? ভার্জিনিয়া উলফ সেই প্রশ্নকে আরও গভীরে নিয়ে গিয়েছিলেন। নারী কেন শেক্সপিয়ারের মতো লিখতে পারেননি, তার উত্তর তিনি নারীর মেধায় খোঁজেননি; খুঁজেছিলেন শিক্ষা, সম্পত্তি, অবসর ও স্বাধীনতার অসম বণ্টনে। একই সঙ্গে উপন্যাসের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে তিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষের মনের ভেতরেও ঘটে ইতিহাস। নারীর সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং মানুষের অন্তর্জগতের মর্যাদা—এই দুটি অনুসন্ধান তাঁর সাহিত্যকে একসূত্রে বেঁধেছে।

১৮৮২ সালের ২৫ জানুয়ারি লন্ডনের কেনসিংটনে জন্ম নেওয়া অ্যাডেলিন ভার্জিনিয়া স্টিফেনের পরিবার ছিল ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের শিক্ষিত সমাজের অংশ। বাবা লেসলি স্টিফেন ছিলেন লেখক ও জীবনীসম্পাদক; মা জুলিয়া স্টিফেনের জীবন জড়িয়ে ছিল বৃহৎ পরিবারের পরিচর্যার সঙ্গে। বাবার বিশাল গ্রন্থাগারে ভার্জিনিয়ার প্রবেশাধিকার ছিল, কিন্তু ভাইদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার পথ তাঁর সামনে খোলা ছিল না। ভাইয়েরা কেমব্রিজে পড়তে গেলেও তিনি মূলত বাড়িতে পড়াশোনা করেন। পরে কিংস কলেজ লন্ডনের নারী বিভাগে ইতিহাস ও ভাষার পাঠ নেন। একই পরিবারে শিক্ষার এই বৈষম্য তাঁর কাছে নারীজীবনের সীমাবদ্ধতাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছিল।

শৈশবের নিরাপত্তাও ছিল ভঙ্গুর। ১৮৯৫ সালে মায়ের মৃত্যু, পরে সৎবোন স্টেলা এবং বাবার মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। আত্মজৈবনিক লেখায় তিনি সৎভাইদের হাতে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে গুরুতর মানসিক অসুস্থতায় ভুগেছেন তিনি। তবে তাঁর সাহিত্যকে কেবল অসুস্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সৃষ্টিশীল পরিশ্রম, বিস্তৃত পাঠ এবং সচেতন শিল্পচিন্তা আড়াল হয়ে যায়। উলফের রচনা যন্ত্রণার দলিলের পাশাপাশি কঠোর অনুশীলনে নির্মিত সাহিত্য। তাঁর পাণ্ডুলিপিতে বারবার সংশোধনের উপস্থিতি সেই শ্রমের সাক্ষ্য বহন করে।

১৯০৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর ভাইবোনদের সঙ্গে ব্লুমসবারিতে চলে যাওয়া তাঁর জীবনে নতুন পরিসর তৈরি করে। তাঁদের বাড়ির আলোচনায় শিল্প, দর্শন, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। এই বৃত্ত থেকেই গড়ে ওঠে ব্লুমসবারি গোষ্ঠী; এর পরিচিত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন লিটন স্ট্রেচি, জন মেনার্ড কেইনস এবং উলফের বোন, চিত্রশিল্পী ভ্যানেসা বেল। ভিক্টোরীয় সামাজিক শিষ্টাচারের অনেক বাধা এখানে শিথিল হয়েছিল। তবে বৃত্তটি ছিল প্রধানত সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষিত মানুষের। এই সামাজিক অবস্থান উলফকে স্বাধীনতা দিয়েছিল, আবার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কিছু সীমাও নির্ধারণ করেছিল।

১৯১২ সালে তিনি লেখক লিওনার্ড উলফকে বিয়ে করেন। দুজনেই লেখালেখি ও সাংবাদিকতাকে জীবিকার অংশ করে তোলেন। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ভয়েজ আউট’-এ এক তরুণীর আত্মপরিচয়, সামাজিক প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতার সংঘাত উঠে আসে। কিন্তু উলফ ক্রমে উপলব্ধি করেন, জীবনের সত্য ধরতে শুধু ঘটনাক্রম সাজানো যথেষ্ট নয়। বাইরে একটি সাধারণ কথোপকথন চললেও মানুষের মনে একই মুহূর্তে স্মৃতি, আশঙ্কা, আকাঙ্ক্ষা ও অনুশোচনা জেগে উঠতে পারে। উপন্যাসে সেই সমান্তরাল জীবন ধরার উপায় খুঁজতে থাকেন তিনি।

এই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল ‘জেকবস রুম’, প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রকে সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর পূর্ণাঙ্গ পরিচয়ে পাওয়া যায় না; অন্য মানুষের স্মৃতি, আভাস ও বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাকে বুঝতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ছায়ায় ব্যক্তির অনুপস্থিতিও অর্থবহ হয়ে ওঠে। উলফের পরবর্তী রচনায় চেতনাপ্রবাহ ও দৃষ্টিকোণ পরিবর্তনের কৌশল আরও সমৃদ্ধ হয়। তিনি এই পদ্ধতির একমাত্র উদ্ভাবক ছিলেন না; তবে ভাষার ছন্দ, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও সময়ের ব্যবহারে তাকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে যান।

১৯২৫ সালের ‘মিসেস ড্যালোওয়ে’ উপন্যাসের ঘটনাকাল লন্ডনের একটি দিন। ক্ল্যারিসা ড্যালোওয়ে সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেন; পাশাপাশি যুদ্ধফেরত সেপটিমাস ওয়ারেন স্মিথের মানসিক বিপর্যয় সামনে আসে। আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন এই জীবনগুলোকে যুক্ত করে যুদ্ধের অভিঘাত, সামাজিক নিয়ম এবং নিঃসঙ্গতা। ঘড়ির সময় এগোয়, অথচ চরিত্রদের মন বারবার অতীতে ফিরে যায়। ক্ল্যারিসার স্মৃতিতে পুরোনো ভালোবাসা ও অপূর্ণ সম্ভাবনা বর্তমানকে নতুন অর্থ দেয়। এক দিনের দৈনন্দিনতার ভেতর দিয়ে উলফ গোটা সমাজের ক্ষত দেখান, বিশেষত সেই ক্ষত, যা বাহ্যিক ভদ্রতা দিয়ে ঢাকা থাকে।

‘টু দ্য লাইটহাউস’ বা ‘বাতিঘরের দিকে’, প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। র‌্যামসে পরিবারের অবকাশযাপন, একটি স্থগিত যাত্রা এবং সময়ের ব্যবধানে বদলে যাওয়া সম্পর্ক এর কেন্দ্রে। মিসেস র‌্যামসের পরিচর্যা পরিবারকে ধরে রাখে, কিন্তু সেই শ্রমের ব্যক্তিগত মূল্যও আছে। অন্যদিকে চিত্রশিল্পী লিলি ব্রিসকো নিজের শিল্পের সত্য খুঁজে বেড়ান, নারীর সৃজনক্ষমতা নিয়ে তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে। উপন্যাসের মধ্যবর্তী অংশে মানুষের উপস্থিতি ক্ষীণ হয়; বাড়ির ক্ষয়, যুদ্ধ ও মৃত্যু সময়ের শক্তিকে প্রকাশ করে। ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং ইতিহাস এখানে পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করে।

১৯২৮ সালের ‘অরল্যান্ডো’ পরিচয় নিয়ে আরও সাহসী পরীক্ষা। কয়েক শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকা কেন্দ্রীয় চরিত্র এক পর্যায়ে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হয়। এই কল্পনার সাহায্যে উলফ দেখান, পোশাক, আইন, সম্পত্তি ও সামাজিক আচরণ কীভাবে লিঙ্গভেদে মানুষের স্বাধীনতা বদলে দেয়। লেখিকা ভিটা স্যাকভিল-ওয়েস্টের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রেমের সম্পর্ক বইটির গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা। ভিটার পারিবারিক ইতিহাস এবং নারী হওয়ায় উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও এখানে প্রতিধ্বনিত। রসিকতা ও কল্পনার আড়ালে ‘অরল্যান্ডো’ পরিচয়ের স্থির সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করে।

তাঁর নারীবাদী চিন্তার সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রকাশ ‘আ রুম অব ওয়ানস ওন’, ১৯২৯ সালে প্রকাশিত। আগের বছর কেমব্রিজের দুটি নারী কলেজে দেওয়া বক্তৃতা থেকে বইটির বিকাশ। এখানে নিজের ঘর এবং বছরে পাঁচশ পাউন্ড আয়ের প্রসঙ্গ আসে। ঘর বলতে বোঝানো হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার বাস্তব পরিসর; অর্থ বলতে অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভর না করার সামর্থ্য। তাঁর যুক্তির শক্তি এখানেই: প্রতিভাকে বিকশিত করতে বস্তুগত অবস্থা দরকার। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সৃজনশীল স্বাধীনতা বারবার বাধার মুখে পড়ে। নারীর সাহিত্যিক অনুপস্থিতিকে তিনি ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বদলে সামাজিক ইতিহাসের প্রশ্নে পরিণত করেন।

এই বক্তব্য বোঝাতে উলফ শেক্সপিয়ারের সমান প্রতিভাবান একটি কাল্পনিক বোনের কথা ভাবেন—নাম জুডিথ। ভাইয়ের মতো শিক্ষা, মঞ্চে কাজের সুযোগ বা স্বাধীন চলাফেরা তার জোটে না। ফলে সমান মেধা থেকেও সমান সাহিত্যিক জীবন জন্মায় না। এই কল্পনা পাঠককে ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে উলফের আলোচনার সীমাও আছে: দরিদ্র নারী, গৃহকর্মী এবং উপনিবেশিত সমাজের নারীদের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় সমান বিস্তারে উপস্থিত নয়। তাঁর চিন্তার গুরুত্ব স্বীকার করার সঙ্গে এই শ্রেণিগত ও সাম্রাজ্যিক সীমা বোঝাও প্রয়োজন।

প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তিনি স্বাধীনতার বাস্তব ব্যবস্থা গড়েছিলেন। ১৯১৭ সালে লিওনার্ডের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন হোগার্থ প্রেস। ঘরের ছোট ছাপাখানা থেকে শুরু হওয়া উদ্যোগ পরে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। নিজের পরীক্ষামূলক লেখা প্রকাশের সুযোগ উলফকে বাজার ও প্রচলিত রুচির চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়। ১৯৩১ সালের ‘দ্য ওয়েভস’-এ ছয় চরিত্রের স্বগতকথনের মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তা, বন্ধুত্ব ও সময়কে অনুসন্ধান করেন তিনি। আর ১৯৩৮ সালের ‘থ্রি গিনিজ’-এ নারীর শিক্ষা ও পেশাগত অধিকারকে যুদ্ধবিরোধী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেন। পরিবারের পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রের আগ্রাসী ক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক খোঁজেন তিনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ১৯৪১ সালের ২৮ মার্চ তিনি আত্মহত্যায় মারা যান। তাঁর মৃত্যু জীবনের বেদনাদায়ক সমাপ্তি, কিন্তু তাঁর পরিচয়ের পূর্ণ সংজ্ঞা নয়। উপন্যাস, প্রবন্ধ, সমালোচনা, দিনলিপি এবং প্রকাশনার কাজে তিনি যে পরিবর্তন এনেছিলেন, তা অনেক বিস্তৃত। তিনি পাঠককে মানুষের নীরব অভিজ্ঞতা শুনতে শিখিয়েছেন এবং সাহিত্য ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছেন—কারা ভেতরে ঢুকতে পেরেছে, কারা পারেনি? তাঁর রেখে যাওয়া নিজের ঘরের দাবি তাই আজও শিক্ষা, আয় ও চিন্তার অধিকারের আলোচনায় ফিরে আসে। ইতিহাস বদলানোর এই পথ ধরে পরবর্তী প্রশ্নটিও অনিবার্য হয়ে ওঠে: স্বাধীনতার সুযোগ পাওয়ার পর একজন নারী পৃথিবীকে কত দূর বদলে দিতে পারেন?