বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ

সিরিজ: আলোকায়নের যুগ

আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ
পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও যুক্তির পথে ইউরোপে আলোকায়নের সূচনা।

সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপে একটি প্রশ্ন ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল: কোনো বক্তব্য বহু শতাব্দী ধরে গ্রহণ করা হয়েছে বলেই কি সেটি সত্য? বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং রাজক্ষমতার দাবির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু আকাশ পর্যবেক্ষণ, মানবদেহ পরীক্ষা এবং প্রকৃতির নিয়ম নিয়ে গণনা করতে গিয়ে অনুসন্ধানীরা এমন ফল পাচ্ছিলেন, যা পুরোনো ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলছিল না। জ্ঞান যাচাইয়ের অধিকার কার—প্রতিষ্ঠানের, নাকি অনুসন্ধানী মানুষের? এই প্রশ্ন থেকেই আলোকায়নের বৌদ্ধিক ভিত্তি শক্ত হতে শুরু করে।

আলোকায়ন কোনো নির্দিষ্ট দিনে ঘোষিত আন্দোলন ছিল না। এর সবচেয়ে পরিচিত বিকাশ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ঘটলেও প্রস্তুতি চলেছিল আগের শতাব্দীজুড়ে। রেনেসাঁর পাঠসমালোচনা, ধর্মসংস্কারের ফলে খ্রিষ্টীয় কর্তৃত্বের বিভাজন এবং দূরদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ইউরোপীয়দের পরিচিত জগতের সীমা প্রসারিত করেছিল। তবে মধ্যযুগকে সম্পূর্ণ চিন্তাহীন অন্ধকার হিসেবে দেখলে ইতিহাস বিকৃত হয়। মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তিবিদ্যা এবং আরবি ও লাতিন ভাষায় সংরক্ষিত জ্ঞানও নতুন অনুসন্ধানের ভিত্তি জুগিয়েছিল। পরিবর্তনটি ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্ঞানকে আরও কঠোরভাবে যাচাই করার প্রবণতায়।

এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি নিকোলাস কোপার্নিকাস। ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থে পৃথিবীর পরিবর্তে সূর্যকে গ্রহগুলোর গতির কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। তাঁর মডেলের সব অংশ নির্ভুল ছিল না; বৃত্তাকার কক্ষপথের ধারণাও রয়ে গিয়েছিল। তবু পৃথিবী স্থির এবং মহাবিশ্বের কেন্দ্র—এই প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিকল্প তৈরি হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ইয়োহানেস কেপলার টাইকো ব্রাহের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে দেখান, গ্রহের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার। প্রকৃতিকে কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রত্যাশার চেয়ে প্রকৃতি সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য গুরুত্ব পেতে থাকে।

গ্যালিলিও গ্যালিলেই এই পরিবর্তনকে দৃশ্যমান প্রমাণের শক্তি দেন। ১৬০৯ সাল থেকে উন্নত দূরবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তিনি চাঁদের অসমতল পৃষ্ঠ, বৃহস্পতির উপগ্রহ এবং পরে শুক্রের কলা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। বৃহস্পতির চারদিকে উপগ্রহ ঘোরা দেখায়, সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় না। শুক্রের কলা প্রচলিত টলেমীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দেয়, যদিও তা একাই পৃথিবীর গতি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেনি। ১৬৩৩ সালে গ্যালিলিওর বিচার দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধানের ফল ধর্মগ্রন্থের অনুমোদিত ব্যাখ্যার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে অনুসন্ধানীর স্বাধীনতা কতটা সীমিত হতে পারে।

নতুন বিজ্ঞানের শক্তি শুধু দূরবীক্ষণে ছিল না; ছিল অনুসন্ধানের পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতায়। ফ্রান্সিস বেকন ১৬২০ সালের নোভুম অর্গানুম গ্রন্থে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং সংগৃহীত তথ্য থেকে সতর্কভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেন। মানুষের অভ্যাস, ভাষা ও পূর্বধারণা কীভাবে বিচারকে বিভ্রান্ত করে, সেটিও তিনি বিশ্লেষণ করেন। বেকন একা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান আবিষ্কার করেননি। তাঁর বিশেষ অবদান ছিল এমন একটি কর্মসূচি তুলে ধরা, যেখানে জ্ঞানকে সহযোগিতামূলক অনুসন্ধান এবং মানুষের বাস্তব জীবন উন্নত করার উপায় হিসেবে দেখা হয়।

রেনে দেকার্ত নিশ্চয়তার সন্ধান করেন অন্য পথে। ১৬৩৭ সালের ডিসকোর্স অন মেথড-এ তিনি দেখাতে চান, গ্রহণ করা বিশ্বাসগুলোকে পদ্ধতিগত সন্দেহের মুখে ফেলে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের ভিত্তি খুঁজতে হবে। সন্দেহ করার কাজটিই চিন্তাশীল নিজের অস্তিত্বের নিশ্চয়তা দেয়—এই যুক্তি তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে আসে। গণিতের সুস্পষ্টতা তাঁকে আকর্ষণ করেছিল। বেকনের পরীক্ষামুখী অনুসন্ধান এবং দেকার্তের যুক্তিনির্ভর পদ্ধতি এক ছিল না, কিন্তু উভয়েই কেবল প্রাচীন লেখকের মর্যাদাকে সত্য নির্ধারণের যথেষ্ট ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।

এই বৈচিত্র্য বোঝা জরুরি, কারণ আলোকায়ন নিছক যুক্তির জয়ধ্বনি ছিল না। যুক্তিবাদীরা জ্ঞান নির্মাণে বুদ্ধির অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেন; অভিজ্ঞতাবাদীরা জ্ঞানের উপাদান আসে কীভাবে, সেই প্রশ্নে অভিজ্ঞতার ভূমিকা সামনে আনেন। বাস্তব বৈজ্ঞানিক চর্চায় আবার পর্যবেক্ষণ, গণিত, অনুমান এবং পরীক্ষা পরস্পরের সাহায্য নেয়। চিকিৎসক উইলিয়াম হার্ভি ১৬২৮ সালে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালন সম্পর্কে নিজের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেন। শারীরস্থান, প্রাণীদেহে পরীক্ষা এবং পরিমাণগত যুক্তির সমন্বয় দেখিয়ে দেয়, প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যার সম্মানিত মতও নতুন প্রমাণে সংশোধিত হতে পারে।

আইজ্যাক নিউটনের ১৬৮৭ সালের প্রিন্সিপিয়া এই পরিবর্তনকে অসাধারণ ব্যাপ্তি দেয়। গতির সূত্র ও সর্বজনীন মহাকর্ষের সাহায্যে পৃথিবীর বস্তুর গতি এবং আকাশের গ্রহগুলোর গতিকে একই গাণিতিক কাঠামোয় ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। আকাশ ও পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নিয়ম মেনে চলে—এই পুরোনো বিভাজন দুর্বল হয়ে পড়ে। এর দার্শনিক তাৎপর্য ছিল গভীর: প্রকৃতির এত বিচিত্র ঘটনায় যদি অনুসন্ধানযোগ্য নিয়ম থাকে, তবে সমাজ ও মানুষের আচরণও কি যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে? পরবর্তী আলোকায়নচিন্তায় এই আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।

জ্ঞানচর্চার জন্য নতুন সামাজিক ব্যবস্থাও তৈরি হচ্ছিল। ১৬৬০ সালে লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটির সূচনা হয়; ১৬৬৬ সালে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয় আকাদেমি দে সিয়ঁস। বৈজ্ঞানিক সংগঠনগুলো পর্যবেক্ষণ জানানো, পরীক্ষা প্রদর্শন এবং ফল নিয়ে আলোচনার সুযোগ বাড়ায়। ১৬৬৫ সালে ফিলসফিক্যাল ট্রানজ্যাকশনস প্রকাশ শুরু হলে গবেষণার সংবাদ বিনিময়ের একটি স্থায়ী মাধ্যম তৈরি হয়। জ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যক্তির খ্যাতির পাশাপাশি পদ্ধতি, সাক্ষ্য এবং অন্যের যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানেও প্রবেশাধিকার ছিল অসম; নারী ও নিম্নবিত্ত মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল।

মুদ্রণযন্ত্র, চিঠিপত্র এবং বইয়ের আন্তর্জাতিক বাজার এই অনুসন্ধানকে ছড়িয়ে দেয়। আমস্টারডাম ও লেইডেনের মতো প্রকাশনাকেন্দ্র রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বাধার মুখে পড়া লেখকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চিঠির মাধ্যমে সংযুক্ত পণ্ডিতদের বিস্তৃত যোগাযোগজালকে প্রায়ই রিপাবলিক অব লেটার্স বলা হয়। ইংল্যান্ডের কফিহাউসগুলোতে সংবাদ, বাণিজ্য ও বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে আলোচনাও বাড়ছিল। তবু এই পরিসরকে সর্বজনীন স্বাধীনতার ক্ষেত্র ভাবা ভুল হবে। সাক্ষরতা, অর্থ, ভাষা এবং সামাজিক অবস্থান ঠিক করত কে আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন এবং কার বক্তব্য গুরুত্ব পাবে।

ধর্মীয় সংঘাত নতুন চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। ত্রিশ বছরের যুদ্ধ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন বিশ্বাসের ঐক্য বলপ্রয়োগে প্রতিষ্ঠার মূল্য স্পষ্ট করে দেয়। ১৬৮৫ সালে ফ্রান্সে নঁতের ফরমান প্রত্যাহার প্রোটেস্ট্যান্টদের বিপন্ন করে এবং বহু মানুষ দেশত্যাগ করেন। এই অভিজ্ঞতার মধ্যে পিয়ের বেইলের মতো লেখকেরা বিবেকের স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা নিয়ে যুক্তি দেন। বারুখ স্পিনোজা ১৬৭০ সালের ধর্মতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক গ্রন্থে ধর্মগ্রন্থকে তার ভাষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের বাইরে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার ক্রমে রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

তবে বিজ্ঞান বিকশিত হওয়া মানেই ধর্ম বিলুপ্ত হওয়া ছিল না। বেকন, দেকার্ত ও নিউটন প্রত্যেকেই নিজস্বভাবে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেক অনুসন্ধানীর কাছে প্রকৃতির নিয়ম বোঝা ঈশ্বরের সৃষ্টির শৃঙ্খলা অনুধাবনের পথ। অন্যদিকে স্পিনোজার দর্শন প্রচলিত ধর্মতত্ত্বকে অনেক বেশি মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে। ফলে আলোকায়নের সূচনাকে বিজ্ঞান ও ধর্মের সরল যুদ্ধ হিসেবে দেখলে তার ভেতরের মতপার্থক্য হারিয়ে যায়। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল কোন প্রশ্নে কার কর্তৃত্ব চলবে এবং যুক্তিসম্মত সমালোচনার সীমা কোথায়।

রাষ্ট্র সম্পর্কেও একইভাবে প্রতিষ্ঠিত ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় টমাস হবস ১৬৫১ সালের লেভায়াথান-এ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে মানুষের পারস্পরিক চুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করেন, যদিও তাঁর সিদ্ধান্ত শক্তিশালী সার্বভৌম ক্ষমতার পক্ষে যায়। জন লক ভিন্নভাবে সম্মতি, প্রাকৃতিক অধিকার এবং সীমিত সরকারের যুক্তি বিকশিত করেন। তাঁর জ্ঞানতত্ত্বে অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। এই চিন্তাগুলো এক অভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করেনি; কিন্তু শাসনের বৈধতা বিচার করতে মানুষের স্বার্থ ও যুক্তিকে সামনে এনেছিল।

নতুন যুগের সীমাবদ্ধতাও প্রকট ছিল। স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা চলার পাশাপাশি ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তার ও আটলান্টিক দাসবাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। নারীরা শিক্ষার সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে বৈষম্যের মুখোমুখি হন। তবু মেরি অ্যাস্টেল ১৬৯৪ সালে নারীর শিক্ষার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যুক্তি যদি মানুষের মর্যাদার ভিত্তি হয়, তবে নারীকে সেই যুক্তিচর্চা থেকে বঞ্চিত করা যায় কেন—এমন প্রশ্ন প্রতিষ্ঠিত সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে। সার্বজনীনতার দাবি ও বাস্তব বঞ্চনার এই ব্যবধান আলোকায়নের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে।

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ পুরোনো সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই বাস করছিলেন। তবু জ্ঞান, ধর্ম এবং শাসনকে প্রশ্ন করার ভাষা বদলে গিয়েছিল। দূরবীক্ষণযন্ত্রে দেখা আকাশ, পরীক্ষায় সংশোধিত চিকিৎসাবিদ্যা এবং সম্মতির ভিত্তিতে বিচার করা রাষ্ট্র একটি নতুন বৌদ্ধিক সম্ভাবনা তৈরি করে। মানুষ শুধু উত্তর গ্রহণ করবে না; উত্তরটি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, তারও হিসাব চাইবে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই অনুসন্ধিৎসাই বই, বিতর্ক ও জনপরিসরে বিস্তৃত হয়ে ক্ষমতা, অধিকার এবং সমাজসংস্কারের আরও সুস্পষ্ট দাবিতে রূপ নিতে শুরু করবে।