বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কোকো শ্যানেল: পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে নারীর জীবনধারা বদলে দেওয়ার ইতিহাস

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

কোকো শ্যানেল: পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে নারীর জীবনধারা বদলে দেওয়ার ইতিহাস
স্বাচ্ছন্দ্য, সরলতা ও আধুনিক রুচিতে নারীর পোশাক বদলে দিয়েছিলেন কোকো শ্যানেল।

একটি পোশাক সুন্দর দেখালেও যদি তা পরে সহজে হাঁটা, বসা কিংবা হাত তোলা না যায়, তবে সেই সৌন্দর্য কার জন্য? বিশ শতকের গোড়ার ইউরোপে নারীর পোশাক নিয়ে এই প্রশ্নের তাৎপর্য ছিল গভীর। আঁটসাঁট কোমরবন্ধ, ভারী অলংকরণ এবং শরীরকে নির্দিষ্ট আকৃতিতে ধরে রাখার ব্যবস্থা সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোকো শ্যানেল এই পরিবেশে এমন পোশাক জনপ্রিয় করেন, যার কেন্দ্রে ছিল ব্যবহারকারীর চলাফেরা ও স্বাচ্ছন্দ্য। তিনি একা নারীর পোশাক বদলাননি, কিন্তু পরিবর্তিত জীবনযাত্রার জন্য একটি প্রভাবশালী রুচি তৈরি করেছিলেন।

১৮৮৩ সালের ১৯ আগস্ট ফ্রান্সের সোম্যুরে জন্ম নেওয়া শ্যানেলের আসল নাম গ্যাব্রিয়েল বনর শ্যানেল। শৈশব ছিল দারিদ্র্য ও পারিবারিক অনিশ্চয়তায় ভরা। মায়ের মৃত্যুর পরে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাটে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে। সেলাই শেখা পরবর্তীকালে তাঁর পেশার ভিত্তি গড়ে দেয়। তরুণ বয়সে মঞ্চে গান গাওয়ার চেষ্টা করেন এবং সেই সময়ে ‘কোকো’ নামটি পরিচিত হয়। তবে তাঁর প্রথম জীবন নিয়ে প্রচলিত সব গল্প সমান নির্ভরযোগ্য নয়; নিজের অতীত সম্পর্কে তিনিও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছিলেন।

শ্যানেলের ব্যবসার সূচনা হয় টুপি তৈরির মাধ্যমে। তাঁর সরল, সংযত টুপি তখনকার ভারী পালক ও অতিরিক্ত সাজসজ্জার বিকল্প হয়ে ওঠে। প্যারিসের পরে দোভিল ও বিয়ারিৎসের মতো সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশযাপনকেন্দ্রে ব্যবসা বিস্তার করেন। এই স্থানগুলোর জীবনযাত্রা তাঁর নকশায় প্রভাব ফেলে। হাঁটা, খেলাধুলা, সমুদ্রের ধারে সময় কাটানো কিংবা বাইরে ঘোরার জন্য আরামদায়ক পোশাক দরকার ছিল। ধনী ক্রেতাদের এই চাহিদাকে তিনি নতুন নকশার সুযোগ হিসেবে বুঝতে পেরেছিলেন।

তাঁর সাফল্যের পেছনে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক যোগাযোগও ছিল। বিশেষত আর্থার ‘বয়’ ক্যাপেলের সহযোগিতা ব্যবসা গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তাঁকে সম্পূর্ণ সহায়তাহীন অবস্থায় একা সাম্রাজ্য গড়া নারী হিসেবে দেখানো ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে। বরং তাঁর দক্ষতা ছিল প্রাপ্ত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। তিনি শুধু পোশাক তৈরি করতেন না; নিজে সেগুলো পরতেন এবং নিজের জীবনযাত্রাকে সেই পোশাকের গ্রহণযোগ্যতার অংশ করে তুলতেন।

শ্যানেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল নরম বোনা কাপড়ের ব্যবহার। এই কাপড় আগে অন্তর্বাস, খেলাধুলা বা সাধারণ ব্যবহারিক পোশাকের সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল। তিনি তা দিয়ে মার্জিত দৈনন্দিন পোশাক তৈরি করেন। কাপড় শরীরের সঙ্গে সহজে নড়াচড়া করত, ভারী কাঠামোর প্রয়োজন কমাত এবং তুলনামূলক স্বাভাবিক অবয়ব তৈরি করত। নাবিকের পোশাক ও পুরুষের ব্যবহারিক পোশাক থেকেও অনুপ্রেরণা নেন। পরিচিত উপাদানকে নতুন সামাজিক মর্যাদা দেওয়াই এখানে তাঁর বিশেষত্ব।

এই পরিবর্তন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। নারীরা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছিলেন, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছিল এবং অতিরিক্ত আড়ম্বরের ব্যবহারিক অসুবিধা স্পষ্ট হচ্ছিল। অবশ্য কর্মজীবী নারী অনেক আগে থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাক পরতেন। শ্যানেলের ভূমিকা ছিল সেই ব্যবহারিকতার কিছু বৈশিষ্ট্যকে উচ্চমানের পোশাকের জগতে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। তিনি চলাফেরার স্বাধীনতাকে সৌন্দর্যের বিরোধী হিসেবে দেখেননি; বরং আরাম ও মার্জিত চেহারাকে একই নকশায় মিলিয়েছিলেন।

শ্যানেলকে প্রায়ই নারীর আঁটসাঁট কোমরবন্ধের একমাত্র অবসানকারী বলা হয়। বাস্তবে এই পরিবর্তনে অন্য নকশাকার, চিকিৎসাগত আলোচনা, খেলাধুলা এবং সামাজিক রূপান্তরও ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর বিশেষ অবদান ছিল সহজ অবয়ব, নরম কাপড় এবং কম অলংকরণকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। পোশাক যেন শরীরকে প্রদর্শনের জন্য স্থির করে রাখার বদলে জীবনের কাজগুলো করতে সাহায্য করে—এই নীতিই তাঁর নকশায় বারবার ফিরে আসে। ফলে তাঁর প্রভাব বুঝতে হলে আবিষ্কারের দাবির চেয়ে নকশার বিস্তার ও গ্রহণযোগ্যতা দেখতে হয়।

১৯২৬ সালে একটি সরল কালো পোশাকের নকশা মার্কিন ‘ভোগ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হলে তা বিশেষ আলোচনায় আসে। কালো রঙের পোশাক তখনও ছিল; শ্যানেল কালো রং কিংবা ছোট কালো পোশাক প্রথম আবিষ্কার করেননি। তবে শোক, সেবামূলক কাজ বা নির্দিষ্ট সামাজিক ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত রংটিকে তিনি আধুনিক সৌন্দর্যের শক্তিশালী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেন। একই সংযত পোশাক গয়না ও অন্যান্য অনুষঙ্গ বদলে বিভিন্ন উপলক্ষে ব্যবহার করা যেত। এই বহুমুখিতা নারীর পোশাক নির্বাচনে নতুন গুরুত্ব পায়।

গয়নাতেও তিনি একইভাবে প্রচলিত মর্যাদার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। দামি রত্নের পাশাপাশি অনুকরণে তৈরি মুক্তা ও সাজসজ্জার গয়না ব্যবহার করতেন। এর ফলে গয়নার মূল্য শুধু উপাদানের দাম দিয়ে বিচার করার বদলে সামগ্রিক সাজের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা শক্তিশালী হয়। অবশ্য তাঁর তৈরি পোশাক সাধারণ মানুষের জন্য সস্তা ছিল না। এখানে একটি পার্থক্য রয়েছে: শ্যানেলের বিলাসবহুল পণ্য সীমিত ক্রেতার নাগালে থাকলেও তাঁর নকশার ভাষা অনুকরণ ও ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৯২১ সালে সুগন্ধি প্রস্তুতকারক এর্নেস্ট বোয়ের সহযোগিতায় বাজারে আসে ‘শ্যানেল নম্বর পাঁচ’। একক ফুলের সরাসরি গন্ধের পরিবর্তে জটিল মিশ্র সুবাস এবং সংযত বোতলের নকশা তাকে আলাদা পরিচয় দেয়। সুগন্ধির মাধ্যমে শ্যানেলের নাম পোশাকের বাইরেও বিস্তার লাভ করে। একজন নকশাকারের পরিচয় যে পোশাক, গয়না, সুগন্ধি ও জীবনযাত্রার সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হতে পারে, তাঁর ব্যবসা তার শক্তিশালী উদাহরণ। তবে সুগন্ধির ব্যবসায় অংশীদারত্ব নিয়ে দীর্ঘ বিরোধও তাঁর জীবনের অংশ ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর উত্তরাধিকারের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় তৈরি হয়। ১৯৩৯ সালে পোশাক তৈরির ব্যবসা বন্ধ করে দেন। জার্মান অধিকৃত প্যারিসে তাঁর সঙ্গে জার্মান গোয়েন্দাসংশ্লিষ্ট হান্স গুন্টার ফন ডিনকলাগের সম্পর্ক ছিল। ঐতিহাসিক গবেষণায় নাৎসি গোয়েন্দা কার্যক্রমে তাঁর সংশ্লিষ্টতার নথিও আলোচিত হয়েছে। ইহুদি অংশীদারদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতির সুযোগ নিয়ে সুগন্ধির ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টাও তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিতর্ক নয়; নিপীড়নমূলক ক্ষমতার সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্কের প্রশ্ন।

তাঁর যুদ্ধকালীন ভূমিকার কিছু দিক নিয়ে গবেষণা ও ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু পোশাকের ইতিহাসে অবদানের কারণে সেই অধ্যায় উপেক্ষা করা যায় না। নারীর জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় নকশা তৈরি করা এবং নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে অন্য মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা দুটি আলাদা মূল্যায়নের বিষয়। শ্যানেলকে বুঝতে হলে অর্জন ও নৈতিক ব্যর্থতা পাশাপাশি দেখতে হয়। তাঁকে সম্পূর্ণ নির্ভুল মুক্তিদাত্রী হিসেবে উপস্থাপন করলে তাঁর জীবন ও কাজের জটিলতা হারিয়ে যায়।

১৯৫৪ সালে সত্তর বছর বয়সে শ্যানেল পোশাকের জগতে ফিরে আসেন। যুদ্ধোত্তর সময়ে আঁটসাঁট কোমর ও পূর্ণাঙ্গ স্কার্টের বিপরীতে তিনি আবার সহজে পরার উপযোগী পোশাককে গুরুত্ব দেন। নরম পশমি কাপড়ের কলারবিহীন জ্যাকেট ও মানানসই স্কার্ট তাঁর পরবর্তী পরিচয়ের কেন্দ্রে আসে। জ্যাকেটের গঠন, আরামদায়ক হাতা এবং কাপড়ের নমনীয়তা চলাফেরা সহজ করত। এই পোশাক সামাজিক অনুষ্ঠান ও পেশাগত পরিবেশে ব্যবহারযোগ্য মার্জিত সাজের একটি স্থায়ী আদর্শ হয়ে ওঠে।

১৯৫৫ সালে তাঁর শিকলযুক্ত কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগও ব্যবহারিকতার একই চিন্তা প্রকাশ করে। হাতে ব্যাগ ধরে রাখার বদলে কাঁধে বহন করলে হাত অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়। তিনি কাঁধের ব্যাগ প্রথম উদ্ভাবন করেননি, তবে তার একটি প্রভাবশালী বিলাসবহুল সংস্করণ তৈরি করেন। ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হলেও নকশার এই ভাষা টিকে থাকে। কোকো শ্যানেলের বড় পরিবর্তন ছিল সৌন্দর্যকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মেলানো। তাঁর ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, পোশাক কখনো শুধু সাজ নয়; তা চলাফেরা, সামাজিক উপস্থিতি এবং নিজের জীবন পরিচালনার অভিজ্ঞতাকেও বদলে দিতে পারে।


আপনার পছন্দ হতে পারে