বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

তাকলামাকান মরুভূমি: বালুর সমুদ্রের নিচে হারানো নগর ও প্রাচীন মানুষের ইতিহাস

তাকলামাকান মরুভূমি: বালুর সমুদ্রের নিচে হারানো নগর ও প্রাচীন মানুষের ইতিহাস
তাকলামাকানের চলমান বালুর মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বসতি, নদী ও বাণিজ্যপথের চিহ্ন।

চারদিকে বালুর ঢেউ, দিগন্তে কাঁপতে থাকা উত্তপ্ত বাতাস, আর দূরে তুষারঢাকা পাহাড়। এই দৃশ্যের মধ্যে কোথাও মাটির দেয়ালের ভাঙা অংশ, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া নদীর রেখা, কোথাও প্রাচীন মানুষের সমাধি। চীনের তাকলামাকান মরুভূমি তাই শুধু বিশাল বালুর বিস্তার নয়। এটি এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে পানির উপস্থিতি সভ্যতা তৈরি করেছে, আবার পানির গতিপথ বদলে যাওয়া বসতি পরিত্যাগের কারণ হয়েছে। এর ভেতরে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভূগোলের সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব ও মানুষের অভিযোজনের ইতিহাসও দেখতে হয়।

তাকলামাকান চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিনজিয়াংয়ে, তারিম অববাহিকার বড় অংশজুড়ে অবস্থিত। প্রায় তিন লাখ ত্রিশ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই মরুভূমি পৃথিবীর বৃহত্তম বালুময় মরুভূমিগুলোর একটি। উত্তরে তিয়ান শান, দক্ষিণে কুনলুন এবং পশ্চিমে পামিরের উঁচু ভূমি একে ঘিরে রেখেছে। মানচিত্রে অঞ্চলটিকে বিশাল একটি বাটির মতো মনে হয়। তবে তারিম অববাহিকা ও তাকলামাকান পুরোপুরি একই জিনিস নয়; অববাহিকার মধ্যে মরূদ্যান, নদী ও বসতিও রয়েছে।

নামটির সঙ্গে সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যা হলো, এখানে ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। এটি মরুভূমির বিপজ্জনক পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হলেও নিশ্চিত ভাষাতাত্ত্বিক অনুবাদ হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। তাকলামাকান নামের উৎস নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে এবং গবেষকদের মধ্যে মতভেদও আছে। তাই ‘ফিরে না আসার মরুভূমি’ কথাটি জনপ্রিয় পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত শব্দার্থ হিসেবে নয়। মরুভূমির বাস্তব প্রতিকূলতা বোঝাতে এই কিংবদন্তির ওপর নির্ভর করারও প্রয়োজন নেই।

এই প্রতিকূলতার মূল কারণ পানির অভাব। সমুদ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থান এবং চারপাশের পাহাড় আর্দ্র বাতাস পৌঁছানো কঠিন করে তোলে। পাহাড়ের বৃষ্টিচ্ছায়ায় অববাহিকার ভেতর অত্যন্ত শুষ্ক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিছু অংশে বছরে দশ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিও পড়ে না। অন্যদিকে বাষ্পীভবনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফলে অল্প পানি দীর্ঘ সময় খোলা পৃষ্ঠে টিকে থাকতে পারে না। বিস্তৃত এলাকায় উদ্ভিদ কম থাকায় বালু ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাও দুর্বল।

তাকলামাকানের বড় অংশ চলমান বালিয়াড়িতে ঢাকা। কিছু বালিয়াড়ি দুইশ থেকে তিনশ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বাতাস বালুকণা তুলে এক ঢাল থেকে অন্য ঢালে সরিয়ে দেয়; দীর্ঘ সময়ে বালিয়াড়ির আকৃতি ও অবস্থান বদলায়। তবে বালিয়াড়ি আর ধুলাঝড় এক প্রক্রিয়ার সমান দৃশ্য নয়। তুলনামূলক ভারী বালুকণা সাধারণত মাটির কাছাকাছি চলে, আর সূক্ষ্ম ধুলো বাতাসে অনেক ওপরে উঠতে পারে। প্রবল ঝড়ে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া ও পরিচিত পথ আড়াল হওয়া চলাচলকে বিপজ্জনক করে।

এটি সারা বছর গরম থাকা উষ্ণমণ্ডলীয় মরুভূমিও নয়। মহাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থানের কারণে গ্রীষ্মে তাপ এবং শীতে প্রবল ঠান্ডা—দুই অভিজ্ঞতাই রয়েছে। কখনো তুষারও পড়ে। দিনের সঙ্গে রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। তাই শুধু প্রচণ্ড গরমের প্রস্তুতি নিয়ে এই পরিবেশ বোঝা যায় না। পানি, আশ্রয়, পথনির্দেশ ও যোগাযোগের অভাবের সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন যুক্ত হলে বিপদ বাড়ে।

অথচ চারপাশের পাহাড়ই আবার জীবনের পানির উৎস। তুষার ও হিমবাহের গলিত পানি এবং পাহাড়ি বৃষ্টির পানি নদী হয়ে অববাহিকায় নামে। কোথাও তা মরূদ্যান তৈরি করে, কোথাও বালুর মধ্যে ক্ষীণ হয়ে যায়। নদীর পানি মাটিতে প্রবেশ, সেচে ব্যবহার ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে কমতে থাকে। এই অঞ্চলের জলপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে পৌঁছায় না। ফলে এখানে মানুষের বসতি ও কৃষির অবস্থান বুঝতে নদীর গতিপথ এবং ভূগর্ভস্থ পানির সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন রেশমপথের প্রধান শাখাগুলো তাকলামাকানের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের মরূদ্যান ধরে এগিয়েছিল। কাফেলার জন্য পানি, পশুর খাবার, আশ্রয় এবং বাজার দরকার ছিল। তাই পথটি মরুভূমির কেন্দ্র দিয়ে টানা একটি সরল রেখা ছিল না। কাশগর, খোটান ও কুচার মতো কেন্দ্রের মাধ্যমে পণ্য, ভাষা, ধর্ম ও শিল্পের আদানপ্রদান ঘটত। আজ যাকে অনুর্বর প্রান্তর মনে হয়, তার ধার বরাবর একসময় বহু সমাজের সংযোগ গড়ে উঠেছিল।

এই ইতিহাসের অবশেষ পাওয়া যায় নিয়া, দানদান উইলিক এবং বৃহত্তর তারিম অঞ্চলের লৌলানের মতো প্রত্নস্থানে। কোথাও বসতবাড়ির কাঠামো, কোথাও ধর্মীয় স্থাপনা, চিত্রকর্ম, বস্ত্র ও লিখিত নথি উদ্ধার হয়েছে। দানদান উইলিকের নিদর্শন বৌদ্ধধর্মীয় জীবন ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সাক্ষ্য বহন করে। এসব স্থান এক সময়ের নয় এবং একই কারণে পরিত্যক্তও হয়নি। সব ধ্বংসাবশেষকে একটি আকস্মিক বালুঝড়ে হারিয়ে যাওয়া একক সভ্যতার গল্পে রূপ দিলে প্রকৃত ইতিহাস অস্পষ্ট হয়।

বসতি হারানোর ব্যাখ্যায় পানির ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নদীর শাখা সরে গেলে বা জলপ্রবাহ কমলে কৃষি ও দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হতে পারে। সেচব্যবস্থার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাণিজ্যপথের গুরুত্ব বদলানোও প্রভাব ফেলেছে। লৌলানের ইতিহাস বৃহত্তর লোপ নুর অঞ্চলের জলব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তবে কোনো প্রাচীন নগরের পতনকে শুধু জলবায়ু বা শুধু মানুষের কাজ দিয়ে ব্যাখ্যা করার আগে স্থানভিত্তিক প্রমাণ পরীক্ষা করা জরুরি।

তারিম অববাহিকার স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষিত মমিগুলো আরও পুরোনো মানবজীবনের পরিচয় দেয়। অত্যন্ত শুষ্ক পরিবেশে পচন ধীর হওয়ায় কিছু দেহের সঙ্গে চুল, পোশাক ও সমাধিসামগ্রী টিকে গেছে। এগুলো মিশরের মতো একই প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা মমি নয়। আবার তারিম অঞ্চলের সব মমি একই যুগের বা একই জনগোষ্ঠীরও নয়। তাদের পোশাক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক অনুমান তৈরি হলেও বাহ্যিক চেহারা থেকে সরাসরি ভাষা বা জাতিগত পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না।

২০২১ সালের একটি প্রাচীন বংশগতিবিষয়ক গবেষণা প্রাথমিক ব্রোঞ্জযুগের কয়েকটি তারিম সমাধিস্থলের মানুষ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। বিশ্লেষিত ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন স্থানীয় বংশগত ধারার পরিচয় পাওয়া যায়, যদিও তাঁদের জীবনযাত্রায় প্রতিবেশী সমাজের কৃষি ও পশুপালনের প্রভাব ছিল। এর অর্থ সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ঘটতে সব সময় ব্যাপক জনস্থানান্তর দরকার হয় না। তবে সীমিত নমুনার এই ফলকে সমগ্র তারিম অঞ্চলের সব যুগের মানুষের পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

আধুনিক তাকলামাকানের ভেতর দিয়ে সড়ক গেছে; গবেষণাকেন্দ্র এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কার্যক্রমও রয়েছে। সড়ক বালুচাপা পড়া ঠেকাতে কিছু অংশে উদ্ভিদবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে উপযুক্ত প্রজাতি ও নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সড়কের পাশের সবুজ রেখা মানেই পুরো মরুভূমি বনে পরিণত হচ্ছে না। পানির প্রাপ্যতা, লবণাক্ততা ও রক্ষণাবেক্ষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ সীমা। তাকলামাকানের আসল বিস্ময় এই যে, একই ভূখণ্ডে চলমান বালু, গভীর ভূগর্ভের সম্পদ এবং মানুষের বহু সহস্রাব্দের স্মৃতি পাশাপাশি রয়েছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে