বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কাস্তেল দেল মন্তে: ইতালির রহস্যময় অষ্টভুজ দুর্গ কেন আজও ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করে?

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

কাস্তেল দেল মন্তে: ইতালির রহস্যময় অষ্টভুজ দুর্গ কেন আজও ইতিহাসবিদদের বিস্মিত করে?
আট কোণের পাথুরে স্থাপত্যে সাম্রাজ্য ও রহস্যের ছাপ

ইতালির দক্ষিণে পুলিয়া অঞ্চলের মুরজিয়া পাহাড়ি ভূমিতে কাস্তেল দেল মন্তে দূর থেকেই চোখে পড়ে। হালকা রঙের পাথরের একটি অষ্টভুজ ভবন, যার প্রতিটি কোণে আবার অষ্টভুজ টাওয়ার। নেই পরিচিত রূপকথার দুর্গের সূচালো ছাদ কিংবা চারপাশে বিস্তৃত পরিখা। তার সৌন্দর্য এসেছে সংযত অবয়ব, জ্যামিতি এবং পাহাড়ের ওপর একক উপস্থিতি থেকে। কাস্তেল দেল মন্তের সবচেয়ে বড় রহস্য কোনো লুকানো সুড়ঙ্গ নয়; এত ব্যতিক্রমী নকশার ভবন কেন নির্মিত হয়েছিল, সেই প্রশ্ন। ইতিহাসবিদেরা এর সামরিক, আবাসিক ও প্রতীকী ভূমিকা নিয়ে এখনো আলোচনা করেন।

দুর্গটি আন্দ্রিয়া শহরের কাছে একটি পাথুরে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে আশপাশের বিস্তৃত ভূমি পর্যবেক্ষণ করা যায়। বর্তমানের তুলনামূলক নির্জন পরিবেশ দেখে মনে হতে পারে, নির্মাতা ইচ্ছাকৃতভাবে জনজীবন থেকে অনেক দূরে ভবনটি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মধ্যযুগে এটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি ও যোগাযোগপথের কাছাকাছি ছিল। তাই অবস্থানকে শুধু রহস্যময় নিঃসঙ্গতা হিসেবে দেখা যথাযথ নয়। উঁচু ভূমি, দৃশ্যমানতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় দুর্গটির অবস্থান বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মাণের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক। তিনি পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের শাসক এবং সিসিলির রাজা ছিলেন। ইতালিতে জন্ম ও সিসিলিতে বেড়ে ওঠার ফলে তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগৎ উত্তর ইউরোপে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জ্ঞানধারা তাঁর দরবারে মিলেছিল। গ্রিক, আরব, ইতালীয় ও ইহুদি পণ্ডিতদের উপস্থিতি তাঁর শাসনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তবে তাঁকে শুধু শান্তিপ্রিয় জ্ঞানসাধক ভাবলে ভুল হবে। রাজকীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, প্রশাসন পরিচালনা এবং বিরোধী শক্তির সঙ্গে সংঘাতও তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

কাস্তেল দেল মন্তের নির্মাণকাল বোঝার গুরুত্বপূর্ণ নথি ১২৪০ সালের। কিন্তু এই তারিখকে বিনা প্রশ্নে নির্মাণের প্রথম দিন কিংবা নিশ্চিত সমাপ্তির বছর বলা কঠিন। সরকারি ঐতিহ্যবিবরণেও নির্মাণের পর্যায় নিয়ে ভিন্ন ভাষা দেখা যায়। নিরাপদভাবে বলা যায়, ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে ফ্রেডেরিকের উদ্যোগে ভবনটি গড়ে ওঠে এবং ১২৪০ সালে এর নির্মাণের নথিগত সাক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পের স্থপতি কে ছিলেন, সেটিও নিশ্চিত নয়। সম্রাট নিজে সম্পূর্ণ নকশা এঁকেছিলেন—এমন জনপ্রিয় ধারণার পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ নেই।

ভবনের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য আট সংখ্যার পুনরাবৃত্তি। মূল পরিকল্পনা অষ্টভুজ, কোণে আটটি অষ্টভুজ টাওয়ার এবং কেন্দ্রীয় উঠানও আট কোণের। দুই তলার প্রতিটিতে আটটি করে কক্ষ রয়েছে। ফলে মোট ষোলোটি প্রধান কক্ষ উঠানকে ঘিরে সাজানো। এই পরিকল্পনা দেখে বোঝা যায়, জ্যামিতি এখানে অলংকরণের অতিরিক্ত উপাদান নয়; পুরো ভবন সংগঠনের ভিত্তি। বাইরের অবয়ব, ভেতরের চলাচল এবং কক্ষের বিন্যাস একই জ্যামিতিক ভাবনার অধীনে এসেছে—মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে যা বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

কক্ষগুলো সাধারণ আয়তাকার নয়; ভেতরের ও বাইরের অষ্টভুজের মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে তাদের পরিকল্পনা ট্রাপিজিয়াম আকৃতির। এই সীমার মধ্যে ছাদের খিলান, দরজা ও জানালার অবস্থান সামঞ্জস্য করা হয়েছে। তিনটি টাওয়ারে সিঁড়ি দুই তলাকে যুক্ত করে। সব কক্ষের মধ্যে একইভাবে সরাসরি চলাচল করা যায় না, ফলে ভবনের ব্যবহার বুঝতে চলাচলের বিন্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ওপর থেকে আট কোণ দেখা যথেষ্ট নয়; মানুষ কোথায় প্রবেশ করত, কীভাবে ঘুরত এবং কোন কক্ষে পৌঁছাত—সেগুলোও নকশার অর্থ প্রকাশ করে।

প্রবেশদ্বারে প্রাচীন ধ্রুপদি স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায়, আর জানালা ও খিলানে গথিক রীতির বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় ও ইসলামি সাংস্কৃতিক সংযোগও আলোচিত হয়। চুনাপাথরের হালকা রঙের পাশে লালচে ব্রেচিয়া পাথর এবং মার্বেল দৃশ্যমান বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। ভাস্কর্য ও খোদাইয়ে মানবমুখ, প্রাণী এবং উদ্ভিদের নকশা ব্যবহৃত হয়েছে। এটি কোনো একটি পরিচিত স্থাপত্যরীতির সরল প্রতিলিপি নয়। বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষতা ও শিল্পভাবনা মিলিয়ে ফ্রেডেরিকের রাজকীয় পরিবেশে নতুন রূপ তৈরি হয়েছিল।

আজ দুর্গের ভেতর অনেকটাই শূন্য, কিন্তু সেই শূন্যতা তার মূল অবস্থার পরিচয় নয়। মার্বেলের আবরণ, মোজাইক এবং অন্যান্য অলংকরণের বহু অংশ হারিয়ে গেছে। ওপরের তলার জানালার কাছে বসার মতো পাথরের ব্যবস্থা এবং কক্ষের সূক্ষ্ম কারুকাজ আবাসিক বা আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের সম্ভাবনা জোরালো করে। বর্তমানের অনাড়ম্বর পাথুরে কক্ষ একসময় অনেক বেশি রঙিন ও সমৃদ্ধ ছিল। হারিয়ে যাওয়া সাজসজ্জা সম্পর্কে গবেষণা তাই সৌন্দর্য পুনর্গঠনের পাশাপাশি ভবনের উদ্দেশ্য বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

প্রচলিত যুদ্ধদুর্গের কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে অনুপস্থিত। পরিখা এবং বৃহৎ বহির্প্রাচীর না থাকায় অনেকে মনে করেন, ভবনটি মূলত যুদ্ধের জন্য নির্মিত হয়নি। কিন্তু এই সিদ্ধান্তও সতর্কতার সঙ্গে নিতে হয়। উঁচু অবস্থান, শক্তিশালী পাথরের কাঠামো এবং সম্রাটের বৃহত্তর দুর্গব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ তার সামরিক গুরুত্বের সম্ভাবনা রাখে। প্রতিরক্ষা ও রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্য ছিল না। একই ভবন নিরাপত্তা দিতে, অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করতে এবং শাসকের উপস্থিতি ঘোষণা করতে পারত; কাস্তেল দেল মন্তেকে একটি মাত্র ব্যবহারে সীমাবদ্ধ করা তাই কঠিন।

শিকারি আবাসের ব্যাখ্যাও দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়। ফ্রেডেরিক বাজপাখি দিয়ে শিকারে আগ্রহী ছিলেন এবং এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। আশপাশের প্রাচীন বনভূমি এমন শিকারের অনুকূল পরিবেশ দিতে পারত। কিন্তু সম্রাটের শিকারপ্রেম থেকেই এই নির্দিষ্ট ভবন নিশ্চিতভাবে শিকারি আবাস ছিল—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। পরিকল্পিত রাজকীয় অনুষ্ঠান কিংবা অতিথি গ্রহণের সম্ভাবনাও রয়েছে। একটি ব্যাখ্যা পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না; নথি, স্থাপত্য এবং বস্তুগত নিদর্শন একসঙ্গে বিচার করতে হয়।

দুর্গের জলব্যবস্থা তার ব্যবহার সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। কিছু টাওয়ারে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জলাধার ছিল; কেন্দ্রীয় উঠানের নিচেও জলাধার রয়েছে। শৌচাগার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং কিছু কক্ষে অগ্নিকুণ্ড বাসযোগ্যতার প্রতি মনোযোগ দেখায়। উঁচু পাহাড়ে পানি সংরক্ষণ ছিল বাস্তব প্রয়োজন, কোনো রহস্যময় আচার নয়। এগুলো প্রমাণ করে, জ্যামিতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের অবস্থানের জন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা পরিকল্পিত ছিল। তবে উন্নত জলব্যবস্থা দেখেই পুরো দুর্গকে নিশ্চিতভাবে স্নানাগার ঘোষণা করা যায় না; সেটি আরও প্রমাণের দাবি রাখে।

অষ্টভুজের প্রতীকী অর্থ নিয়ে বহু ব্যাখ্যা রয়েছে। মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় স্থাপত্যে আট কোণ পুনর্জন্ম ও ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারত; রাজকীয় স্থাপত্যেও এর মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার ছিল। কেউ বর্গ ও বৃত্তের মধ্যবর্তী রূপ হিসেবে অষ্টভুজকে পৃথিবী ও আকাশের সম্পর্কের প্রতীক মনে করেন। কিন্তু ফ্রেডেরিক এই ভবনে ঠিক কোন অর্থ আরোপ করেছিলেন, তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে একটি রূপের অর্থ থাকা এবং নির্দিষ্ট নির্মাতার সেই অর্থ ব্যবহার করা—দুটি আলাদা ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

আলো, ছায়া ও দিকনির্দেশ নিয়েও আলোচনা হয়। ভবনের অবস্থান এবং নিয়মিত জ্যামিতি সূর্যের পরিবর্তিত অবস্থানের সঙ্গে আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরি করে। তবে সেখান থেকে একে বিশাল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, গোপন মন্দির কিংবা পবিত্র গুপ্তধনের আশ্রয় বলা অতিরিক্ত অনুমান। এমন দাবির পক্ষে সমসাময়িক নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দরকার। ইতিহাসবিদদের বিস্ময়ের কারণ অলৌকিকতা নয়; স্থাপত্য এত সুসংগঠিত, অথচ তার মূল কার্যক্রমের বিবরণ এত অসম্পূর্ণ। জানা তথ্য ও অনিশ্চয়তার এই ব্যবধান গবেষণাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।

দীর্ঘ অবহেলা ও অলংকরণ হারানোর পর ইতালীয় রাষ্ট্র ১৮৭৬ সালে দুর্গটি অধিগ্রহণ করে; পরে সংরক্ষণকাজ চলে। ১৯৯৬ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। মূল অষ্টভুজ কাঠামো টিকে থাকলেও ভেতরের ক্ষয় তার ইতিহাস বোঝার সীমা তৈরি করেছে। আজ কাস্তেল দেল মন্তে সম্রাটের রাজনৈতিক দৃষ্টি, ভূমধ্যসাগরীয় শিল্পসংযোগ এবং জ্যামিতিক নির্মাণদক্ষতার অসাধারণ সাক্ষ্য। পাহাড়চূড়ার আট কোণ যেন একটি অসম্পূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন ধরে রেখেছে—ভবনটি আমরা দেখতে পাই, কিন্তু তার নির্মাতার সমস্ত উদ্দেশ্য এখনো পড়ে নিতে পারিনি।