বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রয়্যাল আলকাসার অব সেভিল: ইসলামি স্থাপত্য থেকে স্প্যানিশ রাজপ্রাসাদে রূপান্তরের ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

রয়্যাল আলকাসার অব সেভিল: ইসলামি স্থাপত্য থেকে স্প্যানিশ রাজপ্রাসাদে রূপান্তরের ইতিহাস
ইসলামি শিল্পঐতিহ্যে গড়া খ্রিস্টীয় রাজশক্তির প্রাসাদ

স্পেনের সেভিলে রয়্যাল আলকাসারের ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হয়, পাথর, কাঠ ও প্রলেপের কারুকাজ দিয়ে ইতিহাসকে লিখে রাখা হয়েছে। দেয়ালে আরবি লিপি, খিলানে ইসলামি শিল্পের পরিচিত নকশা, আবার পাশাপাশি কাস্তিলের রাজকীয় প্রতীক। এই সমন্বয় প্রথম দর্শনে বিভ্রান্ত করতে পারে। কারণ প্রাসাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ইসলামি রীতির অংশটি কোনো মুসলিম সুলতানের নির্মাণ নয়; সেটি খ্রিস্টীয় রাজা প্রথম পেদ্রোর উদ্যোগে তৈরি। সেভিলের আলকাসার দেখায়, রাজনৈতিক শাসন বদলালেও শিল্পের ভাষা একইভাবে হারিয়ে যায় না।

‘আলকাসার’ নামটি আরবি ‘আল-কাসর’ থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রাসাদ বা সুরক্ষিত রাজকীয় আবাস। সেভিলের এই স্থানে একাধিক যুগের ভবন পাশাপাশি রয়েছে। কিছু অংশ ইসলামি শাসনামলের, কিছু খ্রিস্টীয় রাজাদের নতুন নির্মাণ, আবার কিছু পরবর্তী পরিবর্তনের ফল। তাই একে একটি পুরোনো মুসলিম প্রাসাদে সামান্য সংস্কার করে তৈরি স্প্যানিশ রাজবাড়ি ভাবলে ইতিহাসের বড় অংশ বাদ পড়ে। রয়্যাল আলকাসার আসলে ধারাবাহিকভাবে নির্মিত ও পুনর্বিন্যস্ত প্রাসাদসমষ্টি, যেখানে প্রতিটি শাসনপর্ব নিজের পরিচয় যুক্ত করেছে।

দশম শতকের উমাইয়া শাসনামলে এখানে সুরক্ষিত প্রশাসনিক ও রাজকীয় কেন্দ্রের বিকাশ ঘটে। পরবর্তী একাদশ শতকে সেভিলের আব্বাদীয় শাসকেরা রাজপ্রাসাদের পরিসর সম্প্রসারিত করেন। আল-মুতামিদের মতো শাসকের দরবারে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তবে সেই যুগের সব ভবন অক্ষত অবস্থায় টিকে নেই। কিছু কাঠামো পরবর্তী নির্মাণে বিলীন হয়েছে; অন্যগুলোর অস্তিত্ব প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে জানা যায়। বর্তমানের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে তাই মনে রাখা দরকার, মাটির নিচে এবং পরবর্তী দেয়ালের আড়ালেও আলকাসারের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।

দ্বাদশ শতকে আলমোহাদ শাসকেরা সেভিলকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেন এবং প্রাসাদাঞ্চলে নতুন নির্মাণ যোগ করেন। তাঁদের স্থাপত্যের কিছু নিদর্শন এখনো দেখা যায়। পাতিও দেল ইয়েসো বা প্রলেপের প্রাঙ্গণ এই উত্তরাধিকারের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এর খিলান, জালিকাসদৃশ নকশা এবং উঠানকেন্দ্রিক বিন্যাস ইসলামি আবাসিক স্থাপত্যের ধারণা প্রকাশ করে। বাইরের শক্তিশালী প্রাচীরের ভেতরে এমন প্রাঙ্গণ আলো, বাতাস ও ব্যক্তিগত জীবনের পরিসর তৈরি করত। নিরাপত্তা ও অন্তর্মুখী সৌন্দর্যের এই সম্পর্ক আলকাসারের পরবর্তী নকশাতেও বজায় থাকে।

১২৪৮ সালে তৃতীয় ফার্দিনান্দ সেভিল দখল করেন। এর ফলে নগরের শাসন মুসলিম কর্তৃত্ব থেকে কাস্তিলের হাতে যায়। কিন্তু নতুন শাসকেরা আলকাসারকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেননি; তাঁরা এখানেই রাজকীয় ব্যবহার বজায় রাখেন। দশম আলফনসোর উদ্যোগে গথিক প্রাসাদ নির্মিত হয়, যেখানে আগের ভবনের ওপর নতুন কক্ষ ও ভিন্ন স্থাপত্যভাষা যুক্ত হয়। এই পরিবর্তন খ্রিস্টীয় রাজশক্তির উপস্থিতি প্রকাশ করেছিল। একই সঙ্গে পুরোনো রাজকীয় অবস্থান ব্যবহার করে নতুন শাসকেরা নগরের পরিচিত ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারাবাহিকতা নিজেদের হাতে নেন।

আলকাসারের সবচেয়ে বিখ্যাত নির্মাণপর্ব আসে চতুর্দশ শতকে প্রথম পেদ্রোর শাসনামলে। প্রধান নির্মাণকাজ সাধারণভাবে ১৩৬৪ থেকে ১৩৬৬ সালের মধ্যে স্থাপন করা হয়। পেদ্রো গথিক প্রাসাদের পাশে নতুন আবাস গড়ে তোলেন, কিন্তু তার শিল্পভাষা বেছে নেন আন্দালুসের ইসলামি ঐতিহ্য থেকে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়: মুসলিম শাসনের অধীনে ইসলামি প্রাসাদ নির্মাণ এবং খ্রিস্টীয় রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামি প্রভাবসমৃদ্ধ প্রাসাদ নির্মাণ একই ঘটনা নয়। দ্বিতীয় ধারাটিই এখানে মুদেখার শিল্পের অসাধারণ প্রকাশ।

মুদেখার স্থাপত্যে ইসলামি নকশা ও কারুশিল্প খ্রিস্টীয় শাসনব্যবস্থার চাহিদার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়। সেভিলের পেদ্রোর প্রাসাদে তোলেদো, গ্রানাডা এবং স্থানীয় কারিগরদের অবদান রয়েছে। তাঁদের কাজে আলমোহাদ ঐতিহ্য, গ্রানাডার নাসরিদ শিল্প এবং তোলেদোর মুদেখার রীতি মিলেছে। প্রাসাদের ইসলামি চেহারা তাই কোনো পরাজিত ভবনের নিছক অবশিষ্টাংশ নয়; সচেতনভাবে নির্বাচিত রাজকীয় শিল্পভাষা। এর সৌন্দর্য পেদ্রোর সম্পদ, সাংস্কৃতিক সংযোগ ও মর্যাদা তুলে ধরত। তবে এই শিল্পসমন্বয়কে সমগ্র সমাজে অবাধ ধর্মীয় সমতার প্রমাণ ভাবাও যথাযথ নয়।

পাতিও দে লাস দোনসেয়াস বা কুমারীদের প্রাঙ্গণ পেদ্রোর প্রাসাদের পরিচিত কেন্দ্র। দীর্ঘ জলাধারের পাশে নিচু বাগান, চারপাশে অলংকৃত খিলান এবং ওপরের তলার বারান্দা একাধিক সময়ের নির্মাণকে যুক্ত করেছে। উঠানকে কেন্দ্র করে কক্ষগুলোর বিন্যাস আলো ও চলাচলের ব্যবস্থা গড়ে তোলে। জলাধারের স্থির পৃষ্ঠে খিলানের প্রতিবিম্ব প্রাঙ্গণের সৌন্দর্য বাড়ায়। নামটির সঙ্গে জনপ্রিয় নানা গল্প থাকলেও ‘কুমারীদের প্রাঙ্গণ’ নামকে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক করপ্রথার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। স্থাপত্যের বাস্তব ইতিহাস এবং নামঘিরে লোককথা আলাদা বিষয়।

এই প্রাঙ্গণের বর্তমান দৃশ্যও দীর্ঘ পরিবর্তনের ফল। পরবর্তী সময়ে পুরোনো বাগান ও জলাধার ঢেকে মেঝে তৈরি করা হয়েছিল। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আগের বিন্যাসের অবশেষ পাওয়ার পর তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুনরুদ্ধার করা হয়। ফলে আজ দৃশ্যমান মধ্যযুগীয় পরিকল্পনাটি বহু শতাব্দী একইভাবে খোলা ছিল না। এই ইতিহাস সংরক্ষণের জটিলতা বোঝায়। একটি পুরোনো স্তর সামনে আনতে হলে অন্য সময়ের পরিবর্তন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হয়; তাই পুনরুদ্ধার শুধু পরিষ্কার করা নয়, গবেষণানির্ভর ব্যাখ্যার কাজও।

রাষ্ট্রদূতদের হল প্রাসাদের আনুষ্ঠানিক মহিমার অন্যতম কেন্দ্র। খিলান, টালি, আরবি লিপি এবং সোনালি কাঠের গম্বুজ দর্শকের দৃষ্টি ওপরের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এই পরিচিত গম্বুজটি পেদ্রোর মূল নির্মাণপর্বের নয়; ১৪২৭ সালে কারিগর দিয়েগো রুইস এটি তৈরি করেন। একটি কক্ষের মধ্যেও ভিন্ন সময়ের শিল্প একত্র হতে পারে। বিদেশি প্রতিনিধি গ্রহণের মতো আনুষ্ঠানিক পরিবেশে এমন অলংকরণ শাসকের মর্যাদা তুলে ধরত। এখানে সৌন্দর্য ব্যক্তিগত আনন্দের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কার্যকর মাধ্যম ছিল।

দেয়ালের আরবি লিপি আলকাসারের এই সম্পর্ক আরও স্পষ্ট করে। ইসলামি শিল্পের পরিচিত বাক্য ও অলংকরণ খ্রিস্টীয় রাজার প্রশংসা এবং রাজকীয় প্রতীকের সঙ্গে দেখা যায়। শব্দ, নকশা ও প্রতীক মিলিয়ে ক্ষমতার এক নতুন ভাষা তৈরি হয়েছিল। কিছু ব্যক্তিগত পরিসর আবার আনুষ্ঠানিক কক্ষ থেকে আলাদা ছিল; ছোট প্রাঙ্গণ ও সংযুক্ত কক্ষ রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ জীবনযাপনের পরিবেশ গড়ে তুলত। তাই পুরো প্রাসাদকে একই ধরনের প্রদর্শনক্ষেত্র ভাবা ঠিক নয়। অতিথির প্রবেশাধিকার ও কক্ষের অবস্থান সামাজিক দূরত্ব নির্ধারণেও ভূমিকা রাখত।

পরবর্তী রাজারা আলকাসারকে নতুন চাহিদা অনুযায়ী বদলেছেন। ইসাবেলা ও ফার্দিনান্দের সময় এবং পরে হাবসবার্গ রাজাদের অধীনে আবাসিক অংশ, প্রাঙ্গণ ও উদ্যানের পরিবর্তন ঘটে। নবজাগরণধর্মী নির্মাণ মুদেখার অংশের পাশে নতুন স্তর যুক্ত করে। সেভিলের আমেরিকামুখী সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রশাসনের সঙ্গেও প্রাসাদাঞ্চলের সম্পর্ক তৈরি হয়; কাসা দে লা কনত্রাতাসিওন সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নাম। ফলে আলকাসারের পরিচয় মধ্যযুগীয় দরবারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্প্যানিশ রাজশক্তির নতুন ভৌগোলিক বিস্তারের সঙ্গে পুরোনো প্রাসাদও নতুন ভূমিকা পেয়েছিল।

উদ্যানগুলো এই পরিবর্তনের আরেকটি সাক্ষ্য। জলাধার, ফোয়ারা, সাইট্রাস গাছ, সরু পথ এবং বিশ্রামস্থল ইসলামি উদ্যানঐতিহ্যের সঙ্গে পরবর্তী ইউরোপীয় রুচিকে মিলিয়েছে। সব বাগান একই সময়ের নয়; কিছু বিংশ শতকের সম্প্রসারণও রয়েছে। পানি এখানে দৃশ্য ও শব্দের অভিজ্ঞতা তৈরি করে, আবার ছায়া ও গাছপালা বাইরের খোলা পরিসরকে বসবাসযোগ্য করে তোলে। আলকাসারের উদ্যান শুধু প্রাসাদের পেছনের সাজসজ্জা নয়; রাজকীয় আবাসের অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভবন ও প্রকৃতির সম্পর্ক বোঝার জন্য দুটিকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

১৯৮৭ সালে সেভিলের ক্যাথেড্রাল, আলকাসার এবং আর্কিভো দে ইন্দিয়াস সম্মিলিতভাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। এই তিন স্থাপনা নগরের ধর্মীয়, রাজকীয় ও সাম্রাজ্যিক ইতিহাসকে পাশাপাশি তুলে ধরে। আলকাসারের রাজকীয় ব্যবহারও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। তার গুরুত্ব তাই শুধু অতীত সংরক্ষণে নয়, দীর্ঘস্থায়ী অভিযোজনেও। ইসলামি শাসকদের প্রাসাদাঞ্চল থেকে খ্রিস্টীয় মুদেখার আবাস এবং পরবর্তী স্প্যানিশ রাজপ্রাসাদে রূপান্তর ছিল বহু পর্যায়ের প্রক্রিয়া। সেই ইতিহাস আজও খিলান, জলাধার, কাঠের গম্বুজ ও উদ্যানের মধ্যে পড়ে নেওয়া যায়।