বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডি-ডে ও দুই ফ্রন্টের যুদ্ধ: মিত্রশক্তি কীভাবে নাৎসি জার্মানিকে ঘিরে ফেলেছিল?

সিরিজ: নাৎসি জার্মানির উত্থান ও পতন

ডি-ডে ও দুই ফ্রন্টের যুদ্ধ: মিত্রশক্তি কীভাবে নাৎসি জার্মানিকে ঘিরে ফেলেছিল?
দুই ফ্রন্টে ঘিরে পড়ল নাৎসি জার্মানি

১৯৪৪ সালের শুরুতে নাৎসি জার্মানি তখনো ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে রেখেছিল, কিন্তু যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। পূর্বে রেড আর্মি স্টালিনগ্রাদ ও কুর্স্কের পর ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমে এগিয়ে আসছিল। দক্ষিণে পশ্চিমা মিত্রশক্তি ইতালি অভিযান চালাচ্ছিল এবং আকাশে ব্রিটিশ ও মার্কিন বোমারু বিমান জার্মান শিল্প ও যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত করছিল। তবু ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূল থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু না হওয়া পর্যন্ত জার্মানিকে পশ্চিম ইউরোপে পূর্ণাঙ্গ দ্বিতীয় স্থলফ্রন্টের মুখোমুখি হতে হয়নি। ১৯৪৪ সালের ডি-ডে অবতরণ এবং একই মাসে সোভিয়েত অপারেশন বাগরেশন নাৎসি জার্মানিকে পূর্ব ও পশ্চিম—দুই দিক থেকে সংকুচিত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করে।

সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা মিত্রদের কাছে ফ্রান্সে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার দাবি জানাচ্ছিলেন। পূর্ব ফ্রন্টে জার্মান সেনাবাহিনীর বৃহত্তম অংশের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করছিল। ১৯৪৩ সালের তেহরান সম্মেলনে স্তালিন, ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও উইনস্টন চার্চিল পশ্চিম ইউরোপ আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছান। মিত্রবাহিনীর স্থল অভিযানের নাম দেওয়া হয় অপারেশন ওভারলর্ড এবং সমুদ্রপথে প্রাথমিক অবতরণের অংশটি অপারেশন নেপচুন নামে পরিচিত ছিল।

জার্মানরা জানত পশ্চিম ইউরোপে আক্রমণ আসছে, কিন্তু কোথায় এবং কখন তা হবে নিশ্চিত ছিল না। ইংলিশ চ্যানেলের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ পা দ্য কালে সম্ভাব্য লক্ষ্য বলে মনে করা হতো। মিত্ররা অপারেশন ফোর্টিটিউড নামে বিস্তৃত প্রতারণামূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ধারণা শক্তিশালী করে। দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে নকল ট্যাংক, ভুয়া সামরিক শিবির ও কৃত্রিম বেতার বার্তা তৈরি করা হয়। জেনারেল জর্জ প্যাটনের নেতৃত্বে একটি কাল্পনিক সেনাদল দেখানো হয় এবং দ্বৈত গুপ্তচরদের মাধ্যমে জার্মানদের বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। ফলে নরম্যান্ডিতে অবতরণের পরও হিটলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী কালে অঞ্চলে ধরে রাখেন।

নরম্যান্ডির উপকূল বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি সুবিধা ছিল। অঞ্চলটি জার্মানির ধারণার তুলনায় কম প্রত্যাশিত, কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে মিত্র যুদ্ধবিমানের কার্যকর পাল্লার মধ্যে ছিল। উপকূলে অবতরণের উপযোগী সৈকত এবং কাছাকাছি শেরবুর্গ বন্দরও ছিল। তবে বড় বন্দর অবিলম্বে ব্যবহার করা সম্ভব নাও হতে পারে বলে মিত্ররা কৃত্রিম ম্যালবেরি বন্দর তৈরি করে। সমুদ্রের নিচে পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনাও করা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে জ্বালানি সরবরাহ সহজ হয়। হাজার হাজার জাহাজ, বিমান এবং লাখ লাখ সৈন্যের সমন্বয়ে এটি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ উভচর অভিযান হয়ে ওঠে।

খারাপ আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত অভিযান এক দিন পিছিয়ে ১৯৪৪ সালের ৬ জুন শুরু হয়। মধ্যরাতের পর মার্কিন, ব্রিটিশ ও কানাডীয় প্যারাসুট ও গ্লাইডার বাহিনী উপকূলের পেছনে অবতরণ করে। তাদের কাজ ছিল সেতু, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করা এবং জার্মান পাল্টা আক্রমণ বিলম্বিত করা। মেঘ, বাতাস ও বিমানবিধ্বংসী গোলার কারণে বহু ইউনিট নির্ধারিত স্থান থেকে ছড়িয়ে পড়ে। তবু ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দল যোগাযোগব্যবস্থা নষ্ট এবং জার্মান প্রতিরক্ষা বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়।

ভোরে নৌবাহিনীর ব্যাপক গোলাবর্ষণের পর পাঁচটি সৈকতে স্থলবাহিনী নামে। মার্কিন বাহিনী ইউটা ও ওমাহা, ব্রিটিশ বাহিনী গোল্ড ও সোর্ড এবং কানাডীয় বাহিনী জুনো সৈকতে অবতরণ করে। ইউটায় স্রোতের কারণে সৈন্যরা নির্ধারিত স্থান থেকে কিছুটা দূরে নামলেও তুলনামূলক কম প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ওমাহায় পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। নৌ ও বিমান হামলা অনেক জার্মান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করতে পারেনি; শক্তিশালী অবস্থান থেকে মেশিনগান ও কামানের গোলায় মার্কিন সেনারা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। তারপরও ছোট দলগুলো পাহাড়ি ঢাল বেয়ে প্রতিরক্ষা ভেদ করে সৈকত থেকে বেরিয়ে আসে।

গোল্ড, জুনো ও সোর্ডে ব্রিটিশ ও কানাডীয় বাহিনী বিভিন্ন মাত্রার প্রতিরোধ অতিক্রম করে ভিতরে অগ্রসর হয়। দিনের শেষে মিত্রবাহিনী পাঁচটি সৈকতে অবস্থান প্রতিষ্ঠা করলেও সব লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে কাঁ শহর প্রথম দিন দখল করা সম্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও জার্মানরা মিত্রবাহিনীকে সমুদ্রে ঠেলে দিতে ব্যর্থ হয়। ৬ জুনের মধ্যেই প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার মিত্রসেনা নরম্যান্ডিতে পৌঁছায়। সেদিন মিত্রবাহিনীর নিহত, আহত ও নিখোঁজ মিলিয়ে দশ হাজারের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, যাদের মধ্যে চার হাজারের বেশি নিহত হন বলে সাধারণভাবে হিসাব করা হয়।

জার্মান প্রতিক্রিয়া নানা সমস্যায় বাধাগ্রস্ত হয়। ফিল্ড মার্শাল এরভিন রোমেল মনে করতেন, সৈন্য অবতরণের সময় সৈকতেই আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে, কারণ মিত্রবাহিনী একবার শক্ত অবস্থান তৈরি করলে তাদের বিমান ও সরঞ্জামের শ্রেষ্ঠতা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। অন্যদিকে কিছু কমান্ডার সাঁজোয়া বাহিনীকে ভেতরে কেন্দ্রীভূত রেখে বড় পাল্টা আক্রমণের পক্ষে ছিলেন। ট্যাংক ইউনিট ব্যবহারের কর্তৃত্ব আংশিকভাবে হিটলারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। মিত্র বিমান হামলা দিনের বেলায় জার্মান সেনা ও সরঞ্জাম সরানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ নরম্যান্ডির সংকীর্ণ ঝোপঝাড়ঘেরা পথ ও মাঠে কঠিন যুদ্ধ চলে। কাঁ অঞ্চলে ব্রিটিশ ও কানাডীয় বাহিনী জার্মান সাঁজোয়া ইউনিটের বড় অংশকে আটকে রাখে। পশ্চিমে মার্কিন বাহিনী শেরবুর্গ দখল করলেও বন্দরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পায়। জুলাইয়ের শেষভাগে অপারেশন কোবরার মাধ্যমে মার্কিন বিমান ও স্থলবাহিনী সাঁ-লো অঞ্চলের জার্মান প্রতিরক্ষা ভেঙে উন্মুক্ত ভূমিতে প্রবেশ করে। দ্রুত অগ্রসর হয়ে তারা ব্রিটানি ও ফ্রান্সের অভ্যন্তরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

হিটলার আভরঁশের কাছে পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিলেও তা ব্যর্থ হয়। এরপর ফালেজ অঞ্চলে বহু জার্মান ইউনিট মিত্রবাহিনীর ঘেরাওয়ে পড়ে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনা বেরিয়ে যেতে পারলেও জার্মান বাহিনী বিপুল মানুষ, যানবাহন ও ভারী অস্ত্র হারায়। ২৫ আগস্ট ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলন ও মুক্ত ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় প্যারিস মুক্ত হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের অধিকাংশ এলাকা অতিক্রম করে বেলজিয়াম ও জার্মান সীমান্তের দিকে এগিয়ে যায়। তবে দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে সরবরাহপথ দীর্ঘ হয়ে পড়ে এবং জ্বালানি ও গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দেয়।

পশ্চিমে ডি-ডের মাত্র ষোলো দিন পর, ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন অপারেশন বাগরেশন শুরু করে। আক্রমণের তারিখটি ১৯৪১ সালের জার্মান সোভিয়েত আক্রমণের তৃতীয় বার্ষিকী ছিল। বেলারুশে অবস্থানরত জার্মান আর্মি গ্রুপ সেন্টারকে ধ্বংস করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। সোভিয়েতরা আক্রমণের প্রকৃত স্থান গোপন রাখতে বিভ্রান্তিমূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। জার্মান নেতৃত্ব মনে করেছিল, প্রধান সোভিয়েত আঘাত দক্ষিণে ইউক্রেন বা রোমানিয়ার দিকে আসতে পারে। ফলে কেন্দ্রের প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত সংরক্ষিত সাঁজোয়া বাহিনী ছিল না।

হাজার হাজার কামান, ট্যাংক ও বিমানের সহায়তায় একাধিক সোভিয়েত ফ্রন্ট জার্মান অবস্থানে আক্রমণ করে। পক্ষপাতী যোদ্ধারা রেললাইন, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থায় নাশকতা চালিয়ে জার্মান বাহিনীর রসদ ও পশ্চাদপসরণ ব্যাহত করে। ভিটেবস্ক, বব্রুইস্ক ও মিনস্কের কাছে বড় জার্মান বাহিনী ঘেরাও হয়ে ধ্বংস হয়। হিটলারের নির্দেশে অনেক শহরকে যেকোনো মূল্যে ধরে রাখার “দুর্গ” ঘোষণা করা হয়েছিল, ফলে সময়মতো পশ্চাদপসরণের সুযোগ হারিয়ে বহু ইউনিট সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

জুলাইয়ের শুরুতে সোভিয়েত বাহিনী মিনস্ক মুক্ত করে এবং এরপর দ্রুত পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। কয়েক সপ্তাহে আর্মি গ্রুপ সেন্টারের অধিকাংশ কার্যকর শক্তি ধ্বংস হয়ে যায়। নিহত, আহত ও বন্দী মিলিয়ে জার্মান ক্ষতি কয়েক লাখে পৌঁছায় এবং পূর্ব ফ্রন্টে শত শত কিলোমিটার বিস্তৃত ফাঁক তৈরি হয়। অপারেশন বাগরেশন নাৎসি জার্মানির জন্য স্টালিনগ্রাদের চেয়েও বৃহৎ সামরিক বিপর্যয়গুলোর একটি ছিল। ডি-ডে পশ্চিমে নতুন ফ্রন্ট খুলেছিল, আর বাগরেশন পূর্বে জার্মান প্রতিরক্ষার কেন্দ্র ভেঙে দিয়েছিল।

সোভিয়েত অগ্রযাত্রা একই সময়ে বহুমুখী হয়ে ওঠে। রেড আর্মি বাল্টিক অঞ্চল, পূর্ব পোল্যান্ড ও ইউক্রেনে এগিয়ে যায়। আগস্টে সোভিয়েত বাহিনী রোমানিয়ায় বিশাল আক্রমণ শুরু করলে দেশটির রাজা মাইকেল হিটলারপন্থী সরকারকে অপসারণ করেন এবং রোমানিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়। এতে জার্মানি প্লয়েশ্তির গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র হারায়। বুলগেরিয়াও অক্ষশক্তি থেকে বেরিয়ে আসে এবং জার্মান বাহিনী গ্রিস, যুগোস্লাভিয়া ও বলকানের বড় অংশ থেকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়।

পোল্যান্ডে পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। রেড আর্মি ভিস্তুলা নদীর কাছে পৌঁছালে ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট পোলিশ হোম আর্মি ওয়ারশতে জার্মানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। তারা সোভিয়েত বাহিনী আসার আগে রাজধানী মুক্ত করে স্বাধীন পোলিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জার্মানরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহ দমন করে এবং বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ হত্যা করে। সোভিয়েত সহায়তা সীমিত ও বিলম্বিত ছিল; এর সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। তেষট্টি দিনের প্রতিরোধের পর বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে এবং শহরটি পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়।

পশ্চিমা মিত্রবাহিনীও সব ক্ষেত্রে সহজ সাফল্য পায়নি। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে অপারেশন মার্কেট গার্ডেনে নেদারল্যান্ডসের একাধিক সেতু দখল করে রাইন পেরোনোর পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু আর্নহেমে শক্তিশালী জার্মান প্রতিরোধ, যোগাযোগ সমস্যা এবং সরু স্থলপথের কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়। অ্যান্টওয়ার্প বন্দর দখল করা হলেও শেল্ড মোহনার নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত সেটি ব্যবহার করা যায়নি। সরবরাহ সংকট ও জার্মান প্রতিরোধের কারণে পশ্চিমা অগ্রযাত্রা শরৎকালে ধীর হয়ে পড়ে।

হিটলার ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে আর্ডেন অঞ্চলে পশ্চিমে শেষ বড় পাল্টা আক্রমণ চালান। লক্ষ্য ছিল মিত্রবাহিনীকে বিভক্ত করে অ্যান্টওয়ার্প দখল করা এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে পৃথক শান্তিতে বাধ্য করা। আকস্মিক আক্রমণে জার্মানরা প্রাথমিক সাফল্য পেলেও বাস্তোনে প্রতিরোধ, জ্বালানির অভাব এবং আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ার পর মিত্র বিমান হামলায় অগ্রযাত্রা থেমে যায়। “ব্যাটল অব দ্য বাল্জ” জার্মানির অবশিষ্ট সাঁজোয়া শক্তি ও অভিজ্ঞ সেনাদের বড় অংশ ক্ষয় করে, যা পরবর্তী প্রতিরক্ষায় আর পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত ভিস্তুলা-ওডার অভিযান শুরু হলে রেড আর্মি অল্প সময়ে পোল্যান্ড অতিক্রম করে বার্লিন থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরের ওডার নদীতে পৌঁছে যায়। একই সময়ে পশ্চিমা মিত্রবাহিনী আর্ডেনের সংকট কাটিয়ে রাইন নদীর দিকে এগোয়। মার্চে রেমাগেনের অক্ষত সেতু দখল এবং অন্যান্য স্থানে বৃহৎ নদী পারাপারের মাধ্যমে তারা জার্মানির শিল্পসমৃদ্ধ রুর অঞ্চল ঘিরে ফেলে। পূর্বে সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব প্রুশিয়া, পোমেরানিয়া ও সিলেসিয়ায় জার্মান প্রতিরোধ ভেঙে বার্লিন আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।

দুই ফ্রন্টের এই চাপ শুধু জার্মান সেনাবাহিনীকেই বিভক্ত করেনি; তার জ্বালানি, বিমান, ট্যাংক, রেলপথ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তিও নিঃশেষ করে দেয়। কোন রণাঙ্গনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মিত্রবাহিনীর কৌশলগত বোমাবর্ষণ জার্মান তেলশোধনাগার, পরিবহনকেন্দ্র ও শিল্পনগরে আঘাত করছিল। অধিকৃত দেশগুলোর প্রতিরোধ আন্দোলনও রেল যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান ও জার্মান প্রশাসনে বাধা সৃষ্টি করে। নাৎসি নেতৃত্ব বাস্তবসম্মত পশ্চাদপসরণ বা আত্মসমর্পণের বদলে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় সৈন্য ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি আরও বেড়ে যায়।

নাৎসি জার্মানির পতন কোনো একটি সৈকত, একটি যুদ্ধ কিংবা একক মিত্রবাহিনীর বিজয়ের ফল ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্বে জার্মান স্থলবাহিনীর প্রধান অংশকে ভয়াবহ ক্ষয়ের মুখে ফেলেছিল; ডি-ডে পশ্চিমে বহুপ্রতীক্ষিত দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলে জার্মানিকে নতুন দিক থেকে চাপ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পক্ষমতা, ব্রিটেনের সামরিক ঘাঁটি ও নৌনিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন দেশের মিত্রসেনা এবং অধিকৃত জনগণের প্রতিরোধ এই দুই অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করে। ১৯৪৪ সালের মাঝামাঝি থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের ফাঁক দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে, আর হিটলারের তথাকথিত হাজার বছরের রাইখ এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বার্লিনের ধ্বংসস্তূপে এসে শেষ হয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে