বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্যায়ামের আগে ও পরে কী খাওয়া ভালো? খাবারের সময়, পরিমাণ ও পানির নিয়ম

ব্যায়ামের আগে ও পরে কী খাওয়া ভালো? খাবারের সময়, পরিমাণ ও পানির নিয়ম
উপযুক্ত খাবার ও পানি ব্যায়ামের সুফল পেতে সাহায্য করে।

ত্রিশ মিনিট হাঁটা, এক ঘণ্টা ভারোত্তোলন এবং দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর জন্য খাবারের চাহিদা এক নয়। শরীর কতটা পরিশ্রম করছে, শেষ খাবার কখন খেয়েছেন এবং পরের ব্যায়াম কখন করবেন—এসব বিষয় মিলিয়ে খাবারের পরিকল্পনা করতে হয়। তাই ব্যায়াম করলেই বিশেষ পানীয় বা বাড়তি খাবার দরকার—এমন ধারণা ঠিক নয়।

শর্করা পেশির কাজের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। শরীর কিছু শর্করা পেশি ও যকৃতে গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা রাখে। আমিষ পেশিসহ বিভিন্ন কলার মেরামত ও গঠনে সাহায্য করে। পানি ঘামের সঙ্গে হারানো তরল পূরণ এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

সারাদিনের খাবারই মূল ভিত্তি

ব্যায়ামের আগে একটি কলা বা পরে এক গ্লাস দুধ উপকারী হতে পারে, কিন্তু বাকি দিনের অপর্যাপ্ত খাবার পূরণ করতে পারে না। পর্যাপ্ত মোট খাবার, আমিষের নিয়মিত সরবরাহ এবং ঘুমও পুনরুদ্ধারের অংশ।

স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে হালকা হাঁটতে গেলে আলাদা নাশতা সাধারণত প্রয়োজন হয় না। দীর্ঘ বা কঠিন ব্যায়ামের আগে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবার ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে ব্যায়াম করলে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি খাবার মোট শক্তি গ্রহণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

ব্যায়ামের আগে কখন এবং কী খাবেন?

বড় খাবার খাওয়ার পরে সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা বিরতি রেখে কঠিন ব্যায়াম করা সুবিধাজনক। ছোট খাবার বা নাশতার ক্ষেত্রে প্রায় এক থেকে তিন ঘণ্টা বিরতি সহনীয় হতে পারে। এগুলো ব্যবহারিক নির্দেশনা; ব্যক্তির হজমক্ষমতা ও ব্যায়ামের ধরন অনুযায়ী সময় বদলাতে পারে।

ব্যায়ামের কয়েক ঘণ্টা আগে পরিমিত ভাত বা রুটি, মাছ বা ডিম এবং কিছু সবজি খাওয়া যায়। খুব তেলযুক্ত খাবার, বড় মাংসের পরিবেশন বা অতিরিক্ত ভাজাপোড়া পেটে ভার লাগাতে পারে। সময় যত কাছে আসবে, খাবারের পরিমাণ তত ছোট রাখা ভালো।

অল্প সময় হাতে থাকলে

ব্যায়ামের আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা আগে ক্ষুধা লাগলে ছোট কলা, অল্প সাধারণ রুটি বা অন্য সহজপাচ্য শর্করাযুক্ত খাবার নেওয়া যায়। তবে তখন বড় বাটি ওটস, প্রচুর বাদাম বা বেশি ছোলা খেলে কারও পেট ফাঁপতে পারে।

আঁশ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি দৈনন্দিন খাদ্যে জরুরি, কিন্তু দৌড়ানো বা তীব্র ব্যায়ামের ঠিক আগে বেশি পরিমাণে নিলে অস্বস্তি হতে পারে। দুধে অসহিষ্ণুতা থাকলে ব্যায়ামের আগে দুধ খেলেও সমস্যা হতে পারে।

নিজের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করুন। কোন খাবারে শক্তি ভালো থাকে এবং কোনটিতে ঢেকুর, বমিভাব বা পেটব্যথা হয়, তা লিখে রাখলে পরিকল্পনা সহজ হয়। প্রতিযোগিতা বা দীর্ঘ ব্যায়ামের দিনে নতুন খাবার পরীক্ষা না করাই ভালো।

সকালে খালি পেটে ব্যায়াম করা কি ভালো?

সুস্থ কোনো ব্যক্তি সকালে পানি পান করে স্বল্প সময়ের হালকা হাঁটা স্বচ্ছন্দে করতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘ দৌড়, তীব্র শরীরচর্চা বা কঠিন ভারোত্তোলনে খালি পেটে দুর্বল লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগে অল্প খাবার নিয়ে কিছু সময় বিরতি রাখা উপযোগী।

খালি পেটে ব্যায়ামের সময় শরীর তুলনামূলক বেশি চর্বি ব্যবহার করতে পারে। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদে বেশি ওজন কমবেই—এমন নিশ্চয়তা নেই। ওজনের পরিবর্তন নির্ভর করে মোট খাদ্যশক্তি, ব্যায়ামের ধারাবাহিকতা এবং পরের খাবারের অভ্যাসের ওপর।

না খেয়ে ব্যায়াম করে পরে অতিরিক্ত ক্ষুধায় বড় খাবার খেলে প্রত্যাশিত সুবিধা নাও মিলতে পারে। যে সময় ও পদ্ধতিতে নিয়মিত ব্যায়াম করতে পারেন এবং স্বস্তি পান, সেটিই বেশি ব্যবহারিক।

ডায়াবেটিসে ইনসুলিন বা রক্তের শর্করা কমাতে পারে এমন কিছু ওষুধ ব্যবহার করলে আলাদা পরিকল্পনা দরকার। ব্যায়ামে শর্করা কমে যেতে পারে। খাবার, ওষুধ ও শর্করা পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ব্যায়ামের সময় মাথা ঘোরা, কাঁপুনি বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা হলে থামুন। তীব্র বুকব্যথা বা গুরুতর শ্বাসকষ্টকে শুধু না খেয়ে থাকার ফল ধরে নিয়ে ব্যায়াম চালিয়ে যাবেন না।

ব্যায়ামের পরে শর্করা ও আমিষ কেন দরকার?

ব্যায়ামের পরে শরীর ব্যবহৃত জ্বালানি পূরণ করে এবং পেশির মেরামতের কাজ চালায়। তাই শর্করা ও আমিষের সমন্বয় উপকারী। ভাতের সঙ্গে মাছ, রুটির সঙ্গে ডিম, দইয়ের সঙ্গে ফল কিংবা দুধ ও পরিমিত ওটস সাধারণ খাবার দিয়েই এই চাহিদায় সাহায্য করতে পারে।

আমিষ শুধু ব্যায়ামের পরের একবেলার বিষয় নয়। নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারে উপযুক্ত আমিষ রাখা বেশি কার্যকর পরিকল্পনা। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, দই, ডাল ও সয়াজাতীয় খাবার বৈচিত্র্য আনতে পারে।

খাবারের সময় নিয়ে অযথা তাড়াহুড়ো নয়

ব্যায়াম শেষ হওয়ার ত্রিশ মিনিটের মধ্যে না খেলে সব সুফল নষ্ট হয়ে যায়—এমন নয়। ব্যায়ামের আগে কী খেয়েছেন এবং সারাদিনে কতটা পুষ্টি পাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে পরের এক থেকে দুই ঘণ্টায় শর্করা ও আমিষযুক্ত খাবার নেওয়া ব্যবহারিক।

শিগগিরই স্বাভাবিক দুপুর বা রাতের খাবার খেলে আলাদা নাশতা লাগতে নাও পারে। খাবারের সময় অনেক দূরে হলে চিনি ছাড়া দই ও ফল বা দুধের সঙ্গে ছোট নাশতা নেওয়া যায়।

একই দিনে একাধিক কঠিন প্রশিক্ষণ থাকলে দ্রুত জ্বালানি পূরণের গুরুত্ব বাড়ে। সাধারণভাবে দিনে একবার মাঝারি ব্যায়াম করা মানুষের জন্য স্বাভাবিক সুষম খাবারই প্রায়ই যথেষ্ট। ব্যায়াম করেছেন বলে বড় মিষ্টি, অতিরিক্ত ভাত বা তেলযুক্ত খাবার নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

পানি, লবণ ও ব্যায়ামের মাঝের খাবার

ব্যায়াম শুরু করার আগে থেকেই শরীরে পর্যাপ্ত তরল থাকা দরকার। সারাদিন নিয়মিত পানি পান করুন এবং ব্যায়ামের সময় সুবিধামতো অল্প অল্প করে পান করুন। প্রয়োজনীয় পরিমাণ নির্ভর করে গরম, আর্দ্রতা, ঘাম, ব্যায়ামের তীব্রতা ও সময়ের ওপর।

স্বল্প সময়ের সাধারণ ব্যায়ামে অধিকাংশ মানুষের জন্য পানি যথেষ্ট। দীর্ঘ সময়ের কঠিন ব্যায়াম ও প্রচুর ঘামের ক্ষেত্রে তরলের পাশাপাশি লবণ এবং শর্করা সরবরাহের পরিকল্পনা দরকার হতে পারে। এটি বিশেষত দীর্ঘ দৌড় বা সহনশীলতার প্রশিক্ষণে প্রাসঙ্গিক।

বিশেষ পানীয় সব ব্যায়ামে দরকার হয় না

মিষ্টি ক্রীড়াপানীয় স্বল্প সময়ের হাঁটায় অপ্রয়োজনীয় শক্তি যোগ করতে পারে। আবার দীর্ঘ কঠিন ব্যায়ামে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উপকারী হতে পারে। ক্যাফেইনসমৃদ্ধ শক্তিবর্ধক পানীয় এবং ক্রীড়াপানীয় এক জিনিস নয়।

জোর করে অতিরিক্ত পানি পান করাও নিরাপদ নয়; দীর্ঘ ব্যায়ামে এতে রক্তের সোডিয়াম অস্বাভাবিকভাবে কমতে পারে। খুব বেশি ঘাম হলে ব্যক্তিগত তরল পরিকল্পনার জন্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া ভালো।

বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ায় ঠান্ডা সময়ে ব্যায়াম, বিরতি এবং ছায়া গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়ামের পরে ধীরে তরল পূরণ করুন। হৃদ্‌যন্ত্র বা বৃক্কের রোগে পানি সীমিত রাখার নির্দেশনা থাকলে সাধারণ পরামর্শের বদলে নিজের চিকিৎসাপরিকল্পনা অনুসরণ করুন।

সাধারণ খাবার দিয়ে ব্যবহারিক পরিকল্পনা

সকালে হালকা হাঁটার পরে আটার রুটি, ডিম ও সবজি দিয়ে নাশতা করা যায়। সকালে কঠিন ব্যায়াম করলে আগে সহনীয় ছোট নাশতা এবং পরে পূর্ণ খাবার রাখতে পারেন। বিকেলের ব্যায়ামে দুপুরের সুষম খাবারের পর প্রয়োজনে ছোট নাশতা, আর শেষে স্বাভাবিক রাতের খাবার যথেষ্ট হতে পারে।

আমিষের গুঁড়া সবার জন্য অপরিহার্য নয়। সাধারণ খাবারে চাহিদা পূরণ হলে সেটি যোগ করার প্রয়োজন নেই। খাবার গ্রহণে অসুবিধা বা বিশেষ প্রশিক্ষণচাহিদায় সম্পূরক বিবেচনা করা যায়, তবে তা ব্যক্তিগত পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।

কাঁচা ডিম খাওয়ার বাড়তি সুবিধা নেই, বরং সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। ডিম ভালোভাবে রান্না করুন। কোনো বিশেষ সম্পূরক, চর্বি পোড়ানোর পণ্য বা অজানা মিশ্রণ দিয়ে খাবারের ঘাটতি ঢাকার চেষ্টা করবেন না।

ব্যায়ামের আগে স্বস্তিদায়ক জ্বালানি, পরে সুষম খাবার এবং পুরো দিনে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও পানি—এই ভিত্তি মেনে নিজের অভ্যাস সাজান। কঠিন নিয়মের চেয়ে শরীরের সহনশীলতা ও নিয়মিততা বেশি কাজে আসে।