ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর জীবনযাপন: খাবার, ব্যায়াম ও ঘুমের অভ্যাস
ছোট ছোট নিয়মিত পরিবর্তনেই কমতে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কথা উঠলেই অনেকে শুধু মিষ্টি খাওয়া বন্ধ করার কথা ভাবেন। কিন্তু রোগটির ঝুঁকি তৈরি হয় বংশগত বৈশিষ্ট্য, শরীরে চর্বির বণ্টন, চলাফেরা, খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য বিষয়ের সম্মিলিত প্রভাবে। তাই কার্যকর পরিবর্তনও কয়েকটি অভ্যাসকে একসঙ্গে ঘিরে গড়ে তুলতে হয়।
এখানে মূল আলোচনা দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিস নিয়ে। এই রোগে শরীর ইনসুলিন যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে না এবং সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ইনসুলিন সরবরাহও অপর্যাপ্ত হতে পারে। প্রথম ধরনের ডায়াবেটিসকে এসব জীবনযাপনের পরিবর্তন দিয়ে প্রতিরোধ করা যায়—এমন প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ নেই।
মা-বাবা বা ভাইবোনের ডায়াবেটিস, পেটের অতিরিক্ত মেদ, কম চলাফেরা এবং আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকার মতো বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়। তবে বংশে ডায়াবেটিস আছে মানেই রোগ হবেই, কিংবা বংশে নেই মানেই ঝুঁকি নেই—দুটিই ভুল ধারণা।
উচ্চঝুঁকির প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ওজন কমানো ও নিয়মিত শরীরচর্চার সমন্বিত কর্মসূচি প্রায় তিন বছরে ডায়াবেটিস হওয়ার আপেক্ষিক ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ কমিয়েছিল। এটি প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নিশ্চিত ফল নয়; তবে পরিকল্পিত পরিবর্তনের কার্যকারিতার শক্ত প্রমাণ।
অতিরিক্ত ওজন ও পেটের মেদ নিয়ন্ত্রণ করুন
শরীরের অতিরিক্ত চর্বি, বিশেষ করে পেটের ভেতরে অঙ্গগুলোর চারপাশে জমা চর্বি, ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু ওজনযন্ত্রের সংখ্যা নয়, কোমরের মাপ এবং ওজন বাড়ার প্রবণতাও গুরুত্ব পায়।
যাঁদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, তাঁদের শুরুতে বর্তমান ওজনের পাঁচ থেকে সাত শতাংশ কমানোর লক্ষ্য উপকারী হতে পারে। যেমন, ৮০ কিলোগ্রাম ওজনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি প্রায় চার থেকে সাড়ে পাঁচ কিলোগ্রাম। কয়েক মাস ধরে বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
অল্প কমলেও লাভ হতে পারে
স্বাস্থ্যকর হতে অবশ্যই অনেক কিলোগ্রাম কমাতে হবে—এমন নয়। তুলনামূলক সামান্য ওজন হ্রাসও উচ্চঝুঁকির মানুষের উপকার করতে পারে। তবে স্বাভাবিক বা কম ওজনের সবাইকে আরও ওজন কমাতে হবে না। তাঁদের জন্য খাদ্যের মান, পেশির সক্ষমতা ও নিয়মিত চলাফেরা গুরুত্বপূর্ণ।
না খেয়ে থাকা, হঠাৎ কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ বা দ্রুত ওজন কমানোর অপ্রমাণিত পণ্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সপ্তাহে একবার একই ধরনের পরিস্থিতিতে ওজন মাপুন এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন দেখুন। গর্ভাবস্থা, অসুস্থতা বা বিশেষ পুষ্টিচাহিদা থাকলে ব্যক্তিগত পরামর্শ প্রয়োজন।
ভাত বাদ দেওয়ার চেয়ে খাবারের ভারসাম্য বদলান
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে ভাত সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া সবার জন্য প্রয়োজন নয়। সমস্যা হতে পারে যখন থালার বেশির ভাগ অংশ ভাত দিয়ে ভরা থাকে, সঙ্গে আলু ও অল্প সবজি থাকে এবং পরে মিষ্টি পানীয় নেওয়া হয়। এতে মোট শর্করা ও শক্তি সহজেই বেশি হয়ে যায়।
একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি হলো থালার অর্ধেক অংশে শর্করা তুলনামূলক কম এমন সবজি, এক-চতুর্থাংশে মাছ, ডিম বা অন্য আমিষ এবং বাকি অংশে পরিমিত ভাত বা রুটি রাখা। ডাল পুষ্টিকর হলেও এতে শর্করাও থাকে; বড় পরিমাণে খেলে সেটিও হিসাবে রাখতে হবে।
আঁশ বাড়ান, তরল চিনি কমান
শাকসবজি, গোটা ফল, ডাল এবং তুলনামূলক কম পরিশোধিত শস্য খাদ্যের আঁশ বাড়ায়। আঁশযুক্ত খাবার তৃপ্তি পেতে সাহায্য করে এবং খাবারের সামগ্রিক মান উন্নত করে। লাল চাল বা আটার রুটি ভালো বিকল্প হতে পারে, তবে এগুলোও সীমাহীন খাওয়ার খাবার নয়।
চিনি মেশানো কোমল পানীয়, মিষ্টি চা, শরবত ও প্যাকেটজাত ফলের পানীয় কমানো একটি কার্যকর শুরু। ফলের রসের বদলে গোটা ফল এবং তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ পানি বেছে নিন। মধু, গুড় বা বাদামি চিনি ব্যবহার করলেই চিনির প্রভাব দূর হয় না।
ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও ঘন ঘন বড় পরিমাণের বাইরের খাবার কমান। স্বাস্থ্যকর তেল ও বাদামও পরিমিত রাখুন। নির্দিষ্ট একটি খাবার নিষিদ্ধ করার চেয়ে সারাদিনের খাদ্যাভ্যাসের মান ও পরিমাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
হাঁটা, পেশির ব্যায়াম ও বসে থাকার বিরতি
পেশি কাজ করার সময় গ্লুকোজ ব্যবহার করে। নিয়মিত শরীরচর্চা ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। তাই ওজন দ্রুত না কমলেও চলাফেরার উপকার থাকতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। পাঁচ দিন ত্রিশ মিনিট দ্রুত হাঁটলে এই পরিমাণ পূরণ হয়। মাঝারি মাত্রা বলতে এমন গতি বোঝায়, যাতে শ্বাস কিছুটা বাড়ে, কথা বলা যায়, কিন্তু সহজে গান গাওয়া কঠিন হয়।
শুরুতেই ত্রিশ মিনিট হাঁটতে না পারলে পাঁচ বা দশ মিনিট দিয়ে শুরু করুন। দিনের বিভিন্ন সময়ের ছোট পর্বও মোট হিসাবে যোগ হয়। সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো বেশি টেকসই।
শুধু হাঁটা নয়, পেশিকেও কাজে লাগান
সপ্তাহে অন্তত দুই দিন প্রধান পেশিগুলোর শক্তিবর্ধক ব্যায়াম উপকারী। চেয়ার থেকে ওঠাবসা, দেয়ালে ভর দিয়ে চাপ দেওয়া বা উপযুক্ত প্রতিরোধযুক্ত ব্যায়াম করা যায়। ব্যথা বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা নিন।
সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসলে নিয়মিত উঠে কয়েক মিনিট হাঁটুন। খাবারের পরে স্বল্প সময়ের হালকা হাঁটাও ব্যবহারিক অভ্যাস। তবে এই ছোট বিরতি সাপ্তাহিক শরীরচর্চার পূর্ণ বিকল্প নয়; দুটো একসঙ্গে রাখাই ভালো।
ঘুম, মানসিক চাপ ও ধূমপানের দিকে নজর দিন
অপর্যাপ্ত বা অনিয়মিত ঘুম ক্ষুধা, খাবারের পছন্দ এবং শরীরের শর্করা নিয়ন্ত্রণে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ রাখা উপযোগী। নিয়মিত ওঠার সময়, রাতে ক্যাফেইন কমানো এবং ঘুমের উপযোগী পরিবেশ সাহায্য করে।
জোরে নাক ডাকা, শ্বাস থামা বা দিনের অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব থাকলে ঘুমের মধ্যে শ্বাসের বাধার মূল্যায়ন দরকার। শুধু বেশি সময় বিছানায় থাকলেই এই সমস্যা সমাধান হয় না।
মানসিক চাপ একাই ডায়াবেটিসের নিশ্চিত কারণ নয়। তবে চাপের কারণে বেশি খাওয়া, কম ঘুমানো, ধূমপান বা শরীরচর্চা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। হাঁটা, শান্তভাবে শ্বাস নেওয়া, কাজের বিরতি এবং কাছের মানুষের সহায়তা অভ্যাস ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ধূমপান ছাড়াও প্রতিরোধের অংশ
ধূমপান দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। ছাড়ার সময় ক্ষুধা বা ওজন কিছুটা বাড়তে পারে বলে ধূমপান চালিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সহায়তায় ধূমপান ছাড়ার পরিকল্পনার সঙ্গে খাবার ও চলাফেরার পরিকল্পনাও রাখুন।
পরীক্ষা ও ছোট লক্ষ্য দিয়ে অভ্যাস স্থায়ী করুন
ডায়াবেটিসের আগের অবস্থায় রক্তের শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও অনেকের কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই শুধু সুস্থ লাগছে বলে পরীক্ষা অপ্রয়োজনীয় ধরে নেওয়া যায় না। পারিবারিক ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন বা আগের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরীক্ষার প্রয়োজন আলোচনা করুন।
উপবাসের শর্করা, গত কয়েক মাসের গড় শর্করার পরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনে অন্য পরীক্ষার মাধ্যমে অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। অস্বাভাবিক ফল নিশ্চিত করতে পুনরায় পরীক্ষা লাগতে পারে। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব বা অনিচ্ছাকৃত ওজন কমলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
প্রথম সপ্তাহে মিষ্টি পানীয় বাদ দেওয়া এবং প্রতিদিন দশ মিনিট হাঁটার মতো দুটি লক্ষ্য নিন। পরে হাঁটার সময় বাড়ান, থালায় সবজি বাড়ান এবং ঘুমের সময় ঠিক করুন। পরিবারের সহায়তা ও অগ্রগতির সংক্ষিপ্ত নথি অভ্যাস বজায় রাখতে সুবিধা দেয়।
করলা, দারুচিনি বা কোনো ভেষজ পানীয় খেয়ে নিশ্চিতভাবে ডায়াবেটিস ঠেকানো যায়—এমন প্রমাণ নেই। কিছু উচ্চঝুঁকির ব্যক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসক ওষুধও বিবেচনা করতে পারেন। জীবনযাপন পরিবর্তন ঝুঁকি কমায়, কিন্তু রোগ হলে সেটি ব্যক্তির ব্যর্থতার প্রমাণ নয়; তখন যথাযথ চিকিৎসাও জরুরি।
সকালের রোদ কতটা উপকারী? ঘুম, ভিটামিন ডি ও নিরাপদ সূর্যালোকের নিয়ম
গর্ভাবস্থায় ফল খাওয়ার নিয়ম: পুষ্টি, নিরাপত্তা ও জরুরি সতর্কতা
অতিরিক্ত সফট ড্রিংক পান করলে শরীরে কী ঘটে? চিনি, দাঁত ও যকৃতের ক্ষতি
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সামাজিক যোগাযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যাসিডিটি ও বুকজ্বালা কমাতে খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন আনবেন?
প্রতিদিন স্ট্রেচিং করলে শরীরে কী পরিবর্তন হয়? উপকারিতা ও সঠিক পদ্ধতি