বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মীর কাসিমের পতন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশল ও বাংলার ক্ষমতার লড়াই

সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য

মীর কাসিমের পতন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশল ও বাংলার ক্ষমতার লড়াই
কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে গিয়ে নবাবের পতন

পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার সিংহাসনে বসা মীর জাফর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে অকার্যকর হয়ে পড়েছিলেন। কোম্পানির বিপুল অর্থের দাবি পূরণ করতে গিয়ে তাঁর রাজকোষ দুর্বল হয়ে যায়, প্রশাসন বিশৃঙ্খল হয় এবং সেনাবাহিনীর ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ইংরেজরা এমন একজন নতুন নবাব খুঁজতে শুরু করে, যিনি তাদের আরও অর্থ ও ভূখণ্ড দেবেন এবং দুর্বল মীর জাফরের পরিবর্তে প্রশাসন সচল রাখবেন। সেই নির্বাচিত ব্যক্তি ছিলেন মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিম। কিন্তু কোম্পানি যাঁকে নিজের স্বার্থে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, তিনিই অল্প সময়ের মধ্যে বাংলায় তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন।

মীর কাসিমের পতনের ইতিহাস তাই শুধু একজন নবাবের পরাজয়ের কাহিনি নয়। এটি দেখায় কীভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অর্থ, গোপন দরকষাকষি, বাণিজ্যিক সুবিধা, সামরিক শক্তি এবং শাসক পরিবর্তনের কৌশল একত্রে ব্যবহার করে বাংলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছিল। মীর কাসিম প্রথমে সেই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী ছিলেন, পরে তা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তাঁর সংস্কার ও প্রতিরোধ কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। শেষ পর্যন্ত যে সংঘর্ষ শুরু হয়, তা পলাশীর সীমিত যুদ্ধকে ছাড়িয়ে উত্তর ভারতের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজদের সহায়তায় মীর জাফর বাংলার নবাব হন। এর বিনিময়ে তিনি কোম্পানি, কলকাতার ব্যবসায়ী, ইংরেজ সেনা ও নৌবাহিনী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিপুল অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাজকোষ থেকে নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী বেরিয়ে যেতে থাকে। কোম্পানির কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগত উপঢৌকন, জমি, বাণিজ্যিক সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব দাবি করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই মীর জাফর বুঝতে পারেন, ইংরেজদের সহায়তায় মসনদ অর্জন করা যত সহজ ছিল, তাদের ক্রমবর্ধমান দাবি পূরণ করে ক্ষমতায় থাকা ততটাই কঠিন।

মীর জাফর স্বাধীন কূটনৈতিক পথ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। ইংরেজদের প্রভাব সামলাতে তিনি ওলন্দাজদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে সন্দেহ তৈরি হয়। ১৭৫৯ সালে বাংলায় ইংরেজ ও ওলন্দাজ বাহিনীর সংঘর্ষে ওলন্দাজরা পরাজিত হলে মীর জাফরের বিকল্প বিদেশি সহায়তার আশা ভেঙে যায়। কোম্পানির কর্মকর্তারা তখন তাঁর আর্থিক অক্ষমতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে সামনে এনে নতুন নবাব বসানোর পরিকল্পনা করেন।

মীর কাসিম ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বাস্তববাদী এবং প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি বুঝেছিলেন যে ইংরেজদের সমর্থন ছাড়া তখন মুর্শিদাবাদের সিংহাসন পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে কোম্পানিও জানত, মীর কাসিম নবাব হতে চাইলে বড় মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকবেন। ১৭৬০ সালে গোপন দরকষাকষির মাধ্যমে মীর জাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করে মীর কাসিমকে নবাব করার ব্যবস্থা হয়। এই পরিবর্তনে বড় কোনো যুদ্ধ বা জনসমর্থনের প্রয়োজন পড়েনি; ইংরেজ সৈন্যের উপস্থিতি ও রাজনৈতিক চাপই যথেষ্ট ছিল।

নবাব হওয়ার বিনিময়ে মীর কাসিম কোম্পানিকে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের রাজস্বপূর্ণ জেলা হস্তান্তর করেন। এই তিন অঞ্চল থেকে পাওয়া আয় কোম্পানির সেনাবাহিনীর ব্যয় বহনে সহায়তা করত। পাশাপাশি কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের বিপুল অর্থ দেওয়া হয়। মীর জাফরকে ভাতা দিয়ে সিংহাসন থেকে সরিয়ে রাখা হয়। বাইরে থেকে নবাবি শাসন অপরিবর্তিত মনে হলেও এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাংলার শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা ক্রমে কোম্পানির হাতে চলে গেছে।

ইংরেজরা ধারণা করেছিল, মীর কাসিম তাদের অনুগ্রহে ক্ষমতায় এসেছেন বলে দীর্ঘদিন অনুগত থাকবেন। কিন্তু তিনি মীর জাফরের মতো নামমাত্র শাসক হয়ে থাকতে চাননি। সিংহাসনে বসেই তিনি রাজস্বব্যবস্থা পুনর্গঠন, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা অপসারণ, জমিদার নিয়ন্ত্রণ এবং সেনাবাহিনী আধুনিক করার উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রাজকোষ শক্তিশালী করা এবং ইংরেজদের ওপর নির্ভরতা কমানো।

মীর কাসিম প্রথমে কোম্পানির পাওনা ও প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধের চেষ্টা করেন, যাতে ইংরেজরা তাঁর প্রশাসনিক সংস্কারে বাধা না দেয়। কিন্তু রাজকোষ তখন দুর্বল ছিল। তিনি বকেয়া রাজস্ব আদায় করেন, অপচয় কমান এবং ধনী কর্মকর্তা ও জমিদারদের হিসাব পরীক্ষা করান। কঠোর রাজস্বনীতির কারণে অনেক দেশীয় অভিজাত তাঁর বিরোধী হয়ে ওঠে। তবু অল্প সময়ের মধ্যে তিনি প্রশাসনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পান।

মুর্শিদাবাদ ছিল বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজধানী, কিন্তু সেখানে জগৎশেঠ পরিবার, পুরোনো দরবারি গোষ্ঠী এবং কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। মীর কাসিম অনুভব করেন, মুর্শিদাবাদে থাকলে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ইংরেজ ও বিরোধীদের নজরদারিতে থাকবে। তাই তিনি রাজধানী মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন। বিহারের ভেতরে গঙ্গার তীরে অবস্থিত মুঙ্গের ছিল প্রতিরক্ষার জন্য সুবিধাজনক এবং কলকাতার ইংরেজ কেন্দ্র থেকে তুলনামূলক দূরে।

মুঙ্গেরকে তিনি শুধু প্রশাসনিক রাজধানী করেননি; এটিকে সামরিক সংস্কারের কেন্দ্রেও পরিণত করেন। দুর্গ মেরামত, অস্ত্রাগার স্থাপন, কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র নির্মাণ এবং সৈন্যদের নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ইউরোপীয় যুদ্ধরীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিদেশি ও আর্মেনীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় পদাতিক বাহিনীকে নিয়মিত অনুশীলন করানো হয়। সেনাদের বেতন, পোশাক, অস্ত্র এবং শৃঙ্খলার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।

এই সামরিক সংস্কার ইংরেজদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। কোম্পানি এমন একজন নবাব চেয়েছিল, যিনি প্রশাসন চালাবেন কিন্তু স্বাধীন সামরিক শক্তি গড়বেন না। মীর কাসিমের আধুনিক বাহিনী প্রমাণ করছিল যে তিনি প্রয়োজনে কোম্পানির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তিনি শুরুতেই যুদ্ধ চাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে নবাবি সরকার ইংরেজদের সঙ্গে সমান মর্যাদায় আলোচনা করতে পারে।

মীর কাসিম ও কোম্পানির সংঘাতের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অপব্যবহার। মুঘল সম্রাটের পুরোনো ফরমান অনুসারে কোম্পানি নির্দিষ্ট আমদানি ও রপ্তানি পণ্যে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করত। এসব সুবিধা কোম্পানির আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের জন্য ছিল। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসায়ও শুল্কমুক্ত ছাড়পত্র ব্যবহার করতে শুরু করেন। লবণ, সুপারি, তামাক, চাল, তেল, কাপড়সহ অভ্যন্তরীণ বাজারের নানা পণ্য তারা কর না দিয়েই পরিবহন করতেন।

দস্তক নামে পরিচিত এসব ছাড়পত্র অনেক সময় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছেও বিক্রি বা ভাড়া দেওয়া হতো। ফলে কোম্পানির সুরক্ষায় থাকা ব্যবসায়ীরা শুল্ক না দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন, অথচ সাধারণ দেশীয় ব্যবসায়ীকে নির্ধারিত কর দিতে হতো। একই পণ্য নিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দেশীয় ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়তেন। নবাবের রাজস্বও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

কোম্পানির নিচু পর্যায়ের কর্মচারীরাও নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষা ব্যবহার করে রাজস্ব কর্মকর্তাদের অপমান বা বাধা দিতেন। কোনো শুল্ক কর্মকর্তা কোম্পানির পতাকাবাহী নৌকা পরীক্ষা করতে চাইলে তাঁকে গ্রেপ্তার, মারধর বা হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ছিল। কোম্পানির বাণিজ্যিক সুবিধা এভাবে একটি সমান্তরাল কর্তৃত্বে পরিণত হয়েছিল। বাংলার ভেতরে ইংরেজ কর্মচারীরা যেন নবাবের আইন ও রাজস্বব্যবস্থার বাইরে একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী হয়ে উঠেছিল।

মীর কাসিমের কাছে এটি শুধু রাজস্বের প্রশ্ন ছিল না। তাঁর মতে, নিজের ভূখণ্ডে কার কাছ থেকে কত কর নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা নবাবের মৌলিক অধিকার। কোম্পানির কর্মচারীরা সেই অধিকার অস্বীকার করছিলেন। তিনি ইংরেজদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে কর দেওয়ার জন্য চাপ দেন এবং অপব্যবহার বন্ধে আলোচনা শুরু করেন। কলকাতার কোম্পানি পরিষদের সদস্যদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ ছিল। কেউ সমঝোতার পক্ষে থাকলেও ব্যক্তিগত বাণিজ্য থেকে লাভবান অধিকাংশ কর্মকর্তা বিশেষ সুবিধা ছাড়তে রাজি ছিলেন না।

এক পর্যায়ে মীর কাসিম সমস্যার একটি চতুর সমাধান বের করেন। যদি ইংরেজদের কাছ থেকে কর আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি সকল ব্যবসায়ীর জন্য অভ্যন্তরীণ শুল্ক তুলে দেবেন। ১৭৬৩ সালে তিনি দেশীয় ও বিদেশি সবার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ওপর থেকে শুল্ক বাতিল করেন। এর ফলে আইনগতভাবে সবাই সমান সুবিধা পেত এবং কোম্পানির কর্মচারীদের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের বিশেষ মূল্য শেষ হয়ে যেত।

সাধারণ দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত মুক্ত বাণিজ্য ও সমতার নীতি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কোম্পানির কর্মকর্তারা একে নিজেদের বিশেষ অধিকারের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখেন। তাদের উদ্দেশ্য শুধু কর না দেওয়া ছিল না; দেশীয় ব্যবসায়ীদের তুলনায় বেশি সুবিধা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ছিল। সবাই শুল্কমুক্ত হলে তাদের একচেটিয়া সুবিধা আর থাকত না। তাই তারা নবাবের সিদ্ধান্ত বাতিল এবং দেশীয় ব্যবসায়ীদের ওপর আবার কর আরোপের দাবি করে।

এখানেই কোম্পানির রাজনৈতিক চরিত্র স্পষ্ট হয়। একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলে তারা সবার জন্য করমুক্ত বাজারকে স্বাগত জানাতে পারত। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা সমান প্রতিযোগিতা চাননি; তারা বিশেষ মর্যাদা চেয়েছিলেন। সেই মর্যাদা রক্ষার জন্য তারা সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন। মীর কাসিমের সঙ্গে বিরোধ তাই করের হারের প্রশ্ন ছাড়িয়ে সার্বভৌমত্বের সংঘাতে রূপ নেয়।

কলকাতার পরিষদ নবাবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। আলোচনা ব্যর্থ হতে থাকে এবং উভয় পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ে। কোম্পানির পাটনা কারখানার প্রধান উইলিয়াম এলিস বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক ছিলেন। তিনি মীর কাসিমকে বিশ্বাস করতেন না এবং বিহারে ইংরেজ কর্তৃত্ব বাড়াতে চাইতেন। নবাবের সেনা প্রস্তুতি ও অস্ত্র সংগ্রহকে তিনি আসন্ন আক্রমণের প্রমাণ হিসেবে দেখতেন।

পাটনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ১৭৬৩ সালের জুনে এলিস নবাবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণার আগেই পাটনা দখলের চেষ্টা করেন। ইংরেজ বাহিনী প্রথমে শহরের কিছু অংশ দখল করে এবং লুণ্ঠনেও জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মীর কাসিমের সেনারা দ্রুত পাল্টা আক্রমণ করে। ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয় এবং এলিসসহ বহু ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও সৈন্য বন্দী হন। এই ঘটনা সমঝোতার অবশিষ্ট সম্ভাবনাও প্রায় শেষ করে দেয়।

কোম্পানি মীর কাসিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বৃদ্ধ মীর জাফরকে আবার বাংলার নবাব ঘোষণা করে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছর আগে যাঁকে অকার্যকর বলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁকেই এখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। কোম্পানির দৃষ্টিতে নবাবের যোগ্যতা বা বৈধতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মীর জাফর নতুন শর্তে কোম্পানির দাবিগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন।

মীর কাসিমকে অপসারণের পক্ষে কোম্পানি প্রচার চালায় যে তিনি চুক্তিভঙ্গকারী ও অত্যাচারী। অন্যদিকে মীর কাসিম নিজেকে বৈধ নবাব এবং কোম্পানির অবৈধ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলার কর্তৃত্ব রক্ষাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। সংঘর্ষটি তাই শুধু দুই বাহিনীর যুদ্ধ ছিল না; কে বাংলার বৈধ শাসক এবং আইন তৈরির অধিকার কার—সেই প্রশ্নেও লড়াই চলছিল।

১৭৬৩ সালে কোম্পানি ও মীর কাসিমের মধ্যে পূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়। কোম্পানির বাহিনী মুর্শিদাবাদ ও বিহারের দিকে অগ্রসর হয়। কাটোয়া, গিরিয়া এবং আরও কয়েকটি স্থানে মীর কাসিমের সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। তাঁর বাহিনী আগের নবাবি সেনাবাহিনীর তুলনায় বেশি প্রশিক্ষিত ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবু ইংরেজ বাহিনীর অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, নিয়মিত অনুশীলন, দ্রুত কামান পরিচালনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের সমন্বয় তাদের এগিয়ে রাখে।

উধুয়া নালা বা উদয়নালার যুদ্ধ ছিল এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ। মীর কাসিমের বাহিনী শক্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সামনে জলাভূমি, খাল ও দুর্গযুক্ত অবস্থান কোম্পানির অগ্রযাত্রাকে কঠিন করেছিল। সরাসরি আক্রমণে সাফল্য পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু গোপন পথ, তথ্য ফাঁস এবং প্রতিরক্ষার দুর্বল অংশ ব্যবহার করে ইংরেজরা অবস্থানের ভেতরে প্রবেশ করে। তীব্র লড়াইয়ের পর নবাবের বাহিনী পরাজিত হয়।

উদয়নালার পর মীর কাসিমের সামরিক অবস্থান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজমহল ও মুঙ্গেরের প্রতিরক্ষা ভেঙে যায়। তাঁর প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কিছু অধিনায়ক আনুগত্য হারায়। মুঙ্গেরের দুর্গও শেষ পর্যন্ত কোম্পানির দখলে যায়। রাজধানী ও অস্ত্রাগার হারিয়ে তিনি পাটনার দিকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এই সংকটের মধ্যে বন্দী ইংরেজ কর্মকর্তা ও সৈন্যদের হত্যার ঘটনা ঘটে, যা পাটনা হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। মীর কাসিমের অধীন বিদেশি সেনানায়ক ওয়াল্টার রাইনহার্ট সমরুর লোকেরা বন্দীদের হত্যা করে। ঘটনাটি মীর কাসিমের নির্দেশে ঘটেছিল বলে সাধারণত ধরা হয়, যদিও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিস্তারিত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এলিসসহ বহু ইংরেজ বন্দীর মৃত্যু কোম্পানির প্রচারে মীর কাসিমকে নির্মম শত্রু হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেয়।

পাটনায় বন্দীদের হত্যা সামরিক ও নৈতিক—দুই দিক থেকেই মীর কাসিমের জন্য বিপর্যয়কর ছিল। এতে কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক সুবিধা অর্জিত হয়নি; বরং ইংরেজদের প্রতিশোধের সংকল্প আরও শক্তিশালী হয়। সম্ভাব্য সমঝোতা বা আত্মসমর্পণের পথও সংকুচিত হয়। তাঁর শাসন রক্ষার লড়াই তখন ক্রমে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, আতঙ্ক ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্যে প্রবেশ করে।

মীর কাসিম রাজকোষ নিয়ে মুঙ্গের থেকে পিছু হটার সময় নিজের বিরোধীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেন। জগৎশেঠ পরিবারের মহাতাব রায় ও স্বরূপচাঁদ তাঁর হেফাজতে ছিলেন। তারা ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন বা তাঁর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে পারেন—এই আশঙ্কায় তাঁদের হত্যা করা হয় বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ আছে। পলাশীর আগে শাসক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা শক্তিশালী ব্যাংকার পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব এভাবে নির্মম পরিণতির মুখে পড়ে।

বাংলা ও বিহারের প্রধান কেন্দ্রগুলো হারিয়ে মীর কাসিম পশ্চিমে অযোধ্যার নবাব শুজাউদ্দৌলার কাছে আশ্রয় নেন। কিন্তু তিনি তখনো পরাজয় মেনে নেননি। তাঁর কাছে বিপুল অর্থ ও কিছু সামরিক সম্পদ ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, একা কোম্পানির বিরুদ্ধে জয় সম্ভব নয়। তাই উত্তর ভারতের আরও শক্তিশালী শাসকদের নিয়ে বৃহত্তর জোট গড়ার চেষ্টা করেন।

অযোধ্যার নবাব শুজাউদ্দৌলা কোম্পানির বাংলায় বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। বাংলার পর কোম্পানির প্রভাব অযোধ্যার সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেলে তাঁর নিজের স্বাধীনতাও বিপন্ন হতে পারত। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমও তখন সাম্রাজ্যের নামমাত্র মর্যাদা ধরে রেখে স্থায়ী রাজস্ব ও ভূখণ্ডের সন্ধানে ছিলেন। মীর কাসিম, শুজাউদ্দৌলা ও শাহ আলমের স্বার্থ একত্রিত হওয়ায় কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জোট তৈরি হয়।

জোটের তিন পক্ষের উদ্দেশ্য অবশ্য এক ছিল না। মীর কাসিম চেয়েছিলেন বাংলার সিংহাসন ফিরে পেতে। শুজাউদ্দৌলা চেয়েছিলেন কোম্পানিকে দুর্বল করে পূর্ব ভারতে নিজের প্রভাব বাড়াতে। শাহ আলম চেয়েছিলেন মুঘল সম্রাটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্থায়ী রাজস্ব নিশ্চিত করতে। তাদের সম্মিলিত বাহিনী সংখ্যায় শক্তিশালী হলেও একক নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও অভিন্ন কৌশলের অভাব ছিল।

জোট গড়ার মধ্যেই মীর কাসিম ও শুজাউদ্দৌলার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। মীর কাসিমের কাছে থাকা সম্পদ ও তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অযোধ্যার দরবারে সন্দেহ তৈরি হয়। শুজাউদ্দৌলা তাঁর অর্থ ও সেনাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ফলে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগেই জোটের ভেতরে পারস্পরিক অবিশ্বাস দেখা দেয়। মীর কাসিম শেষ পর্যন্ত সম্মিলিত বাহিনীতে আগের মতো স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি।

১৭৬৪ সালের ২৩ অক্টোবর বক্সারের কাছে কোম্পানির বাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিত জোটের নির্ণায়ক যুদ্ধ হয়। কোম্পানির সেনাপতি হেক্টর মনরোর অধীনে বাহিনী সংখ্যায় প্রতিপক্ষের তুলনায় ছোট ছিল। কিন্তু সৈন্যদের নিয়মিত অনুশীলন, কামানের সমন্বিত ব্যবহার, পদাতিক বাহিনীর শৃঙ্খলা এবং একক নেতৃত্ব তাদের বড় সুবিধা দেয়। বিপরীতে মুঘল, অযোধ্যা ও মীর কাসিমের সঙ্গে যুক্ত বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল ছিল।

বক্সারের যুদ্ধ পলাশীর মতো প্রধানত নিষ্ক্রিয়তা ও গোপন সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। সেখানে সম্মিলিত বাহিনী বাস্তব ও বিস্তৃত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কয়েক ঘণ্টার তীব্র লড়াইয়ের পর কোম্পানির বাহিনী বিজয়ী হয়। জোটের শিবির, কামান ও বিপুল যুদ্ধসামগ্রী ইংরেজদের হাতে পড়ে। এই বিজয় সামরিক দিক থেকে পলাশীর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ কোম্পানি এবার একটি নবাবি বাহিনী নয়, মুঘল সম্রাট ও অযোধ্যার নবাবের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করেছিল।

বক্সারের যুদ্ধের সময় মীর কাসিমের প্রত্যক্ষ ভূমিকা সীমিত ছিল। শুজাউদ্দৌলার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে তিনি জোটের মূল নেতৃত্ব থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তবু যুদ্ধটির পটভূমি তৈরি হয়েছিল তাঁর সঙ্গে কোম্পানির সংঘাত থেকেই। তাঁর বাংলার মসনদ পুনরুদ্ধারের আশা এই পরাজয়ের পর কার্যত শেষ হয়ে যায়।

বক্সারে পরাজয়ের পর দ্বিতীয় শাহ আলম ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতার পথে যান। শুজাউদ্দৌলা কিছুদিন প্রতিরোধ চালালেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে সন্ধি করতে বাধ্য হন। মীর কাসিমের বিনিময়ে ইংরেজদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও অযোধ্যার দরবারে হিসাব চলেছিল। একসময়ের নবাব তখন রাজনৈতিক দরকষাকষির সম্পদে পরিণত হন।

মীর কাসিম পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় খুঁজতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সম্পদ শেষ হয়ে যায়, অনুসারীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কোনো শক্তিশালী শাসক তাঁকে পুনরায় বাংলার সিংহাসনে বসানোর ঝুঁকি নিতে রাজি হননি। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি উত্তর ভারতে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটিয়েছিলেন বলে জানা যায়। ১৭৭৭ সালের দিকে দিল্লির নিকটবর্তী অঞ্চলে তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলার আধুনিক সেনাবাহিনী গড়তে চাওয়া এই নবাব শেষ পর্যন্ত নির্বাসিত ও ক্ষমতাহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

অন্যদিকে মীর জাফরকে দ্বিতীয়বার নবাব করা হলেও তিনি আগের চেয়ে আরও বেশি কোম্পানিনির্ভর ছিলেন। তাঁর শাসনকালে প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমে কলকাতার কোম্পানি পরিষদের হাতে চলে যায়। ১৭৬৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র নাজমুদ্দৌলাকে নবাব করা হয়। তখন নবাব নির্বাচন যে কোম্পানির অনুমোদনের বিষয় হয়ে গেছে, তা আর গোপন ছিল না।

বক্সারের বিজয়ের পর ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করেন। এর মাধ্যমে কোম্পানি এসব অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক অধিকার পায়। নবাবের হাতে নামমাত্র বিচার ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকলেও অর্থের উৎস কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যে প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের বিশেষ সুবিধা চাইছিল, সেটিই এখন সম্পূর্ণ প্রদেশের রাজস্ব সংগ্রাহক হয়ে ওঠে।

মীর কাসিমের পতনে কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশলের কয়েকটি ধাপ স্পষ্ট দেখা যায়। প্রথমে তারা আর্থিকভাবে অক্ষম মীর জাফরকে সরিয়ে বেশি সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে মীর কাসিমকে বসায়। এরপর মীর কাসিম স্বাধীন হতে চাইলে তাঁর সংস্কারকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করে। তারপর পুরোনো নবাবকে পুনঃস্থাপন করে নিজেদের যুদ্ধকে বৈধতার আবরণ দেয়। সামরিক বিজয়ের পর মুঘল সম্রাটের কাছ থেকেই রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়ে তারা দখলকে আইনি রূপ দেয়।

এই কৌশলে কোম্পানি সরাসরি প্রথম দিন থেকেই রাজা হওয়ার দাবি করেনি। তারা বিদ্যমান নবাবি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী একজন নবাবকে বৈধ এবং অন্যজনকে বিদ্রোহী ঘোষণা করেছে। অর্থ, উপঢৌকন ও ভূখণ্ডের বিনিময়ে শাসক বসিয়েছে, আবার একই শাসক স্বাধীনতা দেখালে তাঁকে সরিয়েছে। এতে বাংলার দেশীয় প্রশাসনিক কাঠামো বাইরে থেকে টিকে থাকলেও তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে যায়।

মীর কাসিমকে অনেক সময় ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতার নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁর শুল্কসমতা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আধুনিক সেনাবাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলার সার্বভৌম কর্তৃত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা ছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে কোম্পানির বিশেষ সুবিধা বহাল থাকলে নবাবি রাজস্ব ও দেশীয় ব্যবসা ধ্বংস হবে। এই উপলব্ধি তাঁর সময়ের বহু অভিজাতের তুলনায় গভীর ছিল।

কিন্তু মীর কাসিমকে আধুনিক জাতীয়তাবাদী শাসক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি প্রথমে ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তি করে নিজের শ্বশুরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন এবং বিপুল ভূখণ্ড ও অর্থের বিনিময়ে সিংহাসন পেয়েছিলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজের নবাবি ক্ষমতা সুসংহত করা, আধুনিক অর্থে জাতীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা নয়। সংকটে তিনি বিরোধীদের হত্যা, কঠোর রাজস্ব আদায় এবং বন্দীদের মৃত্যুদণ্ডের মতো নির্মম পদক্ষেপও নিয়েছিলেন।

তাঁর পতনের পেছনে কয়েকটি নিজস্ব দুর্বলতাও ছিল। তিনি দ্রুত সংস্কার করলেও একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে পারেননি। কঠোর রাজস্বনীতি জমিদার ও অভিজাতদের দূরে সরিয়ে দেয়। মুর্শিদাবাদের পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে তিনি বিশ্বাস করতেন না, আবার তাদের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক সমর্থনও তৈরি করতে পারেননি। আধুনিক সেনাবাহিনী গড়লেও তার নেতৃত্ব ও আনুগত্য পুরোপুরি দৃঢ় ছিল না।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে মীর কাসিমের বাহিনী কয়েকটি স্থানে সাহসিকতার সঙ্গে লড়লেও কোম্পানির শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ার পর তিনি নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন। পাটনার বন্দী হত্যা তাঁর নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে এবং কোম্পানির প্রচারের জন্য শক্তিশালী অস্ত্র দেয়। অযোধ্যায় গিয়েও তিনি সমান মর্যাদার অংশীদার হতে পারেননি; ধীরে ধীরে শুজাউদ্দৌলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

তবু তাঁর প্রতিরোধ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি কোম্পানির রাজনৈতিক লক্ষ্যকে উন্মোচিত করেছিলেন। শুল্ক নিয়ে বিরোধ প্রমাণ করে যে ইংরেজ কর্মকর্তারা সমান বাণিজ্যিক সুযোগ চাননি; তারা এমন বিশেষ সুবিধা চেয়েছিলেন যা দেশীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেবে। নবাব যখন সবার জন্য সমান নিয়ম চালু করেন, তখন কোম্পানি বাণিজ্যিক আলোচনা নয়, শাসক পরিবর্তন ও যুদ্ধের পথ বেছে নেয়।

মীর কাসিমের পতনের পর বাংলার ক্ষমতার লড়াইয়ে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। পলাশীর পর কোম্পানি দরবারের একটি শক্তিশালী অংশীদার হয়েছিল; বক্সারের পর তারা উত্তর ভারতের প্রধান সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। আগে কোম্পানি নবাবের কাছ থেকে সুযোগ চাইত, পরে নবাবকেই কোম্পানির অনুমতি নিয়ে শাসন করতে হয়। রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ইংরেজদের সেনাবাহিনীর ব্যয় ভারতীয় অর্থ থেকেই মেটানো সম্ভব হয়, যা তাদের আরও ভূখণ্ড জয়ের শক্তি দেয়।

মীর কাসিমের ইতিহাস তাই এক গভীর বৈপরীত্যের কাহিনি। ইংরেজদের রাজনৈতিক কৌশলে তিনি ক্ষমতা লাভ করেছিলেন, আবার সেই কৌশলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই সব হারিয়েছিলেন। তিনি কোম্পানির সহায়তায় মীর জাফরকে সরিয়েছিলেন, পরে কোম্পানি তাঁকে সরিয়ে মীর জাফরকে ফিরিয়ে আনে। তিনি রাজস্ব ও বাণিজ্যে সমতা আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিশেষ সুবিধা হারানোর ভয়ে কোম্পানি তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তিনি আধুনিক সেনাবাহিনী গড়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্য ও নির্ভরযোগ্য জোট ছাড়া সেই বাহিনী টেকেনি।

শেষ বিচারে মীর কাসিমের পতন শুধু একজন নবাবের ব্যর্থতা নয়; এটি বাংলার রাষ্ট্রক্ষমতার রূপান্তরের নির্ধারক অধ্যায়। এখানে একটি বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রথমে অর্থ দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে, তারপর সেনাবাহিনী দিয়ে শাসক বদলেছে এবং শেষে আইনি অনুমোদনের আবরণে রাজস্বব্যবস্থা দখল করেছে। মীর কাসিম এই রূপান্তর থামানোর শেষ শক্তিশালী নবাবি প্রচেষ্টাগুলোর একটি করেছিলেন। তাঁর পরাজয়ের সঙ্গে শুধু তাঁর মসনদ নয়, বাংলার স্বাধীন আর্থিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তিও ভেঙে পড়ে।


আপনার পছন্দ হতে পারে