বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দ্য ওয়াচার হাউস: ভয়ংকর চিঠির প্রেরক কে? বাস্তব ঘটনা ও অমীমাংসিত রহস্য

দ্য ওয়াচার হাউস: ভয়ংকর চিঠির প্রেরক কে? বাস্তব ঘটনা ও অমীমাংসিত রহস্য
চিঠির প্রেরক নিজেকে বাড়িটির পর্যবেক্ষক দাবি করলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হয়নি।

দ্য ওয়াচার হাউসের রহস্যের সরাসরি উত্তর হলো: হুমকির চিঠিগুলোর লেখক কে ছিলেন, তা প্রকাশ্য প্রমাণে এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রতিবেশী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা বাড়ির সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক থাকা মানুষের দিকে সন্দেহ গিয়েছিল। কিন্তু সন্দেহ থেকে কাউকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। ঘটনাটির কেন্দ্রে কোনো প্রমাণিত অতিপ্রাকৃত উপস্থিতি নেই। রয়েছে একটি বাস্তব বাড়ি, পরিচয় গোপন রাখা চিঠির প্রেরক এবং এমন একটি পরিবার, যারা নিরাপত্তার আশঙ্কায় কেনা বাড়িতে বসবাসই শুরু করতে পারেনি।

ঘটনার শুরু ২০১৪ সালের জুনে। ডেরেক ও মারিয়া ব্রডাস যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ওয়েস্টফিল্ডে একটি বড় বাড়ি কেনেন। পরিচিত ঠিকানা ৬৫৭ বুলেভার্ড। প্রায় তেরো লাখ ছাপ্পান্ন হাজার ডলারের বাড়িটি ছিল পরিবারের ভবিষ্যৎ বাসস্থান। তাঁদের তিন সন্তান ছিল এবং মারিয়ার শৈশবের এলাকার সঙ্গেও স্থানটির সম্পর্ক ছিল। কেনাকাটার পর তাঁরা সংস্কারের কাজ শুরু করেন। কিন্তু মালিকানা পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আসা একটি চিঠি বাড়িটিকে ঘিরে তাঁদের পরিকল্পনা বদলে দেয়।

চিঠির লেখক নিজেকে ‘দ্য ওয়াচার’, অর্থাৎ পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিচয় দেন। বাড়িটিকে নিজের পরিবারের দীর্ঘদিনের নজরদারির বিষয় বলে দাবি করেন এবং আগের প্রজন্মের কথাও উল্লেখ করেন। এই দাবি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস নয়। লেখক সত্যিই পারিবারিক কোনো সম্পর্কের কথা জানাচ্ছিলেন, নাকি ভয়ের আবহ তৈরির জন্য অতীত বানাচ্ছিলেন, তা জানা যায়নি। রহস্যটি বোঝার সময় চিঠিতে লেখা বক্তব্য এবং যাচাই করা ঘটনা আলাদা রাখা জরুরি।

প্রথম চিঠিতেই স্বাগত জানানোর ভঙ্গির পাশাপাশি অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ছিল। বাড়ির পরিবর্তন, নতুন বাসিন্দা এবং সন্তানদের নিয়ে লেখকের আগ্রহ পরে আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। শিশুদের এমন ভাষায় উল্লেখ করা হয়, যা অভিভাবকদের কাছে সম্ভাব্য বিপদের সংকেত মনে হওয়া স্বাভাবিক। বাড়ির মালিকদের জন্য সমস্যাটি তাই নিছক অদ্ভুত চিঠি পাওয়া ছিল না। অজ্ঞাত ব্যক্তি তাঁদের পরিবারের উপস্থিতি ও কার্যকলাপ সম্পর্কে কিছু জানেন বলে মনে হচ্ছিল।

পরবর্তী চিঠিতে সন্তানদের সম্পর্কে তথ্য এবং বাড়িতে ঘটে যাওয়া কার্যকলাপের উল্লেখ সন্দেহ বাড়ায়। একটি বিবরণে পরিবারের ছোট সন্তানকে ছবি আঁকতে দেখার দাবি ছিল। এসব তথ্য কাছাকাছি কোনো অবস্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এমন উল্লেখ নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে লেখক বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলেন বা সর্বক্ষণ নজর রাখতেন। বাইরে থেকে দেখা, আশপাশে শোনা এবং অনুমান করার সম্ভাবনাও আলাদাভাবে বিচার করতে হয়।

ব্রডাস পরিবার পুলিশকে জানায় এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানকারীরও সহায়তা নেয়। বাড়ির আশপাশের মানুষ, চিঠির ভাষা এবং প্রেরকের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে অনুসন্ধান চলে। কিন্তু তদন্তে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল তথ্য থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিতে পৌঁছানো। বাড়ির সংস্কার অপছন্দ করা, রাস্তা দিয়ে নিয়মিত হাঁটা কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করা কাউকে সন্দেহের মধ্যে আনতে পারে; এগুলোর কোনোটি একা চিঠি লেখার প্রমাণ নয়। প্রকাশ্য আলোচনায় এই পার্থক্য প্রায়ই হারিয়ে গেছে।

খামের সঙ্গে পাওয়া জৈব নমুনা তদন্তের একটি উল্লেখযোগ্য সূত্র ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষায় নারীর ডিএনএর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু খামে যার জৈব উপাদান রয়েছে, তিনিই চিঠি রচনা করেছেন—এ সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেওয়া যায় না। খাম বন্ধ করা, চিঠি প্রস্তুত করা এবং ভাষা লেখা একই ব্যক্তির কাজ না-ও হতে পারে। নমুনার মান, প্রাসঙ্গিকতা এবং তুলনামূলক পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিচয়-নির্ধারক নিশ্চিত মিল প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বাড়ির আগের মালিকেরাও বিক্রির কিছু আগে একই পরিচয়ে একটি চিঠি পাওয়ার কথা জানান। তাঁরা সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেছিলেন। ব্রডাস দম্পতি পরে অভিযোগ করেন, এই তথ্য কেনার আগে তাঁদের জানানো উচিত ছিল। বিষয়টি দেওয়ানি মামলায় গড়ায়, কিন্তু সেই মামলা চিঠির লেখক শনাক্ত করেনি। সম্পত্তি বিক্রির সময় কোন তথ্য প্রকাশ করা দরকার এবং কে হুমকির চিঠি লিখেছে—দুটি প্রশ্নের প্রমাণ ও বিচার এক নয়।

ঘটনার সবচেয়ে ভুলভাবে উপস্থাপিত অংশগুলোর একটি হলো পরিবারের বসবাস। ব্রডাস দম্পতি সন্তানদের নিয়ে ওই বাড়িতে উঠে দীর্ঘদিন আতঙ্কের মধ্যে থাকেননি। তাঁরা সেখানে পারিবারিক বসবাস শুরুই করেননি। সংস্কারের জন্য যাওয়া এবং স্থায়ীভাবে থাকা আলাদা বিষয়। পরে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ভাড়াটিয়া থাকার সময়ও ব্রডাসদের উদ্দেশে আরেকটি চিঠি আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে ঘটনাটি শুধু কেনার পরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

বাড়ি ছেড়ে দেওয়াও সহজ হয়নি। ২০১৫ সালে বিক্রির চেষ্টা শুরু হলেও চিঠির খবর সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ায়। বাড়ি ভেঙে জমিতে দুটি নতুন বাড়ি তৈরির পরিকল্পনাও স্থানীয় অনুমোদন পায়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে বাড়িটি নয় লাখ ঊনষাট হাজার ডলারে বিক্রি হয়। ক্রয়মূল্যের সঙ্গে পার্থক্য ছিল প্রায় চার লাখ ডলার; সংস্কার, কর এবং অন্যান্য ব্যয় তার বাইরে। তাই আর্থিক ক্ষতি বলতে শুধু বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানই পুরো হিসাব নয়।

পরিবার নিজেরাই ঘটনা সাজিয়েছিল কি না, এমন অভিযোগও ছড়িয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্য প্রমাণে ব্রডাসদের মূল হুমকির চিঠিগুলোর লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। কোনো গল্প থেকে প্রচার পাওয়া বা পরে সেই গল্পের নাট্যরূপ তৈরি হওয়া তার আগের অভিযোগকে সত্য করে না। একইভাবে পরিবারের ক্ষতি হয়েছে বলেই সম্ভাব্য প্রতিটি প্রশ্ন তদন্তের বাইরে চলে যায় না। গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট চিঠির সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তির যাচাইযোগ্য সম্পর্ক।

২০২২ সালের ধারাবাহিক নাট্যরূপ ঘটনাটিকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে, তবে বাস্তবের সঙ্গে বহু কল্পিত উপাদান যোগ করে। পরিবারের নাম ও গঠন বদলানো হয় এবং চরিত্রদের বাড়িতে বসবাস করতে দেখানো হয়। সুড়ঙ্গ, গোপন সংগঠন ও হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত নাটকীয় ঘটনাকে বাস্তব তদন্তের ফল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। ওয়েস্টফিল্ডের অন্য একটি বাস্তব হত্যাকাণ্ড থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া কাহিনিও ওয়াচারের চিঠির সঙ্গে প্রমাণিত সম্পর্ক তৈরি করে না। পর্দার সন্দেহভাজন আর বাস্তব অপরাধী এক বিষয় নয়।

তাহলে প্রেরক সম্পর্কে কতটুকু বলা যায়? চিঠিগুলোতে বাড়ি ও পরিবারের বিষয়ে মনোযোগ এবং ভীতি তৈরির ভাষা ছিল। কিন্তু লেখকের বয়স, লিঙ্গ, উদ্দেশ্য, বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না—এসব নিশ্চিত নয়। ‘আমি দেখছি’ ধরনের বক্তব্যের কিছু অংশ সত্য পর্যবেক্ষণ, কিছু অংশ অতিরঞ্জনও হতে পারে। এই মামলার অমীমাংসিত অবস্থার অর্থ সব ব্যাখ্যা সমান গ্রহণযোগ্য নয়; অর্থ হলো, পরিচয় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


আপনার পছন্দ হতে পারে