বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইস্টার দ্বীপের মোয়াই কীভাবে সরানো হয়েছিল? বিশাল পাথরের মূর্তি ‘হাঁটানোর’ বিজ্ঞান

ইস্টার দ্বীপের মোয়াই কীভাবে সরানো হয়েছিল? বিশাল পাথরের মূর্তি ‘হাঁটানোর’ বিজ্ঞান
দড়ির নিয়ন্ত্রিত টানে মূর্তি দুলিয়ে এগিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি পরীক্ষায় সফল হয়েছে।

ইস্টার দ্বীপের মোয়াই নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, আধুনিক যন্ত্র ছাড়া এত ভারী পাথরের মূর্তি কীভাবে কয়েক কিলোমিটার দূরে নেওয়া হয়েছিল? এর একটি পরীক্ষিত উত্তর হলো, মূর্তিকে দাঁড়ানো অবস্থায় দড়ি দিয়ে দুলিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। বাইরে থেকে এই চলাচল অনেকটা হাঁটার মতো দেখায়। তবে শিরোনামের ‘শত টন’ কথাটির সংশোধন দরকার। সব মোয়াই এত ভারী নয়, আর সবচেয়ে বড় অসমাপ্ত মূর্তিটিকে খনি থেকে সরানোই হয়নি। পরিবহনের প্রমাণ এবং মূর্তির সম্ভাব্য ওজন আলাদা বিষয়।

দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপের স্থানীয় নাম রাপা নুই। এখানকার পলিনেশীয় জনগোষ্ঠী মোয়াই তৈরি করেছিল। মূর্তিগুলো শুধু মাথা নয়; অধিকাংশের ধড়, হাত এবং শরীরের অন্য অংশও রয়েছে। কিছু মূর্তি মাটিতে আংশিক চাপা পড়ে থাকায় শুধু মাথার ছবি বেশি পরিচিত হয়েছে। বহু মোয়াই আচার-অনুষ্ঠানের পাথরের মঞ্চে স্থাপন করা হয়েছিল, যেগুলোর নাম আহু। তাই নির্মাণের কাজটি ছিল শিলা খোদাই, পরিবহন এবং নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠা করার একটি ধারাবাহিক প্রকল্প।

প্রথমে ওজনের পার্থক্যটি বোঝা দরকার। অনেক মোয়াইয়ের ওজন কয়েক টন থেকে কয়েক দশ টনের মধ্যে। পরিবহন করে মঞ্চে তোলা বৃহত্তম পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি পারো, যার ওজন প্রায় চুয়াত্তর মেট্রিক টন বলে হিসাব করা হয়েছে। অন্যদিকে রানু রারাকুর বিশাল অসমাপ্ত মূর্তি প্রায় একুশ মিটার দীর্ঘ এবং সম্ভাব্য ওজন দুইশ টনের বেশি। কিন্তু সেটি মূল শিলা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নই করা হয়নি। ফলে তার আকার দেখে দ্বীপবাসী দুইশ টনের মূর্তি কয়েক কিলোমিটার সরিয়েছিল বলা যাবে না।

অধিকাংশ মোয়াই খোদাই করা হয়েছিল রানু রারাকুর আগ্নেয় ছাই থেকে গঠিত টাফ শিলায়। শক্ত ব্যাসল্টের পাথরের সরঞ্জাম দিয়ে শিলা কেটে মুখ ও শরীর তৈরি করা হতো। খনিতে বিভিন্ন পর্যায়ের অসমাপ্ত মূর্তি থাকায় নির্মাণপ্রক্রিয়ার অনেক ধাপ বোঝা যায়। তবে পাথর কাটা থেকে মূর্তি দাঁড় করানো এবং সেখান থেকে দূরের মঞ্চে পৌঁছানো—প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা ব্যবস্থা দরকার ছিল। একই কৌশল দিয়ে পুরো কাজ সম্পন্ন হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

পরিবহনের সূত্র রয়েছে প্রাচীন রাস্তা এবং রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মোয়াইয়ে। কিছু মূর্তি গন্তব্যের মঞ্চে পৌঁছেছে, কিছু খনিতে রয়ে গেছে, আর কিছু পরিবহনপথে পরিত্যক্ত হয়েছে বলে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেন। পথের মূর্তির ভিত্তি, সামনের দিকে হেলে থাকার প্রবণতা এবং ভাঙনের ধরন পরীক্ষা করে পরিবহনের ধারণা যাচাই করা যায়। গন্তব্যে স্থাপিত মূর্তির আকৃতি হুবহু নকল করলেই পরিবহনকালের নকশা পুনর্গঠন করা হয় না; শেষ পর্যায়ে ভিত্তি ও অন্যান্য অংশ বদলানো হয়ে থাকতে পারে।

রাপা নুইয়ের মৌখিক ঐতিহ্যে মূর্তি ‘হেঁটে’ গিয়েছিল—এমন বিবরণ রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ কার্ল লিপো ও টেরি হান্ট এই ধারণাকে ভৌতভাবে পরীক্ষা করেছেন। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, চওড়া ভিত্তি এবং উপযুক্ত ভরবণ্টনের মূর্তিকে সামান্য সামনে হেলিয়ে রাখা যায়। দুই পাশ থেকে পালাক্রমে দড়ি টানলে সেটি ভিত্তির এক ধার থেকে অন্য ধারে ভর বদলায়। প্রতিটি দোলের সঙ্গে সামান্য ঘুরে সামনে এগোয়। মূর্তির নিচে পা নেই; ‘হাঁটা’ শব্দটি এই দুলে এগোনোর বর্ণনা।

পেছনের দড়ি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সামনের দিকে ঝোঁকা মূর্তিকে শুধু পাশ থেকে টানলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পেছনের দল সেই ঝোঁক সীমিত রাখে এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করে। পুরো মূর্তিকে মাটি থেকে তুলে বহন করতে হয় না; ভিত্তির অংশবিশেষ পর্যায়ক্রমে ভার বহন করে। তবে এতে মূর্তির ওজন কমে যায় না। সাফল্য নির্ভর করে ভরকেন্দ্র, ভিত্তির আকৃতি, দড়ির অবস্থান, রাস্তার ঢাল এবং দলের ছন্দময় সমন্বয়ের ওপর।

এই পদ্ধতি যাচাইয়ে প্রায় চার দশমিক তিন পাঁচ মেট্রিক টনের একটি প্রতিরূপ ব্যবহার করা হয়েছিল। আঠারো জনের দল সেটিকে প্রায় চল্লিশ মিনিটে একশ মিটার এগিয়ে নিতে পেরেছিল। পরীক্ষাটি দেখায় যে কয়েক টন ওজনের উপযুক্ত আকৃতির মূর্তি দড়ি দিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় সরানো বাস্তবসম্ভব। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি বলা যায় না, একই সংখ্যক মানুষ চুয়াত্তর টনের মূর্তি সব ধরনের পথে সমান গতিতে নিতে পারত। আকার বাড়লে দড়ির টান, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার চাহিদাও বদলায়।

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় প্রায় এক হাজার মোয়াইয়ের তথ্যের মধ্যে বিশেষভাবে বাষট্টিটি পথসংলগ্ন মূর্তি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা ত্রিমাত্রিক মডেল, ভিত্তির গঠন, রাস্তার বৈশিষ্ট্য ও ভাঙনের বিন্যাস মিলিয়ে হাঁটানোর ব্যাখ্যার পক্ষে যুক্তি দেন। কিছু পথের অবতল আড়াআড়ি গঠনও তাঁরা বিবেচনা করেন। তবে এগুলো একই ব্যাখ্যার সঙ্গে বিভিন্ন প্রমাণ মেলানোর প্রচেষ্টা। পরীক্ষায় কোনো পদ্ধতি সফল হওয়া এবং অতীতের প্রতিটি মূর্তি সেই পদ্ধতিতেই সরানো হয়েছিল প্রমাণ করা এক নয়।

শুইয়ে টানার বিকল্প পদ্ধতিও পরীক্ষিত হয়েছে। কাঠের পরিবহনকাঠামো, গুঁড়ি কিংবা পিছলে চলার উপযোগী ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতিরূপ সরানোর পরীক্ষা রয়েছে। এসব পদ্ধতির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আলাদা। শুইয়ে নিলে স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে, কিন্তু কাঠামো তৈরি, ঘর্ষণ সামলানো এবং শেষে মূর্তি দাঁড় করানোর কাজ দরকার হয়। দাঁড়ানো অবস্থায় নিলে পতনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাই গবেষণার প্রশ্ন শুধু কোন পদ্ধতি সম্ভব, তা নয়; কোনটি বাস্তব রাস্তা ও মূর্তির চিহ্ন সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা করে।

কিছু মোয়াইয়ের মাথার লাল পাথরের অংশ, পুকাও, আবার আলাদা প্রকৌশলগত সমস্যা। এটি মূল মূর্তির সঙ্গে একই শিলায় খোদাই করা নয়। গবেষকেরা প্রস্তাব করেছেন, নলাকার পুকাও দড়ি পেঁচিয়ে ঢালু পথ দিয়ে গড়িয়ে ওপরে তোলা হয়ে থাকতে পারে। এই পদ্ধতিতে দড়ি দিয়ে ঘূর্ণন ও ওঠা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মূর্তি পরিবহন এবং মাথায় পুকাও বসানো তাই দুটি পৃথক কাজ; একটির পরীক্ষামূলক সাফল্য অন্যটির পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না।

মোয়াই সরাতে দ্বীপের সব গাছ কেটে গুঁড়ির পথ বানানো হয়েছিল—এমন জনপ্রিয় কাহিনিও প্রমাণিত সিদ্ধান্ত হিসেবে বলা উচিত নয়। হাঁটানোর পদ্ধতিতে অবিরাম কাঠের গুঁড়ির সারি অপরিহার্য নয়, যদিও দড়ি ও অন্যান্য কাজে উদ্ভিজ্জ উপকরণ লাগত। বন পরিবর্তনের ইতিহাসকে শুধু মূর্তি পরিবহনের একটি অনুমান দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পরিবেশগত প্রশ্ন অতিরিক্ত সরল হয়ে যায়। পরিবহনপদ্ধতি বোঝার জন্য রাস্তা, শিলার ক্ষয়চিহ্ন এবং যান্ত্রিক পরীক্ষাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী মোয়াই ‘হাঁটানো’ একটি শক্তিশালী ও পরীক্ষায় সমর্থিত ব্যাখ্যা। তবু সবচেয়ে বড় মূর্তির পরিবহন, জটিল পথ পার হওয়া এবং মঞ্চে শেষবার বসানোর সব বিস্তারিত সমানভাবে নিশ্চিত নয়। যা পরিষ্কার, তা হলো এই কাজের জন্য স্থানীয় মানুষের সংগঠন, পরিকল্পনা এবং ভারসাম্য সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কয়েক টনের প্রতিরূপের সফল চলাচল সেই দক্ষতার বাস্তব সম্ভাবনা দেখায়; খনিতে রয়ে যাওয়া বিশাল অসমাপ্ত মূর্তি আবার তাঁদের অর্জন ও অসম্পূর্ণ কাজের সীমা আলাদা করতে শেখায়।


আপনার পছন্দ হতে পারে