বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বলিভিয়ার ‘ডেথ রোড’: পাহাড়ের খাড়া খাদে নির্মিত সড়কটি কেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পথগুলোর একটি?

বলিভিয়ার ‘ডেথ রোড’: পাহাড়ের খাড়া খাদে নির্মিত সড়কটি কেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পথগুলোর একটি?
পাহাড়, কুয়াশা ও গভীর খাদের মাঝখানে বলিভিয়ার ডেথ রোড

বলিভিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী লা পাজ থেকে পূর্বদিকে আন্দিজ পর্বতমালা পেরিয়ে ইউঙ্গাস অঞ্চলের দিকে নামতে গেলে এমন একটি পুরোনো পাহাড়ি সড়কের দেখা পাওয়া যায়, যার নাম শুনলেই বিপদের ধারণা তৈরি হয়—‘ডেথ রোড’ বা মৃত্যুর সড়ক। এর আনুষ্ঠানিক পরিচয় উত্তর ইউঙ্গাস সড়ক। একসময় লা পাজের উচ্চভূমি থেকে কোরোইকো ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল এটি। কিন্তু সরু রাস্তা, খাড়া পাহাড়, গভীর খাদ, ঘন কুয়াশা, বৃষ্টি, ভূমিধস এবং দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব মিলিয়ে সড়কটি এমন কুখ্যাতি অর্জন করে যে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়কগুলোর একটি হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

ডেথ রোডের বিপদ বোঝার জন্য প্রথমে এর ভূপ্রকৃতি বুঝতে হয়। লা পাজ পৃথিবীর অন্যতম উচ্চতায় অবস্থিত বড় নগরাঞ্চল। সেখান থেকে ইউঙ্গাস অঞ্চলের দিকে যেতে হলে আন্দিজের অত্যন্ত উঁচু ও শীতল এলাকা থেকে দ্রুত নিচের উষ্ণ ও আর্দ্র উপত্যকার দিকে নামতে হয়। অর্থাৎ অল্প দূরত্বের মধ্যেই উচ্চতা, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, উদ্ভিদ এবং ভূপ্রকৃতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। এই বিশাল উচ্চতার পার্থক্য অতিক্রম করার জন্য পুরোনো সড়কটি পাহাড়ের ঢাল অনুসরণ করে অসংখ্য বাঁক নিয়ে নিচে নেমেছে।

সড়কটির সবচেয়ে ভীতিকর বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রস্থ। অনেক অংশ এতটাই সরু যে দুটি বড় যান পাশাপাশি নিরাপদে অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। একদিকে পাহাড়ের প্রায় উল্লম্ব পাথুরে দেয়াল, অন্যদিকে সরাসরি গভীর খাদ। বহু স্থানে রাস্তার কিনারায় শক্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। ফলে চালকের সামান্য ভুল, চাকার অবস্থানের ভুল হিসাব কিংবা বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে জায়গা দিতে গিয়ে অতিরিক্ত পাশে সরে যাওয়া মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারত।

কিছু অংশের পাশের খাদ কয়েক শ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। ফলে এখানে সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা এবং ডেথ রোডের দুর্ঘটনার মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল। সমতল সড়কে কোনো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালে রাস্তার পাশে থেমে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু এই সড়কের খাদের দিকের প্রান্ত অতিক্রম করলে গাড়ি সরাসরি পাহাড়ের নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। উদ্ধার অভিযানও তখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং নিচে পড়ে যাওয়া যান বা যাত্রীদের উদ্ধার করা সহজ ছিল না।

এই বিপজ্জনক পথের জন্মও বলিভিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ের মধ্যে চাকো যুদ্ধের সময় বন্দি প্যারাগুয়ীয় সৈন্যদের শ্রম ব্যবহার করে সড়কটির বিভিন্ন অংশ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়। পাহাড়ের গা কেটে তৈরি সেই পথ আধুনিক মহাসড়কের মতো পরিকল্পিত প্রশস্ত সড়ক ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে পরিবহন যোগাযোগ স্থাপনই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। পরবর্তী কয়েক দশকে যানবাহনের সংখ্যা ও আকার বাড়লেও পুরোনো সড়কের অনেক অংশ সেই তুলনায় অত্যন্ত সংকীর্ণ থেকে যায়।

এর বিপদের আরেকটি বড় কারণ ছিল আবহাওয়া। ইউঙ্গাস অঞ্চল আন্দিজের উচ্চভূমি ও আমাজন অববাহিকার মধ্যবর্তী একটি আর্দ্র পাহাড়ি অঞ্চল। মেঘ পাহাড়ের গায়ে আটকে গিয়ে ঘন কুয়াশা সৃষ্টি করতে পারে। কখনো চালকের সামনে দৃশ্যমান দূরত্ব হঠাৎ এত কমে যায় যে পরবর্তী বাঁক বা বিপরীত দিক থেকে আসা যান আগেভাগে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে এক পাশে গভীর খাদ রেখে অত্যন্ত সরু রাস্তায় গাড়ি চালানো স্বাভাবিকভাবেই বিপজ্জনক।

বৃষ্টি সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। রাস্তার পুরোনো অংশের অনেক জায়গা কাঁচা, পাথুরে বা কাদাময় ছিল। বৃষ্টিতে পৃষ্ঠ পিচ্ছিল হয়ে গেলে চাকার নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে। পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নেমে এসে কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ডেথ রোডের বিখ্যাত ছবিগুলোতে এমন অংশও দেখা যায় যেখানে পাহাড়ি ঝরনা বা ছোট জলপ্রপাতের পানি সরাসরি রাস্তার ওপর পড়ছে। ফলে চালককে একই সঙ্গে পিচ্ছিল পৃষ্ঠ, কম দৃশ্যমানতা এবং খাদের প্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হতো।

পাহাড়ি ভূমিধস এবং পাথর পড়ার ঝুঁকিও ছিল বাস্তব। প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে গেলে রাস্তার ওপর পাথর ও মাটি নেমে আসতে পারে। আবার রাস্তার খাদের দিকের অংশ ক্ষয়ে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে। অর্থাৎ বিপদ শুধু চালকের ভুল থেকে আসত না; পাহাড় নিজেই যেকোনো সময় পথের অবস্থা বদলে দিতে পারত।

ডেথ রোডের একটি অস্বাভাবিক নিয়ম ছিল খাদের দিকের ঝুঁকি সামলানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। বলিভিয়ায় সাধারণত যানবাহন রাস্তার ডান পাশ দিয়ে চলে। কিন্তু পুরোনো উত্তর ইউঙ্গাস সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনকে বাম দিকে চলার প্রচলন তৈরি হয়েছিল। এর একটি ব্যবহারিক ব্যাখ্যা হলো, খাদের দিকে থাকা চালক নিজের জানালা দিয়ে রাস্তার বাইরের প্রান্ত আরও ভালোভাবে দেখতে পারতেন এবং চাকা কতটা কিনারার কাছে রয়েছে তা অনুমান করতে সুবিধা হতো। বিপরীতমুখী দুটি যান মুখোমুখি হলে কে কোথায় থামবে এবং কীভাবে পাশ কাটাবে—এটিও অত্যন্ত সতর্কতার বিষয় ছিল।

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতো বাস ও ট্রাকের মতো বড় যানবাহনের ক্ষেত্রে। সরু অংশে দুটি বড় যান একসঙ্গে পার হওয়া সম্ভব না হলে একটিকে পিছিয়ে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত স্থানে যেতে হতো। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে একটি বড় গাড়িকে পেছনের দিকে চালানো নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ। তার ওপর যদি কয়েক মিটার দূরেই গভীর খাদ থাকে, তাহলে চালকের ওপর মানসিক চাপ কতটা ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এই সড়কের ‘ডেথ রোড’ নামটি শুধু নাটকীয় পর্যটন নাম হিসেবে তৈরি হয়নি। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এখানে বিপুলসংখ্যক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার খবর আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বহুল প্রচারিত পুরোনো হিসাব অনুযায়ী, কোনো কোনো সময় বছরে দুই শতাধিক মানুষ এই পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতেন বলে অনুমান করা হতো। তবে ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎসে পার্থক্য রয়েছে। দুর্গম অঞ্চল, অসম্পূর্ণ নথি এবং বিভিন্ন সময়ের আলাদা হিসাবের কারণে প্রতিটি সংখ্যাকে নিখুঁত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু সড়কটিতে নিয়মিত মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটত এবং এর নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ ছিল—এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম।

বিশেষ করে বাস দুর্ঘটনা এখানে ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হতে পারত। একটি যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে গেলে একই দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু ঘটত। সড়কের বিভিন্ন স্থানে অতীতের দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ক্রুশ বা স্মৃতিচিহ্ন দেখা যেত। এগুলো পথটির বিপজ্জনক ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে তুলেছিল এবং পরবর্তী চালকদের জন্য সতর্কবার্তার কাজও করত।

তবে বর্তমান ডেথ রোডের বাস্তবতা বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা দরকার। আজ এটি আর আগের মতো লা পাজ ও কোরোইকোর মধ্যে প্রধান যানবাহন চলাচলের পথ নয়। দীর্ঘদিনের দুর্ঘটনা ও পরিবহন সমস্যার পর পুরোনো সড়কের বিকল্প হিসেবে অনেক বেশি প্রশস্ত ও নিরাপদ নতুন পথ নির্মাণ করা হয়। নতুন সড়কে উন্নত পৃষ্ঠ, প্রশস্ত চলাচলের জায়গা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আধুনিক যানবাহনের উপযোগী অবকাঠামো থাকায় অধিকাংশ স্বাভাবিক যান চলাচল সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের ফলে পুরোনো ডেথ রোডে আগের মতো বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের ঘন চাপ নেই। তাই ‘আজও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জীবন হাতে নিয়ে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে’—এমন বর্ণনা বর্তমান পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করবে। সড়কটি এখনও বিপজ্জনক ভূপ্রকৃতির মধ্যে রয়েছে, কিন্তু এর ব্যবহার বদলে গেছে। যে পথ একসময় ভয়ংকর দৈনন্দিন যাত্রার প্রতীক ছিল, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক দুঃসাহসিক পর্যটনের অন্যতম পরিচিত গন্তব্য।

বিশেষ করে পাহাড়ি সাইকেল চালানোর জন্য ডেথ রোড বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। পর্যটকেরা সাধারণত উচ্চভূমির দিক থেকে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘ পথ ধরে ইউঙ্গাসের নিচু অঞ্চলের দিকে নামেন। একই যাত্রায় তুষারশীতল উচ্চ আন্দিজ থেকে সবুজ, আর্দ্র উপক্রান্তীয় পরিবেশে পৌঁছে যাওয়া যায়। উচ্চতার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে দৃশ্যপটও অসাধারণভাবে বদলে যায়। শুরুতে অনাবৃত পাহাড়ি ভূদৃশ্য, পরে মেঘ, ঝরনা এবং শেষে ঘন সবুজ বন—এই বৈচিত্র্য সাইকেলযাত্রাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়া মানেই পথটি নিরাপদ হয়ে গেছে, এমন নয়। সাইকেল আরোহীর জন্য সরু রাস্তা, পাথর, কাদা, ভেজা পৃষ্ঠ, তীক্ষ্ণ বাঁক এবং গভীর খাদ এখনও বাস্তব বিপদ। দ্রুতগতিতে নামতে গিয়ে একটি ছোট ভুলও গুরুতর দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ দীর্ঘ উতরাইয়ে গতি খুব দ্রুত বেড়ে যায়। কোনো বাঁকে রাস্তার অবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ হলে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কম থাকে।

এ কারণেই ডেথ রোডে সাইকেল ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভালো মানের সাইকেল, কার্যকর ব্রেক, সুরক্ষামূলক পোশাক, শিরস্ত্রাণ এবং অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত যাত্রার আগে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয় এবং দলগতভাবে নিচে নামায়। তারপরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয় না। ডেথ রোডের পর্যটন আকর্ষণের একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য এখানেই—মানুষ যে বিপদের কারণে একসময় এই পথ এড়াতে চাইত, সেই বিপদের অনুভূতিই এখন অনেক পর্যটককে সেখানে টেনে নিয়ে যায়।

সড়কটির খ্যাতির পেছনে ছবিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। পৃথিবীতে আরও অনেক দুর্গম ও বিপজ্জনক পাহাড়ি রাস্তা আছে, কিন্তু ডেথ রোডের দৃশ্য অত্যন্ত নাটকীয়। একটি সরু রাস্তা খাড়া সবুজ পাহাড়ের গায়ে প্রায় ঝুলে আছে, পাশে কোনো শক্ত বেষ্টনী নেই, নিচে মেঘে ঢাকা গভীর উপত্যকা এবং ওপর থেকে জলপ্রপাত পড়ছে—একটি ছবিই পথটির বিপদ বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। এই দৃশ্য গণমাধ্যম, প্রামাণ্যচিত্র এবং পর্যটন প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়ক’ উপাধিটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী বিশ্বমর্যাদা মনে করা উচিত নয়। পৃথিবীর সব সড়কের দুর্ঘটনা, যানবাহনের সংখ্যা, মৃত্যুহার, আবহাওয়া, অবকাঠামো এবং ব্যবহার একই পদ্ধতিতে তুলনা করে এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত স্থায়ী তালিকা নেই। বিভিন্ন দেশে আরও বিপজ্জনক পাহাড়ি সড়ক রয়েছে। তাই উত্তর ইউঙ্গাস সড়ককে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়কগুলোর একটি’ বলা অধিক নির্ভুল।

ডেথ রোডের ইতিহাস একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নের গুরুত্বও দেখায়। কোনো সড়ক শুধু পিচ দিয়ে তৈরি পথ নয়; তার নিরাপত্তা নির্ভর করে প্রস্থ, ঢাল, বাঁকের নকশা, পানি নিষ্কাশন, পাহাড় স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা, নিরাপত্তাবেষ্টনী, দৃশ্যমানতা এবং যানবাহনের চাপের ওপর। উত্তর ইউঙ্গাস সড়কে এসব সীমাবদ্ধতার অনেকগুলো একই সঙ্গে উপস্থিত ছিল। ফলে একটি ছোট ভুলও বড় বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেত।

নতুন বিকল্প সড়ক নির্মাণের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রমাণ করে যে ডেথ রোডের কুখ্যাতি শুধু প্রকৃতির কারণে তৈরি হয়নি। পাহাড়, বৃষ্টি ও কুয়াশা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু মানুষের তৈরি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই দুর্গম অঞ্চলে উন্নত প্রকৌশল, প্রশস্ত সড়ক এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।

আজ তাই বলিভিয়ার ডেথ রোড একই সঙ্গে তিনটি পরিচয় বহন করে। এটি চাকো যুদ্ধের সময়কার ইতিহাসের স্মারক, বলিভিয়ার পুরোনো পরিবহনব্যবস্থার কঠিন বাস্তবতার নিদর্শন এবং আধুনিক দুঃসাহসিক পর্যটনের আন্তর্জাতিক গন্তব্য। রাস্তার পাশে গভীর খাদ এখনও আছে, পাহাড়ি কুয়াশা এখনও নামে, জলপ্রপাত এখনও পথ ভেজায় এবং সরু বাঁকগুলো এখনও সতর্কতা দাবি করে। কিন্তু এর ওপর নির্ভরশীল দৈনন্দিন ভারী যান চলাচল আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

ডেথ রোডের প্রকৃত ভয়াবহতা তাই শুধু একটি গভীর খাদ বা সরু বাঁকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিপদের কারণ ছিল অনেকগুলো প্রতিকূল উপাদানের একই জায়গায় মিলিত হওয়া—অত্যন্ত সরু পথ, শত শত মিটার গভীর খাদ, নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব, ঘন কুয়াশা, প্রবল বৃষ্টি, পিচ্ছিল পৃষ্ঠ, পাহাড়ি ঝরনা, ভূমিধস, তীক্ষ্ণ বাঁক এবং একসময়ের ব্যস্ত যান চলাচল। এই কারণগুলোর যেকোনো একটি আলাদাভাবে সামলানো সম্ভব হতে পারে; কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে উপস্থিত হলে চালকের একটি ছোট ভুলও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

আর এ কারণেই বলিভিয়ার উত্তর ইউঙ্গাস সড়ক আজও ‘ডেথ রোড’ নামে পৃথিবীর মানুষের কল্পনায় বেঁচে আছে। এটি হয়তো এখন আর আগের সময়ের মতো ব্যস্ত মৃত্যুফাঁদ নয়, কিন্তু পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা সেই সরু পথের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায় কেন একসময় সেখানে প্রতিটি যাত্রা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ডেথ রোডের গল্প শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ভয়ংকর রাস্তার গল্প নয়; এটি কঠিন ভূপ্রকৃতি, সীমিত পুরোনো অবকাঠামো, মানুষের প্রয়োজন, প্রকৌশল উন্নয়ন এবং বিপদকে পর্যটন আকর্ষণে রূপান্তরের এক অসাধারণ ইতিহাস।


আপনার পছন্দ হতে পারে