বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ক্রনবর্গ ক্যাসেল: শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর এলসিনোর দুর্গের বাস্তব ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

ক্রনবর্গ ক্যাসেল: শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর এলসিনোর দুর্গের বাস্তব ইতিহাস
বাল্টিকের প্রবেশদ্বারে ইতিহাস ও হ্যামলেটের মিলন

ডেনমার্কের হেলসিংওর শহরের সমুদ্রতীরে ক্রনবর্গ ক্যাসেল দাঁড়িয়ে আছে এমন এক জলপথের পাশে, যার নিয়ন্ত্রণ একসময় বিপুল সম্পদের উৎস ছিল। দূরে সুইডেনের উপকূল, মাঝখানে জাহাজ চলাচলের ব্যস্ত প্রণালি এবং তীরে রাজকীয় প্রাসাদকে ঘিরে সামরিক প্রতিরক্ষা। কিন্তু বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষ এই দুর্গকে প্রথম চেনেন শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর এলসিনোর হিসেবে। সাহিত্যের বিখ্যাত দুর্গটির বাস্তব ইতিহাসে ভূতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুল্ক, কামান, বাণিজ্য এবং ডেনিশ রাজশক্তি। সেই ইতিহাস জানলে নাটকের পরিচিত পটভূমিও নতুন অর্থ পায়।

এলসিনোর আসলে হেলসিংওর শহরের ইংরেজি নাম। শহরটির পাশে ওরেসুন্দ প্রণালি ডেনমার্ক ও বর্তমান সুইডেনকে আলাদা করেছে। এখানে জলপথের প্রস্থ প্রায় চার কিলোমিটার। বাল্টিক সাগরে প্রবেশ বা সেখান থেকে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়ার জন্য এই পথের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সংকীর্ণ অংশের পাশে দুর্গ স্থাপন করলে জাহাজ পর্যবেক্ষণ ও শাসকের দাবি কার্যকর করা সহজ হতো। ক্রনবর্গের অবস্থান তাই কোনো নির্জন রাজকীয় খেয়ালের ফল নয়; উত্তর ইউরোপের বাণিজ্যিক ভূগোলের হিসাব করা নির্বাচন।

বর্তমান প্রাসাদের আগে এখানে ছিল ‘ক্রোগেন’ নামের দুর্গ। পঞ্চদশ শতকের তৃতীয় দশকে পোমেরানিয়ার এরিকের উদ্যোগে সেটি নির্মিত হয়। ১৪২৯ সাল থেকে ডেনমার্ক এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর সমুদ্রশুল্ক আদায় করতে শুরু করে। এই ব্যবস্থা বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। ফলে পাহাড়ি সীমান্তের যুদ্ধদুর্গের তুলনায় ক্রোগেনের ভূমিকা ছিল আলাদা। এটি এমন এক জলপথের কর্তৃত্বের প্রতীক, যেখানে চলাচলের অধিকারকে রাজস্বে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছিল।

সমুদ্রশুল্ক থেকে পাওয়া অর্থ ডেনিশ রাজশক্তিকে সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু জাহাজ থেকে অর্থ দাবি করার জন্য শুধু ঘোষণাই যথেষ্ট ছিল না; তার পেছনে সামরিক শক্তির বিশ্বাসযোগ্য উপস্থিতি দরকার হতো। দুর্গ, কামান ও প্রশাসন সেই দাবি কার্যকর করার বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ ছিল। একই সঙ্গে বিদেশি বণিক ও শাসকদের কাছে এই নিয়ন্ত্রণ বিরক্তির কারণও হতে পারত। ক্রনবর্গের ইতিহাস তাই রাজকীয় সম্পদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বার্থের সংঘাতের ইতিহাস। প্রণালি ছিল যোগাযোগের পথ, আবার রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগও।

ষোড়শ শতকে দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক পুরোনো দুর্গকে মহিমান্বিত রেনেসাঁ প্রাসাদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। ১৫৭৪ থেকে ১৫৮৫ সালের নির্মাণপর্বে ক্রনবর্গ তার পরিচিত রাজকীয় অবয়ব পায়। হান্স ফান পেশেন এবং আন্তোনিস ফান অপবের্গেনের মতো নেদারল্যান্ডীয় অঞ্চলের স্থপতিরা প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। বেলেপাথরের সম্মুখভাগ, তামার ছাদ এবং অলংকৃত শিখর নতুন মর্যাদা প্রকাশ করে। দুর্গটি আগের সামরিক কাজ বজায় রেখেও রাজদরবারের প্রদর্শনক্ষেত্রে পরিণত হয়। সমুদ্রপথে আসা মানুষের কাছে ভবনটিই ডেনমার্কের সম্পদের দৃশ্যমান ঘোষণা ছিল।

প্রাসাদের ভেতরের বৃহৎ হল, রাজকীয় কক্ষ ও চ্যাপেল সেই দরবারি জীবনের পরিচয় দেয়। ভোজ, অতিথি আপ্যায়ন এবং আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান শাসকের রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ার অংশ ছিল। রেনেসাঁর রাজদরবারে সৌন্দর্য কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় ছিল না; তা মর্যাদা ও প্রভাব প্রকাশ করত। ক্রনবর্গে প্রতিরক্ষা ও বিলাসিতা একই পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছিল। বাইরে জাহাজের দিকে তাক করা কামান যেমন কর্তৃত্ব বোঝাত, ভেতরের সজ্জিত কক্ষও বিদেশি অতিথিকে রাজ্যের অবস্থান সম্পর্কে বার্তা দিত।

এই দরবারের খ্যাতি ইংল্যান্ডেও পৌঁছায়। প্রায় ১৬০০ সালের দিকে লেখা ‘হ্যামলেট’-এ শেক্সপিয়ার এলসিনোরকে ডেনিশ রাজদরবারের পটভূমি করেন। তবে শেক্সপিয়ার নিজে ক্রনবর্গে এসেছিলেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ভ্রমণকারী, বণিক কিংবা ডেনমার্কে অভিনয় করা নাট্যদলের মাধ্যমে তিনি দরবারের গল্প শুনে থাকতে পারেন। এই সম্ভাবনাগুলো আকর্ষণীয় হলেও কোন নির্দিষ্ট সূত্র থেকে তিনি দুর্গের ধারণা পেয়েছিলেন, তা নিশ্চিত নয়। সাহিত্যিক সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রত্যক্ষ ভ্রমণের কল্পিত কাহিনি দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

হ্যামলেটও ক্রনবর্গে বসবাস করা কোনো প্রমাণিত ঐতিহাসিক রাজপুত্র নন। নাটকের পেছনে রয়েছে আমলেথ নামের চরিত্রকে ঘিরে পুরোনো স্ক্যান্ডিনেভীয় প্রতিশোধকাহিনি, যা সাক্সো গ্রামাতিকুসের রচনায় সংরক্ষিত হয়েছিল। শেক্সপিয়ার সেই ঐতিহ্যকে নতুন নাট্যরূপ দেন। প্রাচীন কিংবদন্তির চরিত্র এবং ষোড়শ শতকের রেনেসাঁ দুর্গ তাঁর কল্পনায় একত্র হয়েছে। ফলে নাটকের ঘটনা দিয়ে ক্রনবর্গের বাস্তব রাজপরিবারের জীবন পুনর্গঠন করা যায় না। হ্যামলেটের দ্বিধা, ভূত ও প্রতিশোধ সাহিত্য; দুর্গের শুল্ক ও যুদ্ধ পৃথক ইতিহাস।

তবে এই সংযোগ ভবনটির অভিজ্ঞতাকে গভীর করেছে। প্রাচীর, সমুদ্রের বাতাস এবং বড় হলের মধ্যে দাঁড়িয়ে নাটকের নজরদারি, ক্ষমতার সন্দেহ ও বিচ্ছিন্নতার পরিবেশ কল্পনা করা সহজ। বাস্তব রাজদরবারেও উত্তরাধিকার, আনুগত্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু মিল থাকা মানেই নাটকটি কোনো নির্দিষ্ট ডেনিশ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়। ক্রনবর্গের সাহিত্যিক শক্তি এসেছে বাস্তব স্থানের সঙ্গে কল্পিত ঘটনার মেলবন্ধন থেকে। ইতিহাস ও নাটককে আলাদা রেখেও দুটির সম্পর্ক উপভোগ করা সম্ভব।

১৬২৯ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্রনবর্গের বড় অংশ ধ্বংস হয়। ছাদ ও বহু অভ্যন্তরীণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চ্যাপেলসহ কিছু স্থান রক্ষা পায়। দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের ছেলে চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। বাইরের পরিচিত রূপ অনেকাংশে ফিরিয়ে আনা হলেও ভেতরের সাজসজ্জায় নতুন সময়ের ছাপ যুক্ত হয়। তাই আজকের দুর্গকে শেক্সপিয়ারের জীবদ্দশার সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ভবন ভাবা ভুল। এর মধ্যে আগুনের ক্ষতি এবং সপ্তদশ শতকের পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে।

পরবর্তী বড় বিপর্যয় আসে ১৬৫৮ সালে। ডেনমার্ক ও সুইডেনের যুদ্ধের সময় সুইডিশ বাহিনী ক্রনবর্গ আক্রমণ করে দখল করে। শিল্পবস্তু ও মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়ে যায়। প্রভাবশালী অবস্থান ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা থাকা সত্ত্বেও দুর্গটি অজেয় ছিল না। ১৬৬০ সালে তা ডেনমার্কের হাতে ফিরে আসে। এই ঘটনা দেখায়, সমুদ্রশুল্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত শক্তিও বৃহত্তর সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির কাছে দুর্বল হতে পারে। রাজকীয় জাঁকজমক একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।

পরে দুর্গের প্রতিরক্ষা আরও উন্নত করা হয়। নিচু বুরুজ, পরিখা এবং মাটির বাঁধ কামানের যুগের সামরিক চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে তৈরি হয়েছিল। নিচের সুরক্ষিত কক্ষ ও পথ সৈন্যদের অবস্থান এবং মজুতের পরিসর দিত। পরবর্তী সময়ে ব্যারাক ও সামরিক ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়ে। দুর্গরক্ষণ ও প্রতিরক্ষাবাঁধের কাজে দণ্ডিত শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের ইতিহাসও রয়েছে। ফলে ক্রনবর্গ শুধু রাজা-রানির গল্প নয়; তার স্থায়িত্বের পেছনে সৈন্য, কর্মচারী এবং বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত মানুষের জীবনও যুক্ত ছিল।

নিচের অন্ধকার কক্ষের সঙ্গে আরেকটি বিখ্যাত কাহিনি জড়িত—হোলগার দানস্কে বা ডেনিশ বীর হোলগারের নিদ্রা। কিংবদন্তি অনুসারে, ডেনমার্ক মহাবিপদে পড়লে তিনি জেগে উঠে দেশ রক্ষা করবেন। হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের ১৮৪৬ সালের গল্প এই চরিত্রকে ক্রনবর্গের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করেছে। তবে নিদ্রিত বীরের উপস্থিতি লোককথার অংশ, প্রত্নতাত্ত্বিক সত্য নয়। হ্যামলেটের মতো এই কাহিনিও দুর্গের অর্থকে বাস্তব সামরিক ব্যবহারের বাইরে নিয়ে গিয়ে সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ করেছে।

২০০০ সালে ক্রনবর্গ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। এর গুরুত্ব রেনেসাঁ স্থাপত্য, বাল্টিকের প্রবেশপথে রাজশক্তির ভূমিকা এবং বিশ্বসাহিত্যের সংযোগে নিহিত। আজ নাট্যাভিনয় ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা একই স্থানে এই পরিচয়গুলো সামনে আনে। সমুদ্রশুল্কের ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে, রাজদরবার সরে গেছে, কিন্তু দুর্গটি টিকে আছে। ক্রনবর্গের বাস্তব ইতিহাস কোনো কাল্পনিক ট্র্যাজেডির চেয়ে কম নাটকীয় নয়—তার প্রধান চরিত্র ছিল জলপথ, অর্থ, আগুন ও যুদ্ধ। আর শেক্সপিয়ার সেই বাস্তব স্থানের নামকে মানুষের অন্তর্জগতের এক চিরস্থায়ী নাটকের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।