বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্ফোর্ৎসা ক্যাসেল: মিলানের ডিউক, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও ইতালীয় রেনেসাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র

সিরিজ: বিশ্বের কিংবদন্তি দুর্গ ও প্রাসাদ

স্ফোর্ৎসা ক্যাসেল: মিলানের ডিউক, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও ইতালীয় রেনেসাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র
মিলানের লাল ইটের দুর্গে শিল্প ও রাজশক্তির ইতিহাস

মিলানের ব্যস্ত নগরপরিসরে স্ফোর্ৎসা ক্যাসেলের লাল ইটের প্রাচীর এক ভিন্ন সময়ের উপস্থিতি ঘোষণা করে। বিশাল গোলাকার টাওয়ার, প্রশস্ত প্রাঙ্গণ এবং কেন্দ্রীয় প্রবেশটাওয়ার দেখে বোঝা যায়, ভবনটি শুধু রাজপরিবারের আরামদায়ক আবাস ছিল না। এখানে শাসকের নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি এবং দরবারি মহিমা একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছিল। স্ফোর্ৎসা ক্যাসেল ইতালীয় রেনেসাঁর সেই বাস্তবতার সাক্ষী, যেখানে শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির উপস্থিতি এই দুর্গের ইতিহাসকে বিশেষ আকর্ষণ দিয়েছে, কিন্তু তার গুরুত্ব একজন শিল্পীর কাজের চেয়েও বিস্তৃত।

বর্তমান নামটি স্ফোর্ৎসা পরিবারের হলেও দুর্গের সূচনা তাঁদের আগে। চতুর্দশ শতকে মিলানের শাসক ভিসকন্তি পরিবার শহরের পোর্তা জোভিয়া এলাকার কাছে দুর্গ নির্মাণ করে। পরবর্তী সম্প্রসারণে এটি রাজকীয় আবাস ও নিরাপত্তার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মধ্যযুগীয় মিলানে একটি শক্তিশালী দুর্গ বাইরের শত্রুকে প্রতিরোধ করার পাশাপাশি নগরের ওপর শাসকের কর্তৃত্বও প্রকাশ করত। তাই জনগণের কাছে এমন ভবনের অর্থ সব সময় সুরক্ষা ছিল না; কখনো তা দমন ও নিয়ন্ত্রণের স্মারকও হতে পারত।

১৪৪৭ সালে ডিউক ফিলিপ্পো মারিয়া ভিসকন্তির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসংকট দেখা দেয়। মিলানে আমব্রোসীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পুরোনো শাসনের প্রতীক দুর্গটি ধ্বংসের মুখে পড়ে। এই অস্থির পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফ্রানচেস্কো স্ফোর্ৎসা। তিনি পেশাদার সামরিক নেতা এবং ফিলিপ্পো মারিয়ার মেয়ে বিয়াঙ্কা মারিয়া ভিসকন্তির স্বামী ছিলেন। ১৪৫০ সালে ফ্রানচেস্কো মিলানের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সামরিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সুযোগ এবং ভিসকন্তি পরিবারের সঙ্গে বিবাহসূত্র—সব মিলিয়ে তাঁর নতুন রাজবংশের ভিত্তি তৈরি হয়।

ফ্রানচেস্কো দুর্গ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে তিনি নিরাপদ আবাস তৈরির পাশাপাশি আগের শাসকদের উত্তরসূরি হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন। নতুন শাসকের জন্য এমন নির্মাণ ছিল রাজনৈতিক ঘোষণা: মিলানে আবার কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব ফিরে এসেছে। কিন্তু দুর্গকে শুধু অনতিক্রম্য সামরিক কাঠামো করলেই চলত না; শহরের সামনে রাজকীয় মর্যাদাও তুলে ধরতে হতো। স্ফোর্ৎসা পুনর্নির্মাণে তাই প্রতিরক্ষা এবং প্রাসাদসুলভ প্রতিনিধিত্ব পাশাপাশি গুরুত্ব পায়। এই দুই উদ্দেশ্য পরবর্তী নির্মাণপর্বেও বজায় থাকে।

১৪৫২ সালে ফ্লোরেন্সের স্থপতি আন্তোনিও আভেরুলিনো, ফিলারেতে নামে পরিচিত, শহরমুখী সম্মুখভাগ ও কেন্দ্রীয় টাওয়ারের পরিকল্পনার দায়িত্ব পান। পরে বার্তোলোমেও গাদিও নির্মাণের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দুর্গের মোটা প্রাচীর, প্রতিরক্ষামূলক টাওয়ার ও পরিখা নিরাপত্তার বাস্তব চাহিদা মেটাত। ভেতরের বিভিন্ন প্রাঙ্গণ সামরিক ও আবাসিক অংশকে সংগঠিত করেছিল। বাইরে শক্তির প্রকাশ এবং ভেতরে নিয়ন্ত্রিত চলাচল—এই পরিকল্পনা বোঝায়, রেনেসাঁর রাজপ্রাসাদও যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।

ফ্রানচেস্কোর ছেলে গালেয়াত্ৎসো মারিয়া স্ফোর্ৎসার সময় দুর্গের আবাসিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। ১৪৬৮ সাল থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী বোনা দি সাভোইয়া এখানে ডিউকীয় আবাস ব্যবহার করেন। চ্যাপেল, অলংকৃত কক্ষ এবং দরবারি পরিবেশ শাসকের মর্যাদা প্রকাশ করত। সংগীত, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসব রাজদরবারের জীবনের অংশ ছিল। তবে বিলাসিতার পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও ছিল প্রবল। ১৪৭৬ সালে গালেয়াত্ৎসো মারিয়া হত্যার শিকার হন; তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারীকে কেন্দ্র করে নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

এই পরিস্থিতিতে গালেয়াত্ৎসোর ভাই লুদোভিকো স্ফোর্ৎসা, ‘ইল মোরো’ নামে পরিচিত, ক্রমে প্রকৃত কর্তৃত্ব নিজের হাতে নেন। প্রথমে ভাতিজা জিয়ান গালেয়াত্ৎসোর শাসনের আড়ালে ক্ষমতা পরিচালনা করলেও ১৪৯৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিউক হন। তাঁর দরবার ইতালির অন্যতম পরিশীলিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ব্রামান্তে ও লিওনার্দোর মতো শিল্পীরা মিলানে কাজ করেন। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক উত্থান রাজনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছিল না। ইতালীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ মিলানের অবস্থানকে ক্রমেই জটিল করে তুলছিল।

লিওনার্দোর মতো বহুমুখী প্রতিভার জন্য এমন দরবার ছিল কাজের বিস্তৃত ক্ষেত্র। ছবি আঁকার পাশাপাশি যন্ত্র, নির্মাণ, উৎসব ও দৃশ্যপরিকল্পনার মতো বিষয়েও তাঁর দক্ষতার চাহিদা ছিল। লুদোভিকোর পৃষ্ঠপোষকতা তাঁকে বড় প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়; অন্যদিকে শিল্পীর উদ্ভাবন ডিউকের দরবারকে মর্যাদা এনে দেয়। রেনেসাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল পারস্পরিক সম্পর্ক—শিল্পী সম্পদ ও সুযোগ পেতেন, শাসক পেতেন সাংস্কৃতিক খ্যাতি। স্ফোর্ৎসা ক্যাসেলে এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান নিদর্শন সালা দেল্লে আস্সে।

১৪৯৮ সালে লিওনার্দো এই কক্ষের চিত্রসজ্জায় কাজ করেন। ‘আস্সে’ নামটি কাঠের তক্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা একসময় কক্ষের দেয়ালে ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয়। তাঁর পরিকল্পনায় বন্ধ ঘরটি তুঁতগাছের ঘন ছায়ামণ্ডপে রূপ নেয়। গাছের কাণ্ড থেকে উঠে যাওয়া ডাল ছাদের ওপর পরস্পর জড়িয়ে যায়; ফাঁকে আকাশ দেখা যায়। স্থাপত্যের কঠিন সীমাকে প্রকৃতির কল্পিত বিস্তারে বদলে দেওয়া এই কাজের বিশেষত্ব। শিকড়, পাথর এবং ডালের পর্যবেক্ষণে লিওনার্দোর অনুসন্ধানী দৃষ্টিও ফুটে ওঠে।

তুঁতগাছের সঙ্গে লুদোভিকোর ‘মোরো’ উপাধির শব্দগত সম্পর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা রয়েছে। ফলে উদ্ভিদসজ্জাকে নিছক প্রকৃতির ছবি হিসেবে দেখলে তার দরবারি অর্থের একটি অংশ বাদ পড়ে। একই সঙ্গে সতর্ক থাকা দরকার: আজ দৃশ্যমান সব রেখা ও রং অপরিবর্তিতভাবে লিওনার্দোর সময় থেকে আসেনি। সামরিক ব্যবহারের যুগে চিত্র ঢেকে যায়; পরে পুনরাবিষ্কার ও পুনরুদ্ধার হয়। মূল কাজ, ক্ষয় এবং পরবর্তী সংস্কারের স্তর আলাদা করা সালা দেল্লে আস্সের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর সংরক্ষণ তাই সাধারণ পরিষ্কারের চেয়ে অনেক জটিল।

লিওনার্দোর মিলান-সম্পর্কিত কাজ নিয়ে আরেকটি পার্থক্য জরুরি। তাঁর বিখ্যাত ‘শেষ নৈশভোজ’ স্ফোর্ৎসা ক্যাসেলের ভেতরে নয়; সেটি সান্তা মারিয়া দেল্লে গ্রাৎসিয়ের ভোজনকক্ষে রয়েছে। একইভাবে স্ফোর্ৎসা পরিবারের জন্য পরিকল্পিত বিশাল অশ্বারোহী স্মৃতিস্তম্ভ শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জে সম্পন্ন হয়নি। এই প্রকল্পগুলো একই পৃষ্ঠপোষকতার পরিবেশের অংশ হলেও তাদের অবস্থান ও পরিণতি আলাদা। দুর্গকে রেনেসাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র বলা মানে মিলানের প্রতিটি শিল্পকর্ম তার দেয়ালের ভেতর তৈরি হয়েছিল—এমন নয়।

১৪৯৯ সালে ফরাসি বাহিনী মিলান দখল করলে লুদোভিকোর দরবারের উজ্জ্বল অধ্যায় ভেঙে পড়ে। পরের বছর ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়; বন্দি অবস্থায় ফ্রান্সে তাঁর জীবন শেষ হয়। দুর্গ পরবর্তী সময়ে বিদেশি শাসনের সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৫২১ সালে গোলাবারুদের বিস্ফোরণে মূল ফিলারেতে টাওয়ার ধ্বংস হয়। স্প্যানিশ শাসনের সময় চারপাশে আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফলে রাজকীয় শিল্পের পরিবেশ ধীরে ধীরে সৈন্য, মজুত ও সামরিক প্রশাসনের প্রয়োজনে বদলে যায়।

উনিশ শতকের শেষভাগে লুকা বেলত্রামির উদ্যোগে দুর্গকে সংরক্ষণ ও নাগরিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তরের কাজ এগোয়। আজকের ফিলারেতে টাওয়ার সেই পুনর্নির্মাণের ফল; এটি পঞ্চদশ শতক থেকে অক্ষত দাঁড়িয়ে নেই। পুরোনো চিত্র ও স্থাপত্যসূত্র ব্যবহার করে হারানো রূপ পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হয়েছিল। বর্তমান দুর্গ তাই মধ্যযুগীয় অবশেষ এবং আধুনিক ঐতিহ্যসংরক্ষণের সম্মিলিত সৃষ্টি। তার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এই নির্মাণস্তরগুলো বোঝা ইতিহাসকে আরও স্পষ্ট করে।

আজ স্ফোর্ৎসা ক্যাসেলে শিল্প, অস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য সংগ্রহের জাদুঘর রয়েছে। মিকেলাঞ্জেলোর শেষ জীবনের অসমাপ্ত ‘পিয়েতা রোন্দানিনি’ও এখানে সংরক্ষিত, যদিও সেটি মূল স্ফোর্ৎসা দরবারের সংগ্রহের অংশ ছিল না। যে দুর্গ একসময় বংশীয় ক্ষমতা রক্ষা করত, সেটি এখন মিলানের নাগরিক শিল্পস্মৃতির আশ্রয়। এর ইতিহাসে লিওনার্দোর সৃজনশীলতা যেমন আছে, তেমনি আছে উত্তরাধিকারসংকট, যুদ্ধ, ধ্বংস ও পুনর্গঠন। লাল ইটের প্রাচীরের আকর্ষণ সেই বহুমাত্রিক ইতিহাসেই—যেখানে শিল্পের দীপ্তি এবং ক্ষমতার অনিশ্চয়তা পাশাপাশি টিকে রয়েছে।