বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য

সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন

ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য
সমুদ্র ব্রিটেনের, কিন্তু অস্টারলিৎসের পর ইউরোপের স্থলে নেপোলিয়নের কর্তৃত্ব।

নোত্র দামের অভিষেক নেপোলিয়নকে সম্রাটের মর্যাদা দিয়েছিল, কিন্তু ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো সেই কর্তৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। ফ্রান্সের প্রশাসনিক সংস্কার ও নতুন আইনব্যবস্থা দেশের ভেতরে তাঁর অবস্থান শক্ত করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল যুদ্ধের ফলের ওপর। ১৮০৫ সালে সেই পরীক্ষা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হয়। ট্রাফালগারে তাঁর নৌকৌশল বিপর্যস্ত হয়, অথচ কয়েক সপ্তাহ পর অস্টারলিৎসে তাঁর স্থলবাহিনী অসাধারণ বিজয় অর্জন করে। একই বছরের এই দুই যুদ্ধ ইউরোপে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের শক্তির পৃথক সীমা নির্ধারণ করে।

১৮০২ সালের আমিয়াঁর শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৮০৩ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যুদ্ধ আবার শুরু হলে নেপোলিয়ন ইংল্যান্ড আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। বুলোনের আশপাশে বিপুল সৈন্যসমাবেশ, নৌযান নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। কিন্তু সেনাবাহিনী প্রস্তুত করাই যথেষ্ট ছিল না। ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখতে হতো। নেপোলিয়নের আশা ছিল, ফরাসি ও স্প্যানিশ নৌবহরের সমন্বিত চলাচল ব্রিটিশদের বিভ্রান্ত করবে এবং কয়েক দিনের জন্য হলেও নিরাপদ পারাপারের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় সমস্যা ছিল যোগাযোগ ও সমন্বয়। সমুদ্রের আবহাওয়া, দূরত্ব এবং ব্রিটিশ অবরোধের মধ্যে বিভিন্ন বন্দরের বহরকে একত্র করা কঠিন ছিল। অ্যাডমিরাল পিয়ের-শার্ল ভিলনভের বহর ক্যারিবীয় অঞ্চলে গিয়ে ফিরে এলেও প্রত্যাশিত কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়নি। জুলাইয়ে কেপ ফিনিস্তেরের সংঘর্ষের পর তিনি শেষ পর্যন্ত দক্ষিণে কাদিসে আশ্রয় নেন। এদিকে ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার নেতৃত্বে তৃতীয় জোট গড়ে ওঠে। নেপোলিয়ন আগস্টের শেষদিকে ইংল্যান্ড আক্রমণের প্রস্তুতি সরিয়ে স্থলবাহিনীকে মধ্য ইউরোপের দিকে পাঠান।

তাই ট্রাফালগারের পরাজয়ই এক মুহূর্তে ইংল্যান্ড আক্রমণের পরিকল্পনা বন্ধ করেছিল—এমন ধারণা অসম্পূর্ণ। ট্রাফালগারের আগেই নেপোলিয়ন তাঁর প্রধান সেনাবাহিনীকে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে নৌপরাজয় ভবিষ্যতে সমুদ্রপথে ব্রিটেনকে আক্রমণের সম্ভাবনা আরও দুর্বল করে। অক্টোবরের মধ্যে ভিলনভ কাদিস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর অধীনে তেত্রিশটি প্রধান যুদ্ধজাহাজ ছিল; নেলসনের ব্রিটিশ বহরে ছিল সাতাশটি। সংখ্যায় ছোট হলেও ব্রিটিশদের প্রশিক্ষণ, গোলাবর্ষণের দক্ষতা এবং সমুদ্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দেয়।

২১ অক্টোবর কেপ ট্রাফালগারের কাছে নেলসন প্রচলিত সমান্তরাল সারিতে যুদ্ধ করার পরিবর্তে দুটি স্তম্ভে আক্রমণ করেন। একটি স্তম্ভের নেতৃত্বে ছিল তাঁর জাহাজ ভিক্টরি, অন্যটির নেতৃত্বে কলিংউডের রয়্যাল সভরেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিপক্ষের দীর্ঘ সারি ভেদ করে তাকে বিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত করা। এগিয়ে যাওয়ার সময় ব্রিটিশ জাহাজগুলো শত্রুর গোলাবর্ষণের মুখে পড়েছিল; কৌশলটি ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। কিন্তু সারি ভেঙে কাছাকাছি লড়াই শুরু হলে ব্রিটিশ নাবিকদের দ্রুত কামান চালানোর ক্ষমতা কার্যকর হয়ে ওঠে।

ফরাসি-স্প্যানিশ বহরের সমন্বয় ভেঙে যায় এবং বহু জাহাজ দখল করা হয়। ব্রিটিশরা কোনো প্রধান যুদ্ধজাহাজ হারায়নি, যদিও তাদেরও ব্যাপক হতাহতের ক্ষতি হয়। নেলসন ভিক্টরির ওপর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। যুদ্ধের পর ঝড়ে কয়েকটি দখল করা জাহাজও হারিয়ে যায়। তবু কৌশলগত ফল স্পষ্ট ছিল: সম্মিলিত নৌবহর বিধ্বস্ত হয়েছে, ব্রিটিশ সমুদ্রপ্রাধান্য আরও দৃঢ় হয়েছে। নেপোলিয়ন নিজে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেননি; কিন্তু তাঁর সাম্রাজ্যের নৌক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

সমুদ্রের এই বিপর্যয়ের সময় স্থলে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বুলোন থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হওয়া গ্রঁদ আর্মে পৃথক সেনাদলে সংগঠিত ছিল। প্রতিটি সেনাদলে পদাতিক, কামান এবং কিছু অশ্বারোহী থাকায় তারা সীমিত সময় স্বাধীনভাবে লড়তে পারত, আবার প্রয়োজনে একত্র হতে পারত। বিভিন্ন পথ ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে নেপোলিয়ন অস্ট্রীয় সেনাপতি কার্ল মাকের বাহিনীর পেছনের যোগাযোগে আঘাত করেন। রুশ সহায়তা পৌঁছানোর আগে উলমে অস্ট্রীয় বাহিনী ঘিরে পড়ে। ২০ অক্টোবর মাক আত্মসমর্পণ করেন—ট্রাফালগারের মাত্র এক দিন আগে।

উলমের সাফল্যে নেপোলিয়ন একটি বড় যুদ্ধ ছাড়াই অস্ট্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী নিষ্ক্রিয় করেন। নভেম্বরে ফরাসিরা ভিয়েনায় প্রবেশ করে। কিন্তু অস্ট্রিয়ার যুদ্ধ শেষ হয়নি; রুশ বাহিনী ও অবশিষ্ট অস্ট্রীয় সৈন্যরা মোরাভিয়ায় একত্র হচ্ছিল। দীর্ঘ অগ্রযাত্রায় ফরাসিদের সরবরাহপথও প্রসারিত হয়েছিল। নেপোলিয়নের দরকার ছিল এমন একটি নির্ণায়ক যুদ্ধ, যা জোটকে ভেঙে দেবে। বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের অস্টারলিৎসের কাছে তিনি সেই সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করেন।

প্রতিপক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন রুশ সম্রাট প্রথম আলেকজান্ডার, অস্ট্রীয় সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিস এবং বিভিন্ন সামরিক কর্মকর্তা। কুতুজভের সতর্কতা সত্ত্বেও মিত্র নেতৃত্ব আক্রমণে আগ্রহী হয়। নেপোলিয়ন নিজের অবস্থানকে তুলনামূলক দুর্বল দেখান এবং প্রাৎজেন উচ্চভূমি প্রতিপক্ষের হাতে থাকতে দেন। তাঁর দক্ষিণের ডান অংশকে আঘাত করে ফরাসিদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করে মিত্রবাহিনী। নেপোলিয়নের লক্ষ্য ছিল সেই আক্রমণে শত্রুর কেন্দ্র দুর্বল হলে উচ্চভূমিতে পাল্টা আঘাত করে বাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করা।

২ ডিসেম্বর সকালের কুয়াশায় যুদ্ধ শুরু হয়। মিত্রবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ তেলনিৎস ও সোকোলনিৎসের দিকে নেমে যায়। সেখানে ফরাসি প্রতিরোধ বিপজ্জনক চাপে পড়লেও দাভুর বাহিনীর সময়মতো আগমন অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করে। প্রতিপক্ষের কেন্দ্র পাতলা হয়ে গেলে নেপোলিয়ন সুলের সৈন্যদের প্রাৎজেন উচ্চভূমি আক্রমণের নির্দেশ দেন। সাঁ-ইলের ও ভঁদামের ডিভিশন কঠিন লড়াই করে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে। সকালের সূর্য ও কুয়াশা কেটে যাওয়ার দৃশ্য পরে বিজয়ের কিংবদন্তির অংশ হলেও মূল বিষয় ছিল আক্রমণের সময় নির্বাচন।

উচ্চভূমি হারিয়ে মিত্রবাহিনীর বিভিন্ন অংশের যোগাযোগ ভেঙে যায়। উত্তরে লান ও মুরার বাহিনী বাগ্রাতিওনের সৈন্যদের মোকাবিলা করে, আর কেন্দ্রে রুশ রক্ষীবাহিনীর পাল্টা আক্রমণও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। দক্ষিণের মিত্র সৈন্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। হিমায়িত পুকুর ভেঙে হাজার হাজার সৈন্য ডুবে যাওয়ার বিখ্যাত গল্পটি অত্যন্ত অতিরঞ্জিত; কিছু সৈন্য, ঘোড়া ও সরঞ্জাম পানিতে পড়লেও প্রচলিত বিপুল মৃত্যুর বিবরণ নির্ভরযোগ্য নয়। অস্টারলিৎসের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়েছিল কেন্দ্র ভাঙা ও সমন্বিত প্রতিরোধ নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে।

বিজয়ের পর অস্ট্রিয়া যুদ্ধবিরতি চায় এবং ২৬ ডিসেম্বর প্রেসবার্গের চুক্তি স্বাক্ষর করে। তাকে ভূখণ্ড ছাড়তে ও ক্ষতিপূরণ দিতে হয়; ফ্রান্সের জার্মান মিত্ররাও লাভবান হয়। রুশ বাহিনী সরে যায় এবং তৃতীয় জোট কার্যত ভেঙে পড়ে, যদিও ব্রিটেন যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১৮০৬ সালে রাইন সংঘ গঠন এবং পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অবসান মধ্য ইউরোপের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো আরও বদলে দেয়। নেপোলিয়নের আধিপত্য তখন পুরো ইউরোপে নিরঙ্কুশ ছিল না, কিন্তু মধ্য ইউরোপে তাঁর প্রভাব অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছায়।

ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎসের বিপরীত ফল নেপোলিয়নের সামনে নতুন বাস্তবতা স্থাপন করে। ব্রিটেনকে সমুদ্রে সরাসরি হারানো কঠিন, অথচ মহাদেশের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রগুলোকে তাঁর শর্ত মানানো সম্ভব। এই উপলব্ধি পরে ব্রিটিশ বাণিজ্য বন্ধের মহাদেশীয় ব্যবস্থার দিকে তাঁকে ঠেলে দেয়। স্থলবিজয় সমুদ্রের সীমাবদ্ধতা মুছে দেয়নি; বরং দুই ধরনের শক্তির দীর্ঘ প্রতিযোগিতা তৈরি করেছিল। অস্টারলিৎসের পর সম্রাটের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এবার তাঁর সামনে দাঁড়াবে প্রুশিয়া, যার বিরুদ্ধে ইয়েনা ও আউয়েরস্টেটের যুদ্ধ সাম্রাজ্যের বিস্তারকে আরও এগিয়ে নেবে।


আপনার পছন্দ হতে পারে