প্রথম কনসাল থেকে সম্রাট: নেপোলিয়নিক কোড, সংস্কার ও ১৮০৪ সালের অভিষেক
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
বিপ্লবের কিছু অর্জন সংরক্ষণ করেই প্রতিষ্ঠিত হয় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য।
ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর নেপোলিয়নের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, সেই ক্ষমতা কীভাবে স্থায়ী করা যায়। আইনসভা ছত্রভঙ্গ করে সরকার বদলানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধক্লান্ত ফ্রান্সকে পরিচালনা করতে দরকার ছিল কার্যকর প্রশাসন, নিয়মিত রাজস্ব এবং গ্রহণযোগ্য আইনব্যবস্থা। ১৭৯৯ সালের শেষদিকে প্রথম কনসাল হিসেবে তিনি এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে শুরু করেন, যেখানে বিপ্লবের কিছু সামাজিক অর্জন টিকে থাকবে, অথচ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রধান নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাঁর হাতে। স্থিতিশীলতা ও ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা একই প্রকল্পের দুটি অংশ হয়ে ওঠে।
অষ্টম বছরের সংবিধানে তিনজন কনসাল থাকলেও তাঁদের ক্ষমতা সমান ছিল না। প্রথম কনসাল নেপোলিয়ন মন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রধান কর্তৃত্ব পান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কনসালের ভূমিকা মূলত পরামর্শমূলক ছিল। আইন প্রস্তাব, আলোচনা ও অনুমোদনের কাজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করা হয়। রাষ্ট্রপরিষদ আইন প্রস্তুত করত, ত্রিব্যুনা আলোচনা করত এবং আইনসভা আলোচনা ছাড়াই ভোট দিত। এই বিন্যাসে প্রতিনিধিত্বের আনুষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিরোধ সংগঠিত করা কঠিন হয়ে যায়।
নেপোলিয়নের প্রশাসনিক সংস্কারের কেন্দ্রে ছিল প্রিফেক্ট ব্যবস্থা। ১৮০০ সালের ফেব্রুয়ারির আইনে প্রতিটি বিভাগে কেন্দ্রীয় সরকারনিযুক্ত প্রিফেক্ট বসানো হয়। তাঁদের অধীনে উপপ্রিফেক্ট এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কাজ করতেন। কর সংগ্রহ, জনশৃঙ্খলা, সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক প্রতিবেদন পাঠানোর ক্ষেত্রে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। বিপ্লবের সময় স্থানীয় নির্বাচিত সংস্থাগুলোর যে ভূমিকা তৈরি হয়েছিল, তা সংকুচিত হয়। প্যারিস থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্দেশ পৌঁছানোর একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, কিন্তু স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের বিনিময়ে এই দক্ষতা অর্জিত হয়।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জরুরি ছিল। বিপ্লবের কাগুজে মুদ্রার বিপর্যয়, যুদ্ধব্যয় এবং দুর্বল করব্যবস্থা রাষ্ট্রের ওপর আস্থা নষ্ট করেছিল। ১৮০০ সালে ব্যাংক অব ফ্রান্স প্রতিষ্ঠিত হয়; শুরুতে এটি ব্যক্তিগত মূলধনে গঠিত হলেও সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ১৮০৩ সালে প্যারিসে ব্যাংকটির নোট ইস্যুর বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর স্বর্ণ ও রুপাভিত্তিক জার্মিনাল ফ্রাঁর মান নির্ধারণ মুদ্রায় স্থায়িত্ব আনে। কর প্রশাসন ও আদায়ের উন্নতি সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে, যদিও যুদ্ধের আর্থিক চাপ শেষ হয়ে যায়নি।
শিক্ষাক্ষেত্রে ১৮০২ সালে লিসে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এসব রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভবিষ্যৎ কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা এবং শিক্ষিত পেশাজীবী তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়। পাঠ্যক্রমে গণিত, লাতিন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ শিক্ষার গুরুত্ব ছিল। বৃত্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়, কিন্তু শিক্ষা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায়নি। মেয়েদের শিক্ষার জন্য একই ধরনের রাষ্ট্রসমর্থিত সুযোগ তৈরি হয়নি। নেপোলিয়নের দৃষ্টিতে বিদ্যালয় ছিল জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি রাষ্ট্রের উপযোগী দক্ষ ও অনুগত কর্মী তৈরির প্রতিষ্ঠান।
একই বছরে লেজিয়ঁ দনর বা সম্মানসূচক পদকব্যবস্থা চালু করা হয়। সামরিক ও বেসামরিক সেবায় অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে নেপোলিয়ন মর্যাদা অর্জনের নতুন পথ তৈরি করেন। বিপ্লবের বংশগত সুবিধাবিরোধী ধারণার সঙ্গে এটি কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, কারণ যোগ্যতা ও সেবার ভিত্তিতে সম্মান পাওয়া সম্ভব হতো। তবে পুরস্কার দেওয়ার ক্ষমতা শাসকের হাতে থাকায় ব্যক্তিগত আনুগত্য গড়ার সুযোগও তৈরি হয়। সামাজিক উন্নতির দরজা খোলা থাকলেও সেই উন্নতি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের স্বীকৃতির সঙ্গে ক্রমে যুক্ত হয়ে পড়ে।
ধর্মীয় বিভাজন কমাতে নেপোলিয়ন পোপ সপ্তম পায়াসের সঙ্গে ১৮০১ সালের কনকর্ডাত করেন। ক্যাথলিক ধর্মকে ফরাসি নাগরিকদের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়; পুরোনো অর্থে একমাত্র রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সরকার বিশপ মনোনয়নে ভূমিকা পায় এবং পোপ তাঁদের ধর্মীয় অনুমোদন দেন। বিপ্লবে বিক্রি হওয়া গির্জার সম্পত্তির ক্রেতাদের অধিকারও রক্ষিত থাকে। ১৮০২ সালের অতিরিক্ত সরকারি বিধান ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। ফলে ধর্মীয় সমঝোতা সামাজিক শান্তি আনলেও গির্জা স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি।
এই সংস্কারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল ১৮০৪ সালের দেওয়ানি আইনসংহিতা। বিপ্লবের আগে ফ্রান্সে অঞ্চলভেদে প্রচলিত প্রথা, রাজকীয় বিধান এবং রোমান আইনের প্রভাব মিশে ছিল। বিপ্লবের নতুন আইনও সেই জটিলতার ওপর যুক্ত হয়েছিল। একীভূত আইন তৈরির প্রচেষ্টা আগে শুরু হলেও নেপোলিয়নের সময় তা সম্পন্ন হয়। পোর্তালিস, ত্রোঁশে, বিগো দ্য প্রেয়ামেন্যু ও মালভিলের মতো আইনজ্ঞরা খসড়া প্রস্তুত করেন; কাঁবাসেরেসেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নেপোলিয়ন রাষ্ট্রপরিষদের বহু আলোচনায় অংশ নেন, কিন্তু আইনসংহিতাটি তাঁর একক রচনা ছিল না।
২১ মার্চ ১৮০৪ আইনসংহিতা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। তখন এর নাম ছিল ফরাসিদের দেওয়ানি আইনসংহিতা; ১৮০৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নেপোলিয়নিক কোড নাম পায়। জন্মগত অভিজাত সুবিধার পরিবর্তে নাগরিক আইনের সাধারণ কাঠামো, ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষা, চুক্তির স্বীকৃতি এবং উত্তরাধিকারবিধির সামঞ্জস্য এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিপ্লবে অর্জিত জমির মালিকানা নিরাপত্তা পায়। সন্তানদের মধ্যে উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশ বণ্টন পরিবারে সম্পত্তি হস্তান্তরের নিয়ম বদলে দেয়। ফরাসি ভূখণ্ডজুড়ে একই দেওয়ানি নীতির প্রয়োগ আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তবে এই আইনি সমতা নারী-পুরুষের সমান অধিকারের অর্থ বহন করেনি। বিবাহিত নারীর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও বহু আইনি কাজে স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন ছিল। পরিবারের ভেতরে স্বামী ও পিতার কর্তৃত্ব জোরদার হয়। বিবাহবিচ্ছেদ বজায় থাকলেও নারী ও পুরুষের জন্য শর্ত সমান ছিল না। শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্কেও ক্ষমতার ভারসাম্য মালিকের পক্ষে ছিল। বিপ্লবী পরিবর্তনের সীমা আরও স্পষ্ট হয় ১৮০২ সালে উপনিবেশে দাসপ্রথা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পদক্ষেপে। নেপোলিয়নের রাষ্ট্র নাগরিক সমতার কিছু নীতি রক্ষা করেছিল, কিন্তু সর্বজনীন মুক্তি প্রতিষ্ঠা করেনি।
সংস্কারের সাফল্যের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকোচন চলছিল। সংবাদপত্রের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রকাশনার ওপর নজরদারি বাড়ে। পুলিশমন্ত্রী ফুশের গোয়েন্দা ব্যবস্থা রাজনৈতিক বিরোধী ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রকারীদের পর্যবেক্ষণ করত। সরকারের আইন নিয়ে আপত্তি তোলা প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া বা প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার পথও নেওয়া হয়। ১৮০০ সালের মারেঙ্গোর বিজয় এবং পরবর্তী শান্তিচুক্তিগুলো নেপোলিয়নের মর্যাদা বাড়ায়। ১৮০২ সালে গণভোটের মাধ্যমে তিনি আজীবন প্রথম কনসাল হন। সরকারি গণভোটের ফল স্বাধীন প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির বিকল্প ছিল না।
সাম্রাজ্যের দিকে উত্তরণে নিরাপত্তার প্রশ্নও ব্যবহার করা হয়। রাজতন্ত্রী হত্যাচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের বাস্তবতা ছিল, কিন্তু সরকার সেগুলোকে বংশগত শাসনের পক্ষে যুক্তিতে পরিণত করে। ১৮০৪ সালে দ্যুক দঁগিয়েঁকে সীমান্তের বাইরে থেকে আটক করে সামরিক বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাঁর বিরুদ্ধে নেপোলিয়নকে হত্যার নির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত ছিল না। একই বছরের ১৮ মে সিনেটের সিদ্ধান্তে নেপোলিয়নকে ফরাসিদের সম্রাট ঘোষণা করা হয়। বংশগত সাম্রাজ্যের অনুমোদনের জন্য গণভোটও আয়োজন করা হয়।
২ ডিসেম্বর ১৮০৪ প্যারিসের নোত্র দাম গির্জায় অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। পোপ সপ্তম পায়াস উপস্থিত থেকে ধর্মীয় আচার পরিচালনা করেন। নেপোলিয়ন নিজের মাথায় অভিষেকের মুকুট পরেন এবং পরে জোসেফিনকে মুকুট পরান। পোপের হাত থেকে হঠাৎ মুকুট ছিনিয়ে নেওয়ার জনপ্রিয় গল্পটি বিভ্রান্তিকর; অনুষ্ঠান পূর্বপরিকল্পিত ছিল। নিজের হাতে মুকুট পরার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেন যে তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পোপের দাননির্ভর নয়। গির্জার পবিত্র পরিবেশ, রাজকীয় পোশাক ও নতুন আনুষ্ঠানিকতা বিপ্লবোত্তর ক্ষমতাকে বংশগত সাম্রাজ্যের দৃশ্যমান রূপ দেয়।
প্রথম কনসাল থেকে সম্রাট হওয়ার মধ্যে ফ্রান্স তাই একই সঙ্গে আধুনিকীকরণ ও কর্তৃত্বকেন্দ্রিক শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। একীভূত আইন, দক্ষ প্রশাসন এবং সম্পত্তির নিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়; নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ও প্রকাশ্য বিরোধিতার পরিসর ছোট হয়। নেপোলিয়ন বিপ্লবের সব পরিবর্তন মুছে দেননি, বরং নির্বাচিত অর্জনকে নিজের রাষ্ট্রের ভিত্তি করেছেন। এখন নতুন সাম্রাজ্যের সামনে ছিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের প্রশ্ন। অভিষেকের রাজকীয় আলোর পরই তাঁর কর্তৃত্বের পরবর্তী পরীক্ষা এগিয়ে আসছিল যুদ্ধক্ষেত্রে—যেখানে অস্টারলিৎসের বিজয় ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে।
কন্টিনেন্টাল সিস্টেম: ব্রিটেনকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য কেন বিপদে পড়েছিল?
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
কোকো শ্যানেল: পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে নারীর জীবনধারা বদলে দেওয়ার ইতিহাস
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট: আটলান্টিকজয়ী নারী বৈমানিকের জীবন ও অন্তর্ধানের রহস্য
রোজা লুক্সেমবার্গ: বিপ্লব, গণতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রামের অসাধারণ নারী