ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
প্রুশিয়ার পতন ও টিলসিটের সমঝোতায় বদলে যায় ইউরোপের ক্ষমতার মানচিত্র।
অস্টারলিৎসে অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করার পর নেপোলিয়নের সামনে যে নতুন প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়েছিল, সেটি ছিল প্রুশিয়া। মধ্য ইউরোপে ফরাসি প্রভাবের বিস্তার, রাইন সংঘের প্রতিষ্ঠা এবং পুরোনো রাজনৈতিক ভারসাম্যের ভাঙন বার্লিনের উদ্বেগ বাড়াচ্ছিল। প্রুশিয়া আগের যুদ্ধে নিরপেক্ষ থেকে দরকষাকষির সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৮০৬ সালে সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। পরবর্তী দশ মাসে ইয়েনা, আউয়ারস্টেড, আইলাউ ও ফ্রিডল্যান্ডের যুদ্ধ ইউরোপের শক্তির মানচিত্র বদলে দেয়, যার রাজনৈতিক পরিণতি আসে টিলসিটে।
প্রুশিয়ার ক্ষোভের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল হ্যানোভার। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত এই ভূখণ্ড গ্রহণে নেপোলিয়ন প্রুশিয়াকে উৎসাহিত করেছিলেন, ফলে ব্রিটেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হয়। পরে ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনায় হ্যানোভার ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে প্রুশীয় নেতৃত্ব নিজেকে ব্যবহৃত মনে করে। জার্মানিতে ফরাসি কর্তৃত্বের বিস্তারও মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। রানি লুইজেসহ যুদ্ধপন্থী মহল দৃঢ় অবস্থান চেয়েছিল। অবশেষে রাজা তৃতীয় ফ্রিডরিখ উইলহেল্ম ফরাসি সৈন্যদের জার্মানি থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং যুদ্ধের পথে এগোন।
প্রুশীয় সেনাবাহিনীর গৌরবময় অতীত ছিল, কিন্তু সেই খ্যাতি বর্তমান সক্ষমতার নিশ্চয়তা ছিল না। ফ্রিডরিখ মহানের যুগের সাফল্য নেতৃত্বের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল। প্রবীণ সেনাপতিদের বিভক্ত মত, ধীর নির্দেশপ্রবাহ এবং অভিযানের অস্পষ্ট পরিকল্পনা বাহিনীকে দুর্বল করে। অন্যদিকে ফরাসি সেনাদলগুলো পৃথক পথে চলেও দ্রুত একত্র হতে পারত। নেপোলিয়নের সুবিধা শুধু সৈন্যের সাহসে ছিল না; চলাচল, তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার গতিতেও ছিল। রুশ সহায়তা পৌঁছানোর আগেই তিনি প্রুশিয়াকে নির্ণায়ক সংঘর্ষে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন।
১৮০৬ সালের অক্টোবরে ফরাসিরা দ্রুত থুরিঙ্গিয়া অঞ্চলে অগ্রসর হয়। ১৪ অক্টোবর একই দিনে ইয়েনা ও আউয়ারস্টেডে দুটি পৃথক যুদ্ধ ঘটে। নেপোলিয়ন ইয়েনায় যে বাহিনীর মুখোমুখি হন, সেটিকেই প্রথমে প্রুশিয়ার প্রধান শক্তি বলে মনে করেছিলেন। বাস্তবে সেখানে ছিল হোহেনলোহের অধীন বাহিনী, আর প্রধান বাহিনী আরও উত্তরে অবস্থান করছিল। এই ভুল মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুরো সাফল্যকে সম্রাটের নিখুঁত পরিকল্পনার ফল বলা যায় না। যুদ্ধক্ষেত্রে অধীনস্থ সেনাপতিদের স্বাধীন দক্ষতাও বিজয় নির্ধারণ করেছিল।
ইয়েনায় ভোরের কুয়াশার মধ্যে ফরাসিরা উচ্চভূমি থেকে আক্রমণ শুরু করে। লান, সুল ও অজেরোর সেনাদল পর্যায়ক্রমে লড়াইয়ে যুক্ত হয়। প্রুশীয়রা প্রতিরোধ করলেও ফরাসিদের শক্তি বাড়তে থাকে এবং তাদের বিভিন্ন অংশের সমন্বয় ভেঙে পড়ে। নেয়ের অকাল অগ্রযাত্রা সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু অতিরিক্ত বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দেয়। রুশেলের দেরিতে আসা সহায়তাও পরাজয় ঠেকাতে পারেনি। শেষে অশ্বারোহী অনুসরণ পশ্চাদপসরণকে বিশৃঙ্খলায় পরিণত করে। ইয়েনার মাঠে নেপোলিয়ন বড় বিজয় পান, তবে দিনের আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছিল আউয়ারস্টেডে।
সেখানে মার্শাল লুই-নিকোলা দাভুর প্রায় সাতাশ হাজার সৈন্যকে মোকাবিলা করতে হয় সংখ্যায় প্রায় দ্বিগুণ প্রুশীয় বাহিনী। প্রুশিয়ার রাজা ও ব্রান্সউইকের ডিউক প্রধান বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। হাসেনহাউজেনের আশপাশে দাভুর পদাতিকরা দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আক্রমণ ঠেকায়; অশ্বারোহীদের বিরুদ্ধে বর্গাকার বিন্যাস কার্যকর হয়। ব্রান্সউইক গুরুতর আহত হলে নেতৃত্বের সংকট বাড়ে। প্রুশীয়রা সংখ্যাধিক্যকে সমন্বিত আঘাতে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়। আউয়ারস্টেড ছিল দাভুর অসাধারণ বিজয়—নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধ নয়।
দুটি পরাজয়ের সম্মিলিত প্রভাব প্রুশীয় রাষ্ট্রের সামরিক ভিত্তি ভেঙে দেয়। ফরাসিরা দ্রুত অনুসরণ করে বিচ্ছিন্ন বাহিনী, অস্ত্রভাণ্ডার ও দুর্গ দখল করতে থাকে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দীর্ঘ প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে, যদিও কিছু দুর্গ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ২৭ অক্টোবর নেপোলিয়ন বার্লিনে প্রবেশ করেন। প্রুশীয় রাজপরিবার পূর্বদিকে সরে যায়। এই বিপর্যয় পরে প্রুশিয়ার প্রশাসনিক ও সামরিক সংস্কারের প্রেরণা হবে, কিন্তু তখন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল রুশ সহায়তার ওপর।
বার্লিন থেকেই ২১ নভেম্বর নেপোলিয়ন ব্রিটেনের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় অবরোধের ঘোষণা দেন। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জকে অবরুদ্ধ ঘোষণা করে তার সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। ট্রাফালগারের পর সমুদ্রে ব্রিটেনকে পরাজিত করা কঠিন হওয়ায় তিনি স্থলভাগের নিয়ন্ত্রণকে বাণিজ্যযুদ্ধের অস্ত্র করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের সব বন্দর ও বাজারে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে আরও রাষ্ট্রকে বাধ্য করা দরকার ছিল। ফলে সামরিক বিজয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতি জড়িয়ে পড়ে এবং রাশিয়ার অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পোল্যান্ড ও পূর্ব প্রুশিয়ায় অভিযান ফরাসিদের নতুন সমস্যায় ফেলে। দূরত্ব, কাদা, শীত এবং দুর্বল সরবরাহ সৈন্যদের ক্লান্ত করে। ১৮০৭ সালের ৭–৮ ফেব্রুয়ারি প্রয়সিশ আইলাউতে রুশ বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। তুষার ও দুর্বল দৃশ্যমানতার মধ্যে ফরাসি আক্রমণ বিপর্যস্ত হয়; মুরার বৃহৎ অশ্বারোহী আক্রমণ পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করে। রুশদের সঙ্গে প্রুশীয় সহায়তাও লড়ে। যুদ্ধশেষে রুশ বাহিনী সরে গেলেও নেপোলিয়ন নির্ণায়ক বিজয় পাননি। আইলাউ দেখিয়েছিল, তাঁর বাহিনী অপ্রতিরোধ্য নয় এবং জয়ের মূল্য ক্রমে বাড়ছে।
কয়েক মাসের প্রস্তুতির পর জুনে আবার বড় সংঘর্ষ শুরু হয়। হাইলসবের্গে কঠিন লড়াইয়ের পর রুশ সেনাপতি বেনিগসেন ফ্রিডল্যান্ডের কাছে অবস্থান নেন। ১৪ জুন তাঁর বাহিনীর বড় অংশ আল্লে নদী পার হয়ে ফরাসিদের বিরুদ্ধে এগোয়। নদী ও সীমিত পারাপারের পথ তাদের পেছনে থাকায় অবস্থানটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুরুতে লানের বাহিনী সংখ্যায় বড় প্রতিপক্ষকে আটকে রাখে। নেপোলিয়ন প্রধান শক্তি নিয়ে পৌঁছে বুঝতে পারেন, রুশরা পিছু হটার সুবিধা সীমিত রেখে নিজেদের একটি সংকীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে জড়ো করেছে।
বিকেলের ফরাসি আক্রমণে নেয়ের সৈন্যরা রুশ বাম অংশের ওপর চাপ দেয়। কেন্দ্রীভূত কামানের গোলাবর্ষণ রুশ প্রতিরোধ ভাঙতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফ্রিডল্যান্ড শহর ও সেতুর দিকে পশ্চাদপসরণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়; অনেকে বিকল্পভাবে নদী পার হতে বাধ্য হয়। ফ্রিডল্যান্ডের নির্ণায়ক ফল ছিল রাশিয়াকে শান্তি আলোচনায় ঠেলে দেওয়া। তবে রাশিয়ার সমস্ত সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়নি। সম্রাট প্রথম আলেকজান্ডার পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনা করে আপাতত নেপোলিয়নের সঙ্গে সমঝোতাকে সুবিধাজনক মনে করেন।
২৫ জুন নেমান নদীর ওপর ভাসমান মঞ্চে নেপোলিয়ন ও আলেকজান্ডারের বিখ্যাত সাক্ষাৎ হয়। নদী দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে নিরপেক্ষ সাক্ষাৎস্থল তৈরি করেছিল। ৭ জুলাই ফ্রান্স ও রাশিয়ার, আর ৯ জুলাই ফ্রান্স ও প্রুশিয়ার সঙ্গে টিলসিটের চুক্তি হয়। রাশিয়া ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতা এবং ব্রিটেনবিরোধী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার পথে যায়। এই সমঝোতা আন্তরিক বন্ধুত্বের নিশ্চয়তা ছিল না; পরাজয়, সাময়িক স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ লাভের হিসাব মিলিয়ে গড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল।
প্রুশিয়ার জন্য শর্ত ছিল অত্যন্ত কঠোর। তাকে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড ছাড়তে হয়। পশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে নেপোলিয়নের ভাই জেরোমের অধীনে ওয়েস্টফালিয়ার রাজ্য গঠিত হয়। অধিকাংশ প্রুশীয় পোলিশ অঞ্চল থেকে ওয়ারশর ডাচি তৈরি করা হয়, যার শাসক হন স্যাক্সনির রাজা। এটি স্বাধীন পোল্যান্ডের পূর্ণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল না, কিন্তু পোলিশ জাতীয় প্রত্যাশার নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দানৎসিগ পৃথক মুক্ত নগরীর মর্যাদা পায়। ক্ষতিপূরণ ও ফরাসি দখল প্রুশিয়ার সার্বভৌম ক্ষমতাকে আরও সীমিত করে।
টিলসিটের পর নেপোলিয়ন ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসকে পরিণত হন: অস্ট্রিয়া পরাজিত, প্রুশিয়া সংকুচিত এবং রাশিয়া আপাত সহযোগী। তবু ব্রিটেন সমুদ্র ও অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। বিজিত সমাজের অসন্তোষ এবং রাশিয়ার নিজস্ব স্বার্থও ভবিষ্যৎ সংঘাতের বীজ বহন করছিল। নেপোলিয়ন এখন মনে করতে পারতেন, সামরিক চাপ দিয়ে মহাদেশকে নিজের পরিকল্পনায় সাজানো সম্ভব। কিন্তু ব্রিটিশ বাণিজ্য বন্ধের সেই প্রচেষ্টা তাঁকে পর্তুগাল ও স্পেনের দিকে নিয়ে যাবে—যেখানে নিয়মিত সেনাবাহিনীকে হারানোর পরও জনতার প্রতিরোধ সাম্রাজ্যকে দীর্ঘ ও ক্ষয়কর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে।
প্রথম কনসাল থেকে সম্রাট: নেপোলিয়নিক কোড, সংস্কার ও ১৮০৪ সালের অভিষেক
কোকো শ্যানেল: পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্য এনে নারীর জীবনধারা বদলে দেওয়ার ইতিহাস
অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট: আটলান্টিকজয়ী নারী বৈমানিকের জীবন ও অন্তর্ধানের রহস্য
রোজা লুক্সেমবার্গ: বিপ্লব, গণতন্ত্র ও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রামের অসাধারণ নারী