বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

স্যাটার্ন ও স্বর্ণযুগ: রোমান পুরাণে স্যাটার্নালিয়া উৎসবের গল্প

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

স্যাটার্ন ও স্বর্ণযুগ: রোমান পুরাণে স্যাটার্নালিয়া উৎসবের গল্প
স্যাটার্নের স্বর্ণযুগের স্মৃতি জাগিয়ে তুলত রোমের স্যাটার্নালিয়া উৎসব।

সেরেস ও প্রোসারপিনার কাহিনিতে ফসল ফিরে এসেছিল বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের এক নতুন ছন্দে। কিন্তু রোমান কল্পনায় এমন একটি অতীতও ছিল, যখন জীবিকা নিয়ে এত উদ্বেগ ছিল না, জমির ফলন নিয়ে মানুষ পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়াত না। সেই হারানো সময়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্যাটার্ন, কৃষি ও বপনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক প্রাচীন দেবতা। তাঁর গল্প রোমানদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখত: সভ্যতা যত শক্তিশালী হয়েছে, মানুষ কি তত সুখী হয়েছে? এই প্রশ্নের পৌরাণিক উত্তর ছিল স্বর্ণযুগ—সমৃদ্ধি, শান্তি এবং তুলনামূলক সমতার এক কল্পিত যুগ।

স্যাটার্নের পরিচয় বুঝতে তাঁকে কেবল গ্রিক ক্রোনোসের রোমান নাম ভাবলে চলবে না। ইতালীয় ধর্মীয় পরম্পরায় তাঁর নিজস্ব উপাসনা ছিল; পরে গ্রিক পুরাণের প্রভাবে তাঁর জীবনকাহিনি ক্রোনোসের সঙ্গে মিশে যায়। কৃষিকাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বোঝাতে হাতে বাঁকানো কাস্তে বা শস্য কাটার সরঞ্জাম দেখানো হতো। তবে তাঁর উপাসনার একেবারে প্রাচীন রূপ কতটা কৃষিনির্ভর ছিল, তা নিশ্চিতভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন। রোমান ধর্মে দেবতার পরিচয় বহু শতাব্দীর আচার, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠত। স্যাটার্নও সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

গ্রিক প্রভাবে গড়ে ওঠা বংশকাহিনিতে স্যাটার্ন ছিলেন জুপিটারের পিতা। নিজের সন্তান একদিন তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করবে—এই আশঙ্কায় তিনি সন্তানদের গিলে ফেলতেন। জুপিটারকে গোপনে রক্ষা করা হয়, আর শেষ পর্যন্ত পুত্র পিতার শাসনের অবসান ঘটান। এখানে দেবরাজত্বের উত্তরাধিকার শান্তিপূর্ণ নয়; তা ভয়, দমন এবং সংঘর্ষে পূর্ণ। কিন্তু ইতালিতে পৌঁছে স্যাটার্নের চরিত্র অন্য অর্থ পায়। দেবলোক থেকে বিতাড়িত শাসক এখানে হয়ে ওঠেন আশ্রয়প্রার্থী, কৃষির শিক্ষক এবং এক সুখী যুগের প্রতিষ্ঠাতা। একই দেবতার মধ্যে এই পরিবর্তন রোমান পুরাণের সৃজনশীল অভিযোজনকে স্পষ্ট করে।

একটি প্রচলিত কাহিনিতে ইতালির দেবতা জানুস স্যাটার্নকে আশ্রয় দেন। জানুস দরজা, প্রবেশপথ এবং সূচনার সঙ্গে যুক্ত; তাঁর দেশে নির্বাসিত দেবতার আগমন তাই নতুন ব্যবস্থার সূচনা হিসেবেও পড়া যায়। স্যাটার্ন মানুষকে জমি চাষ, বীজ বপন এবং সংগঠিত জীবনযাপনের শিক্ষা দেন। লাতিয়ামের নামের সঙ্গে তাঁর সেখানে লুকিয়ে থাকার গল্পও যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এটি পৌরাণিক শব্দব্যাখ্যা, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়। রোমানরা এভাবে নিজেদের ভূখণ্ডকে দেবতার আশ্রয়স্থল এবং প্রাচীন সমৃদ্ধির জন্মভূমি হিসেবে কল্পনা করেছিল।

স্যাটার্নের শাসনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। বিভিন্ন সাহিত্যিক বর্ণনায় সেই যুগে যুদ্ধ, প্রতারণা, লোভ এবং কঠোর শাস্তির প্রয়োজন ছিল না। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ন্যায় মেনে চলত; সম্পদের জন্য দূর সমুদ্রে বিপজ্জনক যাত্রাও অপরিহার্য ছিল না। পৃথিবী উদারভাবে খাদ্য দিত। কিন্তু স্বর্ণযুগের সব বিবরণ অভিন্ন নয়। কোথাও কৃষিশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও মাটি শ্রম ছাড়াই ফল দেয়। এই পার্থক্য বোঝায়, স্বর্ণযুগ কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অর্থব্যবস্থার বিবরণ নয়; এটি ভালো জীবনের বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষার পৌরাণিক রূপ।

জমির সীমানা এবং ব্যক্তিগত দখল নিয়ে বিরোধ না থাকার ধারণাও এই কল্পনার অংশ। বাস্তব রোমে ভূমির মালিকানা ছিল ক্ষমতা, মর্যাদা এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে। সেই সমাজে স্যাটার্নের যুগের স্মৃতি সম্পদের অসম বণ্টনের বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ প্রশ্ন তুলতে পারত। আবার শাসকেরাও শান্তি ও প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি দিতে স্বর্ণযুগের ভাষা ব্যবহার করতেন। ফলে একই ধারণা কখনো বর্তমান সমাজের সমালোচনা, কখনো ক্ষমতাবানদের আত্মপ্রচারের উপাদান হয়ে উঠত। হারানো সমৃদ্ধি শুধু অতীতের গল্প ছিল না; ভবিষ্যৎ কেমন হওয়া উচিত, তারও একটি মাপকাঠি ছিল।

রোমান কবিরা স্বর্ণযুগের পরে রৌপ্য, ব্রোঞ্জ এবং লৌহযুগের অবক্ষয়ের কথাও বলেছেন। এই ধারায় সময় এগোনো মানেই উন্নতি নয়। অস্ত্র, সম্পদের লোভ এবং মানবিক বিশ্বাসের ক্ষয় সভ্যতার অর্জনের সঙ্গে পাশাপাশি বাড়ে। স্যাটার্নের শান্ত যুগ তখন ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া এক আদর্শ। অবশ্য সব রোমান একইভাবে এই যুগবিভাগ বিশ্বাস করতেন, এমন দাবি করা যাবে না। সাহিত্যিক কল্পনা, ধর্মীয় আচার এবং দৈনন্দিন বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য ছিল। তবু স্বর্ণযুগের গল্প রোমানদের নিজেদের শক্তির মূল্য নিয়ে ভাবার সুযোগ দিত।

স্যাটার্নের উপস্থিতি শুধু কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। রোমান ফোরামের পশ্চিম দিকে, ক্যাপিটোলাইন পাহাড়ের পাদদেশে তাঁর মন্দির ছিল নগরের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা। ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সূচনাকালে মন্দিরটি উৎসর্গ করা হয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা এরারিয়াম যুক্ত ছিল। সমৃদ্ধির দেবতার মন্দিরে রাষ্ট্রের অর্থসম্পদ সংরক্ষণের সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও একে একমাত্র ধর্মীয় কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। এখানে স্যাটার্নের প্রাচীন প্রাচুর্যের স্মৃতি এবং বাস্তব রাষ্ট্রের সম্পদ পাশাপাশি অবস্থান করত—আদর্শের সঙ্গে প্রশাসনের একটি দৃশ্যমান সংযোগ।

এই দেবতার সবচেয়ে প্রাণবন্ত উৎসব ছিল স্যাটার্নালিয়া, যার প্রধান দিন ১৭ ডিসেম্বর। সময়ের সঙ্গে উদ্‌যাপন কয়েক দিন ধরে চলত; বিভিন্ন যুগে আনুষ্ঠানিক সময়সীমা এবং মানুষের বাস্তব উৎসবের দৈর্ঘ্য এক ছিল না। শীতের এই সময়ে ভোজ, উপহার এবং অবকাশ নগরের স্বাভাবিক ছন্দ বদলে দিত। উৎসবের শুরুতে স্যাটার্নের উদ্দেশে ধর্মীয় আচার ও জনভোজের ব্যবস্থা ছিল। তাঁর মূর্তির পায়ে বাঁধা পশমের বন্ধন খুলে দেওয়ার প্রথার কথাও জানা যায়। দেবতার মুক্তি এবং সমাজের সাময়িক শিথিলতা এখানে একই উৎসবের ভাষায় প্রকাশ পেত।

স্যাটার্নালিয়ার সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল প্রভু ও দাসের সম্পর্কের সাময়িক পরিবর্তন। কিছু বিবরণে দাসেরা বিশেষ ভোজ পেত, প্রভুদের সঙ্গে বসত বা তুলনামূলক নির্ভয়ে কথা বলার সুযোগ পেত; কোথাও প্রভুরাই তাদের পরিবেশন করতেন। তবে সব পরিবারে একই নিয়ম চলত না। এই আচারকে দাসত্বের অবসান হিসেবে বোঝা ভুল। উৎসবের স্বাধীনতা ছিল সীমিত, সাময়িক এবং প্রভুর কর্তৃত্বের মধ্যেই অনুমোদিত। তবু এমন একটি সমাজে, যেখানে দাসের অবস্থান গভীরভাবে অধীন, সাময়িক ভূমিকা পরিবর্তন স্বর্ণযুগের সমতার কল্পনাকে স্পর্শ করার সুযোগ তৈরি করত।

উৎসবের পোশাকেও দৈনন্দিন শৃঙ্খলা থেকে বিরতির ইঙ্গিত ছিল। আনুষ্ঠানিক টোগার বদলে আরামদায়ক ভোজের পোশাক দেখা যেত। স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত পিলেউস টুপিও উৎসবের পরিচিত প্রতীক হয়ে ওঠে। পাশাখেলা, হাসিঠাট্টা এবং বন্ধুবান্ধবের মিলন সাধারণ দিনের তুলনায় বেশি প্রশ্রয় পেত। কোথাও মজার ছলে উৎসবের রাজা নির্বাচন করে অদ্ভুত নির্দেশ দেওয়া হতো। এই অভিনয় বাস্তব রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটাত না, কিন্তু ক্ষমতার গাম্ভীর্যকে কয়েক দিনের জন্য হাসির বিষয় বানাত। সামাজিক নিয়মের ভার অনুভব করার পাশাপাশি মানুষ তার সাময়িক উলটপালটও উপভোগ করত।

উপহার বিনিময় স্যাটার্নালিয়াকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উৎসবেও পরিণত করেছিল। মোমবাতি, ছোট মাটির মূর্তি, খাবার এবং অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া হতো। ছোট মূর্তির সঙ্গে যুক্ত সিগিলারিয়া উৎসবপর্ব বিশেষভাবে পরিচিত। উপহার সব সময় দামি হওয়ার কথা ছিল না; তার মধ্যে রসিকতা, আন্তরিকতা এবং মর্যাদার প্রতিযোগিতা—সবই থাকতে পারত। মোমবাতির আলো শীতের অন্ধকারে উৎসবের আবহ বাড়াত। তবে এসব রীতির প্রতিটির জন্য একটি সর্বজনস্বীকৃত পৌরাণিক ব্যাখ্যা ছিল না। রোমান উৎসবকে বুঝতে আচার, লোকাচার এবং পরবর্তী ব্যাখ্যাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

স্যাটার্নালিয়ার মুক্ত পরিবেশ সবার কাছে সমান আনন্দদায়কও ছিল না। নগরের কোলাহল, দীর্ঘ ভোজ এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে কেউ কেউ দূরে থাকতে চাইতেন। আবার দাসদের আনন্দের সুযোগ থাকলেও তাদের শ্রম পুরোপুরি বন্ধ হতো না। এই সীমাবদ্ধতা উৎসবের অর্থ কমায় না; বরং বাস্তব সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্পষ্ট করে। রোমানরা কয়েক দিনের জন্য অন্যরকম জীবন অভিনয় করত, তারপর আগের ব্যবস্থায় ফিরে যেত। স্বর্ণযুগের স্মৃতি তাই সমাজকে উল্টে দেওয়ার পাশাপাশি তার টিকে থাকার ব্যবস্থার অংশও হতে পারত।

স্যাটার্নের গল্পে শেষ পর্যন্ত দুটি সময় পাশাপাশি থাকে: কখনো হারিয়ে যাওয়া এক সুখী অতীত, আর বছরে একবার ফিরে আসা তার অসম্পূর্ণ অনুকরণ। সেরেসের কাহিনি শিখিয়েছিল ফসলের ফিরে আসা বিচ্ছেদের মূল্য মুছে দেয় না; স্যাটার্নালিয়াও দেখায়, আনন্দের বিরতি দৈনন্দিন বৈষম্য দূর করে না। তবু স্বর্ণযুগের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে মনে করিয়ে দিত যে যুদ্ধ, লোভ এবং অধীনতাই জীবনের একমাত্র সম্ভাবনা নয়। রোমের শীতের ভোজে সেই সম্ভাবনার স্মৃতি আলো জ্বালাত, আর জানুসের দরজায় অপেক্ষা করত আরেকটি নতুন সূচনা।