জানুস: দুই মুখের রোমান দেবতা, দরজা ও নতুন শুরুর রহস্য
সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি
জানুসের দুই মুখে ধরা পড়ে বিদায়ের অতীত ও আগমনের ভবিষ্যৎ।
স্যাটার্নালিয়ার ভোজ শেষ হলে রোমানদের দৈনন্দিন শৃঙ্খলা ফিরে আসত, কিন্তু পুরোনো সময় ছেড়ে নতুন সময়ে প্রবেশের প্রশ্নটি থেকে যেত। স্যাটার্নের স্বর্ণযুগ ছিল পেছনে তাকানোর এক পৌরাণিক উপায়; জানুস ছিলেন সেই দেবতা, যিনি পেছনে ও সামনে একসঙ্গে তাকাতেন। তাঁর দুই মুখের মাঝখানে যেন একটি দরজা দাঁড়িয়ে আছে—যার এক পাশে বিদায়, অন্য পাশে আগমন। রোমানদের কাছে দরজা কেবল ঘরের প্রবেশপথ ছিল না। তা ছিল এমন একটি সীমা, যা অতিক্রম করলে মানুষের অবস্থান, কর্তব্য কিংবা জীবনের পর্যায় বদলে যেতে পারে।
জানুস রোমান ধর্মের বিশেষভাবে নিজস্ব চরিত্রের দেবতাদের একজন। জুপিটারের সঙ্গে জিউস বা ভেনাসের সঙ্গে আফ্রোদিতির মতো তাঁর কোনো সরাসরি, প্রতিষ্ঠিত গ্রিক সমতুল্য ছিল না। অবশ্য গ্রিক চিন্তা ও সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন, এমনও নয়। তাঁর পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল প্রবেশ, প্রস্থান এবং সূচনা। লাতিন ভাষায় দরজার জন্য ব্যবহৃত ‘ইয়ানুয়া’ শব্দের সঙ্গে তাঁর নামের সম্পর্ক প্রাচীনকালেই আলোচিত হয়েছিল। তবে নামের ব্যুৎপত্তি দিয়েই উপাসনার সমগ্র ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না। দরজা ও চলাচলের সঙ্গে তাঁর ধর্মীয় সম্পর্কই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জানুসের দুটি মুখকে আজ সহজেই অতীত ও ভবিষ্যতের প্রতীক বলা হয়। ব্যাখ্যাটি অর্থপূর্ণ, কিন্তু তাঁর প্রাচীন পরিচয় আরও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। একটি দরজা দিয়ে কেউ ভেতরে আসে, আবার একই দরজা দিয়ে বাইরে যায়; প্রহরীকে দুই দিকেই নজর রাখতে হয়। দুই মুখ তাই প্রথমে দ্বিমুখী দৃষ্টি ও দুই দিকের প্রবেশপথ বোঝার একটি শক্তিশালী চিত্র। সেখান থেকে পুরোনো ও নতুন, শুরু ও শেষ, পরিচিত ও অজানার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। এই দ্বৈততা প্রতারণা বা দুই রকম কথা বলার প্রতীক ছিল না।
রোমান ধর্মে কোনো কাজ সঠিকভাবে শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা বা বলিদানের ক্ষেত্রে জানুসকে প্রথমে আহ্বান করার প্রথা এই গুরুত্ব প্রকাশ করে। জুপিটার সর্বোচ্চ দেবতা হলেও সূচনার অধিকার জানুসের। বিষয়টি দেবতাদের মধ্যে ক্ষমতার সাধারণ প্রতিযোগিতা নয়; প্রত্যেকের আলাদা ধর্মীয় ভূমিকার প্রকাশ। জানুস নতুন কাজের প্রবেশদ্বার খুলে দেন—তারপর অন্য দেবতার কাছে প্রার্থনা পৌঁছায়, এমনভাবে তাঁর স্থান বোঝা যায়। মানুষের ঘরে যেমন ভেতরে ঢোকার আগে দরজা পার হতে হয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও তেমন একটি শুরুর ধাপ ছিল।
এই কারণে জানুস শুধু বছরের প্রথম দিনের দেবতা ছিলেন না। যাত্রা, নতুন উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সূচনার সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হতো। মাসের প্রথম দিনও রোমান ধর্মীয় সময়বোধে বিশেষ স্থান পেত। তবে প্রতিটি জন্ম, মৃত্যু বা জীবনের পরিবর্তন একমাত্র তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রসব, গৃহ, মৃত্যু এবং সীমারক্ষার জন্য অন্য দেবদেবীও ছিলেন। জানুসের বৈশিষ্ট্য ছিল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় প্রবেশের মুহূর্তটি। তিনি কোনো কাজের সব ফল নির্ধারণের চেয়ে তার সূচনাকে ধর্মীয়ভাবে অর্থপূর্ণ করে তুলতেন।
জানুয়ারি মাসের নাম জানুসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তাঁকে সময়ের দেবতা বলা হয়। কিন্তু তিনি আধুনিক অর্থে ঘড়ি, সময়ের গতি বা মহাবিশ্বের সমস্ত কাল নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা নন। তাঁর সম্পর্ক মূলত সময়ের দোরগোড়ার সঙ্গে: একটি বছর শেষ হচ্ছে, আরেকটি শুরু হচ্ছে। রোমান বর্ষপঞ্জিও একবারে বর্তমান রূপ পায়নি। মার্চকে বছরের সূচনার সঙ্গে যুক্ত করার পুরোনো পরম্পরা ছিল, আর প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে জানুয়ারির প্রথম দিন প্রশাসনিক গুরুত্ব অর্জন করে। তাই জানুসের উপাসনা এবং বর্ষপঞ্জির বিকাশকে একই সরল ঘটনার ফল ভাবা যাবে না।
নতুন বছরের শুভেচ্ছায় রোমানরা ভালো কথা, শুভ লক্ষণ এবং উপহারের গুরুত্ব দিত। খেজুর, শুকনো ডুমুর ও মধুর মতো মিষ্টি খাবার বছরের শুরুতে মঙ্গলকামনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। মুদ্রাও উপহার দেওয়া হতো। কবি ওভিদের উৎসববিষয়ক রচনায় জানুসের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে এসব প্রথার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মিষ্টি উপহারের ধারণাটি সহজ: শুরুটা যেন মধুর হয়, পরের দিনগুলোও যেন শুভ হয়। তবে সাহিত্যিক ব্যাখ্যাকে প্রত্যেক রোমানের অভিন্ন বিশ্বাস মনে করা যাবে না; একই আচারের অর্থ ব্যক্তি ও সময়ভেদে বদলাতে পারত।
জানুসের সঙ্গে ইতালির প্রাচীন রাজত্বের কাহিনিও যুক্ত ছিল। কিছু পরম্পরায় তাঁকে লাতিয়ামের আদিম শাসক হিসেবে কল্পনা করা হয়, যিনি নির্বাসিত স্যাটার্নকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এখানে আগের স্বর্ণযুগের গল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্পষ্ট। জানুস আশ্রয়ের দরজা খুলে দেন, আর স্যাটার্ন নতুন জীবনব্যবস্থার শিক্ষা নিয়ে আসেন। রোমের জানিকুলাম পাহাড়ের নামও তাঁর সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা হতো। এসব কাহিনি দেবতাকে স্থানীয় ভূগোল ও প্রাচীন স্মৃতির মধ্যে স্থাপন করেছিল; এগুলোকে প্রমাণিত রাজবংশের ইতিহাস হিসেবে পড়া উচিত নয়।
জানুসের সবচেয়ে বিখ্যাত জনপরিসরের প্রতীক ছিল রোমান ফোরামের কাছে তাঁর দ্বারযুক্ত ধর্মীয় স্থাপনা, সাধারণভাবে ‘জানুস জেমিনুস’ নামে পরিচিত। একে বিশাল স্তম্ভবেষ্টিত মন্দিরের আদলে কল্পনা করলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। এর পরিচয়ে দ্বার ও পথের গুরুত্ব ছিল কেন্দ্রীয়। রোমান ঐতিহ্যে রাজা নুমা পম্পিলিয়াসের সঙ্গে এর প্রতিষ্ঠা যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু নুমার যুগের বহু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাহিনির মতো এটিও পরবর্তী স্মৃতিতে সংরক্ষিত একটি প্রতিষ্ঠা-পরম্পরা। পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতার নাম এবং সমকালীন প্রত্নপ্রমাণ এক ধরনের সাক্ষ্য নয়।
এই স্থাপনার দরজা যুদ্ধের সময় খোলা এবং শান্তির সময় বন্ধ রাখার প্রথা জানুসকে রাষ্ট্রের ভাগ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। খোলা দ্বার যেন দেখাত, রোমের বাহিনী বাইরে গেছে এবং যুদ্ধের পথ সক্রিয় রয়েছে। বন্ধ দ্বার ঘোষণা করত শান্তির অবস্থা। এটি কোনো সাধারণ নগরদ্বার বন্ধ করে শত্রুকে ঠেকানোর ব্যবস্থা ছিল না; ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীক। যুদ্ধপ্রবণ রোমে দরজা বন্ধ হওয়ার স্মৃতি তাই বিশেষ গুরুত্ব পেত। শান্তি এখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা নয়, দেবতার সামনে প্রকাশিত রাষ্ট্রের দাবি।
অগাস্টাস নিজের শাসনের সাফল্য তুলে ধরতে জানুসের দ্বার বন্ধ করার ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পরে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু কোনো শাসক শান্তি ঘোষণা করলেই সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে সংঘর্ষ শেষ হয়ে গিয়েছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাস্তব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি শাসকের কর্তৃত্বও শক্তিশালী করত। জানুসের বন্ধ দ্বার তাই একই সঙ্গে আচার, স্মৃতি এবং প্রচারের ভাষা। এই পার্থক্য বুঝলে রোমান ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে।
জানুসের দরজা নিয়ে আরও একটি কাহিনিতে রোমের ওপর স্যাবাইন আক্রমণের সময় তাঁর সহায়তার কথা বলা হয়। শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে উত্তপ্ত জলধারা প্রবাহিত হওয়ার বর্ণনা এই পরম্পরার অংশ। এমন গল্পে দেবতা দরজার কাছে নগরের রক্ষক হয়ে দাঁড়ান। তবে এটি যুদ্ধের সময় দ্বার খোলা রাখার প্রথার একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। প্রাচীন লেখকেরা একই আচারকে ভিন্নভাবে বুঝিয়েছেন। রোমান পুরাণ কোনো একক, অপরিবর্তনীয় ধর্মগ্রন্থে বাঁধা ছিল না; একটি পরিচিত প্রতীকের চারপাশে একাধিক গল্প জমা হতে পারত।
শিল্পে জানুসকে প্রায়ই দুটি মুখসহ দেখানো হয়েছে, কখনো হাতে চাবি ও দণ্ড নিয়ে। চাবি প্রবেশের অনুমতি এবং দণ্ড চলাচলের তত্ত্বাবধানের অর্থ বহন করতে পারে। কিছু প্রতিরূপে চার মুখও দেখা যায়, যা চারমুখী পথের ধারণার সঙ্গে মানানসই। আবার রোমান মুদ্রায় দুই মুখবিশিষ্ট মাথা তাঁর পরিচিত চিত্র হয়ে ওঠে। এসব রূপে দেবতার মুখ কোনো দৈত্যসুলভ বিকৃতি নয়; তা মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টির সীমা অতিক্রম করার উপায়। মানুষ একদিকে তাকালে অন্যদিক হারায়, জানুসের দৃষ্টি সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠে।
জানুসের রহস্য শেষ পর্যন্ত তাঁর অস্বাভাবিক মুখের সংখ্যায় নয়, জীবনের খুব পরিচিত একটি অভিজ্ঞতায়। নতুন ঘরে প্রবেশ, যাত্রা শুরু কিংবা বছরের প্রথম সকাল—প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ কিছু পেছনে রেখে এগোয়। সমাপ্তি ও সূচনা তাই একই দোরগোড়ার দুই দিক। স্যাটার্নের স্বর্ণযুগ মানুষকে হারানো শান্তির কথা মনে করিয়েছিল; জানুস সেই স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে সামনে যাওয়ার প্রতীক হয়ে থাকেন। তাঁর খোলা দরজায় যুদ্ধের আশঙ্কা ছিল, বন্ধ দরজায় শান্তির আশা। আর মানুষের প্রতিটি নতুন শুরুতে ছিল অতীতকে স্মরণ করে অজানার দিকে পা বাড়ানোর সাহস।
সেরেস ও প্রোসারপিনা: পাতালজগৎ, ঋতুর জন্ম ও ফসলের রোমান কিংবদন্তি
রিগ্যান যুগ ও স্নায়ুযুদ্ধ: অস্ত্র প্রতিযোগিতা, স্টার ওয়ার্স এবং সোভিয়েত সংকট
সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধ: ১৯৭৯ সালের আক্রমণ ও স্নায়ুযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়
দেতান্ত ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: নিক্সন, ব্রেজনেভ ও SALT চুক্তির ইতিহাস