বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সেরেস ও প্রোসারপিনা: পাতালজগৎ, ঋতুর জন্ম ও ফসলের রোমান কিংবদন্তি

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

সেরেস ও প্রোসারপিনা: পাতালজগৎ, ঋতুর জন্ম ও ফসলের রোমান কিংবদন্তি
মা–মেয়ের বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনে ফসলের চক্রের পৌরাণিক ব্যাখ্যা।

ভেস্তার পবিত্র শিখা রোমের যৌথ গৃহের ধারাবাহিকতা রক্ষা করত, কিন্তু সেই গৃহে খাদ্য পৌঁছানোর জন্য নির্ভর করতে হতো জমি ও ফসলের ওপর। আগুন জ্বললেও শস্য না জন্মালে পরিবার, নগর এবং রাষ্ট্রের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ত। এই জীবিকার জগতে প্রধান দেবী ছিলেন সেরেস। তাঁর কন্যা প্রোসারপিনাকে ঘিরে যে কাহিনি গড়ে ওঠে, সেখানে কৃষির অনিশ্চয়তা একটি মায়ের শোকের ভাষা পায়। কন্যার অপহরণ, পৃথিবীর উর্বরতা হারানো এবং শর্তসাপেক্ষ পুনর্মিলনের মধ্য দিয়ে রোমান সাহিত্য জীবন ও মৃত্যুর পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছে।

সেরেসের উপাসনার নিজস্ব ইতালীয় ভিত্তি ছিল। শস্য, কৃষিজীবন এবং সম্প্রদায়ের খাদ্যনিরাপত্তা তাঁর সঙ্গে যুক্ত। গ্রিক ডেমেতেরের সঙ্গে সমীকরণের ফলে তাঁর পরিচয়ে হারানো কন্যাকে খুঁজে বেড়ানোর বিস্তৃত কাহিনি যোগ হয়। একইভাবে গ্রিক পার্সেফোনি রোমান জগতে প্রোসারপিনা হিসেবে পরিচিত হন। ফলে গল্পটির প্রধান কাঠামো গ্রিক ঐতিহ্য থেকে এলেও রোমে তা নতুন সাহিত্যিক ও ধর্মীয় অর্থ পায়। সেরেসকে শুধু ডেমেতেরের নামবদল বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি এই অপহরণকাহিনিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রোমান উদ্ভাবন বলাও ভুল।

প্রোসারপিনা যখন ফুল তুলছিলেন, তখন পাতালশাসক প্লুটো তাঁকে ধরে নিয়ে যান—এটাই কাহিনির মূল ঘটনা। ওভিদের পরিচিত বর্ণনায় সিসিলির হেন্না অঞ্চলের হ্রদ ও ফুলে ভরা প্রান্তর এই দৃশ্যের পটভূমি। শান্ত সৌন্দর্যের মধ্যে হঠাৎ রথের আগমন নিরাপত্তা ভেঙে দেয়। কন্যা মাকে ডাকেন, ফুল ছড়িয়ে পড়ে এবং পৃথিবীর পথ ছেড়ে তাঁকে পাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই মুহূর্তে প্রোসারপিনা স্বাধীনভাবে নতুন জীবন বেছে নিচ্ছেন না। তাঁর অনিচ্ছা ও অসহায়তা ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছে।

দেবতাদের সম্পর্কের মাধ্যমে অপহরণের ব্যাখ্যাও বিভিন্ন রচনায় ভিন্ন। কোনো ধারায় বৃহস্পতির অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ; ওভিদের রূপান্তরকাব্যে ভেনাস ও কিউপিড প্লুটোর আকর্ষণ সৃষ্টিতে ভূমিকা নেন। কিন্তু দৈবপরিকল্পনা উল্লেখ করলেই প্রোসারপিনার অভিজ্ঞতা সম্মতিপূর্ণ হয় না। এই কাহিনিতে বিবাহের দাবি কন্যার সম্মতি এবং মায়ের অধিকারকে অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী পুনর্মিলন গল্পকে সামঞ্জস্যের দিকে নিয়ে গেলেও শুরুতে ঘটে যাওয়া জবরদস্তি মুছে দেয় না। প্রেমের ভাষা ও ক্ষমতার ব্যবহার এখানে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

সেরেস ফিরে এসে কন্যাকে না পেয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। দিন ও রাত তাঁর খোঁজ থামে না; মশাল হাতে তিনি বিভিন্ন ভূমি অতিক্রম করেন। দেবীর এই যাত্রা কৃষির নিয়মিত পরিচর্যা থেকে সরে যাওয়ার প্রতীকও হয়ে ওঠে। যে শক্তি শস্যের বৃদ্ধি নিশ্চিত করত, তার মনোযোগ এখন হারানো সন্তানের দিকে। ওভিদের কাহিনিতে সিসিলির নানা স্থান ও চরিত্র অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হয়। এতে দ্বীপের ভূদৃশ্য শুধু পটভূমি থাকে না; দেবীর শোক ও মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

ওভিদের বর্ণনায় জলনিম্ফ কিয়ানে অপহরণের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি শোকে জলে বিলীন হন; পরে প্রোসারপিনার কোমরবন্ধের মাধ্যমে সেরেস একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান। আরেক জলনিম্ফ আরেথুসা জানান, কন্যাকে তিনি পাতালে দেখেছেন। এসব পর্বে নদী, ঝরনা ও জলাশয় বার্তা বহন করে। প্রকৃতি এখানে নির্বাক দৃশ্য নয়; দেবীর অনুসন্ধানে কখনো সাক্ষী, কখনো প্রতিবাদী, কখনো পথপ্রদর্শক। তবে সব প্রাচীন সংস্করণে একই চরিত্র বা একই অনুসন্ধানপথ উপস্থিত নেই।

কন্যার অবস্থান জানার আগে ও পরে সেরেসের শোক পৃথিবীর উর্বরতার সংকটে রূপ নেয়। জমি ফসল দেয় না, বীজের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং মানুষের খাদ্য বিপন্ন হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় দেবীর অবহেলা, প্রত্যাহার বা ক্রোধের ওপর আলাদা জোর দেওয়া হয়েছে। এই দুর্ভিক্ষ দেবতাদের জন্যও সমস্যা, কারণ মানুষের জীবন ও উপাসনা পরস্পরনির্ভর। সেরেসের শক্তি এখানে মাতৃত্বের অসহায়তার পাশাপাশি প্রতিরোধের ক্ষমতাও প্রকাশ করে। কন্যাকে হারানোর সিদ্ধান্ত তিনি নিঃশর্তভাবে মেনে নেন না; জীবনের উৎপাদন থামিয়ে দৈবব্যবস্থাকে আলোচনায় বাধ্য করেন।

সেরেস বৃহস্পতির কাছে কন্যাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু মৃতলোকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্ত হিসেবে সেখানে খাদ্য গ্রহণের প্রশ্ন সামনে আসে। প্রোসারপিনা পাতালে কিছু খেয়ে থাকলে তাঁর সম্পূর্ণ ফিরে আসা বাধাগ্রস্ত হবে। এই নিয়ম জীবন ও মৃত্যুর জগতের সীমা প্রকাশ করে। খাদ্য এখানে শুধু পুষ্টি নয়; নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে বন্ধন। মানুষের সাধারণ জীবনে একসঙ্গে খাওয়া যেমন সম্পর্ক তৈরি করে, কাহিনিতে পাতালের খাদ্য গ্রহণও সেই রাজ্যের সঙ্গে স্থায়ী সংযোগের চিহ্ন হয়ে ওঠে।

প্রোসারপিনা ডালিমের দানা খেয়েছিলেন। কতটি দানা, কীভাবে খেয়েছিলেন এবং কতদিন পাতালে থাকতে হবে—এসব বিষয়ে প্রাচীন সংস্করণগুলো একমত নয়। ওভিদের রূপান্তরকাব্যে সাতটি দানার উল্লেখ রয়েছে; অন্যান্য ধারায় ভিন্ন সংখ্যা ও সময়বণ্টন দেখা যায়। তাই জনপ্রিয় পুনর্কথনের একটি সংখ্যাকে সর্বজনীন সত্য বলা ঠিক নয়। ডালিমের প্রধান তাৎপর্য সংখ্যায় নয়, বরং এমন একটি কাজের মধ্যে, যা ফিরে আসার সম্ভাবনাকে শর্তযুক্ত করে। কন্যাকে পাওয়া যাবে, কিন্তু আগের মতো সম্পূর্ণভাবে নয়।

শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়: প্রোসারপিনা সময়ের একটি অংশ মায়ের কাছে এবং অন্য অংশ পাতালে কাটাবেন। ওভিদের পরিচিত রোমান বর্ণনায় বছর দুই সমান ভাগে বিভক্ত হয়। কিন্তু গ্রিক ঐতিহ্যের অন্য ধারায় পাতালে থাকার সময় আলাদা। মা–মেয়ের পুনর্মিলনে পৃথিবী আবার উর্বর হয়; বিচ্ছেদের সঙ্গে উৎপাদনের বিরতি ও শোক যুক্ত হয়। এই বিন্যাস ঋতুচক্রের পৌরাণিক ব্যাখ্যা হিসেবে জনপ্রিয়। তবে গল্পটি সব অঞ্চলের প্রকৃত কৃষিবর্ষকে একইভাবে বর্ণনা করে না।

এখানে আধুনিক চার ঋতুর সহজ ছক বসালে ভুল হতে পারে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শস্যের বৃদ্ধি শীতের বৃষ্টি, বসন্তের বিকাশ এবং গ্রীষ্মের শুষ্কতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে পাতালে থাকা মানেই সর্বত্র তুষারঢাকা শীত—এমন ব্যাখ্যা যথাযথ নয়। সেরেস–প্রোসারপিনার কাহিনি মূলত বৃদ্ধি, অনুপস্থিতি এবং পুনরাগমনের সম্পর্ক বোঝায়; এটি আধুনিক জলবায়ুবিজ্ঞানের বিকল্প নয়। বিভিন্ন সমাজ নিজেদের কৃষি ও ঋতুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেই সম্পর্ক মিলিয়ে অনুভব করতে পেরেছে।

প্রোসারপিনা ফিরে এলেও তাঁর পরিচয় বদলে গেছে। তিনি শুধু মায়ের সঙ্গে ফুল তোলা কন্যা নন; পাতালরাজ্যের রানিও। ফলে এক ব্যক্তিত্বে পৃথিবীর জীবনীশক্তি এবং মৃতলোকের কর্তৃত্ব যুক্ত হয়। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁকে জীবন ও মৃত্যুর সীমান্তে বিশেষ মর্যাদা দেয়। কিন্তু রানির পদ পাওয়াকে অপহরণের ন্যায্যতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। কাহিনির মধ্যে তাঁর নতুন ক্ষমতা এবং পূর্বের জবরদস্তি পাশাপাশি থাকে। মা ও কন্যার সম্পর্কও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে হয়।

রোমে সেরেসের বাস্তব উপাসনা শুধু এই সাহিত্যিক গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না। আভেন্তাইনের কাছে সেরেস, লিবার ও লিবেরার মন্দিরের গুরুত্ব ছিল; খাদ্যসরবরাহ এবং সাধারণ নাগরিকদের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গেও সেরেসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবার গ্রিক ধারার বিশেষ আচার ও মা–কন্যার উপাসনাও রোমে স্থান পায়। তবে লিবেরা ও প্রোসারপিনাকে সব সময় সম্পূর্ণ অভিন্ন বলা যায় না। উপাসনার ইতিহাস, দেবীদের সমীকরণ এবং সাহিত্যিক পরিচয় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। একই দেবীর সামাজিক ভূমিকা একটি কাহিনির চেয়ে অনেক বিস্তৃত হতে পারে।

সেরেস ও প্রোসারপিনার গল্প মানুষের জীবিকার অনিশ্চয়তাকে পারিবারিক সম্পর্কের ভাষায় অনুভবযোগ্য করে। শস্য হারালে শুধু জমি অনুর্বর হয় না, মানুষের ভবিষ্যৎও থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়; কন্যা হারালে মায়ের জগৎও তেমন বদলে যায়। পুনর্মিলন তাই আগের অবস্থায় সম্পূর্ণ ফিরে যাওয়া নয়, ক্ষতির পরে নতুন ছন্দে জীবন চালিয়ে যাওয়ার সমঝোতা। প্রোসারপিনার দুই জগতে অবস্থান সেই ছন্দের প্রতীক। ভেস্তার চুলায় যে খাদ্য প্রস্তুত হতো, তার শস্য সেরেসের জমি থেকে আসত—এভাবেই গৃহ, কৃষি এবং মৃতলোকের পৃথক গল্প রোমান বিশ্বাসে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকত।