বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ম্যাককোয়ারি বাতিঘর: অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীনতম বাতিঘর ও সিডনির সামুদ্রিক ইতিহাস

সিরিজ: ইতিহাসের কিংবদন্তি বাতিঘর

ম্যাককোয়ারি বাতিঘর: অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীনতম বাতিঘর ও সিডনির সামুদ্রিক ইতিহাস
ম্যাককোয়ারি বাতিঘর

সিডনির পূর্ব উপকূলে ভক্লুজের উঁচু ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাককোয়ারি বাতিঘর অস্ট্রেলিয়ার নৌইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু। সাদা টাওয়ার, গম্বুজযুক্ত আলোককক্ষ এবং দুই পাশের ধ্রুপদি স্থাপত্য তাকে সাধারণ উপকূলীয় স্থাপনা থেকে আলাদা করেছে। তবে এর ইতিহাস বোঝার শুরুতেই একটি পার্থক্য জানা জরুরি: ১৮১৮ সালে এখানে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বাতিঘর চালু হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে দৃশ্যমান টাওয়ারটি ১৮৮৩ সালের। প্রাচীনত্বের পরিচয়টি মূলত এই স্থানে নৌসংকেত পরিষেবার দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত।

ম্যাককোয়ারি বাতিঘর পোর্ট জ্যাকসন বা সিডনি হারবারের প্রবেশমুখের দক্ষিণে অবস্থিত। উঁচু সমুদ্রতীরবর্তী অবস্থান দূরের জাহাজ থেকে আলো শনাক্ত করার সুবিধা দিয়েছিল। উপনিবেশের প্রথম যুগে সমুদ্র ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান পথ। খাদ্য, সরঞ্জাম, মানুষ ও খবর জাহাজে আসত। ফলে একটি জাহাজের নিরাপদ আগমন শুধু নাবিকের বিষয় ছিল না; বসতির অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনও তার ওপর নির্ভর করত। বাতিঘর এই সমুদ্রনির্ভর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে ওঠে।

বাতিঘর নির্মাণের আগেও সাউথ হেডে জাহাজ দেখার ও সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ঔপনিবেশিক বসতির শুরুর দিকে পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, পতাকাদণ্ড এবং পরে আগুনের আলোকসংকেত ব্যবহৃত হয়। এগুলোর দুটি কাজ ছিল: সমুদ্রের জাহাজকে ভূমির অবস্থান জানানো এবং বসতির মানুষকে জাহাজ আসার খবর দেওয়া। নৌনির্দেশ ও সংবাদ আদান-প্রদানের এই দ্বৈত ভূমিকা থেকেই আরও নির্ভরযোগ্য বাতিঘরের প্রয়োজন তৈরি হয়। তবে এই উপকূল বিররাবিররাগাল মানুষের ঐতিহ্যগত ভূমি; তার ইতিহাস ইউরোপীয় বসতির অনেক আগের।

১৮১৬ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের গভর্নর ল্যাচলান ম্যাককোয়ারি স্থায়ী বাতিঘর নির্মাণের নির্দেশ দেন। নেপোলিয়নিক যুদ্ধের অবসানের পর উপনিবেশে জাহাজ চলাচল এবং মানুষের আগমন বাড়ছিল। ম্যাককোয়ারির প্রশাসন তখন বিভিন্ন জনসেবামূলক ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ করছিল। বাতিঘর ছিল সেই কর্মসূচির অংশ। নকশার দায়িত্ব পান ফ্রান্সিস গ্রিনওয়ে, যিনি তখন সরকারের স্থপতি ও সহকারী প্রকৌশলী। তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকল্পটিকে অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্য ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

গ্রিনওয়ে ইংল্যান্ডে স্থপতি হিসেবে কাজ করতেন, কিন্তু জালিয়াতির অপরাধে দণ্ডিত হয়ে ১৮১৪ সালে সিডনিতে আসেন। দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুত প্রশাসনের নজরে পড়েন এবং সরকারি কাজে যুক্ত হন। একজন দণ্ডিত মানুষের পেশাগত দক্ষতা উপনিবেশের গুরুত্বপূর্ণ জনসেবায় ব্যবহৃত হওয়ার উদাহরণ ছিল এই প্রকল্প। তাঁর নকশা ও কাজ দেখে ম্যাককোয়ারি সন্তুষ্ট হন; ১৮১৭ সালে গ্রিনওয়ে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পান। তবে তাঁর অবদানকে শুধু ব্যক্তিগত মুক্তির গল্পে সীমাবদ্ধ করলে স্থাপত্য ও সরকারি নির্মাণে তাঁর বৃহত্তর ভূমিকা আড়াল হয়ে যায়।

প্রথম টাওয়ার স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত হয়। কেন্দ্রীয় টাওয়ার, পাশের ভবন এবং ঘেরা প্রাঙ্গণ মিলিয়ে পরিকল্পিত কেন্দ্র গড়ে ওঠে। নির্মাণের সময় মানসম্মত উপকরণ ও দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি ছিল। মূল ভবন অনেকটা প্রস্তুত হলেও আলোককক্ষ সম্পূর্ণ করতে ইংল্যান্ড থেকে কাচ আসার অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ১৮১৮ সালের ৩০ নভেম্বর নিয়মিত আলো প্রদর্শন শুরু হয়। সমকালীন সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে প্রতি রাতে আলো দেখানো এবং তার ব্যয় মেটাতে জাহাজের ওপর নির্দিষ্ট মাশুল আরোপের পরিকল্পনা জানানো হয়।

প্রথম আলোর উৎস ছিল তিমির তেল ব্যবহারকারী বাতি এবং প্রতিফলক। ঘূর্ণায়মান ব্যবস্থার সাহায্যে সমুদ্রে আলো পাঠানো হতো। আজকের দৃষ্টিতে এটি অপেক্ষাকৃত সরল মনে হলেও তখন আগুনের অস্থায়ী সংকেতের তুলনায় বড় উন্নতি ছিল। রক্ষকদের জ্বালানি, শিখা, কাচ ও যন্ত্রের পরিচর্যা করতে হতো। বাতিঘরের কার্যকারিতা শুধু ভবন বা বাতির ওপর নির্ভর করত না; নিয়মিত মানুষের শ্রমও অপরিহার্য ছিল। সমুদ্রের কাছে লবণাক্ত বাতাস ও আবহাওয়া সেই কাজকে আরও কঠিন করত।

প্রথম রক্ষক ছিলেন রবার্ট ওয়াটসন। তিনি প্রথম নৌবহরের এইচএমএস সিরিয়াসে কাজ করেছিলেন এবং পরে বন্দর প্রশাসনের সঙ্গেও যুক্ত হন। তাঁর নাম থেকেই কাছের ওয়াটসনস বে নামটি এসেছে। বাতিঘরের কর্মজীবনে সমুদ্রসম্পর্কিত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ আলোর ব্যবহার বুঝতে নৌযাত্রার বাস্তবতা জানা দরকার। পরবর্তী প্রজন্মের রক্ষকেরাও এই কেন্দ্রে দীর্ঘদিন কাজ করেন। ভবনগুলোর আবাসিক ব্যবহারে পরিবার, কাজের সময়সূচি এবং সরকারি দায়িত্ব একই পরিসরে মিলিত হয়েছিল।

প্রথম টাওয়ারের দুর্বলতা খুব তাড়াতাড়ি প্রকাশ পায়। স্থানীয় বেলেপাথরের মান দীর্ঘস্থায়ী নির্মাণের জন্য যথেষ্ট ভালো ছিল না। ১৮২২ সালেই জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হয়; পরে আরও সংস্কার করতে হয়। টাওয়ার ধরে রাখতে লোহার বন্ধনীও বসানো হয়েছিল। সুন্দর নকশা মানেই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো নয়—উপকরণের মান সমান গুরুত্বপূর্ণ, যা এই ইতিহাসে স্পষ্ট। উনিশ শতকের শেষভাগে ক্ষয় এত বাড়ে যে মেরামতের পাশাপাশি সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

নৌনিরাপত্তার দিক থেকেও একটিমাত্র বাতিঘর যথেষ্ট ছিল না। ১৮৫৭ সালের আগস্টে ডানবার জাহাজ সাউথ হেডের পাথুরে উপকূলে বিধ্বস্ত হয়; ১২১ জন প্রাণ হারান। প্রবল আবহাওয়ায় বন্দরের প্রবেশপথ শনাক্ত করার সমস্যা এই বিপর্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঘটনাটি দেখায়, দূর থেকে উপকূল চিনতে সাহায্য করা আলো এবং সরাসরি বন্দরপ্রবেশ নির্দেশ করার সংকেতের কাজ আলাদা। পরের বছর প্রবেশমুখের কাছে হর্নবি বাতিঘর চালু হয়। তাই ম্যাককোয়ারির ইতিহাস বৃহত্তর নৌসংকেত ব্যবস্থার সঙ্গেই বিবেচনা করতে হয়।

১৮৭০-এর দশকে পুরোনো টাওয়ারের কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে নতুন আলোকপ্রযুক্তির প্রয়োজন যুক্ত হয়। বড় ও উন্নত লেন্স পুরোনো আলোককক্ষে বসানো সম্ভব হচ্ছিল না। নতুন ভবনের নকশা করেন ঔপনিবেশিক স্থপতি জেমস বারনেট। তিনি গ্রিনওয়ের পরিচিত অবয়ব বজায় রাখলেও অনুপাত, আলোককক্ষ ও বিভিন্ন স্থাপত্যাংশে পরিবর্তন আনেন। ফলে বর্তমান ভবনটি পুরোনোটির হুবহু অনুলিপি নয়; ঐতিহাসিক নকশার প্রতি সম্মান রেখে নতুন প্রযুক্তির উপযোগী করা একটি স্থাপনা।

১৮৮৩ সালে নতুন বাতিঘর চালু হয়। এটি পুরোনো টাওয়ার থেকে চার মিটারেরও কম দূরে নির্মিত হয়েছিল। কিছু সময় দুটি বাতিঘর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল; পরে প্রথমটি সরিয়ে ফেলা হয়। নতুন কেন্দ্র প্রস্তুত হওয়ার আগে পুরোনো আলো বন্ধ না করার ব্যবস্থা নৌসেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিল। সেই সময়ের ছবিতে দুই টাওয়ারের উপস্থিতি নির্মাণপর্বের একটি অসাধারণ দলিল। প্রায় ২৬ মিটার উঁচু বর্তমান টাওয়ার তার পূর্বসূরির স্থাপত্যপরিচয় ধরে রেখেও অধিক উন্নত কার্যক্রমের সুযোগ দেয়।

নতুন কেন্দ্রে বড় লেন্স ও বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা ছিল। তখন শহরের সাধারণ বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে আলো চালানোর যুগ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি; নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থা দরকার হতো। তবে প্রযুক্তির পরিবর্তন সব সময় সরলভাবে একদিকে এগোয়নি। ১৯১২ সালে ব্যয় ও পরিচালনার সুবিধার জন্য বৈদ্যুতিক আলোর পরিবর্তে কেরোসিনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৩৩ সালে আবার বিদ্যুতে ফিরে আসে কেন্দ্রটি। এই পরিবর্তন দেখায়, নৌসংকেতের সিদ্ধান্তে উজ্জ্বলতার পাশাপাশি খরচ, কর্মীসংখ্যা এবং নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচিত হতো।

১৯১৫ সালে কেন্দ্রের নৌসংকেত পরিচালনা কমনওয়েলথ বাতিঘর পরিষেবার অধীনে যায়। পরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসারে রক্ষকদের ভূমিকা বদলায়। ১৯৭৬ সালে আলো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হলেও কিছু কর্মী পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেখানে থাকতেন। ১৯৮৯ সালে শেষ বাতিঘররক্ষক স্থানটি ছেড়ে যান। বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা ও দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণ মানুষের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির প্রয়োজন কমিয়ে দেয়। কিন্তু আবাসিক রক্ষক না থাকলেও বাতিঘরের নৌসংকেত হিসেবে কাজ শেষ হয়নি।

পুরোনো প্রাঙ্গণের অবশিষ্ট পাথরের দেয়াল, রক্ষকদের ভবন এবং বারনেটের টাওয়ার আজ বিভিন্ন যুগের সাক্ষ্য বহন করে। সংরক্ষণে শুধু সাদা টাওয়ারের বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, প্রথম কেন্দ্রের অবশেষও গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাককোয়ারি বাতিঘরের প্রতীক বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয়েও স্থান পেয়েছে। এটি সিডনির সমুদ্রনির্ভর সূচনা, দণ্ডিত স্থপতির অবদান এবং নৌপ্রযুক্তির পরিবর্তনকে একত্রে মনে করায়। অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীনতম বাতিঘরকেন্দ্রের শক্তি তার অপরিবর্তিত ভবনে নয়, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বদলে গিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে।