তৃতীয় বিশ্বের প্রক্সি যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র–সোভিয়েত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৈশ্বিক যুদ্ধক্ষেত্র
সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত
পরাশক্তির লড়াইয়ে বিধ্বস্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ায়নি। উভয় দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকায় এমন যুদ্ধ পারস্পরিক ধ্বংস ডেকে আনতে পারত। কিন্তু এই সতর্কতা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ, সীমান্তবিরোধ এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে দুই পরাশক্তি বিপরীত পক্ষকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও রাজনৈতিক সমর্থন দিতে থাকে। মস্কো ও ওয়াশিংটন নিজেদের ভূখণ্ড নিরাপদ রেখে অন্য দেশের মাটিতে প্রভাব বিস্তারের যে সংঘাত চালিয়েছিল, সেটিই স্নায়ুযুদ্ধের প্রক্সি যুদ্ধের প্রধান রূপ।
‘তৃতীয় বিশ্ব’ শব্দটি মূলত এমন দেশগুলোকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, যারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শিবির বা সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের কোনোটির আনুষ্ঠানিক সদস্য ছিল না। এদের বহু দেশ সদ্য ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হয়েছিল। দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কৃত্রিম সীমান্ত, অসম ভূমিবণ্টন, জাতিগত বিরোধ, দারিদ্র্য এবং বিদেশি কোম্পানির অর্থনৈতিক প্রভাব তাদের অস্থিতিশীল করে রেখেছিল। স্থানীয় সংঘাতের এসব বাস্তব কারণকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই কমিউনিজমের বিস্তার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লব হিসেবে ব্যাখ্যা করত।
তবে এসব দেশের নেতা ও আন্দোলনগুলো নিছক পরাশক্তির পুতুল ছিল না। তারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী, সামাজিক, ধর্মীয় বা অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য বাইরের সহায়তা গ্রহণ করত এবং কখনো এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে সরে যেত। অনেক নেতা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে অস্ত্র, ঋণ বা উন্নয়ন সহায়তা আদায় করেছিলেন। তাই প্রক্সি যুদ্ধ ছিল শুধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সংঘাত নয়; স্থানীয় বিরোধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যুদ্ধগুলোকে দীর্ঘ ও বিধ্বংসী করেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিযোগিতা তেল, সুয়েজ খাল, ইসরায়েল–আরব বিরোধ এবং ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। মিসরের গামাল আবদেল নাসের কোনো পরাশক্তির অধীন হতে চাননি। যুক্তরাষ্ট্র আসওয়ান বাঁধের অর্থায়ন প্রত্যাহার করলে তিনি ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ ও ফরাসি মালিকানাধীন সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল, ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিসর আক্রমণ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভিন্ন কারণে এই অভিযান থামানোর চাপ দিলে আক্রমণকারীরা সরে যায়। নাসের আরব জাতীয়তাবাদের নায়কে পরিণত হন এবং মিসর সোভিয়েত অস্ত্র ও অর্থনৈতিক সহায়তার দিকে আরও ঝুঁকে পড়ে।
আরব–ইসরায়েল সংঘাতও পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে ইসরায়েলের প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থক হয়ে ওঠে, আর সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসর, সিরিয়া ও ইরাকসহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্রকে অস্ত্র ও উপদেষ্টা দেয়। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের দ্রুত বিজয় সোভিয়েত-সমর্থিত আরব বাহিনীর বড় পরাজয় ছিল। এরপর মস্কো মিসর ও সিরিয়াকে পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত করে, আর ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে উন্নত অস্ত্র সরবরাহ বাড়ায়। আঞ্চলিক বিরোধটি এভাবে দুই পরাশক্তির প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদার পরীক্ষায় পরিণত হয়।
১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর বা অক্টোবর যুদ্ধে মিসর ও সিরিয়া অধিকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে ইসরায়েলে আক্রমণ চালায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন আরব মিত্রদের অস্ত্র পাঠায়, যুক্তরাষ্ট্র জরুরি আকাশপথে ইসরায়েলকে সরঞ্জাম সরবরাহ করে। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সোভিয়েত সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র নিজের পারমাণবিক বাহিনীর সতর্কতা বাড়ায়। স্থানীয় যুদ্ধ দ্রুত পরাশক্তির মুখোমুখি সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল। একই সঙ্গে আরব তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দাম ও জ্বালানি সংকটের বড় ধাক্কা দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু কমিউনিজম নয়, তেল সরবরাহ, সমুদ্রপথ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার রক্ষাকেও অগ্রাধিকার দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন অস্ত্রচুক্তি, বন্দর ব্যবহারের সুযোগ এবং আরব জাতীয়তাবাদী সরকারগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু আনোয়ার সাদাতের নেতৃত্বে মিসর সোভিয়েত উপদেষ্টাদের সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়লে বোঝা যায়, আঞ্চলিক নেতারা স্থায়ীভাবে কোনো একটি শিবিরের অধীন ছিলেন না। মিসর পরে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে এবং ওয়াশিংটনের প্রধান আরব মিত্রে পরিণত হয়।
আফ্রিকায় উপনিবেশমুক্তির ঢেউ স্নায়ুযুদ্ধের জন্য অসংখ্য নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। ১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর কঙ্গো দ্রুত বিদ্রোহ, সেনাবাহিনীর ভাঙন এবং খনিজসমৃদ্ধ কাতাঙ্গা প্রদেশের বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তায় সন্তুষ্ট না হয়ে সোভিয়েত সাহায্য চান। ওয়াশিংটন তাঁকে সম্ভাব্য কমিউনিস্ট মিত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। সেনাপ্রধান জোসেফ মোবুতুর ক্ষমতা দখল এবং ১৯৬১ সালে লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বেলজীয় স্বার্থ ও পশ্চিমা গোপন তৎপরতা একত্রে কাজ করেছিল।
পরে মোবুতু দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পান, যদিও তাঁর শাসন দুর্নীতি, দমননীতি ও ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের জন্য কুখ্যাত ছিল। তাঁর প্রধান কৌশলগত যোগ্যতা ছিল কমিউনিজমবিরোধিতা। কঙ্গোর ঘটনা দেখিয়ে দেয়, স্নায়ুযুদ্ধের আনুগত্য মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে পরাশক্তিরা স্বৈরশাসকদেরও গ্রহণযোগ্য মিত্রে পরিণত করেছিল। একই ধরনের যুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়নও নিজেদের অনুগত একদলীয় ও দমনমূলক সরকারকে সমর্থন দিয়েছে।
আফ্রিকার সবচেয়ে দীর্ঘ প্রক্সি সংঘাতগুলোর একটি ছিল অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধ। ১৯৭৫ সালে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের আগে থেকেই এমপিএলএ, ইউনিটা ও এফএনএলএ নামের তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী স্বাধীনতা আন্দোলন ক্ষমতার জন্য লড়ছিল। মার্কসবাদী এমপিএলএ সোভিয়েত অস্ত্র ও হাজার হাজার কিউবান সেনার সহায়তা পায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বিভিন্ন সময়ে চীনও এমপিএলএ-বিরোধী শক্তিকে সহায়তা করে; পরে ইউনিটার নেতা জোনাস সাভিম্বি মার্কিন সমর্থনের প্রধান সুবিধাভোগী হন।
অ্যাঙ্গোলায় স্থানীয় জাতিগত, আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত ক্ষমতার বিরোধ বৈশ্বিক আদর্শিক সংঘাতে মিশে যায়। কিউবা নিজের হস্তক্ষেপকে আফ্রিকার স্বাধীনতা ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করত, আর যুক্তরাষ্ট্র এমপিএলএকে সোভিয়েত সম্প্রসারণের হাতিয়ার মনে করত। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার অ্যাঙ্গোলায় এমন শক্তির উত্থান ঠেকাতে চেয়েছিল, যারা প্রতিবেশী নামিবিয়ার স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে আশ্রয় দিচ্ছিল। যুদ্ধটি কয়েক দশক ধরে চলে, বিপুল মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয় এবং ভূমিমাইন দেশটির দীর্ঘস্থায়ী বিপদে পরিণত হয়।
আফ্রিকার শিং অঞ্চলেও জোট বদলের নাটকীয় উদাহরণ দেখা যায়। প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন সোমালিয়াকে সমর্থন করলেও ১৯৭৪ সালের বিপ্লবের পর ইথিওপিয়ার মার্কসবাদী দের্গ সরকার মস্কোর কাছাকাছি আসে। ১৯৭৭ সালে সোমালিয়া ইথিওপিয়ার ওগাদেন অঞ্চল দখলের চেষ্টা করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুরোনো মিত্রকে ছেড়ে ইথিওপিয়াকে সমর্থন করে। কিউবান সেনা, সোভিয়েত অস্ত্র ও সামরিক উপদেষ্টার সাহায্যে ইথিওপিয়া সোমালি বাহিনীকে পিছু হটায়। এরপর সোমালিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আদর্শিক আনুগত্যের ভাষার আড়ালে সামরিক ঘাঁটি, ভূগোল ও কৌশলগত সুবিধাই প্রায়ই জোট নির্ধারণ করত।
মোজাম্বিক, নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের স্বাধীনতা সংগ্রামেও একই জটিলতা দেখা যায়। কিছু আন্দোলন সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিউবা বা চীনের সহায়তা নেয়; পশ্চিমা দেশ বা দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার তাদের বিরোধী শক্তিকে সমর্থন করে। পরাশক্তির অস্ত্র ও অর্থ স্থানীয় আন্দোলনকে টিকে থাকতে সাহায্য করলেও শান্তি আলোচনার প্রয়োজন কমিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করত। বিজয়ের সম্ভাবনা না থাকলেও প্রতিটি পক্ষ বিশ্বাস করত, বিদেশি সহায়তা চালু থাকলে সামরিকভাবে পরিস্থিতি পাল্টানো সম্ভব।
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত প্রভাবকে নিজের নিকটবর্তী নিরাপত্তা অঞ্চলের হুমকি হিসেবে দেখত। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হাকোবো আরবেন্স ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে অব্যবহৃত বৃহৎ জমি অধিগ্রহণ করলে মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁকে কমিউনিস্ট প্রভাবাধীন হিসেবে উপস্থাপন করে সিআইএ একটি ছোট নির্বাসিত বাহিনী, গোপন প্রচারণা ও সামরিক চাপের মাধ্যমে তাঁর পতনে সহায়তা করে। অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত কয়েক দশকের গৃহযুদ্ধ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে রূপ নেয়।
১৯৫৯ সালের কিউবার বিপ্লব লাতিন আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেয়। ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোট গঠন করে এবং বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত বা সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি অঞ্চলের সরকারগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বিদ্রোহ দমনের সহায়তা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য, ভূমিহীনতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে এককভাবে ‘কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগ সংকুচিত হয়ে সশস্ত্র সংঘাতের পথ খুলে যায়।
চিলিতে ১৯৭০ সালে সালভাদর আয়েন্দে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সরকারকে দুর্বল করতে বিরোধী দল, প্রচারণা ও অর্থনৈতিক চাপের পেছনে গোপন ভূমিকা রাখে। ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে আয়েন্দের মৃত্যু এবং জেনারেল অগাস্টো পিনোশের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পিনোশের সরকার কমিউনিজমবিরোধী হলেও বিরোধীদের হত্যা, নির্যাতন ও গুম করে। স্নায়ুযুদ্ধের নিরাপত্তা-যুক্তি আবারও গণতান্ত্রিক বৈধতা ও মানবাধিকারের ওপর স্থান পায়।
নিকারাগুয়ায় ১৯৭৯ সালে সান্দিনিস্তা বিপ্লব দীর্ঘদিনের মার্কিনসমর্থিত সোমোসা স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়। নতুন সরকার কিউবা ও সোভিয়েত শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুললে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসন ‘কনট্রা’ বিদ্রোহীদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয়। কনট্রা ও সরকারি বাহিনীর যুদ্ধে গ্রামীণ জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন কংগ্রেস সহায়তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অর্থ কনট্রাদের দেওয়ার ব্যবস্থা করেন; ঘটনাটি পরে ইরান–কনট্রা কেলেঙ্কারি হিসেবে প্রকাশিত হয়।
এল সালভাদরেও বামপন্থী গেরিলা জোটের বিরুদ্ধে সরকার ও সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সহায়তা পায়। সোভিয়েত শিবির সরাসরি বা কিউবা ও নিকারাগুয়ার মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সহায়তা করত। যুদ্ধের সময় সরকারি বাহিনী ও ডানপন্থী মৃত্যুদল ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়, আর গেরিলাদের বিরুদ্ধেও অপহরণ ও সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। লক্ষাধিক মানুষ দেশত্যাগ করে। পরাশক্তির সহায়তা যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে এমন সামর্থ্য দেয়, যা নিজেদের সম্পদে দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব হতো না।
প্রক্সি যুদ্ধের একটি সুবিধা ছিল পরাশক্তির জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা। অর্থ, অস্ত্র বা উপদেষ্টা পাঠানো সরাসরি মার্কিন ও সোভিয়েত বাহিনীকে মুখোমুখি করার চেয়ে নিরাপদ ও কম ব্যয়বহুল ছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের দেশগুলোর জন্য খরচ ছিল বিপর্যয়কর। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও ভূমিমাইন স্থানীয় বিরোধের ধ্বংসক্ষমতা বাড়ায়। স্কুল, হাসপাতাল, কৃষিজমি ও পরিবহনব্যবস্থা নষ্ট হয়; দুর্ভিক্ষ, শরণার্থী সংকট এবং শিশু সেনার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ শেষে অস্ত্র ও সামরিকীকৃত রাজনীতি সমাজে রয়ে যায়।
এসব সংঘাতকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র–সোভিয়েত দ্বন্দ্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে। ভূমি সংস্কার, জাতিগত পরিচয়, ঔপনিবেশিক সীমান্ত, ধর্মীয় বিরোধ, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল বাস্তব ও স্থানীয়। পরাশক্তিরা এসব সমস্যার সৃষ্টি সব ক্ষেত্রে করেনি, কিন্তু নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে সংঘাতগুলোকে ব্যবহার ও তীব্র করেছে। একইভাবে স্থানীয় নেতারাও বিদেশি সহায়তা পাওয়ার জন্য নিজেদের প্রতিপক্ষকে ‘কমিউনিস্ট’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
তৃতীয় বিশ্বের প্রক্সি যুদ্ধ ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে বড় মানবিক মূল্য বহনকারী অধ্যায়। ওয়াশিংটন ও মস্কোর কাছে এগুলো মানচিত্রে প্রভাব বিস্তার, সামরিক ঘাঁটি অর্জন এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার সুযোগ ছিল; কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে তা ছিল নিহত স্বজন, ধ্বংস হওয়া বাড়ি, অনাহার, নির্যাতন ও নির্বাসনের বাস্তবতা। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিতে বিদেশি সহায়তা কমলেও বহু দেশে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সামরিক শাসন, অবিস্ফোরিত মাইন ও সামাজিক বিভাজন থেকে যায়। পরাশক্তির লড়াই শেষ হয়েছিল, কিন্তু তাদের দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে তৈরি ক্ষত বহু প্রজন্ম ধরে বেঁচে ছিল।
ভালকান: আগুনের দেবতা, দৈব অস্ত্রনির্মাতা ও আগ্নেয়গিরির কিংবদন্তি
ডায়ানা: চাঁদ, শিকার, বনভূমি ও নারীদের রক্ষাকর্ত্রী রোমান দেবী
মার্কারি ও অ্যাপোলো: বাণিজ্য, ভবিষ্যদ্বাণী, সংগীত ও চিকিৎসার দেবতা
প্লুটো ও রোমান পাতালজগৎ: মৃত্যুর পর আত্মার যাত্রা ও বিচারের বিশ্বাস
নেপচুন: সমুদ্র, ঘোড়া ও ভূমিকম্পের রোমান দেবতার পৌরাণিক জগৎ
ভেনাস: প্রেমের দেবী থেকে এনিয়াস ও জুলিয়াস সিজারের বংশমাতা