সিআইএ ও কেজিবি: স্নায়ুযুদ্ধের গুপ্তচরবৃত্তি, গোপন অভিযান ও তথ্যযুদ্ধ
সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত
ছায়ার আড়ালে সিআইএ ও কেজিবির গোপন যুদ্ধ
স্নায়ুযুদ্ধকে সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্র, সামরিক জোট, প্রক্সি যুদ্ধ ও মহাকাশ প্রতিযোগিতার ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সংঘাতের একটি বড় অংশ চলেছিল এমন জগতে, যেখানে সৈন্যরা ইউনিফর্ম পরত না, যুদ্ধ ঘোষিত হতো না এবং সাফল্যের খবর কখনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো না। দূতাবাস, গবেষণাগার, সরকারি দপ্তর, অন্ধকার রাস্তা, গোপন রেডিও ও সাংকেতিক নথির ভেতর দিয়ে চলা এই লড়াইয়ের প্রধান দুই প্রতিষ্ঠান ছিল মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা সিআইএ এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা কেজিবি। তাদের লক্ষ্য শুধু গোপন তথ্য সংগ্রহ করা ছিল না; বিদেশি সরকার, নির্বাচন, গণমাধ্যম, বিদ্রোহ ও জনমতকে প্রভাবিত করাও ছিল এই ছায়াযুদ্ধের অংশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সেবা দপ্তর শত্রু অঞ্চলে গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা ও প্রতিরোধ আন্দোলনকে সহায়তা করেছিল। যুদ্ধশেষে সেটি বিলুপ্ত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বিরোধ বাড়তে থাকায় একটি স্থায়ী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সিআইএ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি বিদেশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির নির্দেশে এমন গোপন অভিযান পরিচালনা করত, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ্যে অস্বীকার করা সম্ভব।
সোভিয়েত গোয়েন্দা ব্যবস্থার ইতিহাস আরও পুরোনো। বলশেভিক বিপ্লবের পর চেকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বিরোধী দমন ও বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে এসব দায়িত্ব একত্র করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কমিটি বা কেজিবি গঠন করা হয়। কেজিবি বিদেশে তথ্য সংগ্রহ, পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সোভিয়েত নাগরিকদের ওপর নজরদারি করত। ফলে এটি শুধু বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ছিল না; নিজের দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ রক্ষারও অন্যতম প্রধান যন্ত্র ছিল।
দুই সংস্থাই মূলত মানবসূত্র ও প্রযুক্তিগত নজরদারির ওপর নির্ভর করত। মানবসূত্র বলতে বিদেশি সরকার, সেনাবাহিনী, বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান বা গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ করা বোঝাত, যিনি গোপনে তথ্য সরবরাহ করবেন। অর্থ, আদর্শ, প্রতিশোধ, ভয় বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে এজেন্ট সংগ্রহ করা হতো। তাঁদের সঙ্গে নিরাপদ বাড়ি, গোপন সংকেত, ছদ্মনাম, ক্ষুদ্র ক্যামেরা, অদৃশ্য কালি এবং নির্জন স্থানে লুকিয়ে রাখা ‘ডেড ড্রপ’-এর মাধ্যমে যোগাযোগ চলত। ধরা পড়লে এজেন্টের কারাদণ্ড, নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ড হতে পারত।
সোভিয়েত গোয়েন্দাদের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি এজেন্ট স্থাপন। ব্রিটেনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কমিউনিজমে বিশ্বাসী কয়েকজন তরুণকে সোভিয়েত গোয়েন্দারা নিয়োগ করেছিল। পরে কিম ফিলবি, গাই বার্জেস, ডোনাল্ড ম্যাকলিন, অ্যান্থনি ব্লান্ট ও জন কেয়ার্নক্রস ব্রিটিশ কূটনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছান। তাঁরা মস্কোকে পশ্চিমা পরিকল্পনা, এজেন্ট ও গোপন নথি সরবরাহ করেন। বিশেষত ফিলবি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থায় সোভিয়েতবিরোধী কার্যক্রমের কাছাকাছি থেকে বহু পশ্চিমা অভিযান ব্যর্থ করতে সাহায্য করেছিলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন পারমাণবিক কর্মসূচির তথ্যও সংগ্রহ করেছিল। ম্যানহাটন প্রকল্পে যুক্ত ক্লাউস ফুকসসহ কয়েকজন ব্যক্তি মস্কোকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য দেন, যা সোভিয়েত পরমাণু বোমা নির্মাণ দ্রুততর করতে সহায়তা করে। জুলিয়াস ও এথেল রোজেনবার্গের মামলাও মার্কিন সমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত গুপ্তচরচক্রে যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে এবং ১৯৫৩ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মামলাটি প্রকৃত নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিস্ট আতঙ্ক, সন্দেহ ও ম্যাকার্থিবাদী পরিবেশকে আরও তীব্র করেছিল।
পশ্চিমা সংস্থাগুলোও সোভিয়েত ব্যবস্থার ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তৈরি করে। সোভিয়েত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কর্নেল ওলেগ পেনকোভস্কি ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রকে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক নীতি ও পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিপুল তথ্য দেন। তাঁর সরবরাহ করা নথি থেকে পশ্চিমারা বুঝতে পারে যে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্রশক্তি ক্রুশ্চেভের প্রকাশ্য দাবির তুলনায় সীমিত। কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্য ও প্রস্তুতির সময় মূল্যায়নেও এই তথ্য সহায়ক হয়। পেনকোভস্কি পরে ধরা পড়েন এবং রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পান।
বার্লিন ছিল এই গুপ্তচরযুদ্ধের প্রধান কেন্দ্র। বিভক্ত শহরটিতে পূর্ব ও পশ্চিমের সামরিক, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান খুব কাছাকাছি অবস্থান করত। ১৯৫০-এর দশকে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা পশ্চিম বার্লিন থেকে একটি গোপন সুড়ঙ্গ খনন করে পূর্ব বার্লিনের নিচ দিয়ে যাওয়া সোভিয়েত সামরিক যোগাযোগের তারে শ্রবণযন্ত্র স্থাপন করে। ‘অপারেশন গোল্ড’ নামে পরিচিত এই অভিযান থেকে হাজার হাজার কথোপকথন সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জর্জ ব্লেক আগে থেকেই কেজিবিকে পরিকল্পনাটি জানিয়েছিলেন। সোভিয়েতরা নিজেদের সূত্র রক্ষার জন্য কিছু সময় অভিযান চলতে দেয় এবং পরে নাটকীয়ভাবে সুড়ঙ্গটি আবিষ্কার করে।
প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা তৎপরতা দ্রুত মানবসূত্রের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র উচ্চতায় উড়তে সক্ষম ইউ-২ বিমান দিয়ে সোভিয়েত সামরিক ঘাঁটি, বিমানক্ষেত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ছবি তুলত। শুরুতে ধারণা ছিল সোভিয়েত আকাশ প্রতিরক্ষা এত উঁচুতে বিমান ভূপাতিত করতে পারবে না। কিন্তু ১৯৬০ সালের ১ মে ফ্রান্সিস গ্যারি পাওয়ার্সের ইউ-২ সোভিয়েত ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। পাইলট জীবিত অবস্থায় বন্দী হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া গবেষণার প্রাথমিক দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং প্যারিস শীর্ষ সম্মেলন ভেঙে পড়ে।
অন্যদিকে ইউ-২-এর তোলা ছবিই ১৯৬২ সালে কিউবায় সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছিল। বিশ্লেষকেরা ছবিতে ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহনযান, উৎক্ষেপণস্থল ও নির্মাণের ধরন মিলিয়ে হুমকি নির্ধারণ করেন। এই তথ্য ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কার্যকর হওয়ার আগে জানতে পারত না। পরে গুপ্তচর উপগ্রহ দূরবর্তী অঞ্চল পর্যবেক্ষণের আরও নিরাপদ উপায় এনে দেয়। ছবি, রেডিও সংকেত, রাডার ও যোগাযোগ থেকে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অস্ত্রসংখ্যা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়। গোয়েন্দা তথ্য কখনো উত্তেজনা বাড়িয়েছে, আবার অতিরঞ্জিত আশঙ্কা সংশোধন করে যুদ্ধ ঠেকাতেও সাহায্য করেছে।
গুপ্তচরবৃত্তি ও গোপন রাজনৈতিক অভিযান এক বিষয় ছিল না। তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সিআইএ বিদেশি সরকারের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের কাজে যুক্ত হয়। ১৯৫৩ সালে ইরানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা প্রচারণা, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বিক্ষোভ সংগঠনে ভূমিকা রাখে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট হাকোবো আরবেন্সের সরকারের বিরুদ্ধে সিআইএ-সমর্থিত অভিযান পরিচালিত হয়। একটি ছোট বিদ্রোহী বাহিনী, রেডিও প্রচারণা ও সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের ভীতি সৃষ্টি করে সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে সিআইএ-প্রশিক্ষিত নির্বাসিতদের বে অব পিগসে নামানো হলেও অভিযান ব্যর্থ হয়। পরে নাশকতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং কাস্ত্রোকে হত্যার নানা পরিকল্পনা নিয়ে ‘অপারেশন মঙ্গুস’ পরিচালিত হয়। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দের নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরোধীদের অর্থায়ন, রাজনৈতিক চাপ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে সিআইএ ভূমিকা রাখে; ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর অগাস্টো পিনোশের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে কমিউনিজম নিয়ন্ত্রণে সাময়িক সুবিধা দিলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি তার ঘোষিত অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কেজিবি ও সোভিয়েত রাষ্ট্রও বিদেশি কমিউনিস্ট দল, মিত্র সরকার, বিপ্লবী আন্দোলন ও গোয়েন্দা সংস্থাকে অর্থ, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিত। পূর্ব ইউরোপে মস্কোপন্থী সরকার রক্ষা, বিরোধীদের নজরদারি এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অনুসরণে কেজিবি সক্রিয় ছিল। তৃতীয় বিশ্বের উপনিবেশবিরোধী ও বামপন্থী আন্দোলনকে সোভিয়েত সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে শক্তিশালী করলেও মস্কো এসব সম্পর্ককে নিজের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর উপায় হিসেবেও ব্যবহার করত। আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের পর কেজিবি মিত্র সরকার ও নিরাপত্তা কাঠামো পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গোপন অভিযান শুধু শাসন পরিবর্তন বা অস্ত্র সরবরাহে সীমাবদ্ধ ছিল না। সোভিয়েত ‘সক্রিয় ব্যবস্থা’র মধ্যে জাল নথি, মিথ্যা সংবাদ, গুজব, সম্মুখ সংগঠন এবং শান্তি বা শ্রমিক আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি, ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে বিভেদ ঘটানো এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা। সিআইএও গোপনে সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা, ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিস্টবিরোধী বুদ্ধিজীবীদের অর্থায়ন করত। কিছু লেখক ও সংগঠন জানত তারা মার্কিন অর্থ পাচ্ছে, আবার অনেকে প্রকৃত উৎস সম্পর্কে অবগত ছিল না।
রেডিও তথ্যযুদ্ধের শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে। রেডিও ফ্রি ইউরোপ ও রেডিও লিবার্টি পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে খবর, রাজনৈতিক আলোচনা এবং নিষিদ্ধ তথ্য সম্প্রচার করত। মস্কো এসব সংকেত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করত। অন্যদিকে সোভিয়েত আন্তর্জাতিক সম্প্রচার পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবৈষম্য ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমালোচনা প্রচার করত। উভয় পক্ষই নিজেদের জীবনব্যবস্থাকে উন্নত, ন্যায়সংগত ও ভবিষ্যতমুখী হিসেবে তুলে ধরতে চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সংবাদ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ব্যবহার করেছিল। তথ্যযুদ্ধে সত্য, নির্বাচিত সত্য, অতিরঞ্জন ও সম্পূর্ণ মিথ্যা একই সঙ্গে অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি ছিল আরও জটিল। প্রতিটি সংস্থা নিজের ভেতরে শত্রুর অনুপ্রবেশ নিয়ে আতঙ্কিত থাকত। সন্দেহভাজন কর্মীদের ওপর নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ ও বিশ্বস্ততা পরীক্ষা চালানো হতো। কখনো ধরা পড়া গুপ্তচরকে দ্বৈত এজেন্ট বানিয়ে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাঠানো হতো। আবার ভুল সন্দেহের কারণে নির্দোষ ব্যক্তির কর্মজীবন নষ্ট হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সত্যিকারের গুপ্তচর দীর্ঘদিন আড়ালে থেকেছে। সিআইএর কর্মকর্তা অ্যালড্রিচ এমস এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার রবার্ট হ্যানসেন অর্থের বিনিময়ে মস্কোকে তথ্য দিয়ে বহু পশ্চিমা অভিযানের ক্ষতি করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সোভিয়েত ব্যবস্থার ভেতরে থাকা একাধিক মার্কিন সূত্র ধরা পড়ে বা মৃত্যুদণ্ড পায়।
সিআইএ ও কেজিবির প্রতিযোগিতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্ধকার দিকও প্রকাশ করে। গোপনীয়তার আড়ালে আইনের সীমা লঙ্ঘন, রাজনৈতিক হত্যা নিয়ে পরিকল্পনা, অননুমোদিত নজরদারি, নির্যাতন এবং মানবদেহে বিতর্কিত পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সিআইএর এমকে-আল্ট্রা কর্মসূচিতে মাদক ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে গোপন পরীক্ষা নৈতিক কেলেঙ্কারিতে পরিণত হয়। কেজিবি নিজ দেশে ভিন্নমতাবলম্বী, লেখক ও মানবাধিকারকর্মীদের নজরদারি, হয়রানি, নির্বাসন বা মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখতে সহায়তা করত। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি প্রায়ই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর স্থান পেয়েছিল।
তবু গোয়েন্দা কার্যক্রমকে শুধু ষড়যন্ত্র ও শাসন পরিবর্তনের ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর আরেকটি ভূমিকা অদৃশ্য থাকে। প্রতিপক্ষের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য নেতাদের অনিশ্চয়তা কমাতে পারত। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি যাচাই, আকস্মিক আক্রমণের প্রস্তুতি শনাক্ত এবং সংকটের সময় ভুল ধারণা সংশোধনে গোয়েন্দা তথ্য জরুরি ছিল। তবে কাঁচা তথ্য সব সময় নির্ভুল ছিল না; বিশ্লেষকের পক্ষপাত, রাজনৈতিক চাপ কিংবা প্রতিপক্ষের প্রতারণা থেকে ভুল সিদ্ধান্তও তৈরি হয়েছে।
সিআইএ ও কেজিবির গোপন যুদ্ধ স্নায়ুযুদ্ধকে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং আরও বিপজ্জনক করেছে। গুপ্তচরদের তথ্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকাতে সাহায্য করেছে, আবার গোপন অভিযান সরকার পতন, স্বৈরশাসন ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পথও খুলেছে। প্রচারণা মানুষকে তথ্য দিয়েছে, একই সঙ্গে সত্যকে বিভ্রান্তির ভেতর ঢেকে দিয়েছে। দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও অন্য দেশের নির্বাচন, রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। তাই স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাস শুধু প্রকাশ্য ভাষণ ও সামরিক মোকাবিলার নয়; এটি এমন অসংখ্য অদৃশ্য সিদ্ধান্তের ইতিহাস, যেগুলোর ছায়া বহু দেশের রাজনীতি ও মানুষের জীবনে আজও রয়ে গেছে।
রোমুলাসের রহস্যময় অন্তর্ধান: প্রথম রাজা থেকে দেবতা কুইরিনাস
স্যাবাইন নারীদের অপহরণ: রোমের সংঘর্ষ ও ঐক্যের পৌরাণিক কাহিনি
রোমের জন্ম ও রেমাসের মৃত্যু: রোমুলাসের ভ্রাতৃহত্যার কিংবদন্তি
মন্টে আলবান: পাহাড়চূড়ায় জাপোটেক সভ্যতার প্রাচীন রাজধানীর রহস্য
তেওতিহুয়াকান: মেক্সিকোর ‘দেবতাদের নগরী’ কে নির্মাণ করেছিল?
ওলমেক সভ্যতা: মেসোআমেরিকার প্রাচীন সংস্কৃতি ও বিশাল পাথরের মাথার রহস্য